print

দেবী দুর্গার আবির্ভাবে সমাজ অসুরমুক্ত হোক

0

সর্বজননীন দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গিয়েছে শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে। মা দুর্গার আবাহনও সম্পন্ন হয়েছে অনেক মন্ডপে। মা দুর্গাকে আবাহণ জানাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাই ছিল অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান। দুর্গা পূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। মহালয়ার মধ্য দিয়েই আসলে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের বার্তা ঘোষিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও এখন শরতের আকাশে যখন পেঁজা তুলার মত সাদা সাদা মেঘের ছুটাছুটি শুরু হয়, তখন থেকেই ছবি দুর্গার শুভ আগমন নিয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের মানুষদের মনে ঢাকের শব্দ গূঢ় গূঢ় করতে থাকে। একদিকে মর্ত্যরে বাতাসে শিউলি ফুলের ম-ম সৌরভ, অন্যদিকে মন্দিরে মন্দিরে ঢাক-কাসরের অওয়াজ, ধূপধুনোর গন্ধ, আর মা-দুর্গার আগমনে ঘরে ঘরে সাজ সাজ রব। আয়োজনের মহাধূম। ষড়ঋতু চক্রে বাংলার প্রকৃতিতে শরতের আগমন মানেই বাঙালি মনে হিমহিম পরশ, আর দেবী দুর্গার শুভ আগমন বার্তা। শরতকালে দূর্গোৎসব হয় বলে একে শারদীয় দুর্গোৎসবও বলা হয়ে থাকে। এই দুর্গোৎসবকে সর্বজনীন উৎসবও বলা হয়। কেননা এর আয়োজনে থাকে সর্বজনীন অংশগ্রহণ। সকলের সঙ্গে সকলের হিত কামনা। দুর্গা পূজার সর্বজনীন উৎসব-মুখরতা অন্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষকেও টানে। অনেকেই সেই টানে আনন্দ-উৎসব উপভোগ করেন মন্ডপে মন্ডপে ঘুওে বেড়িয়ে।
এবার স্বামীগৃহ থেকে দুর্গার আগমন ঘটবে ঘোড়ায়। আর পিতৃগৃহ থেকে বিদায় নেবে দোলায়। ঘোড়ায় চড়ে আসা মানে ঝড়-বৃষ্টি-তুফান অর্থাৎ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের যোগ। যাবে দোলায়। সেটার যোগও শুভ নয়। রোগ-বালাইয়ের যোগ। দেখা যাচ্ছে- দেবী দুর্গার এবার আসা এবং যাওয়া উভয়তেই দুর্যোগের আভাস! তবে প্রবাস জীবনের নানা সীমাবদ্ধতায় অনেক সময়ই প্রকৃত তিথি মেনে পূজা পালন সম্ভব হয় না। অনেকেই সুবিধামত সময় বেছে নিয়ে পূজার আয়োজন করে থাকেন। নিউ ইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটেও সেভাবেই দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে। সেই বিচারে বাংলাদেশ হিন্দু মন্দিরসহ যারা ১৪ অক্টোবর পূজা শুরু করেছেন, তাদের দুর্গার আগমন ঘটেছে গজে, অর্থাৎ হাতিতে। যা ধন-সম্পদ, সুখ-সমৃদ্ধির প্রতীক। বাংলাদেশ হিন্দু মন্দিরে ১৪ অক্টোবর বোধন এবং মহাষষ্টী দিয়ে দুর্গা পূজা শুরু হবে। ১৫, ১৬, ১৭ অক্টোবর যথাক্রমে সপ্তমী, অষ্টমী এবং মহানবমী পূজা হবে। দিব্যধামেও ১৪ অক্টোবর থেকে পূজা শুরু হবে। ১৮ অক্টোবর বিজয়া দশমী। কোথাও কোথাও ২দিন, কোথাওবা ৩দিনেই ষষ্টী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমী শেষ করা হবে। অন্যদিকে জ্যাকসন হাইটস পূজা ফাউন্ডেশনের পূজা শুরু ১৫ অক্টোবর থেকে এবং তাজমহল পার্টি হলে বাংলাদেশ বেদান্ত সোসাইটির ১৮ অক্টোবর থেকে দুর্গোৎসব শুরু হবে। পূজার