print

নির্বাচনে সেনা নিয়োগ নিয়ে কমান্ডিং অফিসারদের অসন্তোষ

0

মঈনুদ্দীন নাসের : বাংলাদেশের নির্বাচনকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতির দিকে ক্রমান্বয়ে মানুষ ঝুঁকছে সারাদেশে। তবে নির্বাচনের জন্য সরকারি মহলের প্রস্তুতি যেমন রয়েছে, তেমনি নির্বাচনের বিকল্প বা উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় চলছে সমান পরিকল্পনা। নিউইয়র্কে বসে পাওয়া এক তথ্যে জানা গেছে, নির্বাচনের জন্য যেমন সরকারি মহল কাজ করছে, তেমনি নির্বাচন তাদের দলের পরিকল্পনা অনুসারে না করতে পারলে কি করবেÑ তা নিয়ে কার্যক্রম গৃহীত হচ্ছে। গত সপ্তাহে সেনাবাহিনীর হেড কোয়ার্টার থেকে কমান্ডিং অফিসারদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়েছে- নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হতে পারে। আর সে জন্য তাদের সতর্ক করা হয়েছে।
চিঠিতে সেনাবাহিনী নামানোর জন্য এজেন্ডা কী বা সেনাবাহিনীকে কী করতে হবে- তার কোন নির্দেশনা নেই। তবে এ ধরনের চিঠির অর্থ হচ্ছে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীর কর্মতৎপরতা। অর্থাৎ নির্বাচন না করতে পারলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হলে সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নিয়োগ অপরিহার্য।
চিঠিতে নির্বাচনে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীকে নামানোর কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে- সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হতে পারে। অর্থাৎ সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদের সহায়তা, কিন্তু জানা যায়, এ নিয়ে কমান্ডিং অফিসারদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কারণ, সেনাবাহিনীর সদস্যরা বলছেন, যদি তাদের নামাতে হয়, তাহলে তাদের কাজ কী, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। সেনাবাহিনী কোন দলকে ক্ষমতায় রাখার জন্য মাঠে নামতে চায় না। তারা কোন দলের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে বিতর্কিত হতে চায় না। যদিও তারা নির্বাচনে তাদের অবদান রাখতে চায়, তা তারা নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য করতে চায়। কিন্তু সরকার নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রক্রিয়াই শুরু করেনি। গত ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামে জনসভায় ড. কামাল হোসেন বলেছেন, বিরোধী শিবিরের সাথে আলোচনা না করে কোন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী থাকবে। কিন্তু সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কাউকেও নির্বাচনে আসার জন্য কোন চেষ্টা করা হবে না। অর্থাৎ তারা একতরফাভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে চান। কিন্তু পরিশেষে চলছে উভয়পক্ষের বৈঠকের উদ্যোগ।
অনেকের মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে, নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। কিন্তু তার আগে যদি ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোন আলাপ না হয়, তাহলে তা কতটুকু কার্যকর হবে, বলা মুস্কিল। অবশ্য সর্বশেষ খবরে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাবে সরকার সম্মত হয়েছে। যদিও সংলাপের দিনক্ষণ এখনও নির্ধারিত হয়নি। ঐক্যফ্রন্টের পেছনে মানুষ যেভাবে সারিবদ্ধ হচ্ছে, তাতে যদি আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পায়, তাহলে নির্বাচন সরকারের জন্য সহায়ক না হয়ে বুমেরাংও হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি বিরোধীদলেরও। কিন্তু সরকার যদি ২০১৪ সালের মতো বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেখানেই সেনাবাহিনীর আপত্তি। সেনাবাহিনী চায় না বিতর্কিত নির্বাচনে নেমে বিতর্কিত হতে। আর সেখানে বিরোধী দলের সাথে আলোচনা না করে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা হলে, তা হবে বিতর্কিত।
