print

দুদকের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

0

দুদক দুর্নীতি দমন কমিশন। বৃক্ষের পরিচয় নাকি ফলে। দুদকের পরিচয় ফলে নয়, নামে। অনেকে বলে থাকেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের লক্ষ্য দুর্নীতি থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করা হলেও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাদের তৎপরতা দেখা যায় না। তাদের কর্মকা- বরং দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দিতেই দেখা যায়। এই প্রবাদ বাংলার মানুষ প্রাচীনকাল থেকে শুনে আসছে : ‘শিষ্টের লালন আর দুষ্টের দমন’। এই প্রবাদ-প্রবচন একসময় শাসনকর্তাদের অনুসরণ করতেও দেখা গেছে। এ যুগেও এই পথ দুদকের অনুসরণ করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। হয়েছে ঠিক যেন উল্টো! দুদককে এখন দুষ্টের লালন এবং শিষ্টের দমন করতে ব্যস্ত দেখা যায়। বিশেষ করে, সরকারবিরোধী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হলে তো কথাই নেই। দুদক তখন ভয়ংকর রূপ নেয়। সরকারের পক্ষের হলে জোঁকের মুখে নুন।

এ কারো মনগড়া কোনো কথা নয়। এমন কথা অনেকের মুখেই শোনা যায়। অভিজ্ঞরাও বলেন, সাধারণ পাবলিকও বলে থাকে। অন্যদিকে পত্রপত্রিকাতেও সে রকম খবর মেলে। বাংলাদেশে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ক্ষমতাসীনদের ইশারা পাওয়ার আগেই নিজেরা প্রস্তুত হয়ে থাকেন ক্ষমতাসীনদের মনোরঞ্জনে। ক্ষমতাসীনদের ইশারায় দায়িত্ব পালনই যেন তাদের জীবনের একমাত্র স্বার্থকতা এবং নিজেদের মোক্ষ লাভের একমাত্র পথ। এরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় না বলে একসময় স্বাবলম্বী হয়ে চলার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। এর ফলে দেশের মানুষের ভরসা করার এবং আস্থার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। তারা ন্যায়বিচার এবং সুশাসন থেকে বঞ্চিত হয়। এই সুযোগে ক্ষমতাসীন, সে যে-ই হোক, যে দল এবং যে রঙেরই হোক, তারা মানুষের গণতন্ত্রের অধিকার, মানবাধিকার, তাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিসহ মৌলিক সব নাগরিক অধিকার, নাগরিক জীবনের সব স্বস্তি, শান্তি, নিরাপত্তা হরণ করে নেয়। দেশের মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগ এবং ভরসা ও সাহসের জায়গা সেনাবাহিনীকেও শাসকগোষ্ঠী তাদের অশুভ চক্রান্ত বাস্তবায়ন করতে লোভ-লালসা দেখিয়ে অন্যায়-অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে করায়ত্ত করার মরিয়া চেষ্টা চালায়।

দুদক কেমন ঠুঁটো জগন্নাথ এবং সরকারের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করে, তার একটা অপূর্ব নিদর্শন দেখা যায় ঠিকানার ২৮ সেপ্টেম্বর সংখ্যার ৩৯ পৃষ্ঠার একটি সংবাদে। সংবাদটির শিরোনাম কালো রঙে দুদকের প্রতীক দিয়ে করাÑ ‘দুদকে দিশেহারা/ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা/সর্বত্র আতঙ্ক।’ খবরের মূলকথা হচ্ছে, দুদক এখন ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদসহ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা এমনকি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে, তাদের পেছনে যদি সরকারবিরোধী কোনো গন্ধ পাওয়া যায়। যারা বড় বড় ব্যাংক লুটেরা, বিদেশে শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারী, বিভিন্ন কেলেঙ্কারির হোতা, তারা বুক চিতিয়ে চলছে। দুদক তাদের আড়াল করে যারা সুনামের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছে, তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে হয়রানির মাধ্যমে।

দুদকের এই হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে অনেক মেগা মেগা প্রকল্পের পরিচালক এতটাই সতর্কতা অবলম্বন করছেন যে প্রকল্পের অর্থই ছাড় দিচ্ছেন না। এতে দেশের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ছে। প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুদকের শর্তাবলিতে রয়েছে, কোনো দুর্নীতির সঙ্গে সরকারি স্বার্থ জড়িত না থাকলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদক নোটিশ এবং তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে দুদক হাতিয়ার হিসেবে দুদক আইনের ২৬-এর ১ ও ২ উপধারা (ক ও খ) ব্যবহার করে হয়রানি করার পন্থা অবলম্বন করে। এই আইনের বলে মনগড়াভাবে সমাজে যারা সুনামের অধিকারী এবং সম্মানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। জানা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় বিএনপির আমলে একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার স্ত্রী এবং একজন ব্যবসায়ী নেতাকেও হয়রানি করা হয়েছে। এভাবে ঊর্ধ্বতন অনেক সরকারি কর্মকর্তাকেও হয়রানি করা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা দুদকের এসব ব্যবস্থাকে আইনের অপব্যবহারের ফল বলে মনে করছেন।

