print

কাজের সময় কাজী কাজ ফুরালে পাজি

সেই সব নানা রঙের দিনগুলি (পর্ব-২০)

3

শামসুল আরেফিন খান

আফ্রিকার অরণ্যে এক কর্মক্লান্ত প্রবীণ পশুরাজ একদা কোন এক চতুর শিকারির লুকানো জালে আটকে পড়েছিল। পথ খুঁজছিল পরিত্রাণের। যখন সে প্রায় হতাশ, নিজের শক্তিতে সেই ফাঁদ কেটে বেরোবার কোন উপায়ই দেখছেনা তখন সেখানে আশার আলো নিয়ে উদিত হল পৃথিবীর লক্ষ কোটি প্রজাতির অন্যতম অতি ক্ষুদ্র এক প্রাণী, যার আভিধানিক নাম হল মুষিক। পশুরাজ তার কাছেই সজল দৃষ্টিতে অনুনয় জানালো উজ্জ্বল উদ্ধারের জন্যে। মুশিক ক্ষুদ্র হলেও প্রাকৃতিকভাবেই জন্মগ্রহণ করেছে অতিশয় তীক্ষ ধারযুক্ত দন্তপাটি নিয়ে। যা কেবল পান্ডিত্যে ঠাসা বই পুস্তক এবং সযত্নে লোহার তোরঙ্গে সংরক্ষিত বিয়ের বানারসি শাড়িই কুটি কুটি করেনা, সুকঠিন প্রস্তরিভূত পর্বত পর্যন্ত ভেদ করতে পারে অনায়াসে। আর তার সেই অনন্য সক্ষমতার কথা নিয়েই জন্ম হয়েছে সেই “পুনর্মুষিক ভব “ শিরোনামের পৌরাণিক কাহিনী । সে গল্প কমবেশি সবাই জানে। অরণ্যের প্রভুতুল্য পশুরাজের অসহায়ত্ব দেখে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষুদ্র প্রাণি মুষিকের প্রাণে দয়ার উদ্রেক হল। তাই সে পশুরাজকে মুক্ত জীবন উপহার দেয়ার জন্য নিজের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখাতে শুরু করলো। বলাবাহুল্য ,তার সাফল্য ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু শিকারির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে পশুরাজ কী মনে রেখেছিল সেই মহাউপকারী ক্ষুদ্র প্রাণীর কথা? বিশ্ব ইতিহাস দেবে তার উত্তর।
অতি ক্ষুদ্র যে কোন গুণধর শক্তিও যে বৃহৎশক্তির কল্যাণে আসতে পারে, সেই বার্তাই রয়েছে এই মামুলি গল্পে। আমরা ইতিহাসের দৃষ্টান্তেও তেমনটি দেখতে পাই। অনেকদিন আগের কথা।
স্পানিশ যুদ্ধের মধ্যদিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে সবচাইতে শক্তিধর রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৯৮ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১৮৯৮ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র তিন মাস তিন সপ্তাহ ২ দিন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে স্পেন ও আমেরিকার যুদ্ধ সংঘটিত হয়।এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়লাভ করে। স্পেন কিউবার উপর নিজের সার্বভৌমত্ব হারায়। ২০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে স্পেন পুয়ের্তো রিকো, ফিলিপিন্স ও গুয়ামের উপর দাবি পরিত্যাগ করে। ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপিন্সের ম্যানিলা পোতাশ্রয়ে শক্তিশালী স্পেনিশ নৌবহরকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। মার্কিন সেনাবাহিনী ১৩ আগস্ট ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলা দখল করে নেয়। তখন থেকেই ম্যানিলা শুধু না , গোটা ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের উপর প্রচ্ছন্ন মার্কিন আধিপত্য কায়েম রয়েছে।
