print

ঠিকানার মুখোমুখি গায়ক ও অভিনেতা তাহসান

0

নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : তাহসান রহমান খান অত্যন্ত জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তার জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তিনি একাধারে কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। সেই সঙ্গে টিভির নাট্য অভিনেতা। সর্বশেষ নাম লিখিয়েছেন চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে। অনেক আগেই নাম লিখিয়েছেন মডেলিংয়ে। তাহসান যখন যে ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন, সাফল্য তাকে ছুঁয়ে গেছে। এ জন্য তাকে পরিশ্রম করতে হয়েছে অনেক। এখনো পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। একজন শিল্পী হিসেবে তার যেমন সাফল্য, সামাজিকভাবেও তিনি অনেক দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানেও তার সাফল্য রয়েছে। একসময় পারিবারিক জীবনেও তার সাফল্য ছিল। তাহসান-মিথিলা দম্পতিরও প্রশংসা ছিল সবার কাছে। কিন্তু হঠাৎই তারা সংসারজীবনের ইতি টানেন। তাদের এক সন্তান রয়েছে। এখন দুজন দুই ভুবনের বাসিন্দা। তা হলেও এখন সন্তানের জন্য তারা কো-প্যারেন্টিং করছেন। এটাকে যদিও কোনো সমস্যা মনে করেন না তাহসান খান। তিনি বলেন, এটা কোনো সমস্যা নয়। দুজনে মিলেই তাকে গড়ে তুলছি। বলেছেন, আমার সন্তানের মায়ের বিরুদ্ধে আমি কোনো বদনাম বলতে চাই না। সে আমার সন্তানের মা। আমি তাকে বলব অসাধারণ। তাহসানের ভক্তের সংখ্যা অনেক। এক ফেসবুকেই ফলোয়ার ৬৭ লাখ ১৮ হাজার ৭২৩ জন।
তাহসান গান করছেন প্রায় ১৪ বছর ধরে। এই সময়ের মধ্যে দুই শতাধিকের বেশি গান করেছেন। এর মধ্যে শতাধিক গান তার নিজের রচিত ও সুর করা। তার রয়েছে এ পর্যন্ত সাতটি সলো অ্যালবাম, ১০টি মিক্সড অ্যালবাম।
তাহসান রহমান খানের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগরে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইবিএতে লেখাপড়া করেছেন। এরপর মিনিসোটা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেছেন।
তাহসান রহমান খান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তিনি ঠিকানার সঙ্গে ২৩ জুলাই রাতে জ্যাকসন হাইটসে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেছেন অনেক কথা।
ঠিকানা : আপনার এবারের যুক্তরাষ্ট্রের সফর সম্পর্কে বলবেন কি?
তাহসান : এবার আমি তিন সপ্তাহের জন্য এসেছি। বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি, ২৯ জুলাই নিউইয়র্কে একক কনসার্ট আছে। ৫ আগস্ট ব্রঙ্কসে কনসার্ট আছে। এরপর আটলান্টায় যাব। পরে দেশে ফিরে যাব।
ঠিকানা : আপনার অন্যান্যবারের সফরের চেয়ে এবারের সফরটি কী কারণে ভিন্ন?
তাহসান : অন্য যতবারই আমি এখানে এসেছি, সেই সময়ে কোনোটি আমার একক কনসার্ট ছিল না। এবারই প্রথম নিউইয়র্কে একক লাইভ শো করছি। এ কারণে আমার খুব ভালো লাগছে। আশা করছি, দর্শক ও শ্রোতারা আমার জনপ্রিয় গানগুলোর পাশাপাশি আমার পছন্দের গানগুলো শুনতে পারবেন।
ঠিকানা : ২৯ জুলাইয়ের কনসার্টের গানগুলো কী বিবেচনায় বাছাই করেছেন?