বিদেশে অর্থ পাচার নিয়েও দুদকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। ভারতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। সেদিকে দুদকের নজর নেই মোটেও। দুদক আঙুল তুলছে মালয়েশিয়া ও কানাডার দিকে। দুদকের এ রকম হয়রানিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে মুখ খুলেছেন স্বয়ং সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি প্রকাশ্যে এই মর্মে অভিযোগ তোলেন যে সুবিধা না পেলেই দুদকের কর্মকর্তারা হয়রানি করেন। বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকা ধসের জন্য মন্ত্রী দুদককেই দায়ী করেন।

অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, দুদকের এ রকম তুঘলকি কারবার চলতে থাকলে পুরো বেসরকারি খাতই ধ্বংস হয়ে যাবে। অথচ আজ যে অগ্রগতি উন্নয়ন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে, তার জন্য সর্বাধিক কৃতিত্ব বেসরকারি খাতের। অভিজ্ঞজনদের মত হলো বিনিয়োগে এখন বড় বাধা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার চাইতেও দুদক। যারা প্রকৃত ব্যাংক লুটেরা, তাদের আড়াল করে নিচের সারির কয়েক শ ব্যাংক কর্মকর্তাকে আটক করেছে দুদক। দুদকের কারণেই ব্যাংকিং খাতে সৃষ্টি হচ্ছে ভীতিকর পরিস্থিতি। এই আতঙ্কের কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ একরকম বন্ধই হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে যারা ক্ষমতাশালী, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। যে কারণে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে। এ কারণে প্রত্যাশিত জিডিপি ৮ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছানো অসম্ভব। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে, দুদক কার স্বার্থে এসব করছে?

টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘বড় বড় দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।’ দুদকের অভিযান চললেও ব্যাংকের বড় বড় দুর্নীতিবাজ ব্যাংক কর্মকর্তারা থেকে যাচ্ছেন বহাল তবিয়তে। দুদকের চেয়ারম্যান নিজে যা বলছেন, বাস্তবে তা ফলতে দেখা যাচ্ছে না। দুদকের চেয়ারম্যান তার সহকর্মীদের বলছেন, ‘দুদক হবে দুর্নীতিবাজদের জন্য আতঙ্কের নাম, আর যারা দুর্নীতি করে না, তাদের জন্য দুদক হবে বটবৃক্ষ বা আশ্রয়স্থল।’ অথচ সাধারণ মানুষের চোখে দুদক এখন উল্টো কাজের কাজি। শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালন। দুদকের অপ্রত্যাশিত হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি কোনো খাতেই বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
রূপালী ব্যাংকের এক করপোরেট কর্মকর্তা বলেছেন, ব্যাংকে এখন সব ঋণ দেওয়া বন্ধ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও দুদকের বাড়াবাড়ির কারণে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঋণ দেওয়ার পরও দুদক যদি হয়রানি করে, তবে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। দুদকের বাড়াবাড়ির কারণে দেশে এখন সেই অবস্থা বিরাজ করছে। অনেকে দুদক নিয়ে কৌতুক করে বলেন, ‘দুদক সরকারের আস্থাভাজন লোকদের কালো টাকাই কেবল সাদা করার সুযোগ দিচ্ছে না, সরকারপক্ষের মানুষ হলে কালো মানুষকেও সাদা করে দিচ্ছে!’ অনেকের মতে, দুদকের ক্ষমতা যত অসীমই হোক দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে, তাতে কিছু যায়-আসে না। যদি দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, সততা এবং ন্যায়বিচারের কথা মনে রেখে কাজ করতে না পারে।
সবাই আশা করে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশনÑএসব প্রতিষ্ঠানকে সব পরিস্থিতিতে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা উচিত। এসব প্রতিষ্ঠানে যদি ন্যায়নিষ্ঠতা কাজ না করে, তবে তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে না। তখন সরিষার ভূতের মতো অবস্থা দাঁড়ায় তাদের। এবং বাংলাদেশে সেই অবস্থাই চলছে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তারা এখন নিজেদের দায়িত্ব পালন নিয়ে ভাবে না। এখন সরকারের স্বার্থরক্ষা করাই তাদের প্রধান কাজ। তারা আর একটুও মনে করে না যে সব অভিযোগ, সব অভিযুক্তকে একনজরে দেখা দরকার। পক্ষপাতমূলক আচরণ জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুন্ন করে।

কিন্তু বাংলাদেশে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার কাজেই সবাইকে ব্যস্ত দেখা যায়। শুধু দুদক কেন, দুদকের মতো সব সংস্থা, প্রতিষ্ঠান যদি কারো আজ্ঞাবহ না হয়ে নিজের সততা এবং দায়িত্ববোধ থেকে স্বাধীনভাবে দেশের দিকে তাকিয়ে কাজ করত, তবে রাজনীতি যেমন ঠিকমতো চলত, দেশের অবস্থাও আর আজকের এই অবস্থায় আটকে থাকত না। কে জানে আজকের অবস্থা থেকে দেশবাসী মুক্ত হতে পারবে কি না!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here