পাশাপাশি চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ, ভারত থেকে অনেক শিল্পী দিয়ে মনোরঞ্জনের আয়োজন করা হয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাই এখন মা দুর্গার আগমন এখন মহা আনন্দে রয়েছে। একদিন দুদিন করে প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। আবার সবার মনকে বিষণœ করে দিয়ে মা দুর্গা ফিরেও যাবেন। তবে এখনও অনেকের দুর্গা-পূজার শপিং নিয়ে মহাব্যস্ত আছে। নতুন নতুন ফ্যাশনের জামা-কাপড়। বনেদী বেনারশী-জামদানী কেনার ধূম। মা দুর্গা আসবেন সেজেগুজে। ভক্তরাও সেজেগুজেই তাকে বরণ করে নেবেন। প্রণতি জানাবেন দেবীর পাদপদ্যে। দেবী দর্শনে তাই শিশু থেকে যুব-প্রৌঢ়, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই যার যার সাধ্যমত সাজছেন।
তবে পূজোর মধ্যে কেবল সাজগোজ, আনন্দ-স্ফূর্তির বিষয়টাই প্রাধান্য পায় না। ভক্তি, বিশ্বাস, ঈশ্বর বন্দনা, স্বর্গ-নরক ভাবনাও কাজ করে সবার মনে। পূজাকে পূজার অন্তর্গত অর্থে গ্রহণ করাটাই পূজার আসল তাৎপর্য। সে কারণে সবকিছুর উপরে স্থান দেয়া হবে প্রহরে প্রহরে পূজা-অর্চনা। স্থায়ী-অস্থায়ী সব মন্দিরেই পুরোহিতগণ মন্ত্রপাঠে পূজার কাজ সম্পাদন করবেন। ধূপ-ধূনো-আরতিতে পূজামন্ডপ পূজারীদের ভিড়ে কয়দিন জমজমাট থাকবে।
শরৎকালের দুর্গাপূজাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলা হয় যেমন, তেমনি অকালবোধনও বলা হয়ে থাকে। অনেকে বসন্তকালেও এই পূজার আয়োজন করে থাকেন। বসন্তকালে যারা এই পূজার আয়োজন করে তারা এই পূজাকে বলে বাসন্তী পূজা। অকালবোধনে হয় দেবী দুর্গার অসময়ে আবাহন। হিন্দুশাস্ত্রে দেবী দুর্গাকে ‘অসুর-নাশিনী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেবতাকূলের শত্রু অসুরকূলের নেতা মঙ্গলবিনাশী মহিষাসুরের নেতৃত্বে একদা অসুরশক্তি সব দেবতাকে বিতাড়িত করে স্বর্গ দখল করে নেয়। দেবতাকূল অসুরদের বিরুদ্ধে আর কোন উপায় না পেয়ে মা দুর্গার শরণাপন্ন হন স্বর্গ উদ্ধারের জন্য। দুর্গা এগিয়ে আসেন দেবতাকূলের সাহায্যে। তিনি সব দেবতার শক্তি ধারণ করে দশ হাতে মহিষাসুরকে নিধন করে অসুরকূলের কবল থেকে স্বর্গ উদ্ধার করেন। দশ হাতে অসুরনিধন করায় দেবী দুর্গার আরেক নাম হয়েছে- দশ ভুজা।
আবার পুরাণে দেবী দুর্গার আগমন তত্ত্বে বলা হয় যে, ত্রেতাযুগে অসুরকূলের অত্যাচারে যখন মানবজাতি এবং সভ্যতার নিদারুন সঙ্কট, সেই দুঃসময়ে সৃষ্টি ও সভ্যতার সঙ্কটমোচনে ইহধামে আবির্ভাব ঘটে প্রভূ রামচন্দ্রের। রামচন্দ্র যখন পিতৃ আজ্ঞায় বনবাসে, তখন লঙ্কার রাবণ রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যায়। লঙ্কাপুরীর বন্দীদশা থেকে প্রিয়তমা স্ত্রী সীতা উদ্ধারে রামচন্দ্র মা দুর্গার সাহায্য প্রার্থনা করেন শক্তি সঞ্চয়ে। তিনি বসন্তকালের আগেই মা দুর্গাকে শরতে আহ্বান করেন। সে কারণে শরৎকালের দুর্গোৎসবকে অকালবোধন বলা হয়। সবাই মিলে সাড়ম্বরে এ পূজার আয়োজন হয় বলে উৎসবটি সর্বজনীন রূপ নেয়। তাই এটি সর্বজনীন দুর্গোৎসব।