তাহসান : এর আগে প্রায় ৮ বার আমেরিকায় এসেছি। যতবারই এসেছি অন্য আর্টিস্টদের সঙ্গে আমি গান করেছি। সেখানে হয়তো ৩-৫টি করে গান করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু দর্শক অনেক অনুরোধ করেছেন, যাতে আমি আরও গান করি। সময়স্বল্পতার কারণে করতে পারিনি। তাদের জন্য আমার খারাপ লাগত। আফসোস থেকে যেত যদি আরও গান করতে পারতাম। এর আগে আমি প্রথম আমেরিকায় আসি ২০০৬ সালে। তখন ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড নেওয়ার জন্যই এসেছিলাম। তখন পারফর্মও করেছি। ‘আলো’ গানের জন্য আমাকে অ্যাওয়ার্ড দিয়েছিল।
এবার আমি হয়তো দুই ঘণ্টা গান করার সময় পাব। প্রথম এক ঘণ্টা গান করব। এরপর একটু বিরতি দেব। আবার গান করব। গান করব ১০-১৫টির মতো। আমি ১৩-১৪ বছরে যত গান করেছি, এর মধ্যে অনেক গান বিভিন্ন সময়ে জনপ্রিয় হয়েছে, সেই সব গান করব। এ ছাড়া আমার নিজের প্রাণের কিছু গান আছে, সেসব গানও করব, যেগুলো দর্শকদের ভালো লাগবে। বাংলা গানগুলোই করব।
ঠিকানা : আপনি কি জানেন, কী কারণে আপনার এত জনপ্রিয়তা?
তাহসান : আমার জনপ্রিয়তার মূল কারণ হতে পারে দর্শক-শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায় এমন কিছু কাজ আমি করেছি। সব সময় সব ধরনের কাজ করি না। একটি ভালো কাজ সময় নিয়ে করতে হয়। সেই হিসেবে সময় নিয়েই কাজ করি। এটি একটি কারণ। এ ছাড়া ভক্তদের কাছে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে। আমি গান করার সময় মঞ্চ থেকে নেমে এসে দর্শক ও ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করি। এটা তারা পছন্দ করেন। এবারও ৪-৫টি গান করার পর অডিয়েন্সের কাছে যাব। শুভেচ্ছা বিনিময় করব। মিট অ্যান্ড গ্রিডও থাকবে। দর্শকদের সঙ্গে ছবি তুলব। অটোগ্রাফ দেব।
ঠিকানা : আপনি নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র ও মডেলিং সব মাধ্যমে কাজ করছেন। এর মধ্যে কোনটিতে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
তাহসান : আমার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে গান, আর একটি অংশ জুড়ে অভিনয়। অপর একটি অংশে মডেলিং। সম্প্রতি যোগ হয়েছে অভিনয়। সবগুলোতে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। ভালো না লাগলে কাজ করতাম না।
ঠিকানা : আপনার চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু হওয়া নিয়ে কিছু বলবেন?
তাহসান : ‘যদি একদিন’ নামে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। এই ছবির কাজ শেষ। এখন মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ছবিতে আমার সঙ্গে আছেন ভারতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী শ্রাবন্তী। সেখানে আমার একটি গানও আছে। ছবির গল্পটি একজন সিঙ্গেল ফাদারকে কেন্দ্র করে। ছবিতে রয়েছে বাবা ও সন্তানের ভালোবাসা, বন্ধুর জন্য বন্ধুর ভালোবাসা, প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য ভালোবাসা। আরও অনেক কিছু। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবিটি দেখলে নিরাশ হবেন না। এই ছবির ‘যদি একদিন’ শিরোনামের গানটি ইউটিউবে রিলিজ হবে।
ঠিকানা : ছবিটি তো একসঙ্গে অনেক দেশে মুক্তি পেতে যাচ্ছে?
তাহসান : ছবিটি বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় মুক্তি পাবে। প্রথম ছবি, আবার এত দেশে একসঙ্গে মুক্তি পাচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে আনন্দের।
ঠিকানা : এর আগেও নিশ্চয় বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব পেয়েছেন কিন্তু করেননি কেন?
তাহসান : বিভিন্ন সময়ে বড় পর্দায় কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছি। কিন্তু কাজ করা হয়নি গল্প পছন্দ হয়নি অথবা অন্য কিছু পছন্দ হয়নি বলে। এবার যে কাজটি করেছি, এটি একটি গল্পনির্ভর ছবি। যখন ছবিটির গল্পটা শুনি, তখনই ভালো লাগে। এ কারণে ফিরিয়ে দিইনি।
ঠিকানা : এই ছবি সফল হবে এমন কোনো প্রত্যাশা আছে আপনার?
তাহসান : ছবিটি ব্যবসাসফল হবে সেই প্রত্যাশা আমার রয়েছে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, ছবিটি সফল হবে। দর্শকদের ভালো লাগবে। দর্শক যদি হলে না যান, তাহলে বুঝতে পারবেন না কত ভালো ছবি এটি। আসলে এখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সুবাতাস বইছে। ভালো ভালো সিনেমা হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামীতে আরও ভালো ছবি হবে। দর্শক হলমুখী হবে।
ঠিকানা : আপনি দর্শককে হলমুখী হওয়ার কথা বলছেন। ঢাকা শহর ছাড়া অন্য কোথাও সব ধরনের দর্শকের কিংবা সপরিবারে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার মতো সিনেমা হল কিংবা পরিবেশ আছে কি?
