print

মনোনয়ন বাণিজ্যে দরকষাকষি

0

সাবেক সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের পক্ষে জাতীয় পার্টির অংশ নিতে সরকারের কাছে ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছেন। বলাবলি হচ্ছে, ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০১৯-এর জানুয়ারির প্রথম দিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হতে পারে, সে হিসেবে সামনে সময় খুব বেশি নেই। এতদিন ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছিল যে, মনোনয়ন টাকা-পয়সার লেনদেন হয়। এবার সে হাঁড়ি হাটে ভেঙে দিলেন এরশাদ।
যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং এমন কি কেউ যদি মনে করেন অংশ নেবেন না, উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ্যে, গোপনে তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। ইদানিং বাংলাদেশে নির্বাচনে এককভাবে আর কোন রাজনৈতিক দলের তৎপরতা লক্ষ করা যায় না। এখন সব জোট-মহাজোট, জোটের জোট, ফ্রন্টের রাজনীতি এবং নির্বাচন। অন্য ক্ষেত্রে সমবায় সফল হোক না হোক, রাজনীতিতে রীতিমত সমবায়। জোটের রাজনীতিতে ব্যক্তির ভোট না থাক, কনস্টিটুয়েন্সি না থাক, দলের খুব কদর। আর যদি ভোট থাকে তো পায় কে! অর্ধেক রাজত্ব চাই তখন। পৌরাণিক যুগে বিয়ের পাত্রের একসঙ্গে রাজকুমারী আর রাজত্ব পাওয়ার গল্প শোনা যেতো। বাংলাদেশে নির্বাচনী গল্পে রাজকুমারী না থাকলেও রাজত্ব আছে। তাইতো বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটে আওয়ামী লীগের পরেই ‘বড় দল’ সাবেক রাষ্ট্রপতি জে. এরশাদের সৃষ্ট জাতীয় পার্টি শুধু আসনই দাবি করেনি, সঙ্গে নির্বাচনী খরচ হিসেবে সরকারের কাছে ২০০ কোটি টাকাও দাবি করে বসেছেন। এবং জানা গেছে, সরকারের পক্ষে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করার সাহস হয়নি। দর কষাকষি চলছে। এই দাবি সরকারের মেনে নেয়ার সম্ভাবনাই অধিক বলে অভিজ্ঞজনেরা মনে করছে। কেননা টাকা লাগে দেবে গৌরী সেন। সেখানে সরকারের কী যায় আসে! এছাড়া এরশাদের চরিত্রও সরকার ভাল জানে। ডিগবাজিতে যেমন ওস্তাদ, ভোল পাল্টাতেও পারঙ্গম। সকাল-দুপুর-রাত তিনবেলায় ৩ রঙ ধারণ করতে তার মতো আর কোন রাজনীতিক বাংলাদেশে দ্বিতীয় কেউ নেই। তাই ২০০ কোটি টাকার আবদার না করার সাধ্য সরকারের হবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে। গতবারের ভোটার ছাড়া নির্বাচনেই যে খেলা এরশাদ দেখিয়েছেন! এবার তো সবাই ভাবছেন ২০১৪-র মত নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এবারের নির্বাচনে বর্তমান সরকারের যে ঝুঁকি রয়েছে, তাতে প্রকাশ্যে না হলেও আন্ডার দি টেবিল ঠিকই রফা হয়ে যাবে, এমনকি যদি দাবি ২০০ কোটি টাকার বেশিও হতো, তবু সরকারকে সম্মতিই জানাতে হতো।
‘এরশাদের দাবি ২০০ কোটি টাকা’- এই শিরোনামের সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে ঠিকানার ১৪ সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায়। খবরটিতে বলা হয়েছে ‘সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টন ছাড়াও একটি একান্ত গোপন বিষয় নিয়েও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করছেন। নির্বাচনে তিনি ৭০টি আসন আর ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছেন।’
খবরটিতে আরও বলা হয়- আর্থিক বিষয়ে এরশাদের চেয়ে রওশন এরশাদ বেশি অনুদার এবং অধিক প্রত্যাশী। অন্যদিকে এরশাদ তুলানমূলক উদার হলেও বর্তমানে কিছুটা আর্থিক সীমাবদ্ধতায় আছেন। মাঝেমধ্যে তা প্রকট আকার ধারণ করে। নির্বাচন এরশাদের কাছে অর্থপ্রাপ্তির একটা বড় মাধ্যম। ইতিপূর্বে দলের কাউকে মন্ত্রী বানিয়ে, আবার স্থানীয় নির্বাচনে নিজের দলের প্রার্থী না দিয়ে অন্য দলের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েও টাকা নিয়েছেন বলে জানা যায়। আগামী সংসদ নির্বাচনেও তার দলের আসনে বিত্তবানদের মনোনয়ন দেয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এবং বিত্তবানদের মনোনয়ন দেয়ার উদ্দেশ্যও বুঝতে কারও খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