১ লক্ষ ২০ হাজার বর্গমাইল জুড়ে রয়েছে ৭৬৪১টি দ্বীপ। তাই নিয়ে ফিলিপিন দ্বীপপুঞ্জ ও ফিলিপিন রাষ্ট্র। ব্যাপকতম জীব বৈচিত্রের দেশ ফিলিপিন ৩৩৩ বছর স্পেনের দ্বারা শোষিত হয়েছে। ১৮৯৬ সালের আগস্ট মাসে ফিলিপিনে সশস্ত্র বিপ্লব শুরু হয় সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের লক্ষ্যে। ম্যানিলা যুদ্ধে ফিলিপিনো বিপ্লবী সরকারের শীর্ষ নেতা ‘এগুইনাল্ডো’ এক অলিখিত মৈত্রীচুক্তি করেন মহাশক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে। বিপ্লবী শক্তির ব্যাপক সহায়তায় মার্কিন নৌবহর স্পেনের শক্তিশালী অবস্থান ধ্বংস করে ম্যানিলা দখল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তার পরেই সাম্রাজ্যবাদের গোদাপায়ে ফিলিপিনো বিপ্লবীদের পদাঘাত করতে একটুও দ্বিধা করে নি ক্ষমতাদর্পী মার্কিন বাহিনী। ৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ এক আকস্মিক হামলার মধ্য দিযে ফিলিপিনো বিপ্লবী সরকারের সাথে মার্কিনীরা যুদ্ধের সূত্রপাত করে। আজও সে যুদ্ধের অবসান হয়নি। সমস্ত ইতিহাস জুড়েই বৃহৎ শক্তির এমন কৃতঘœতার দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে রক্তপাতময় রাজনীতি নামীয় যুদ্ধে এবং রক্তপাতহীন রাজনীতিতেও।
খড়কুটোর মত অপাঙক্তেয় নগণ্য মানুষের আত্মজীবনী লেখা আদিক্ষেতা বই কিছু না। আমি তেমন স্পর্ধিত মানুষ নই। তবে স্মৃতিচারণের লব্ধ সুযোগটুকুর সদ্ব্যবহার করতে দ্বিধা করছি না। ৯ বছর বয়সে ঢাকায় আমার স্কুল জীবন শুরু হয় প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৯ সালে। মাতৃহারা শৈশবে ভারত ভাগ হওয়ার মত ঐতিহাসিক কারণে সেই উথালপাথাল অবস্থায় নার্সারি, কেজি জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ ঘটেনি কোলকাতার প্রবাসে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দামামাও ছিল বড় একটা কারণ। আমাদের ওয়েস এন্ড হাই স্কুলে নতুন একজন শিক্ষক এলেন। শুনলাম তিনি একজন দার্শনিক। সে সময় দর্শন শব্দটাও ছিল দুর্বোর্ধ। তাঁর কাছেই শুনলাম প্রথম মাও সেতুঙ এর কথা। শুনলাম মাওসেতুং এর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর চীন বিপ্লব সফল হওয়ার কথা। আমার সেই প্রিয় শিক্ষক একজন মহান মানুষ। তিনি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সঙ্কলনের খ্যাতিমান প্রকাশক ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সভাপতি মোহাম্মদ সুলতান। তাঁর কাছে চীনের গল্প শুনতে শুনতে মনের ভিতর চীন দেখার একটা স্বপ্ন বাসা বেঁধেছিল। ৫৩ সালে সপ্তম শ্রেণীতে উঠে স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় রবিঠাকুরের “এবার ফিরাও মোরে কবিতা আবৃত্তি করে প্রথম পুরস্কার পেলাম্ । সুলতান স্যারের বন্ধু ফতেহ লোহানী এসেছিলেন আবৃত্তি অনুশীলনে প্রশিক্ষণ দিতে। পুরস্কার হিসাবে যে দুটো বই পেলাম তার নাম (১) নয়া চীন নয়া দুনিয়া (২) চীন দেখে এলাম , লেখক সুভাষ মুখোপাধ্যায়। আমার চীন দেখার সুযোগ হ’ল ১৯৮৫ সালে। সে সময় পিকিঙ এর সাগরের মত প্রশস্ত রাজপথে কেবল হাজার হাজার সাইকেল চলতো। সকাল বিকাল সাইকেলারোহী শ্রমিক নরনারীর বন্যা বইতো। তা দেখেও নয়ন জুড়িয়েছিল। এখন সেই মহানগরীতে দশ লক্ষাধিক ‘ চক চক ‘গাড়ি শত নিয়ন্ত্রণ ভেদ করেও যে হাল্কা পাতলা ধোঁয়া ছাড়ছে তাতেই পরিবেশ দূষণে চীন উন্নত বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে আছে । চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির অতিথিশালা ‘ ওয়াংশি লু রেস্ট হাউজে ’ প্রথম রাত কাটলো । পরের দিন দুপুরেই বাংলাদেশ দূতাবাসে মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমরা ৭ অতিথি যখন রাষ্ট্রদূতকে ঘিরে আলাপচারিতায় মগ্ন তখন বেলা প্রায় তিনটায় ঢাকা থেকে রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ ফোন করলেন। রাষ্ট্রদূত ফোন ধরে আমাদের দলনেতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কাজী সাহেব মহামান্য প্রেসিডেন্ট আপনার সাথে কথা বলতে চান। আমি