তাহসান : সিনেমা হল যে ধরনের ও যত সংখ্যক থাকার দরকার, তা আসলে নেই। এ কারণে অনেকেই সিনেমা হলে যান না, এটাও ঠিক। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত প্রেক্ষাগৃহ আরও দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করপোরেট হাউসগুলো সিনেমা হল তৈরি করছে। বাংলাদেশেও কয়েকটি কোম্পানি সিনেমা হল তৈরি করছে। কিন্তু সেই সংখ্যা অনেক কম। আগামীতে হয়তো তা বাড়বে। এ জন্য আমি বলব, বড় বড় করপোরেট হাউসগুলোকে সিনেমা হল তৈরি করতে আগ্রহী হতে হবে। আমাদের এখানে আরো বেশি সংখ্যক সিনেমা হল হতে হবে, এটাই বড় কথা। সপরিবারে যেতে পারবেন এমন প্রেক্ষাগৃহ থাকলে সব ধরনের দর্শক হলে যাবেন বলে আমার বিশ্বাস। এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।
ঠিকানা : নায়ক হিসেবে আপনার স্যাটিসফ্যাকশন কী?
তাহসান : আমি নিজেকে নায়ক বলি না। বলি অভিনেতা। আমি কাজের জন্য কাজ করলাম, বিষয়টি এমন নয়। আমি চেষ্টা করি এমন একটি কাজ করতে, যে কাজটি দেখে মানুষ ভাববে, প্রশংসা করবে। মানুষ দেখে কাঁদল কি না? তিন ঘণ্টা একজন মানুষকে সিনেমা হলে ধরে রাখতে হলে সেভাবেই কাজ করতে হবে, যাতে তিন ঘণ্টা পর তিনি কিছু নিয়ে যেতে পারেন।
ঠিকানা : সিনেমায় যে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, তা কি যথাযথ?
তাহসান : সিনেমায় যে পারিশ্রমিক পাচ্ছি, সেটা বড় বিষয় নয়। এটা আসলে আপেক্ষিক। ভারতের একটা সিনেমাকে যদি স্কেল ধরে হিসাব করেন, তাহলে দেখবেন সেখানে ১৬০ কোটি মানুষ। একটি সিনেমা ৩০০ কোটি রুপি ব্যবসা করে। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষ। সেখানে ৩০ কোটি টাকা একটি ছবি ব্যবসা করার কথা। কিন্তু ব্যবসা করছে তিন কোটি। ম্যাথটি সিম্পল। কিন্তু সেই পরিমাণ ব্যবসা করতে পারছি না। কেন পারছি না এটা বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঠিকানা : চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করবেন, নাকি এটাই শেষ?
তাহসান : ভালো গল্প, ভালো চলচ্চিত্র ও সবকিছু পছন্দ হলে চলচ্চিত্রে আরও অভিনয় করব। এর আগে অনেক অফার পেয়েছি। কিন্তু করিনি। আমার কথা হলো, আমি কাজ করলে ভালো কিছু হতেই হবে। না হলে করব না। তবে এখনো জানি না মনের মতো ও ভালো সিনেমার কাজের অফার পাব কি না? পেলে করব।
ঠিকানা : সাকিব খান, শুভ এসব নায়কের পাশে আপনি কতটুকু জায়গা করে নিতে পারবেন চলচ্চিত্রে?
তাহসান : ভারতের শাহরুখ খান, সালমান খান অভিনয় করছেন। তাদের পাশাপাশি অন্য নায়কেরা অভিনয় করছেন। তারা কি কাজ করতে পারছেন না? অবশ্যই পারছেন। আমাদের ওখানে সাকিব খান, শুভ অভিনয় করছেন। তাদের দুজনের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। আমার জন্যও আলাদা জায়গা তৈরি হবে। আমি সেটা জানি। এ কারণে আমি মনে করি না আমি কাজ করে জায়গা করে নিতে গেলে কোনো সমস্যা হবে। হলিউডে ২০ জন সুপারস্টার আছেন না? আমাদের এখানে থাকবেন না কেন? আসলে আমাকে আমার জায়গাটা দেখতে হবে। সেখানে আমাকে সেরাটা দিতে হবে।
ঠিকানা : অনেকেই বলে থাকেন, ভারতের শিল্পীদের বাংলাদেশে সুযোগ দেওয়া উচিত নয়, তাতে দেশি শিল্পীরা বঞ্চিত হন। আপনি শুরুই করলেন ভারতীয় নায়িকা দিয়ে? দেশের একজন নায়িকা আপনার বিপরীতে প্রথম কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন না?
