print

সংলাপে শঙ্কা না স্বস্তি

6

বিশেষ প্রতিনিধি : পাঁচ বছর পর আবারও সংলাপের আয়োজন। এবার সংলাপ হচ্ছে গণভবনে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে সংলাপে বসছেন। এই খবর রাজনীতিতে সুবাতাস বয়ে এনেছে। অনেকটা স্বস্তিও এসেছে। তবে সংলাপে স্বস্তি আসবে কি না কিংবা সংকট কাটবে কি না, এ নিয়ে কোনো পক্ষই নিশ্চিত নয়। এর আগে ২০০৬ সাল থেকে দু-দুবার সংলাপ হলেও তাতে সাফল্য আসেনি। এবারও সংলাপে সাফল্য না আসার মতো যথেষ্ট সংশয় রয়েছে, আবার চমকও আসতে পারে। একদিকে সংলাপের আয়োজন, অন্যদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা, ঐক্যফ্রন্টের ঢাকার সমাবেশ, নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী প্রস্তুতি-সব মিলিয়ে রাজনীতিতে সবার ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সংলাপ হতে যাওয়ার বিষয়টি জেনে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা একে ইতিবাচক মনে করছেন। তবে সমস্যার সমাধান হবে কি না এবং সরকার ও আওয়ামী লীগ সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের দাবি কতটা মানবে কতটা মানবে না, এটা বড় বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও সরকার সংবিধানের মধ্য থেকে ও আদালতে চলমান মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার বিষয়টি সামনে রেখেই সংলাপে বসবে। তাদের সিদ্ধান্ত নির্দলীয় সরকার নয়, কারো সাজা মওকুফ নয়, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনও নয়। এই তিন ইস্যুতে কোনো সমঝোতা নয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। তবে অন্যান্য বিষয়ে সরকার ছাড় দিতে পারে। সংলাপে সংকট সমাধানের ও সব দলের অংশগ্রহণের জন্য চমক আসতে পারে। প্রস্তাব আসতে পারে ঐক্যফ্রন্টের চার থেকে ছয় নেতাকে মন্ত্রিপরিষদে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন করে সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন করার। এই ইস্যুতেই সমঝোতা হতে পারে। বিএনপির দাবি সেনা মোতায়েন। সেই ইস্যুতে সেনাবাহিনীকে নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েন করার বিষয়েও সমঝোতা হতে পারে। তবে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের ও নির্বাচন কমিশনের নেই। ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে আরওপি সংশোধনের প্রস্তাবে। অধ্যাদেশ জারি করে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার সুযোগও তৈরি করা হতে পারে। তবে ঐক্যফ্রন্ট না চাইলে এ ব্যাপারেও ছাড় দিতে পারে সরকার। আরও বিভিন্ন বিষয়ে ছাড় দেবে। তবে শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্ট সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনায় কতখানি ছাড় দেবে, সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না। বিএনপি এ ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও কথা বলবে। তাদের সিদ্ধান্ত নিয়েই বিএনপি সংলাপে যেতে পারে। যদিও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গত ২৯ ও ৩০ অক্টোবর আদালতে দুটি মামলার রায়ে খালেদা জিয়া ও বিএনপি অসন্তুষ্ট। সংলাপ করার জন্য ১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করলেও তারা তফসিল ঘোষণার জন্য আরও দুই দিন সময় দিয়ে ৩ নভেম্বর কমিশনের বৈঠক ডেকেছে। সংলাপে সমঝোতা হলে ৪ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা হতে পারে। সংলাপে সমঝোতা হতে কয়েক দিন সময় লাগলে তফসিল ঘোষণা কিছুটা পেছাতে পারে।
এর আগে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান কে হবেন সেই বিষয় নিয়ে দুই দলের মহাসচিব সংলাপে বসেছিলেন। কিন্তু আলোচনা হলেও তখন সমাধান হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সরকার আসে। এরপর ২০১৩ সালেও সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত তারানকো। দুই দলের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি বলেছিলেন, এখন দুই দল আলোচনা করে সংলাপ করবে এবং সমঝোতায় পৌঁছে নির্বাচন দেবে। ওই সময়ে সংলাপে লিখিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। বিএনপি জোট প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ওই