জাপার দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, এরশাদের দাবির কথা ইতিমধ্যেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারও এরশাদের সঙ্গে একটি আপস রফায় আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা ‘ওপেন সিক্রেট’। বিষয়টি গোপনীয় হলেও পাবলিক খুব ভাল করেই জানে- কথাটার অর্থ এমনটাই। নির্বাচন এলে বাংলাদেশে মনোনয়ন দিয়ে প্রার্থীদের কাছে বাণিজ্য করা হয়। এক সময় হয়তো খুব গোপনে করা হলেও এখন আর রাখঢাক নেই। তবে এর মাত্রা, পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে। আগে জাতীয় নির্বাচনেই কেবল এরকম বাণিজ্যের কথা শোনা যেত। তাও খুব গোপনে এবং সীমিত আকারে। লেনদেনের পরিমাণও ছিল সীমিত। এখন যার কাছ থেকে যতো পাওয়া যায়। এবং বর্তমানে এ বাণিজ্যের পরিধি জাতীয় সংসদের নির্বাচন থেকে একেবারে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া আগের বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ দলের হাতে থাকলেও এখন দলের নীতি নির্ধারক প্রভাবশালী নেতারাও বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মীর আশীর্বাদ ধন্য। সে কারণেই হয়তো যা পূর্বে সিক্রেট ছিল, এখন তা পাবলিক হয়ে ওপেন সিক্রেট। আর সময় পাল্টেছে। অর্থনীতির সূত্র মেনে মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে, টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে বলে আগে যা ১০ টাকায় হতো, একই কাজ হতে এখন লাগে ১০ হাজার টাকা। তাই যে মনোনয়ন পেতে আগে হাজার কিংবা লাখে হতো, এখন তা সময়ের চাকা চক্কর খেতে খেতে কোটি ছাড়িয়ে কয়েক কোটিতে দাঁড়িয়েছে বলে শোনা যায়।
অনেকেই বলে থাকেনÑ জাতীয় সংসদে এখন আর রাজনীতিক খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী রাজনীতিক, না হয় রাজনীতিক ব্যবসায়ী। আগে রাজনীতি করতেন স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক, উকিল, মোক্তার। অনেকে রাজনীতি করবেন বলেই ঐসব পেশা বেছে নিতেন। তারা ব্যবসায়ী ছিলেন না। লাভ লোকসানের হিসেব ছিল না। মুনাফার ঝোঁক ছিল না। তারা মানুষকে সেবা করার জন্য সহায় সম্পদ বিক্রি করে চলতেন। এখন রাজনীতি নাকি সবচেয়ে ঝুঁকিহীন এবং অধিক মুনাফার ব্যবসা। বিনিয়োগের সময়েই নাকি মুনাফার হিসেবটা সেরে রাখা হয়।
এক সময় রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক দলকে সহযোগিতা করতেন ব্যবসায়ীরা। এখন গণেশ উল্টে গেছে। নিজেরাই রাজনৈতিক। এখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যবসায়ীরা। রাজনীতির নীতি ঠিক হয় ব্যবসায়ীদের হাতে। তাই তাদের স্বার্থকে সব সময় নিরঙ্কুশ, নিরাপদ দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারেন না। অন্যায় অনিয়ম এমন কি অনেক সময় আইন লংঘন করেও অনেকে ধরা ছোঁয়ার উর্ধ্বে থেকে যান।
রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের হাতে থাকায় সব কিছুর উপরই তাদের নিয়ন্ত্রণ। বাজারের অব্যবস্থা, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে মূল্য এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ সবই করে থাকেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদর হাতে রাজনীতির লাগাম থাকার কী পরিণতি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সড়কে দুর্ঘটনা। নিরাপদ সড়কের যত দাবিই জনগণের দিক থেকে তোলা হোক না কেন, সবই অরণ্যে রোদন, বাস-ট্রাকসহ সড়কের নিয়ন্ত্রণ মালিক-ব্যবসায়ীদের হাতে থাকায়। এখন বাস মালিকও মন্ত্রী, যানবাহন শ্রমিকও মন্ত্রী। বাস্তবে শ্রমিক-মালিকে বিরোধ থাকলেও বাংলাদেশে শ্রমিক-মালিক ভাই ভাই।
এ কথা আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশে রাজনীতি এখন ব্যবসায় পরিণত হওয়ায় না আছে রাজনীতির চরিত্র, না আছে ব্যবসার চরিত্র। বাংলাদেশের বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, গ্রামে-গঞ্জে যারা প্রকৃত অর্থে মানুষের সেবায় নিয়োজিত থেকে রাজনীতি করেন, তারা রাষ্ট্র বা প্রশাসন পরিচালনার কোথাও নেই। তারা মন্ত্রী-এমপি হওয়ার জন্য অচল। জাতীয় সংসদ, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন চালাবেন ব্যবসায়ী-রাজনীতিক অথবা রাজনীতিক-ব্যবসায়ী। এ দলে এখন প্রকৃত রাজনীতিবিদ, যাদেরকে আদর্শ ভাবা হয়, সে রকম রাজনীতিক খুঁজে পেতে মাইক্রোস্কোপে চোখ রাখতে হবে। সবাই ব্যবসায়ী। সামরিক-অসামরিক, আমলা ব্যবসায়ী। নানা চরিত্রের নানা কিসিমের বণিক।
সেদিক থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে দোষ দেয়া যাবে না মোটেই। বরং একদিকে তার প্রশংসাই করতে হয়। তিনি নাচতে নিয়ে ঘোমটা দেননি। বরং তিনি নমিনেশন বেনিয়াদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। পাবলিককে সত্য জানার সুযোগ করে দিয়েছেন। এতে হয়তো কারও কিছুই যাবে আসবে না। বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যাবে না। উল্টো ঘোমটা খুলে পড়ায় তারা হয়তো আরও বুক চিতিয়ে বাণিজ্য করতে থাকবেন। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সব সময় দুর্নীতি করেন না বলে যে দাবি করে থাকেন, তার মাজেজা বুঝতে পারবেন, ‘ঠাকুর ঘরে কে- আমি কলা খাইনি’ এ কথায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here