সত্যি একটু বিস্মিত হলাম। প্রায় এক ঘন্টা ধরে চললো সে প্রেমালাপ। আমার করিৎকর্মা বন্ধু কাজী জাফর আহমদ মুখে একরাশ তৃপ্তির হাসি মেখে ফিরে এলেন প্রশস্ত বৈঠকখানার দেয়াল ঘেষে থাকা টেলিফোন ছেড়ে। বসলেন ঠিক আমার পাশে। আমি বললাম, একি বিস্ময় লীডার ? যার সাথে যুদ্ধ তার সাথেই গোপন প্রণয় ! কী বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস! কাজী সাহেব থতমত খেয়ে বললেন, ধৈর্য ধরুন। রাতেই সব কথা হবে। ঠিক তাই হল। ডিনারের পর আমরা বসলাম সেই গুরুত্বপূর্ণ সন্দেশ পাওয়ার আশায় । কাজী সাহেব বললেন,“চীনে আসার আগে সামরিক হাইকমান্ডের সাথে একটানা ১৬ ঘন্টা বৈঠক করেছি। সেখানেই স্থির হয়েছে আমরা ৫ টা মন্ত্রীপদ নিয়ে এরশাদের সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় যোগদান করবো ”। আমি প্রতিবাদ করলাম । সে কী করে সম্ভব ? আমরা লড়ছি স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে সেই শাহ আলম , জাফর দিপালি শাহার শাহাদাত বরণের দিন থেকে। সেদিন আমাদের ১৮ কর্মী কারারুদ্ধ হল। আমরা কজন আপনার সাথে সাথে বছর খানেক অজ্ঞাতবাসে রইলাম। আমার সংসার ও ছোটখাট আয় রোজগার ছারখার হল । সে কী এই বেঈমানীর জন্যে ? কাজী সাহেব পকেট থেকে বের করে একটা কাগজের টুকরো আমার হাতে তুলে দিয়ে হয়ত ভেবেছিলেন তাতেই আগুনের সলতেটা দপ করে নিভে যাবে। সেই চিরকুটে পাঁজ জনের নাম লেখা ছিল , যার দ্বিতীয় নামটিই আমার। আমি হো হো করে হেসে উঠে বললাম, তাই বলুন। আমিও তাহলে মন্ত্রী হচ্ছি হবু চন্দ্র রাজার ? তা বেশ তা বেশ! আমার বৌ তো খুশিতে গড়াগড়ি যাবে। কিন্তু আপনার কী হবে ? আপনার নামের আগা থেকে “কাজী” উধাও হবে। সেখানে বসবে “মীর” । আমরা হয়ে যাব মীর জাফরের সঙ্গী ঊমিচাঁদ রায় বল্লভ গং। চমৎকার ব্যবস্থা করেছেন কাজী সাহেব ! কিন্তু কে দিল এ অধিকার আপনাকে? অন্ততঃ আমি তো দেইনি আমার অজান্তে আমাকে কালোবাজারে বিক্রি করার অধিকার । আমার সাথে কন্ঠ মিলালেন গাইবান্ধার আমিনুল ইসলাম গোলাপ। কাজী সাহেব গোস্বা করে রণে ভঙ্গ দিলেন সে যাত্রা। লং স্টোরি শর্ট করি।
কাজী সাহেব পরের দিনই দেশে ফিরলেন। সবই ছিল পূর্ব নির্ধারিত। আমরা চীন ভ্রমণ সেরে ফিরলাম যেদিন হংকং কোরিয়া যাওয়ার উদ্দেশে, সেদিনেই ঢাকা কালিগঞ্জে আওয়ামি লীগ নেতা মাইজুদ্দ্ীন নিহত হলেন স্বৈরাচার এরশাদের এক পালতু গুন্ডার হাতে। হংকং দূতাবাস থেকে ১৫ আগস্টের ঘাতক কুখ্যাত কূটনীতিক মেজর ডালিম এসে সেই খবর দিতেই আমরা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম । তোলপাড় তখন সারা দেশ। সেই উত্তাল অবস্থা থামতে না থামতেই কাজী সাহেব তেলেসমাতি দেখালেন। বাণিজ্য মন্ত্রী হয়ে বসলেন এরশাদের মন্ত্রীসভায়। শপথ নিয়েই তিনি ছুটলেন খুলনায় বাবামার পদস্পর্শ করতে। সন্ধ্যা না গড়াতেই আমার বাড়িতে পুলিশ এলো। আমাকে তুলে নিয়ে গেলো। গোয়েন্দা সদর দফতর হোয়াইট হাউজে রাত কাটিয়ে জীবনের এক রোমহর্ষক নতুন অভিজ্ঞতা পেলাম । হাজার পাওয়ারের আলোর নিচে বসে নানা জিজ্ঞাসার সোজাসাপ্টা জবাব দিলাম নির্ভয়ে। রাত পোহাবার আগে সদয় হলেন সিটি এসপি শামসুদ্দীন সাহেব। আলোয় ঝলসানো চোখ নিয়ে বসলাম তার টেবিলের সামনের চেয়ারে। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে তারও অনেক হাস্যকর প্রস্তাবের নেতিবাচক জবাব দিলাম। সদয় পুলিশ কর্মকর্তা আরও নরম হয়ে বললেন, আমি জানি আপনি ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। তা হলে তার জন্যেই প্রস্তুত হোন গিয়ে। পরের দিন দুপুর নাগাদ পুলিশ আবার আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিলো । সংবাদপত্রে বেরিয়েছিল আমার গ্রেফতারের খবর। রাতে সদলবলে এলেন নব্য বাণিজ্যমন্ত্রী আমার বাসায় । অনেক নাটক হল সারা রাত। থানাপুলিশ গোয়েন্দা বিনিদ্র রাত কাটালো আমার অসাদ এভিন্যূর বাসার সামনের রাস্তায়। এর আগেও আমার বসার ঘরে সোফায় শুয়ে বহু রাত কাটিয়েছেন বন্ধুবর কাজী জাফর । ৫৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের দফতর সম্পাদকের দায়িত্ব বুঝে নিলেন সুদর্শন সুবক্তা সুবেশধারী ধীমান কাজী সাহেব। আমি বুঝিয়ে দিলাম তাকে দফতরের দায়িত্ব । আগের বছর জাতীয কাউন্সিলে দফতর সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তখনকার মেডিকেল পড়ুয়া নাটক পাগল ছাত্র ও পরে ৭৫ এ নিহত টিভি প্রযোজক মনিরুল আলম । তার নিরুৎসাহী অনুপস্থিতিতে সারা বছর আমি প্রক্সি দিয়েছি। তার আগের বছর ১৯৫৫ সলে ভাষা আন্দোলনে জেল খেটে বেরুতেই ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদে অভিষিক্ত হলাম । ক্লাস টেনের ছাত্র । তখনই বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীরের কাছে আমার হাতে খড়ি দফতর চালাবার কাজে। আমার এই এগিয়ে যাওয়ার পিছনে প্রচ্ছন্ন ভূমিকা রেখেছিলেন আমার প্রিয় শিক্ষক ৫২ ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ মোহাম্মদ সুলতান । বিনম্র শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছি। তাঁর বিবেচনায় যেটা ছিল আমার এগিয়ে যাওয়া সেটা আমার আব্বা ও পরিবারের সবার বিবেচনায় ছিল বয়ে যাওয়া । সে যা হোক, কাজী সাহেবের হাতে দফতরের ভার তুলে দিয়ে আমি যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচে ছিলাম। তখন থেকেই আমাদের ঘনিষ্ঠতা এগিয়েছে নানা উত্তাপ ও শৈত্যের মধ্যে। সে রাতে পুরানো কথা স্মরণ করে কাজীর চোখ সজল হয়েছিল বোধ হয় বিচ্ছেদ বেদনায়। ভোর বেলায় আমি যখন বললাম , ভাবী রাত জেগে বসে আছেন, এদিকে থানা পুলিশ , আপনি এবার বাড়ি যান। কাজী সাহেব রণে ভঙ্গ দিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে । এক হাতে মধুভান্ড আর এক হাতে গরল। বললেন এখনও ট্রেন ছেড়ে যায়নি। আমি আবারও তুলে নিলাম বিষপাত্র যেমনটি করেছিলাম পিকিঙ রেস্ট হাউজে।
এর পরের দৃশ্যে আমার ঘরে এলেন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূত হয়ে কুষ্টিয়ার রউফ চৌধুরি। তিনি সাত দলীয় জোটের শরীক ডেমোক্রেটিক লীগের নেতা। তিনি একটা দিনক্ষণ দিয়ে বললেন , সাতদলীয় জোটের নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি যেন বিষয়টা জরুরী বিবেচনা করি। ঠিক দুদিন পরে বেলা আড়াইটার সময় সাবেক স্পীকার মীর্জা গোলাম হাফিজের ধানমন্ডির বাসায় গেলাম। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির প্রায় সকল সদস্য। আমি ঘরে প্রবেশ করতেই সবাই উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে আমাকে স্বাগতঃ জানালেন। আমি পরম বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। যে আত্মগর্বী বিএনপি সৌজন্য ও শিষ্টাচার জানেনা, এরকম অভিযোগ এনে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান খান ও সাবেক পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ন্যাপ নেতা নুরুর রহমান এবং সাত দলের রূপকার কাজী জাফর