print

মহামতি ইন্দিরা গান্ধী স্মরণে

3

ইন্দিরা গান্ধী ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী; জন্ম ১৯ শে নভেম্বর ১৯১৭। মৃত্যু ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪। পিতা জওহরলাল নেহেরু, ভারতের তথা ভারতবর্ষের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। মাতা কমলা নেহেরু। মা-বাবার একমাত্র সন্তান, যদিও একটি ভাইয়ের জন্ম হলেও সে নিতান্ত শৈশবেই মারা যায়। গৃহশিক্ষকের কাছেই লেখাপড়া শুরু করেন ইন্ধিরা। দিল্লীর মর্ডান স্কুল ও এলাহাবাদের ক্রিস্টিয়ান কনভেন্ট স্কুলে পড়াশুনা করেন। পরবর্তীতে শান্তি নিকেতনে যান। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। সেখানে বিশ্বকবি রীবন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে সাক্ষাৎ হয়। বিশ্বকবিই তাঁকে ‘প্রিয়দর্শিনী’ উপাধি দেন। এরপর থেকেই তিনি প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা নেহরু হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। এক বছর পরেই বিশ্বভারতী পরিত্যাগ করে ব্রিটেন যাত্রা করেন।
ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পড়াশুনা করেন। অসুস্থতার কারণে তিনি কিছুদিন সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করেন। ১৯৩৬ সালে তার মা কমলা নেহেরু মারা যান। ১৯৪০-৪১ সাল তিনি সুইজারল্যান্ড থাকেন। সেখান থেকে যখন ইংল্যান্ড ফিরে আসেন। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে এবং জার্মান বাহিনী ইউরোপের বিভিন্ন দেশ জয় করছে। ১৯৪১ সালের শেষের দিকে তিনি অক্সফোর্ডে পড়াশুনা অসমাপ্ত রেখেই পর্তুগাল হয়ে ভারতে ফিরে আসেন। ব্রিটেনে অবস্থানকালে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে হবু স্বামী ফিরোজ গান্ধীর পরিচয় হয়। অবশ্য এলাহাবাদ থাকতেই তাদের মধ্যে জানাশোনা ছিলো। ফিরোজ গান্ধীও অক্সফোর্ডে অর্থনীতির উপর লেখাপড়া করেন। ১৯৪২ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬০ সালে ফিরোজ গান্ধী দু সন্তান রাজীব গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধীকে রেখে পরলোক গমন করেন।
ভারতে ফিরে আসার পর ইন্দিরা গান্ধী বাবা জওরহরলাল নেহেরুর সহকারী সচিব হিসাবে পুরোপুরি কংগ্রেসের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৪ সালে বাবা নেহেরুর মৃত্যুর পরে লালবাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলে সেই মন্ত্রীসভায় ইন্দিরা গান্ধী তথ্য ও বেতারমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ইন্দিরা গান্ধীর নীতি ছিল গরিবী হটাও। এর মধ্যে তারই মন্ত্রীসভায় সদস্য মোরারজি দেশাই ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস ভাগ করে ডিমোক্রেসী ফর কংগ্রেস নামক অপর একটি শাখা গঠন করেন। কিছুদিন মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রীরও দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে প্রত্যেক জনসভায় জনগণের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতেন ইন্ধিরা। বলতেনÑ অনেক ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে, সেগুলো শোধরানোর জন্য আবার সুযোগ দিন। দেশাইয়ের পদত্যাগের পরে ১৯৮০ সালে তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হন ইন্ধিরা । শিখ দেহরক্ষীর হাতে প্রাণ হারানোর আগ পর্যন্ত ইন্ধিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ইন্ধিরার অনভিপ্রেত খুনের পর তার বড় ছেলে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।
ইন্দিরা গান্ধীও ভারত আমাদের প্রকৃত বন্ধু। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সর্বতোভাবে সাহায্য করে। সে সময় প্রায় ১ কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রথম সরকার তথা মুজিবনগর সরকার ভারতেই অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমেদ ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করলে মহামতি ইন্ধিরা তাজউদ্দিনকে সর্বাত্মক সাহায্যের আশ্বাস দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন তিনি।