তাহসান : আমি উন্মুক্ত সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। একজন শিল্পীকে কোনো গ-ির মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। একজন শিল্পী অন্য দেশের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করবেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। আমি শ্রাবন্তীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। আমি তো একা ভারতীয় শিল্পীর সঙ্গে কাজ করিনি, অনেকেই করছেন। এ ছাড়া আমার কথা হলো, একজন ভারতীয় শিল্পীকে তো আর জোর করে ঠেকাতে পারব না। মানুষ যাকে পছন্দ করে তাকে দেখতে চায়। নির্মাতারা তাকে নিয়ে কাজ করবেন, এটাই স্বাভাবিক।
ঠিকানা : আপনার বিবেচনায় আপনার গানের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলো কী কী?
তাহসান : আমার জনপ্রিয় গানগুলো সংখ্যায় অনেক। তবে এখন বলতে পারি আলো, দূরে তুমি দাঁড়িয়ে, ছুঁয়ে দিলে মন প্রভৃতি।
ঠিকানা : টেলিভিশনে আপনার অভিনীত নাটকের সংখ্যা কত?
তাহসান : এ পর্যন্ত টেলিভিশনে আমার অভিনীত নাটকের সংখ্যা ৬০।
ঠিকানা : নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারে কোন বিষয়টি প্রাধান্য দিচ্ছেন?
তাহসান : নাটকে অভিনয় করার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি ভালো গল্প ও ভালো চরিত্র। এ ছাড়া এটাও চিন্তা করি, সমাজে যাতে একটি মেসেজ যায়। আমাদের দেশে নাটকের জায়গাটি অনেক ছোট। প্রতিবন্ধকতার মাঝে আমরা কাজ করি। ২ লাখ টাকার একটি নাটক কীভাবে তৈরি করা হয়, এটা যারা কাজ করেন, তারা ছাড়া কেউ জানবেন না। দু-এক দিন শুটিং করে একটি নাটক করা হলো, সেই নাটক দর্শক দেখছেন। আসলে এত কম টাকায় একটি নাটক তৈরি করা সহজ বিষয় নয়।
ঠিকানা : আপনার কি মনে হয় নাটকের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে কমেছে?
তাহসান : নাটকের জনপ্রিয়তা কমেছে কি না এটা বলার চেয়ে এটাই বলা ঠিক হবে যে আসলে নাটকের দর্শক সেভাবে আছেন কি না? কারণ আগে ১৬ কোটি মানুষের জন্য শুধু বিটিভিতে নাটক হতো। এখন ৪০টি চ্যানেলে নাটক হচ্ছে। ৪০টি চ্যানেল তো আর মানুষকে ধরে রাখতে পারছে না। এ কারণে আসলে সব নাটক সবাই না দেখার কারণে একটি ভালো নাটকও দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে না। তবে ভালো কাজ হচ্ছে না, এটা বলা যাবে না।
ঠিকানা : ভালো কাজ যদি হয়ই, তাহলে বলবেন কি এই ১০ বছরে আমরা কি সংশপ্তকের মতো একটি নাটক পেয়েছি?
তাহসান : আসলে সংশপ্তকের মতো নাটক পাইনি, এটা ঠিক। কিন্তু সেই শপ্তক আমাদের কাছে যেভাবে মনে গেঁথে আছে, সেটা আমরা ভুলতে পারছি না। তবে আমি বলতে পারি, আমার ‘নীল পরী নীলাঞ্জনা’ অনেক ভালো নাটক। সেই নাটক যারা দেখেছেন, সবাই এর প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আসলে একেকটি নাটকের জনপ্রিয়তা নির্ভর করে সময়কেন্দ্রিক। এখনো ভালো নাটক হয়।
ঠিকানা : ধারাবাহিক নাটকের কথা কী বলবেন?
তাহসান : ধারাবাহিক নাটক আগে মানুষ বেশি দেখত। এখন তেমন দেখে না। সময়স্বল্পতা আছে। নাটকের বাজেটও কমেছে। সব মিলিয়ে ধারাবাহিক নাটকগুলো এসব কারণে জনপ্রিয়তা তেমনভাবে পাচ্ছে না।
ঠিকানা : অভিযোগ আছে, বিভিন্ন নাটকে বাংলা ভাষাকে এমন ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা দর্শকের বিরক্তি তৈরি করছে, আপনি কী বলেন?