সাত দলীয় ঐক্যজোট ত্যাগ করে এরশাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন, সেই দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আজ আমার মত একজন নগণ্য মানুষকে কেন এ রকম সমাদর করছেন? ভাবতে ভাবতে বসলাম সেই মজলিশে। মীর্জা গোলাম হাফিজ সাহেব বললেন , আমরা সবাই আপনার সাহস দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আপনি এরশাদের ফাঁদে পা দেননি। বেগম জিয়া বললেন, আপনি রাজপথের একজন সাহসী যোদ্ধা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আপনিই পারেন সাতদলকে জাগিয়ে তুলতে। সাতদল না থাকলে স্বৈরাচার এরশাদকে হটানো যাবেনা। আমরা আশা করছি আপনি ইউপিপিকে নতুন করে সংগঠিত করে সাতদলকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে আমাদেরকে সাহায্য করবেন। কম্যুনিস্ট লীগ, ডিএল ও ভাসানী ন্যাপ এখনও আমাদের সঙ্গে আছে । আরও অনেকে আসতে পারে। আপনি সক্রিয় হেেলই জোট আবার নিজের শক্তি ফিরে পাবে। নেত্রীকে সমর্থন জানিয়ে মেজর জেনারেল মজিদুল হক সহ আরও অনেকেই বক্তব্য রাখলেন। আমি নতুন করে উদ্বুদ্ধ হলাম। এই প্রেক্ষাপটে তিনজোটের ঐক্যবদ্ধ অন্দোলন সংগ্রাম ও এরশাদের পতন ঘটাতে সাধ্যমত ভূমিকা রেখে ৯১ সালের নির্বাচনে যেয়ে আবার যে নতুন অভিজ্ঞতা পেলাম , সেই সাতকাহন লেখা সম্ভব না এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে।
আজকের বাংলাদেশে জোট ও ভোটের যে নতুন নাটক হচ্ছে তার ছোট ছোট কুশীলবরা বৃহৎ দলের কাছ থেকে কী প্রতিদান পান সেট দেখার জন্য প্রতীক্ষা করবো। আমার অভিজ্ঞতার কথা বলার সুযোগ শেষ হবে না। বিএনপি তার কর্মফল ভোগ করছে। আবার কিছু ছোট ছোট দল ও দলহীন গুরুত্বপূর্ণ বিশিষ্টজনের কাঁধে ভর করে বিপদ তরাবার চেষ্টা করছে এক সময়ের ক্ষমতাধর বিএনপি। বেগম জিয়া বৃদ্ধ বয়সে কারাবাস করছেন। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ডা. বি . চৌধুরী অনেক যন্ত্রণা বুকে চেপে দূরে সরে আছেন। প্রবীণরা অনেকে প্রয়াত হয়েছেন। নবীনরা আন্দোলনের যোগ্যতা রাখে না। একদিকে অথর্ব বিশ দল অন্যদিকে কয়েকজন ব্যর্থ সেনাপতি। বিএনপি তাদেরকে রণপতি বানিয়ে দুর্যোগের কাদাজল অতিক্রম করার চেষ্টা করছে।
আওয়ামি লীগের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ সেচ্ছাচারিতার। গণতন্ত্র হত্যার। বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা অনেক বড়। ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট, কিবরিয়া হত্যা, আহসানুল্লাহ মাস্টার হত্যা, দশ ট্রাক অস্ত্র পাচার, ক্লীনহার্ট অভিযানে ১২৮ জনকে বিনা বিচারে হত্যা, ১৮ কৃষক হত্যা , হাওয়া ভবনের অনাচার ও মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে জঙ্গিবাদ উস্কে দেয়ার মত সব গুরুতর অভিযোগ রয়েছে সে তালিকায়। নির্বাচন হবে কী হবে না? এমন অনেক সংশয়ও রয়েছে জনমনে। রয়েছে এক এগারো ফিরে আসার আশঙ্কা। সেই সাথে রয়েছে ভূ-রাজনীতির আলাদীনের চেরাগ। রয়েছে পর্দার অন্তরালে চীন রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কলকাঠি। সব অনিশ্চয়তা ঘুচিয়ে বাংলাদেশ বাঁচুক। উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকুক । বাংলাদেশ উচ্চ আয়ের উন্নত দেশে উত্তরণ পেয়ে জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে সফল করে তুলুক নির্বিঘেœ। আমার মত পোড়খাওয়া সব মানুষের প্রত্যাশা সেটাই।
ক্যালিফোর্নিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here