print

শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি বিএনপির

1024

নিজস্ব প্রতিনিধি : দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি কোন পথে যাচ্ছে? নেতৃত্বহীন হয়ে পড়া দলটির ভবিষ্যৎ কী? তারা কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে? প্রধান দাবিদাওয়া অপূর্ণ রেখেই নির্বাচনে গিয়ে তারা কি কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনতে পারবে? রাষ্ট্রীয় শক্তির বিপরীতে অসংগঠিত, মানসিকভাবে বিভক্ত শক্তি নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে তারা কি দাবি পূরণে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে? নির্বাচন বর্জন করলে এবং দাবি আদায়ে ব্যর্থ হলে পরিণতিতে দলের অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে-এমনই সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী ও রাজনৈতিক মহলে। তবে সমমনা সরকারবিরোধীদের নিয়ে ঐক্যপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গন সেপ্টেম্বরে উত্তপ্ত হবে। ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে শক্তি প্রয়োগ ছাড়া সামাল দেওয়া সরকারের জন্য সহজ হবে না। শক্তি প্রয়োগ করতে গেলে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ার দিকটিও সরকারকে ভাবিয়ে তুলছে। এই ঐক্য সরকার অপসারণের, নাকি সরকারকে রক্ষার, তা-ও সংশয়মুক্ত নয়। বিএনপির নেতা-কর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে হলেও শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামছেন। এ ক্ষেত্রে সমস্যা দুই পক্ষেরই রয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি বিএনপির নেতারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছেন। ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে বিএনপি রাজপথ উত্তপ্ত করতে চাচ্ছে। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনার স্থলে অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ আরো কিছু দাবি তাদের। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য সরকারকে তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। বিভিন্ন দাবিদাওয়া রাখা হলেও একটি-দুটি বিষয়ে ফয়সালা হলেই তারা নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হবে। ধ্বংসাত্মক পথে গিয়ে শক্তিক্ষয় না করে যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ পথে থাকা এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে নিশ্চিতভাবে সরকারি দলের পরাজয় ঘটবে এবং দেশের মানুষ তাদের কাছে পরীক্ষিত দল হিসেবে বিএনপিকেই বেছে নেবে-এমন আস্থা থেকেই তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে। অবশ্য এর বিপরীত মতও জোরালোভাবেই রয়েছে। নির্বাচনের আগে রাজনীতিসচেতন মহলসহ দেশের মানুষ বিএনপির ডাকে সাড়া দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসবে বলেই তারা মনে করেন।
বিএনপির একাধিক নেতৃস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশ করতে চাইলেও সরকার তাদের সে অনুমতি দেয়নি। ১ সেপ্টেম্বর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে বিশাল সমাবেশ করেছে বিএনপি। ঢাকার বাইরে জেলা, উপজেলায় সমাবেশ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন কর্মসূচি দেওয়া হবে। সংলাপে বসে সমঝোতায় আসার জন্য সরকারকে আলটিমেটাম দেওয়া হবে। এ জন্য সরকারকে তিন সপ্তাহ সময় বেঁধে দেওয়া হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে বিএনপি সমমনা অপর দলগুলোর সঙ্গে আন্দোলন ও নির্বাচনী সমঝোতার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে নেবে। সরকার কোনো সমঝোতার প্রয়াস না নিলে তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকেই ঢাকাসহ দেশব্যাপী লাগাতার বিক্ষোভ, সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হবে। পরবর্তী ধাপে অবরোধ ও কয়েক দিনের হরতাল দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের। তাদের কর্মসূচির সফলতার ওপরই নির্ভর করবে সরকারের ওপর জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ। আদালতের এখতিয়ারাধীন বিষয় এবং সাংবিধানিক বিষয়ের বাইরের কোনো বিষয়ে তারা কথা না-ও বলতে পারে।
