print

ট্রাম্পের শেষ রক্ষায় মূল ইস্যু ইমিগ্রেশন

1

কাজী ইবনে শাকুর : মধ্য আমেরিকা থেকে ইমিগ্র্যান্ট ক্যারাভানকে ঠেকানো হচ্ছে মেক্সিকো সীমান্তে। আমেরিকায় পৌঁছতে তাদের এক হাজার মাইল পথ অতিক্রম করার কথা। তারপরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইমিগ্রেশন ইস্যুকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রধান ইস্যু বানানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইমিগ্রেশন নিয়ে প্রধান পলিসি বক্তব্য হবে শেষ রক্ষার প্রয়াস।
অন্যদিকে দেশে এখন সন্ত্রাসবাদ হচ্ছে প্রধান আলোচ্য বিষয়। যেমন সিনাগগে স্যুটিংয়ে ১১ জন নিহত হওয়া এবং সন্ত্রাসী বোমা মেইল করে ডেমক্রেট নেতাদের ও সাবেক প্রেসিডেন্টদের হত্যার প্রচেষ্টায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের উস্কানিমূলক বক্তব্যকে সবাই দোষারোপ করছেন। তারপরও সেদিকে না গিয়ে প্রেসিডেন্ট তার সিদ্ধান্তে অটল- ইমিগ্রান্টরাই দেশের সমস্যা। দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি এখন ইমিগ্রেশন বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। বলছেন, ক্যারাভান ঠেকানোর পক্ষে-বিপক্ষে হবে নির্বাচন। তার কথায়, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, গুলি করে মানুষ হত্যা কোন ইস্যু নয়। তিনি ইমিগ্র্যান্ট সমর্থকদের সবাইকে ডেমক্রেট বানাচ্ছেন, আর তাদের রেডিক্যাল ডেমক্রেট হিসেবে বর্ণনা করছেন। তিনি এই কয়দিনে ইমিগ্র্যান্টদের পক্ষের শক্তিকে ‘র‌্যাডিকেল ডেমক্রেট’ হিসেবে ৩৬ বার ও ‘ইসলামী সন্ত্রাসীদের’ প্রতি দুইবার অঙ্গুলী নির্দেশ করেছেন।
ট্রাম্প তার সমর্থকদের কাছে, ‘র‌্যাডিকেল ডেমক্রেট মবকে’ অপরাধীদের দল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বলছেন, বর্ডারকে খোলা রেখে তারা নির্মম গ্যাংদের ড্রাগ নিয়ে এদেশে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে চায়। তারা অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের ভোটাধিকার দিতে চায়। কিন্তু তার এসব কথা মিথ্যা, কোথাও ডেমক্রেটরা অবৈধদের ভোটাধিকার দেয়ার কথা বলেনি। শুধু তাই নয়, তিনি ক্যারাভানদের অর্থ দিচ্ছেন বলে ডেমক্রেটদের প্রতি ইঙ্গিতও করেছেন। মিথ্যায় সয়লাব করছেন তার বক্তৃতা। আর ভুলিয়ে দিতে চাচ্ছেন জঙ্গি রিপাবলিকানদের সন্ত্রাসী কর্মকা-কে।
আরিজোনায় ট্রাম্প বলেছেন- ‘ডেমক্রেটরা ক্যারাভানের জন্য গাড়ি কিনতে চায়।’
নেভাদায় বলেছেন, ‘তারা ক্যারাভানদের গাড়ি দিতে চায়।’
গত ১২ দিনে তার সব বক্তৃতায় ইমিগ্রেশন নিয়ে ডেমক্রেটদের সব ধরণের দোষারোপ করেছে। ওবামা, ক্লিন্টন, হিলারি কিংবা বার্নি বা জর্জ সরোজ ও অন্যান্যদের কাছে তাজা বোমা পাঠানোর ঘটনা তার জন্য কিছুই না।