বিএনপির নেতৃত্ব এখন কার্যত ঐক্যফ্রন্টের হাতে চলে গেছে। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার অবর্তমানে তাছাড়া কোন উপায়ও নেই। বস্তুত ড. কামাল হোসেন এখন তার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন। তার জীবন সায়াহ্নে লাঠিতে ভর করে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। নিশ্চয়ই তার এজেন্ডা অত্যন্ত পরিষ্কার। ড. কামাল হোসেনকে ছেড়ে গেছেন তার পরম বন্ধু ড. বি চৌধুরী। বি চৌধুরীর বিরুদ্ধে এরশাদের সময়ও বিএনপি বিরোধী অভিযোগ উঠেছিল। যেমন, এক দলীয় সমাবেশে তৎকালীন দলের মহাসচিব কেএম ওবায়দুর রহমানের উপস্থিতিতে একদল বিএনপি কর্মী লিফলেট ছেড়েছিলÑ ‘বি চৌধুরী জবাব চাই’ এই নামে। আর বি চৌধুরী ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এরশাদের দেয়া নির্বাচনে অংশ নেননি। তথাপি তিনি পত্রিকায় পরবর্তীতে বলেছিলেন, ‘তিনি ফেব্রুয়ারির পূর্বের একটি অবস্থা চান, যাতে নির্বাচন করতে পারেন।’ অর্থাৎ তিনি মনে করেছিলেন ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারির পূর্বে নির্বাচনে গেলে বিএনপি জিততেন। কী কারণে তখন তিনি বলেছিলেন, তা তিনি ভাবতে পারেন।
আরও অনেক কথা, কিন্তু এখন খালেদা জিয়া বা বি চৌধুরী বা মরহুম কেএম ওবয়াদুর রহমান বিএনপি নিয়ন্ত্রণ করেন না। বিএনপিতে এখন যৌথ নেতৃত্ব বসেছে। এখন ঐক্যফ্রন্টের রশি ড. কামাল হোসেনের হাতে। আর বিএনপির লাগাম বেগম জিয়া বা তারেক জিয়ার হাত থেকে সরে যেতে বসেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। বিদেশের মূল্যায়নে বাংলাদেশের বিরোধী দলকে নতুন করে ভাবা হবে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে পরিস্থিতি বিদ্যমান, সেখানে ড. কামাল হোসেন ও শেখ হাসিনার মধ্যে বিদেশের বা আঞ্চলিক দেশসমূহের কোন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে তা ড. কামালের পক্ষেই থাকবে। দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে শেখ হাসিনার অবস্থান নেই, কিন্তু ড. কামালের তা রয়েছে। এক্ষেত্রে যদি সেনাবাহিনীর নিয়োগ সংক্রান্ত চিঠি সেনাবাহিনীর মধ্যে কোন অসন্তোষ ছড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে নির্বাচন নিয়েই সংকট আছে।
আগেই লিখেছি, যদি নির্বাচন পিছিয়ে নেয়া হয়, তাহলে তা জানুয়ারির পরে হলে এক কথা, আর ২৪ জানুয়ারির মধ্যে হলে ভিন্ন কথা। কারণ ২৪ জানুয়ারির পর সংসদ ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু সংসদীয় নির্বাচন না হলে জরুরি পরিস্থিতিতে ভেঙে যাওয়া সংসদ কি পুণরায় জারি সম্ভব? সেনা নিয়োগের তৎপরতা এ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনে সেনা নিয়োগে বিরোধীদলের কোন আপত্তি থাকার কথা নয়, কিন্তু নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূূলক। দেখা যাচ্ছে, সরকার নির্বাচনের ধরন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হয়ে বা সিদ্ধান্ত না নিয়েই নির্বাচনে সেনা নিয়োগ করতে চাচ্ছে। বিপত্তি সেখানেই। সেনাবাহিনীও জানছে না কোন ধরনের নির্বাচন, আর সে কারণেই কমান্ডিং অফিসারদের ক্ষোভ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here