print

বাংলাদেশে যা হচ্ছে, তা না হলে কি হতো না?

0

বাংলাদেশের চলমান ঘটনা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন তোলা হয়-এসব কী হচ্ছে দেশে? স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স এখন ৪৮ বছর। এখন প্রশ্ন ঘাই মারে মানুষের মনেÑএসব না হলে কি হতো না? প্রশ্ন ওঠে, এসব অনাচার-অত্যাচার, মিথ্যার বেসাতি, নৈরাজ্য, চুরি-ডাকাতি-লুটপাট, খুন-রাহাজানি, লাম্পট্য-দুর্বৃত্তপনা বন্ধ হবে কবে? প্রশ্ন জাগে, নৈতিক অবক্ষয়ের চলমান প্লাবন বন্ধ হবে কি? নাকি সে সম্ভাবনা আদৌ নেই?
না, সবকিছুরই শেষ আছে। ইতিহাস সে কথাই বলে। ইতিহাসে বিশ্বাস রেখে তাই বলা যায়, বাংলাদেশের মানুষও একদিন এসব অনাকাক্সিক্ষত অনাচার থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু বর্তমানের আঁধার এতটাই গভীর যে সেই অনাগত সম্ভাবনা বাংলাদেশের মানুষের মনে কোনো আশা, ভরসা স্থির হতে পারছে না। আর কত দূর গেলে এসব দূর হবে-মনের মধ্যে শুধু সে কথাই বাজে। সর্বত্র নৈরাজ্যের কালো ছায়া। অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ-সবকিছুতে ধস, ভাঙন। ফলে সমাজে অস্থিরতা, গন্তব্য অনিশ্চিত।
যেকোনো সদ্য স্বাধীন দেশকে গড়ে তোলাই হয় দেশের মানুষের প্রথম প্রত্যয়। বিশেষ করে জনযুদ্ধে বিপুল রক্তক্ষয় আর জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়ে যদি সেই দেশটি শত্রুমুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। বাংলাদেশ বুঝি তার একমাত্র ব্যতিক্রম। শুরু থেকেই উল্টো পথে হাঁটছে। দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করার কথা ভুলে দেশকে খেয়ে ফোকল করে দেওয়ার প্রতিযোগিতা দেখা যায় তাদের মধ্যে, যাদের হাতে সোনার বাংলা গড়ার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল। তারা হামলে পড়ে লুটপাট, কামড়াকামড়িতে। পাট পাচার করে শূন্য গুদামে আগুন, লুটেরাদের অনাচারে স্তব্ধ বঙ্গবন্ধু অতিষ্ঠ হয়ে বলতে বাধ্য হন-চারদিকে চাটার দল! তিনি নিজের কম্বলটাও খুঁজে পেলেন না!
যে আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার কথা ছিল-সে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলল। ডুবে গেল অন্ধকারে। মানুষের স্বপ্ন ফিকে হতে হতে এখন তা প্রায় শূন্যের কোটায়। ৪৮ বছরের বাংলাদেশ, সাধারণ মানুষের জন্য হতাশার বাংলাদেশ। লুটেরাদের জন্য উর্বর স্বর্ণখনি। পানি লুট, ভূমি লুট। রিজার্ভ লুট, সোনা লুট। কয়লা লুট, পাথর লুট, মেধা লুট। জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ঘোর আতঙ্কের মধ্যে মানুষের বসবাস। ঘরের মধ্যে মানুষ খুন জোড়ায় জোড়ায়। ঘর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হচ্ছে বিনা বিচারে। সড়ক দিয়ে না চলেও গাড়ির চাকায় খুন হচ্ছে সাধারণ নাগরিক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-সাংবাদিক। পুলিশের হাতে, সরকারি দলের ঠ্যাঙ্গারে বাহিনীর হাতে মার খাচ্ছে ছাত্র-শিশু-বৃদ্ধ! ছাত্রলীগের ঐতিহ্য, গৌরব, অর্জন সবকিছু আজ ধূলিসাৎ। তাদের হাতে হকিস্টিক, কিরিচ, হাতুড়ি, পিস্তল। খুনি, লুটেরা, আইন অমান্যকারীদের শাস্তি হওয়া দূরে থাক, তাদের হাতে সবাই জিম্মি। যারা এত দিন জাতিকে শিক্ষা দিয়ে এসেছেন এই বলে যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, কথাটা যে কত বড় ধোঁকা ছিল, এবার তা নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আইনপ্রণেতা, আইনের প্রয়োগকর্তা, আইনের রক্ষক, আইন লঙ্ঘনকারী সবার অবস্থান আইনের ঊর্ধ্বে। আইনের লক্ষ্য একমাত্র সাধারণ মানুষ। উপরতলার মানুষ, সরকারি দলের মানুষ, ছাত্রনেতা, ব্যবসায়ী নেতা, আইনজীবী নেতারা পাবলিককে সামনে রেখে বক্তৃতামঞ্চে যা বলেন, বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো রকম সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না। এই কথার সত্যতা মিলছে অহরহ দেশের পত্রপত্রিকায়, টিভি চ্যানেলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং লোকবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশে।