তাহসান : কেউ কেউ এটা করছেন। তবে সেটি সংখ্যায় বেশি নয়। এ কারণে তা খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না। এটা সাময়িক।
ঠিকানা : আচ্ছা, এবার গানের জগতে আসি, গানের বাজার বাংলাদেশে কেমন মনে করছেন?
তাহসান : আগে যেমন গানের বাজার ছিল, সে রকম বাজার এখন নেই। কারণ ক্যাসেট সিডি, ভিসিডি এখন চলেই না বলতে গেলে। এখন ইউটিউব বেইজড গানের বাজার তৈরি হয়েছে। মানুষ ইউটিউবে গান দেখছে, শুনছে।

ঠিকানা : এটা কি কোনো স্থায়ী বাজার?
তাহসান : আগামী দিনের জন্য তৈরি হবে। কারণ, একটি গান সেখানে লাখ লাখ ও কোটি দর্শকও দেখছে। এটা ইতিবাচকই বলব। এখন একটি গানের কত ভিউয়ার, কে কোথা থেকে শুনছেন, সেটাও জানা যায়। মতামতও পাওয়া যায়। অনেক সময় ১০ বছরের পুরোনো গানও মানুষ শুনছে। এর অবশ্যই ইতিবাচক দিক রয়েছে। যত বেশি দর্শক-শ্রোতা, তত বেশি আয়।
ঠিকানা : ইউটিউব থেকে কি আপনারা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন?
তাহসান : ইউটিউব থেকে আমরা এখন অর্থ পাচ্ছি। একসময় এমন হতো যে আমরা গানগুলো কোম্পানিকে কপিরাইট স্বত্ব দিয়ে দিতাম। কিন্তু এখন আমরা তা দিই না। এ কারণে আমরা এখন চুক্তি করার সময় কপিরাইট নিজের রাখি। এতে করে একটি গান যত মানুষ শুনবে ও দেখবে, এ জন্য ইউটিউব থেকে যে আয় হবে ওই কোম্পানি আমাদের অর্থ দেবে। আগে শিল্পীদের রয়্যালটি দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলেও এখন আমরা পাচ্ছি।
ঠিকানা : এভাবে কি একজন শিল্পীর গানকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে না?
তাহসান : সেটা হবে না। ধরেন, মাইকেল জ্যাকসনের একটি গান কেউ গাইল। সেটা থেকে তিনি যদি কোনো আয় করেন, তাহলে তিনি একটি অর্থ পাবেন। কিন্তু মূল শিল্পীই অর্থ পাবেন বেশি। আমাদের এখানেও এমন হবে। আগামী দিনে আমাদের গান কেউ গাইলেও আমরা পয়সা পাব। আমাদের দেশে আগে শিল্পীরা সারা জীবন কাজ করতেন, এর পরও দেখা যেত তারা দুস্থই থেকে যেতেন। এর কারণ তারা ভালো ভালো কাজ করলেও, তাদের কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি অর্থ আয় করলেও শিল্পী তা পেতেন না। এখন পাচ্ছেন। আগামী দিনে শিল্পীদের আরও দুস্থ হয়ে থাকতে হবে না।
ঠিকানা : দুস্থ শিল্পীদের বিষয়ে নিজে কতখানি সামাজিক দায়বদ্ধতা অনুভব করেন?
তাহসান : ভীষণ অনুভব করি। যখনই কোনো শিল্পী সমস্যায় পড়েছেন, চেষ্টা করেছি তাদের পাশে দাঁড়াতে। তাদের জন্য কনসার্ট করতে। কেউ করলে সেখানে নিজে অংশ নিতে চেষ্টা করি, যাতে শিল্পীর উপকার হয়। এটা আমাদের সব শিল্পীরই করা প্রয়োজন। একজন শিল্পীকে দায়িত্ববোধ থেকেই তা করতে হবে।
ঠিকানা : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
তাহসান : আমার কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই। মানুষকে বিনোদন দেওয়াই আমার লক্ষ্য।
ঠিকানা : এবার আসি আপনার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে। আপনার সন্তানটি কেমন আছে? সে কার কাছে থাকছে?
তাহসান : সে ভালো আছে। আমরা তাকে কো-প্যারেন্টিং করছি। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দিয়েই তাকে দুজনে মিলে বড় করে তুলছি।
ঠিকানা : এতে করে কোনো সমস্যা হচ্ছে না?