শেষ মুহূর্তে বিএনপি সরকারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগকারী কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে কি না তা নিয়ে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলও সন্দিহান। চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছয় মাস যাবৎ জেলে থাকার পরও তারা বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেননি। তফসিল ঘোষণার আগেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়ে যাবে এবং তাতে তারেক রহমানের দ-িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে বিচলিত বিএনপির তৃণমূলসহ সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা। নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন লাভের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। এমনি হতাশাজনক পরিস্থিতিতে দলের নেতা-কর্মীরা মাঠে কতটা সক্রিয় হবেন, তা নিয়ে বিএনপি শিবিরেও সংশয়-শঙ্কা রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় শতাধিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা রায়ের পর্যায়ে। তারা নির্বাচনবিরোধী কোনো ভূমিকা নিচ্ছেন কি না সরকারি মহল তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা নির্বাচনমুখী হলে মামলার রায়ও ঝুলে থাকবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কৌশলগতভাবে হলেও নির্বাচনের পক্ষে। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত দিলে তারা কী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তা পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ। এখানেই সরকারের বড় খেলা। কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে নির্বাচনে আনার নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছে সরকারি মহল। বিএনপি নির্বাচনে না এলেও নির্বাচন থেমে থাকবে না, অধিকাংশ দলই নির্বাচনে অংশ নেবে, সরকারি দল থেকে সদম্ভে এমন সব কথা বলা হলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য তারা বিএনপির অংশগ্রহণকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হবে না, সংলাপের প্রয়োজন নেই, সময়ও নেই এমন কথাও সরকারি দলের অত্যন্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলেছেন। রাজনৈতিক ময়দানের এমনি বৈরী অবস্থানের পরও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কথাবার্তা হচ্ছে। আলোচনাও হবে। তবে তা একান্তই অনানুষ্ঠানিক। এতে কিছু ছাড়ও আসতে পারে। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মামলা দীর্ঘায়িত করা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার নমনীয়তা নেবে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে কয়েকটি দলকে সরিয়ে আনা, বিশেষ করে জামায়াতকে নির্বাচনী মাঠে নামানো এবং উদারপন্থী বলে পরিচিত দলগুলোকে নির্বাচনমুখী করাসহ আরো কিছু প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে পুরোপুরি কোণঠাসা করার পরিকল্পনা নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে সরকার। জামায়াত আন্দোলনে না থাকায় বিএনপির পক্ষে সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরালোভাবে সংগঠিত করাও সহজ হবে না। মাঠ প্রশাসন, বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা জোরালোভাবে মাঠে নামার শক্তি, সাহস কতটা পাবেন, তা নিয়ে সংশয় কিছুটা থাকলেও দ্রুত তা কেটে যাবে বলে বিএনপির নেতারা আস্থাশীল। কেন্দ্র থেকে কঠোর নির্দেশ পেলে যেকোনো ঝুঁকি নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। আন্দোলনের কথা বলার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। আন্দোলনের ফলে তৃণমূলের কর্মীরাও দ্বিধায় পড়েছেন। একদিকে বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, আ স ম রব এবং অন্যদিকে জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের উল্লেখযোগ্য অংশ সিপিবি, বাসদ ও তাদের সহযোগীরা চূড়ান্তভাবে নির্বাচনমুখী থাকায় বিএনপি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে বিএনপির নেতৃত্বও নিরঙ্কুশভাবে নির্বাচনবিরোধী নয়। আন্দোলন সংগঠিত করা যেমনি ঝুঁকিপূর্ণ, আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনাও সহজসাধ্য হবে না।
সরকারবিরোধী সমমনাদের নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। জামায়াতকে এই ঐক্যপ্রক্রিয়া বাইরে রাখতে বিএনপি সম্মত হওয়ায় সমান্তরাল কর্মসূচি ও সমঝোতার নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়েছে। এ অবস্থা বিএনপির কর্মীদের মনোবল বাড়িয়েছে এবং ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন জামায়াতসহ ২০ দল এবং বি চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, রব, মান্নাসহ সমমনা আরো কয়েকটি দল যুগপৎ কর্মসূচিতে মাঠে নামবে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে। এতে ব্যাপকসংখ্যক সাধারণ মানুষও অংশ নিতে পারে। বিপুল জনসমাবেশ ঘটিয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীনির্ভর সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া সহজ হবে না। আন্দোলনকারীদের বড় অংশ শেষ পর্যায়ে নির্বাচনে গেলে বিএনপির জন্য তা নতুন সংকট ডেকে আনবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here