print

গায়েবি মামলা: ঘটনা ভুল, আইন প্রয়োগে ভুল

0

এএমএম শওকত আলী

ফৌজাদারি মামলার তদন্তে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকলে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট না দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে পেশ করেন। এটাই বিধিবদ্ধ প্রথা। আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করলে মামলা খারিজ হয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে আদালত পুনঃতদন্ত করার আদেশও দিতে পারেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সপক্ষে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। তা হলো, ঘটনা ভুল অথবা আইন প্রয়োগ ভুল। এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই দুটি কারণ তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন তা সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য নয়। তবে ধারণা করা যায়, সিংহভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের মামলায় আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন বিনাবাক্যে গ্রহণ করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সংযুক্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে নারাজি দরখাস্ত দাখিল করে পুনঃতদন্তের আবেদন করতে পারে। এ ধরনের আবেদন উপযুক্ত যুক্তির ভিত্তিতে আদালতও গ্রহণ করে। এ দেশে মামলাবাজের অভাব নেই। জনশ্রুতি রয়েছে যে, আবহমানকাল ধরে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার লক্ষ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে অসত্যের ওপর ভিত্তি করে মিথ্যা মামলা করা হয়।
অতীতে মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটদের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। বেশিরভাগ মহকুমায় ধান কাটার সময় সাজানো তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করা হতো। তবে এ মামলার প্রকার ছিল নালিশি মামলা। এ সংক্রান্ত মামলায় অভিযোগের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। এ তথ্য ও অভিযোগ দেওয়া হতো যে, দু’পক্ষের সংঘর্ষের সময় পকেটে থাকা দামি কলম বা হাতের আংটিও চুরি হয়। এসব ভুয়া তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল প্রতিপক্ষকে কোনো রকমে হাজত-জেলখানায় পাঠানো।
বর্তমানে স্বাধীন ম্যাজিস্ট্রেটরা ধান কাটার অকুস্থল থেকে অনেক দূরে। তবে মহানগর অঞ্চলের বাইরের বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা কিছুটা কাছে। এ বিষয় এদের অভিজ্ঞতা কী তা জানা নেই। তবে যেসব ব্যক্তির এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের মতে, নালিশি মামলায় সাধারণত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে তদন্তের জন্য পাঠানো হতো। কিছুদিন পরে প্রেরিত অভিযোগটি আদালতে ফেরত পাঠানোর পর একটি বাক্য দৃশ্যমান থাকত। এটি ছিল ‘ঘটনা সত্য কিন্তু সাক্ষী-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ ঘটনা সত্যের বিষয়ে বর্তমানে ভিন্ন দৃশ্যপটের কথা মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়েছে। ৩ অক্টোবরের একটি দৈনিকের সম্পাদকীয় মন্তব্যের শিরোনাম ছিল, ‘গায়েবি মামলা এই অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক’- এ মন্তব্যের প্রারম্ভিক অংশে বলা ছিল, ‘কল্পিত কাহিনী সম্বল করে মামলা করার বিরল কৃতিত্ব দেখিয়েছেন আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ ধরনের সম্পাদকীয় মন্তব্যের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, মিডিয়ার সাংবাদিকরা হাতিরঝিল থানায় যে মামলা করা হয়েছে সে বিষয়ে অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছেন, যা পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া বা নাশকতামূলক কোনো ঘটনাই ঘটেনি। অর্থাৎ ঘটনা ঘটেনি। এ ক্ষেত্রে ধান কাটা মামলায় যে ঘটনা সত্য বলা হতো, ঠিক তার বিপরীত বলা হচ্ছে। নালিশি মামলায় শত্রুতাবশত মিথ্যা মামলা রুজু করার ঘটনা ঘটে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি অর্থাৎ পুলিশ কেন এ ধরনের মিথ্যা মামলা করবে, তা বোঝা দুস্কর; কিন্তু অসম্ভ নয়। ৩ অক্টোবর এ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি পত্রিকায় যে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে তার শিরোনাম ছিল- ‘গায়েবি মামলা এ অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক।’ বলা সম্ভব যে, গায়েবি মামলা মূলত মিথ্যা মামলা। আদালতে মিথ্যা মামলা করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে গায়েবি বা মিথ্যা মামলা করলে কেন শাস্তি হবে না। শাস্তির বিধান না থাকলে এ ধরনের অপসংস্কৃতিও বন্ধ হবে না।
এ বিষয়টি অজানা নয় যে, সাধারণত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই এ ধরনের মামলা হয়। তবে অতীতে আন্দোলনরত সাধারণ ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের মামলা হয়েছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯টি জেলা ও মহানগরে মোট ৫৮টি গায়েবি মামলা হয়েছে। এতে আসামির সংখ্যা ৩৭৪০। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মিডিয়া প্রকাশ করেছে। নাশকতামূলক মামলার আসামিদের মধ্যে ছিলেন মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি, হজ পালনরত ও পঙ্গু ব্যক্তি। অর্থাৎ এসব ব্যক্তি কথিত অকুস্থলে উপস্থিত ছিল না অথচ পুলিশ এদের গায়েবি মামলার আসামি করেছে। অক্টোবরের ৬ তারিখে প্রকাশিত এক সংবাদে এ বিষয়ে কিছু আশার বাণী পাওয়া গেছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক এ বাহিনীর কমান্ডার অধিনায়কদের সন্দেহমূলক মামলাগুলো যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহাপরিদর্শকের এহেন মন্তব্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে পরদিন অর্থাৎ ৭ অক্টোবর একই পত্রিকার প্রধান খবর যথেষ্ট আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। ‘হঠাৎ কেন এত গায়েবি মামলা’ শিরোনামে প্রকাশিত এ খবরে যে তথ্যাদি দেওয়া হয়েছে, তা সবারই কমবেশি জানা।
চলমান গায়েবি মামলা আধিক্যের কারণ আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং এর প্রধান লক্ষ্য, সাবেক প্রধান দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মামলার আসামি করা। পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ কথা অবশ্য অস্বীকার করেছেন। পুলিশের ভাষ্য হলো, আসন্ন নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই এ প্রস্তুতি। মিডিয়ায় গত কয়েকদিন ধরে প্রকাশ করা হচ্ছে ভিন্ন তথ্য। এ তথ্যে বলা হচ্ছে, ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে। সাজানো ঘটনার ওপর ভিত্তি করে অনেক মামলাও করা হয়েছে। আইজিপির সাবধান বাণী সত্ত্বেও প্রায় প্রতিদিন মৃত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। একটি মামলায় বিএনপির তিন আইনজীবীও আসামি ছিলেন। তারা এর বিরুদ্ধে রিট মামলা করলে হাইকোর্ট বিভক্ত আদেশ প্রদান করে বলে জানা গেছে। অতীতে গণগ্রেফতারের বিষয় মিডিয়ায় উল্লেখ করা হতো। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে গায়েবি মামলা। সরকারের উচিত হবে, অতীতের গণগ্রেফতারসহ নাম উল্লেখ নেই এমন অনেক মামলার পরিণতি কী হয়েছে তা অনুন্ধান করে জানা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here