এই সম্পাদকীয়তে এত সব কথার প্রমাণ দিতে এখানে একটি মাত্র পত্রিকার একটি সংখ্যার একটি সংবাদের কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো। এই একটি মাত্র সংবাদ থেকেই আশা করি, পাঠককুল সম্পাদকীয়টির বক্তব্যের সত্যাসত্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। সংবাদটি ঠিকানার ২৭ জুলাই সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত। সংবাদ শিরোনাম : ‘হরিলুটের কবলে বাংলাদেশ’। সংবাদটিতে বলা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশে অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল সেক্টরে লুটপাটের মহোৎসব চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কেলেঙ্কারি, ভল্টে জমা রাখা সোনার গরমিল, বড় পুকুরিয়ায় কয়লা লোপাটসহ শেয়ারবাজার, বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, জনতা ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে গভীর হতাশার বর্ণহীন পরিস্থিতি।’
আরও হতাশার বিষয় হচ্ছে, সংবাদটিতে বলা হচ্ছে, ‘এই লুটপাটের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারাই, যাদের এই লুটপাট, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা থেকে দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব। মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে একদম ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা এবং সরকারি বিভিন্ন দফতরের সরকার-সমর্থক আমলা-কর্মচারীরাও লুটপাটের এই মহোৎসবে আছেন। এমনকি পুলিশ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানও লুটপাটের ছোবলে ঝাঝরা হয়ে যাচ্ছে। সরকারের অনেক উন্নয়ন দৃশ্যমানও, কিন্তু এমন লুটপাটে সবকিছু আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে-প্রচারণায় উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে, আড়ালে অগ্রাধিকার রয়েছে লুটপাটের।’
লুটপাটের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট খাত এবং ধরনও উল্লেখ করা হয়েছে খবরটিতে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের মন্ত্রী-এমপি, সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা মানুষকে বোঝাতে চাচ্ছেন যে উন্নয়নের সকল কৃতিত্ব সরকারের আর দুর্নীতি, গুম-খুন, চাঁদাবাজি, লুটপাট, দখলবাজিসহ যত অপকর্ম করছে বিএনপি-জামায়াত। অথচ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রবীণ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের কথায় দুর্নীতির স্বীকৃতি পাওয়া যায়। এসব আড়াল করার জন্য তারা উন্নয়ন প্রচারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে যাওয়ার ফলে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলেও সংবাদটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই খবর থেকে জানা গেছে, কোল ইয়ার্ডে যেখানে দেড় লাখ টন কয়লা মজুদ থাকার কথা, ২১ জুলাই সেখানে দেখা যায় মাত্র ৪-৫ হাজার টন কয়লা মজুদ রয়েছে। কয়লা দুর্নীতির মাধ্যমে বেশ কিছু কর্মকর্তা টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনায় গরমিল নিয়ে তোলপাড় উঠেছিল। ইতিমধ্যে সে তোলপাড় স্তিমিতও হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে সব সময় একটা ঘটনা আরেকটা ঘটনাকে চাপা দিয়ে দেয়। তার অর্থ এই নয় যে সেই ঘটনা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়। এমনকি মানুষের মন থেকেও মুছে যায় না। সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় তা আরও নির্মম হয়ে উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনার হিসাবে গরমিলে বিষয়টাও যতই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হোক, ইতিহাসের পাতায় তা জমা থাকবে এবং অপরাধীরা