নেভাদায় ট্রাম্প বলেন, ডেমক্রেটরা অনাগরিকদের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দিতে দেয়ার কথা বলে। লোকাল লোককে সানফ্রান্সিসকোতে স্কুল ছাত্রদের পিতামাতা, যারা গ্রিনকার্ডধারী, তাদের ভোটাধিকার দেয়ার কথা বলেছে। একইভাবে ম্যারিল্যান্ডেও স্কুল বোর্ডে স্থানীয় গ্রিনকার্ডধারীদের ভোট দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোথাও ফেডারেল নির্বাচনে ভোটের কোন কথা উঠেনি। তারপরও ট্রাম্প প্রচার করছে মিথ্যা। এছাড়া দুজন অবৈধ, জুলিয়ান জাটারাইন ও ফ্রানসিকো মেডিনাকে, বিনা বেতনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সিটি কমিশনে কাজ করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দু’জন দুটি কমিশনে আছে পার্ক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিশন দুটিতে ইমিগ্র্যান্টদের প্রয়োজন আছে বিধায়।
কেন্টাকিতে ট্রাম্প চেইন মাইগ্রেশনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। অনেক কথা বলেছেন। বলেছেনÑ একজন আসলে তার মা-বাবা, ভাই-বোন অথবা তার চাচি ও দাদাদের নিয়ে আসে। তাদের কেউ কাজ করে না। অন্তত একজনের পেছনে ২২ জন আসে। কোন কাজ নেই ২২ জনের। কিন্তু তারপরও তারা আসে। চাচি বা দাদাদের কিন্তু আনা হয় না, অথচ তার স্ত্রী নিজেই অনেককে নিয়ে এসেছেন। মেলিনিয়া ট্রাম্প ২০০৬ সালে আমেরিকার সিটিজেন হয়েছেন। কিন্তু কোন ডেমক্রেট প্রেসিডেন্টের এমন নজির নেই। ট্রাম্পকে কোন জন্মগত আমেরিকান বিয়ে করতেও সম্মত হননি। মেলানিয়ার মা ও বাবা এখন আমেরিকান সিটিজেন।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর বলেন, ট্রাম্পের দাবি সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত।
ট্রাম্প সব সময় ডাইভারসিটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা কর্মসূচি নিয়ে ঠাট্টা করেন। অথচ ডাইভারসিটি ভিসা ডেমক্রেট ও রিপাবলিকানরা মিলে করেছে। ট্রাম্প বলেন, ডিভির মাধ্যমে কোন ভাল লোক আমেরিকায় আসেন না। অথচ ডিভি লটারি নিয়ে তার বক্তব্য সঠিক নয়। এ লটারি দেয়া হয় যেসব দেশ থেকে কম লোক আমেরিকায় এসেছে, সেসব দেশের লোকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা। যাতে জনবৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। আর এখন ডিভি লটারিদের আমেরিকার স্ট্যান্ডার্ডে হাইস্কুল এডুকেশন, এ লেভেল কিংবা ইন্টারমেডিয়েট পাস হতে হবে। এই ডিভি লটারি সত্যিকার লটারি, এ কারণে বিদেশি সরকারের চাতুর্য্যরে কোন কথা নেই। অথচ ট্রাম্প সেটাও জানেন না। বলেন, সব দেশ ভাল লোকদের না দিয়ে খারাপ লোকদের পাঠায়!