প্রস্তাব সরকার মেনে নেয়নি। পরে আর আলোচনাও হয়নি। এ কারণে সমঝোতাও হয়নি। ওই অবস্থায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। ওই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কূটনীতিক মহল, আন্তর্জাতিক মহল, পর্যবেক্ষকেরা প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু সরকার তা অগ্রাহ্য করেই পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করেছে। এ অবস্থায় বিএনপি ২০১৩ সাল থেকেই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে আসছে। কিন্তু এই দাবি সরকার আমলে নেয়নি। বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় সরকার ও আওয়ামী লীগ বসতেও রাজি হয়নি। তবে এবার আওয়ামী লীগ আলোচনায় রাজি হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে এককভাবে নয়, আলোচনায় বসবে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে। চলতি সপ্তাহে ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেন। সেখানে তিনি সাত দফা দাবি ও ১২ দফা লক্ষ্য উপস্থাপন করেন। ওই চিঠি পাওয়ার পর চিঠির কপি আওয়ামী লীগের অফিস থেকে শেখ হাসিনার কাছে এক কপি ও ওবায়দুল কাদেরের কাছে এক কপি পাঠানো হয়। এরপরই ওবায়দুল কাদের সংলাপে বসার বিষয়ে তার নেত্রী সম্মত হয়েছেন বলে জানান। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতির তরফ থেকে নেতাদের একটি আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। ১৬ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধিদল ১ নভেম্বর সংলাপে যাচ্ছে। এবার সংলাপ হচ্ছে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানকে রেখেই। তারা দুজনই একাধিক মামলায় দ-িত হয়েছেন। একজন কারাগারে ও অন্যজন বিদেশে রয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোন কোন নেতা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতির নেতৃত্বে সংলাপে বসবেন, এটা আলোচনা করেই ঠিক করবেন। বিএনপি আলাদা করে সেখানে প্রস্তাব না দিলেও ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই প্রস্তাব দেবে আর দাবি আদায় করার চেষ্টা করবে। একদিকে সংলাপের আয়োজন, অন্যদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা, ঐক্যফ্রন্টের ঢাকার সমাবেশ, নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী প্রস্তুতিÑসব মিলিয়ে রাজনীতিতে সবার ব্যস্ততা বেড়ে গেছে।
সূত্র জানায়, নভেম্বরের প্রথম দিন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনাররা। তারা সেখানে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। তফসিল ঘোষণার বিষয়েও তাকে অবহিত করবেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করার পর ৪-৭ দিনের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করবে কমিশন-এমনই সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু এখন নতুন করে যোগ হয়েছে তফসিল ঘোষণার আগে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠক করার বিষয়টি। বৈঠক হবে ১ নভেম্বর। আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের জন্য আওয়ামী লীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের তরফ থেকে ঐক্যফ্রন্টের কাছে অর্থাৎ ড. কামাল হোসেনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ অবস্থায় ঐক্যফ্রন্ট অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সংলাপের জন্য। এদিকে ২ নভেম্বর ঢাকায় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই হিসেবে তারা প্রস্তুতিও নিচ্ছে। তারা একদিকে সংলাপ করতে চাইছে, অন্যদিকে সমাবেশেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সূত্র জানায়, সরকার সংলাপের কথা বললেও খুব বেশি আশাবাদী এখনই হতে পারছে না বিএনপি। কারণ এর আগের অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছে, আওয়ামী লীগ সমঝোতা করার কথা বলেও করেনি। দশম সংসদ নির্বাচন সংবিধান ও নিয়মরক্ষার নির্বাচন হবে, ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবেÑএমন প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি তারা। এ কারণে বিএনপি তখনই বলতে থাকে সরকার ও সরকারি দল কথা রাখেনি। এবারও এ কারণেই তারা খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছে না। তবু সংলাপ হতে যাচ্ছে, এটাকেও তারা তাদের আংশিক সাফল্য মনে করছে। কারণ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সংলাপে বসবেন এমন খবর দেওয়ার দুই দিন আগেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, সাত দফার কোনো দাবি মানা হবে না। এর পরই বললেন সংলাপে বসার কথা। তার কথার মধ্য দিয়েই প্রকৃতপক্ষে মূল বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।