তাহসান : তাকে আগামী দিনের জন্য মানুষ করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যদি কো-প্যারেন্টিং করতে সমস্যা না হয়, তাহলে কি মনে হয় না আপনারা আলাদা না হয়ে একসঙ্গে থাকলেই সেই কাজটা আরও ভালো করে করতে পারতেন?
তাহসান : দেখেন, এটা আসলে একটা লোডেড কোশ্চেন। এই লোডেড কোশ্চেন করা ঠিক নয়।
ঠিকানা : এই প্রশ্নটি এ জন্য আপনাকে করলাম, আপনি অনেক দায়িত্বের কথা বলেন, অনেক সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন, দুস্থ শিল্পীদের পাশে থাকছেন, এগিয়ে আসছেন অথচ নিজের সন্তানের জন্য যেটা দরকার, সেটাই করতে পারলেন না? একটা পরিবার ও বাসা ম্যানেজ করতে পারলেন না?
তাহসান : আপনি কীভাবে জানলেন যে আমি সেটা পারছি না। আমি খুব ভালোভাবেই সেটা পারছি।
ঠিকানা : আসলে বাবা-মা আলাদা থাকলে কি সন্তানের জন্য আদর্শ বাবা-মা হওয়া যায়?
তাহসান : কে বলেছে হওয়া যায় না?
ঠিকানা : আপনি কিন্তু উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছেন। আমি বিষয়টা এ জন্য বলছি, আপনার অনেক ভক্ত আছে তারা আপনাকে আদর্শ মানে, তাহলে একজন আইডল ম্যান যে হবেন, তার তো সমাজের প্রতি অনেক দায়িত্ব থাকে। অনেক ভালো মানুষ হতে হয়। তাই না?
তাহসান : কে বলেছে আমি খারাপ। আর কেই-বা বলেছে ভক্তদের আমাকে আদর্শ মানতে। আমি তো কাউকে বলিনি আমাকে আদর্শ মানার জন্য।
ঠিকানা : ভক্তদের বলে দিতে হয় না, তারা পছন্দের মানুষকে নিজের অজান্তেই অনুসরণ করেন এটা তো মানবেন?
তাহসান : সেটা ভক্তদের নিজস্ব ব্যাপার। আমি কাউকে বলি না আমাকে আদর্শ মানুষ মনে করুক, অনুসরণ করুক।
ঠিকানা : আপনার মনে হয় না, বাইরে এত সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন, ঘরের দায়িত্বটাও আরও সুষ্ঠুভাবে পালন করা যেত?
তাহসান : কে বলেছে পালন করিনি। আপনি তো আর জানেন না আমি কী করেছি আর কী করিনি। আমি কী করেছি সেটা জানি। দেখুন, আমার সাফ কথা। একজন মানুষের সবকিছু কখনোই ভালো হতে পারে না। কোনো না কোনো দোষ থাকবেই। তাই সংসার ও সন্তানের জন্য কী করেছি, সেটা আমি জানি। এগুলো বলতে চাই না। আমি যদি এখন আমার আগের স্ত্রীর বিষয়ে কিছু বলি, তাহলে তিনি আমাকে বলবেন তুমি এটা কেন বলেছ? আমি সে ধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে চাই না। তাই বলব, আমার সন্তানের মায়ের বিরুদ্ধে আমি কোনো বদনাম বলতে চাই না। সে আমার সন্তানের মা। আমি তাকে বলব অসাধারণ।
ঠিকানা : নতুন করে ঘর বাঁধার কোনো স্বপ্ন দেখছেন?
তাহসান : না, তা দেখছি না। এখন ঘর-সংসার নিয়ে ভাবছি না। কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। বেশ আছি।
ঠিকানা : আপনার তো অনেক ভক্ত। এদের মধ্য থেকে এমন হয়নি কেউ আপনাকে ভালোবেসেছে? কিংবা সংসার করতে চেয়েছে?
তাহসান : কতজন প্রেমে পড়েছে, তার হিসাব নেই। দিওয়ানাও হয়েছে।
ঠিকানা : তখন কী করেন?
তাহসান : জাস্ট ইগনোর করি। ইগনোর করলেই কোনো সমস্যা নেই।
ঠিকানা : জীবনের শেষ ইচ্ছা কী?
তাহসান : প্রতিনিয়ত ভালো কাজ করে যাওয়া।
ঠিকানা : আপনাকে ধন্যবাদ।
তাহসান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here