ট্রাম্প বলেন, ডেমক্রেট রেডিকেলরা আইস তুলে দিতে চায়। খোলা সীমান্ত চায়। কিন্তু ডেমক্রেটরা খোলা সীমান্ত চায় না। তারা জিরো টলারেন্স নীতির মাধ্যমে অমানবিক আচরণের বিরোধিতা করে। দেয়াল নির্মাণ চায় না। দেয়াল দিয়ে আমেরিকাকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় না। উইসকনসিনের প্রতিনিধি আরও আটজন কো-স্পন্সর নিয়ে ‘এস্টাব্লিশিং এ হিউম্যান ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট সিস্টেম এ্যাক্ট’ চায়। সিনেটর চাকশুমার ও কংগ্রেস-ওম্যান ন্যান্সি পেলোসি ইমিগ্রেশন ফাঙ্কশন পুনঃস্ট্রাকচার করতে চায়, তা একদম শেষ করতে চায় না। কেউ চায় না ‘আইস’ পরিবার বিচ্ছিন্নকরণের মতো কোন ভয়ানক কাজ করুক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মারা সালিগাউসা অথবা এমএস-১৩ গ্যাংয়ের উত্থানের জন্য ওবামা প্রশাসনকে দায়ি করেন এবং অতিরঞ্জিত করে বলেন যে, তিনিই তাদের ডিপোর্ট করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় তিনি বলেন, ওবামা প্রশাসন তাদের এনেছে। আর আমরা হাজার হাজার লোককে সরিয়েছি। মূলত এমএস-১৩ ওবামা প্রশাসনের বহু পূর্বেই গঠিত হয়। তারা আল-সালভাদার থেকে এসেছে।
জেফ সেশনের অধীনে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট বলে তাদের সংখ্যা ১০ হাজার জন। কিন্তু এ সংখ্যা বহু আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এই গ্যাংয়ের শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে লস এঞ্জেলেসে। ট্রাম্প হাজার হাজার জন ডিপোর্ট করছেন বললেও সে নিয়ে কোন সঠিক তথ্য দিতে পারেননি।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অনুসন্ধানে দেখা যায়Ñ মাত্র ১ হাজার ৪৫০জন অপরাধী ও এমএস-১৩ সদস্য ২০১৭ সাল থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ এ কার্যক্রম শুরু হয় ওবামা প্রশাসনের আমল থেকে ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর। আইস বলতে পারেনি কত এমএস-১৩ সদস্য ডিপোর্ট হয়েছে।
ক্যারাভানে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার হন্ডুরান ও গুয়াতেমালার ইমিগ্রেন্ট। আর ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ জন মেক্সিকোতে এসাইলামের আবেদন করেছেন বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। ট্রাম্প ক্যারাভানের জন্য ডেমক্রেটদের দায়ি করেন।
২০১৮ সালের আগস্টে এক রিপোর্টে কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস ব্যাখ্যা করেছে- ইমিগ্রেশন এন্ড ন্যাশনেলিটি এ্যাক্ট অনেক এলিয়েনকে আমেরিকায় প্রবেশ করতে না দিয়ে ডিপোর্ট করতে পারে, সে জন্য প্রভিশন রেখেছে।
ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ দিয়েছে অবৈধদের বিতাড়ন ত্বরান্বিত করতে। কিন্তু এখনও তার কোন বিধি জারি হয়নি।
ট্রাম্প সীমান্ত দেয়াল নিয়ে বলেন, দেয়াল দিলে অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট বন্ধ হবে। তা বাস্তবতা বিবর্জিত, কারণ অবৈধ ড্রাগের সিংহভাগ আসে বৈধ পোর্ট দিয়ে। মেক্সিকানরা দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে তাদের ড্রাগের অধিকাংশ ট্রাক্টর-ট্রেইলার দিয়ে বহন করে। আর প্যাসেঞ্জার গাড়িতে ড্রাগ রাখা হয় গোপন স্থানে।
জন কেলি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব থাকাকালীন সময়ে বৈধ পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে ড্রাগ প্রবেশের কথা বলেছেন। অথচ ট্রাম্প বলছেন ভিন্ন কথা। নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় মানে তার হাত-পা কর্তনের মত। তার গলাবাজি বাড়তে পারে, তবে তেমন সুবিধা তিনি করতে পারবেন না। এজন্য নির্বাচন ছিনতাই করতে তার মিথ্যা ভর্ৎসনা, ভয় সৃষ্টি ও ইমিগ্রেশনের তরী বেয়ে যাওয়ার কান্ড করছেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here