আজ আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করলেও ইতিহাসের বিচার থেকে কোনো দিন মুক্তি পাবে না। কেননা রাষ্ট্রের সম্পদ মানে জনগণের সম্পদ। সে সম্পদ বারবার লুটপাট হয়ে যাবে, আর বারবার অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে, তা হতে পারে না। একবার টাকা লোপাট হবে, আরেকবার সোনা। পরের বার আস্ত ব্যাংকটাই থাকবে কি না, সে নিয়েই আশঙ্কা। লুটপাটের বেলায় অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক ইতিমধ্যেই ফোকলা হয়ে গেছে। এভাবে একটি রাষ্ট্র চলে কী করে? চোরের দশ দিন, গৃহস্থের একদিন বলে তো একটা কথা আছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির একটা বড় জায়গা ঋণ জালিয়াতি। এই ঋণ জালিয়াতি, ঋণ আদায়ে ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত ব্যর্থতা, ভুয়া আমদানির বিপরীতে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ ছাড় দেওয়া এবং বিপুল অঙ্কের ঋণখেলাপি বেল আউটের নামে পুনরায় বিপুল অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করে অর্থাৎ চোর লালন, ছোট চোরকে আরো বড় চোর হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার এই ব্যবস্থা ব্যাংকে তারল্য সংকট সৃষ্টি করে তাকে রক্তশূন্য করে ফেলা হচ্ছে। এই সংকটে বড় অবদান রাখছে ব্যাংক থেকে সরকারের বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে চলছে আরেক নৈরাজ্য। বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক। তাতে কী, অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সিলিং তো নির্দিষ্ট নেই! তাই এ ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে ও ব্যাংকের পরিচালকদের মধ্যে গভীর সখ্য, অটুট সমঝোতা। দেবে আর নেবে। যত খুশি তত। তা-ই হচ্ছে। ব্যাংকগুলো যত দেউলিয়া হতে যাচ্ছে, পরিচালকেরা তত ফুলে-ফেঁপে উঠছেন!
দুর্নীতি, লুটপাট এখন বাংলাদেশে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি। তার মধ্যে সড়ক, সেতু এবং উড়াল সেতু শীর্ষে। এছাড়া দুর্নীতি রেলে, বিমানে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। দুর্নীতি পুলিশে। এমনকি দুর্নীতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও ছেড়ে দিচ্ছে না। দুর্নীতি প্রশাসনে, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস্থাসমূহেও। এসব দুর্নীতির খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরও সরকারি দলের পক্ষের প্রচারণায় তারা ‘ধোয়া তুলসী পাতা’। ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না!
অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে মোটেও এমনটি হওয়ার কথা নয়। কেননা ক্ষমতাসীনেরাই স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির একমাত্র দাবিদার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র ধারক। স্বাধীনতার জন্য জনযুদ্ধভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল যে মৌলনীতি, আদর্শ এবং জন-আকাক্সক্ষার চেতনা নিয়ে, তাতে অবশ্য আজকে এ রকম দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল না। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র-যে চার মূলনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করল, লাখো লাখো মানুষ জীবন উৎসর্গ করে দেশকে স্বাধীন করল এবং যাদের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭২-এ রচিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান, তা কোনোভাবেই আজকের লুটপাটের বাংলাদেশ হতে পারে না। তবুও কেন হলো? কেন লিখতে হচ্ছে এ রকম সম্পাদকীয়? কেন দেশজুড়ে ভয়, আতঙ্ক, হতাশা, হাহাকার? এত উন্নয়নের দাবি এবং এত চাকচিক্য নিয়েও? এমনটি না হলে হতো না? কেন সবকিছু জয় করেও ভয় যাচ্ছে না? অন্যকে এত করে ভয় দেখিয়েও সবকিছু বাগে আনা যাচ্ছে না?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here