প্রথম প্রথম মুক্তিযোদ্ধারাই সীমান্ত এলাকায় হানাদার পাক বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাত। ইন্দিরা সরকার যখন বুঝতে পারেন যে মুক্তিবাহিনীরা আস্তে আস্তে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন তারা সাহায্যের পরিকল্পনা করেন। ইন্দিরা গান্ধী বাবা জরহরলাল নেহেরুর মতই খুব মেধাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাই তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করেন। সেই সকল দেশের সরকার প্রধানদের সামনে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্যর কথা যুক্তি সহকারে তুলে ধরেন। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথেও সাক্ষাৎ করেন। সকল সরকার প্রধানের সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তির আবেদন জানানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করার অনুরোধ করেন। পাকিস্তান বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ‘ভারতীয় চর’ বলে অভিহিত করেছিল। এ ভুল ভাঙানোর জন্যই তিনি তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন।
অবশেষে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা করে। তারা ভারতের অমৃতসর, আম্বালা, পাঠান কোট ইত্যাদি স্থানে বোমা বর্ষণ করে। সে দিন ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় এক জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন, সংবাদ পেয়ে তিনি রাজধানী নয়া দিল্লীতে ফিরে যান। লোকসভার মিটিং ডাকেন। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব পাশ হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। চারদিক থেকে পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে ঘিরে ফেলা হয়। ১৪ তারিখ পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পণের জন্য বেতারের মারফত ঘোষণা দেয়া হয় এবং হেলিকপ্টার থেকে লিফলেট ছড়ানো হয়। অবশেষে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সেনাবাহিনী প্রধান নিয়াজী তার সৈনদের নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসর্ম্পণ করে। সেই রেসকোর্স ময়দানেই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ প্রস্তুতির ডাক দেয়ার নামান্তরে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।
আজ বছর ঘুরে আবার ৩১ অক্টোবর ফিরে এসেছে। আমরা মহামতি ইন্ধিরা গান্ধীকে সম্মানের সাথে স্মরণ করছি। ইন্দিরা গান্ধীর বিজ্ঞ কূটনীতি, পরিকল্পনা, সর্বোপরি সবরকম সাহায্য-সহযোগিতা, মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ এবং ১৬ হাজার ভারতীয় সৈন্যের আত্মত্যাগে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। আমাদের সেই সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। ১৯৭৫ সালে আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তখন ভাগ্যক্রমে দু কন্যা শেখ হাসিনা ও রেহানা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এক সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা, স্বামী-সন্তানসহ ইন্দিরা গান্ধীই ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেন। শেখ হাসিনার স্বামীকে চাকরি দেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্রিটেন ও ভারত হয়ে বাংলাদেশের ফিরে আসেন। দিল্লীতে তাকে রাষ্ট্র প্রধানের মর্যাদা দিয়ে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেদিন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছিল। প্রথমেই বঙ্গবন্ধু প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরাকে জিজ্ঞেস করেন- ম্যাডাম আপনার সৈন্য কবে আমার দেশ থেকে ফিরে আসবে? উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন- আপনি যখনই চাইবেন। তিনি কথা রেখেছিলেন। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে আসেন। এ সময়ের মধ্যে ভারতীয় সকল সৈন্য বাংলাদেশ থেকে চলে যায়।
ভারতের জনগণের যে তাদের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে, তা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিই প্রমাণিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জনসভায় ইংরেজিতে বক্তৃতা শুরু করেন। মাঠে গুঞ্জন উঠে বাংলায় বলার জন্য। তারপর বঙ্গবন্ধু বাংলায় বক্তৃতা করেন।
অনেক চড়াই-উৎতরাই পার হয়ে জাতির জনকের কন্যা ক্ষমতায় এসে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন। বাংলাদেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আজকের এই দিনে বাংলাদেশের চিরকালের বন্ধু ইন্দিরা গান্ধীর আত্মার চিরপ্রশান্তি কামনা করছি। মুক্তিযোদ্ধা ভাইবোনদের জানাই গভীর শ্রদ্ধা, কারণ তাদের সবার বুদ্ধি, মেধা সবকিছুর মিলিত ফল স্বাধীন দেশ। সৃষ্টিকর্তা তুমি আমাদের সহায়। আমিন!
পকিপসী, নিউইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here