সনাতন হিন্দু ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাস- অসুরবিনাশী দেবী দুর্গার আবির্ভাবে পাপদগ্ধ এ সমাজ-সভ্যতা পাপমুক্ত হবে। মানুষ অসুর শক্তির দূর্গতি থেকে মুক্তি পাবে। সকল অশুভ শক্তির বিনাশ সাধিত হবে। মানুষের ভেতরের যে অসুর প্রবৃত্তি মানুষকে অশুভ পথে চালিত করে, সেই পথ থেকে মানুষকে সৎপথে ফিরিয়ে আনবে। শুভকর্মে মানুষ প্রবৃত্ত হবে। মানুষ মানবিক হবে। মানুষ মানুষকে ভালবাসবে। মানুষ শুদ্ধ হবে, ঋদ্ধ হবে। সমাজ শুদ্ধ হবে। কলুষতা, অন্ধকার দূর হবে। সভ্যতা এগিয়ে যাবে। মানুষের মন থেকে সব পাপচিন্তা, পঙ্কিলতা, অকল্যাণ চিন্তা, অন্যায় চিন্তা, হিংসা, বিদ্বেষ, নীচতা দূর হয়ে যাবে। ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাত নির্বিশেষে মানুষ কেবলই মানুষ পরিচয়ে বাঁচবে। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প সমাজে ঠাঁই পাবে না। কোন রকম কলুষতা মানব সমাজকে স্পর্শ করতে পারবে না।
তবে মানুষের সেই শুভ ও কল্যাণ চিন্তা আজকের কলিযুগের সমাজে অনেকটাই মিথ্যা হয়ে গেছে। মূল্যহীন প্রতীয়মান হচ্ছে। অসুর শক্তির যেন উত্থান ঘটছে নতুন করে। নতুন নতুন মানুষরূপী অসুরে সয়লাব সমাজ, রাষ্ট্র। বিশ্বময় তাদের দাপটে মানুষের জীবন, সভ্যতার ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে পতিত। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, মানুষের সুখ-শান্তি, স্বস্তি-নিরাপত্তা সবকিছু তছনছ আজকের একবিংশ শতকের অসুরগোষ্ঠীর দাপটে। মানব মস্তিষ্কে এখন অসুরের বাসা। যেদিকে তাকানো যায় সবদিকেই যেন অসুরের আনাগোনা। চারদিকে ঠগ, জোচ্চোর, লম্পট, প্রতারক, বাটপার। মানুষের বিবেকে ধস। বিশ্বাস, মূল্যবোধে ধস। হিংস্রতা, দস্যুতা, লাম্পট্যে চারদিকের বাতাস ভারি।
আজ আবার সেই অসুরবিনাশী শুভ শক্তির আবির্ভাব খুব জরুরি মানুষের মনুষ্যত্ব, বিবেক, মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে। শান্তি ও সভ্যতা রক্ষার জন্য, এ বিশ্বটাকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার জন্য, ধর্মের নামে মানুষ নিধন বন্ধ করতে আজ দেবী দুর্গার মত সেই শুভ শক্তির আবির্ভাব মানুষের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। সেই শক্তি আজ আমাদের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা হোক। যে শক্তি সমাজ-রাষ্ট্রকে অসুরমুক্ত করতে সক্ষম, সেই শক্তি মানুষের কাম্য হোক। যে শক্তি মানুষকে সকল প্রকার অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করতে সক্ষম, যে শক্তি মানুষকে মানবিক করে তোলার ক্ষমতা রাখে, ধর্মের নামে, সাম্প্রদায়িকতার নামে অধর্ম থেকে যে শক্তি মানুষকে বিরত রাখতে পারে- এবারের দুর্গোৎসবে এটাই হোক আমাদের সর্বজনীন প্রার্থনা।
অন্যান্য বারের মত এবারো নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন বরোতে মহাধূমধামে একাধিক দুর্গা পূজার আয়োজন হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য স্টেটের বিভিন্ন সিটিতেও দুর্গোৎসব চলছে। সকলের সব আয়োজন সফল হোক, সার্থক হোক। সবার জীবনে সঞ্চারিত হোক দুর্গা পূজার আনন্দ। সে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সমাজ-রাষ্ট্র ছাড়িয়ে বিশ্বের সবখানে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here