সূত্র জানায়, ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতির সঙ্গে সংলাপে বসতে চেয়েছেন। সেখানে তিনি ও আওয়ামী লীগের নেতারাই বসবেন, নাকি তার সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের কোনো নেতা থাকবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ড. কামাল হোসেন ও ঐক্যফ্রন্টের ১৬ জন প্রতিনিধি যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। যদিও আগেভাগেই চিঠি দিয়ে ড. কামাল তাদের দাবি ও লক্ষ্য জানিয়েছেন। নতুন করে দাবিদাওয়া দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। ঐক্যফ্রন্টের দাবিদাওয়াগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সূত্র জানায়, সরকার সংলাপ করে সমঝোতা করতে চাইলে তা হবে তাদের মতো করেই। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও সরকার কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। তাদের বিষয়গুলো আদালতের ওপরই ছেড়ে দেবে। আদালতে যে সিদ্ধান্ত হবে, সেটাই মেনে নেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হতে পারে। নির্দলীয় সরকারের বিধান সংবিধানে নেই, সেই বিষয়ও ঐক্যফ্রন্টকে জানাতে পারে। বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের আকার বাড়তে পারে। এর আগে ২০১৩ সালে শেখ হাসিনা বিএনপির সঙ্গে সংলাপ করে সমঝোতার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও প্রস্তাব দেওয়া হয়। এবারও যদি ঐক্যফ্রন্টের মধ্য থেকে কাউকে টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী করতে চান, সেই সুযোগ নিতে পারেন। তবে সে ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হলে অতীতের মতো এবারও তা বিএনপি ফিরিয়ে দিলে সংলাপের প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করেন, সংলাপে সরকার সমঝোতার মনোভাব নিয়ে বসলে সমস্যা নেই। কিন্তু লোক দেখানো সংলাপ হলে সমস্যা। আর গতবারের মতো যদি করে, সেটাও সমস্যা। গতবার কথা দিয়ে কথা রাখেনি। তিন মাসের সরকার পাঁচ বছর টেনে নিয়ে গেছে। এবারও দেখা গেল সংলাপ হলো, আলোচনা হলো কিন্তু সমঝোতার জন্য যে ছাড় দেওয়ার কথা, তা কোনো পক্ষই দিল না। তাহলে তো সমঝোতা হলো না। আসলে সরকারের সমঝোতা করার মানসিকতা থাকতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র জানায়, সরকার কোনো রাজনৈতিক চাপের কারণে সংলাপে বসছে, তা মনে করছে না। বরং ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সংলাপ করতে চেয়েছেন, এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বসতে চেয়েছেন। সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ কারো সঙ্গে সংলাপে বসতে চায়নি। এ জন্য কাউকে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে খুব কম সময়ের মধ্যে সরকার আলোচনা করে একটি সমাধান চাইছে। ঐক্যফ্রন্ট সংলাপে সমঝোতা না করলে নির্বাচন যথাসময়েই হবে।
সূত্র জানায়, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই সংলাপ চেয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার রাজি ছিল না তাদের সঙ্গে বসতে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট হওয়ার পর এখন সরকার ও আওয়ামী লীগ সংলাপে বসছে। এ অবস্থায় গোটা জাতি অপেক্ষা করছে সংলাপে কী হয়, তা দেখার জন্য। আর কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক মহলও সংলাপে কী হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছে। সবাই চাইছে সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সে ধরনের নির্বাচনের ব্যবস্থা সরকার করবে বলে ঐক্যফ্রন্টও আশাবাদী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here