print

আমার রোগী বন্ধুরা: ট্রয়ের কথা

58

হুমায়ূন কবির

– আরে ট্রয়! তুমি?
– কি আর করা ডাক্তার। তোমার বন্ধুর চাপাচাপিতেই আসতে বাধ্য হলাম। আমি তো ভালোই আছি। ওদেরই চিন্তা বেশি।
আমার বন্ধু, মানে ট্রয়ের ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান ডেভিড। কনসাল্ট চেয়ে সকালে খবর পাঠিয়েছে। ততক্ষণে রাউন্ড শেষ করে অফিসে চলে এসেছি। তাই জানিয়েছিলাম অফিস শেষ করে ঢু মারবো হাসপাতালে। তখন নামটা ধরতে পারিনি। এখন বুঝলাম। জানলে সকালে এসেই দেখা করতাম।
ট্রয় মরগান। আমার খুবই প্রিয় মানুষদের একজন। আমার বাড়ি বানানোর বছর কয়েক পরে কয়েকটা রুমের সংযোজন করা হয়েছিল। প্রাথমিক ডিজাইনের বাইরে থাকায় এই কাজটার জন্য কোনো বিল্ডার পাচ্ছিলাম না। কেউই রিস্ক নিতে চায় না। ট্রয় এই এলাকার নামকরা বিল্ডারদের অন্যতম। ইতোমধ্যে রিটায়ার করার আয়োজন করেছে। নতুন কাজ নেয় না। ট্রয়ের বউ উইলমা আমাদের হাসপাতালের নার্স। শেষমেষ বাংলাদেশি কায়দায় উইলমাকে ধরেই ট্রয়কে আনলাম।
সেই থেকে পরিচয়। সারাক্ষণ হাসিখুশি এই মানুষটার কথাবার্তায় কখনো কোনো দুঃখবোধ নেই। সবসময় পজিটিভ। বয়স হয়েছে। কাজ করার সময় লক্ষ্য করেছি হাঁটু ভাঙতে অসুবিধে হয়। হাঁটতে কষ্ট হয়।
– ডাক্তার দেখাও না কেন?
– ডাক্তার মানেই তো তোমার মতো মানুষ! সারাক্ষণ ব্যস্ত। কি দরকার তোমাদের বিরক্ত করে?
– বলো কি? খালি কষ্ট করবে, অথচ ডাক্তারের কাছে যাবে না। এ কেমন কথা?
– না না। তোমার সাথে ঠাট্টা করলাম খানিক। আসলে কি জানোই তো। বয়স হচ্ছে। ইঞ্জিনে জং ধরছে। একটু-আধটু অসুবিধাতো হবেই। হাঁটুর ব্যায়াম শুরু করেছি। আইবোপ্রুফেন খাই যখন ব্যথাটা বেড়ে যায়। এর বেশি আর কি করা? ভালোতো হবে না। একটু দমে থাকলেই হলো। খুব খারাপ হলে ডাক্তারের কাছে যাবো। নিশ্চয়ই যাবো।
এই হচ্ছে ট্রয়। পারতপক্ষে ডাক্তারের কাছে যাবে না। সে কিনা ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু! কিন্তু হাসি দেখে বুঝার উপায় নেই।
– বুঝলে ডাক্তার। কিছু কিছু পেশা আছে, যেখানে ভয় দেখালেই রোজগার বাড়ে। তোমরা হচ্ছো সেই দলে। যতোই চেষ্টা করো, আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না!
ট্রয় ভয় না পেলেও আমরা পেয়েছিলাম। সিটি স্ক্যানে দেখা গেলো ডান বুকের পুরোটা জুড়ে পানি। ফুসফুস দেখাই যাচ্ছে না। শ্বাসকষ্ট নেই, তাই ট্রয় টের পাচ্ছে না। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অনুমতি নিয়ে মোটেও বেগ পেতে হলো না। যতোই ঠাট্টা মস্করা করুক, রোগি হিসেবে ট্রয় আদর্শবান। যে কোনো উপদেশ মনোযোগ দিয়ে শুনবে। প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করবে। উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করে নিজের দু-একটা কথা বলবে। শেষমেশ ডাক্তারের ওপরেই ছেড়ে দেবে।
– আমি বাড়ি বানাতে পারি। আর তুমি রোগ সারাতে পারো। তুমি আমার ওপর ভরসা করেছিলে। তোমাকে ঠকাইনি, এবার আমি তোমার ওপর ভরসা রাখলাম। আমাকে ঠকিয়ো না।
ট্রয়ের কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বড়ো ঠকা তো হয়েই গেছে। বুকের পানি বের করে দেখেছি রক্তের মতো রং। লক্ষণটা মোটেও ভালো নয়। জানালাম থোরাকোস্কোপি করতে হবে।
অপারেশন টেবিলে অজ্ঞান করার আগে আমার হাতটা ধরে একটু চাপ দিলো। এবারো ঠাট্টা!
– জানি তোমরা এখন প্রার্থনা করবে। শুধু নিজের জন্যই করো না। আমার জন্যও করো। জেগে উঠে ভালো একটা খবর শুনতে চাই!
অপারেশন থিয়েটারে আমার দুটো নিজস্ব আচার আছে। হাল্কা আওয়াজের ক্লাসিকাল মিউজিক বাজে আমার সময়টুকুতে। এতে মনটা প্রসন্ন থাকে, উত্তেজনা কমে আসে, পরিবেশটাই অন্যরকম মনে হয়। এটা শিখেছিলাম ট্রেনিংয়ের সময় ইহুদি একজন সিনিয়র প্রফেসরের কাছে। আরেকটা হলো শুরু করার আগে আগে টিমের সবাইকে নিয়ে মাথা নিচু করে মৌন প্রার্থনা করা কয়েক সেকেন্ড। এই বিষয়টা শিখেছি এখানকারই এক সার্জনের কাছে। দুটোই ধরে রেখেছি এখনো। ট্রয়ের বউ আমার সার্জিক্যাল টিমের মেম্বার। তার কাছ থেকেই নিশ্চয় শুনেছে ট্রয়। কোনো উত্তর দিলাম না। তার আগেই ঘুমিয়ে গেলো।
বুকের ভেতরে ক্যামেরাসহ নলটা ঢুকাতেই মনিটরে ভেসে উঠলো থোকা থোকা এবড়ো থেবড়ো নডিউলগুলো। যা বুঝার বুঝে পেলাম। তাকিয়ে দেখি কাচের জানালার বাইরে উইলমার মুখ। আপনজনের সার্জারি। তাই ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। চোখ ছলছল। উইলমা আমার সঙ্গে অসংখ্যবার এসব দেখেছে। জানে সে এই নডিউলগুলোর মানে কি।
বায়োপসি রেজাল্ট আসায় খুবই অবাক হলাম। কোন ক্যান্সার নেই। উইলমা খুশি। ট্রয় আগের মতোই।
– সবই তো বুঝলাম। কিন্তু ডায়াগনোসিসটা কি দিলে?
– মোসোথেলিওমা। এসবেস্টস থেকেই হয়েছে। যেমনটা বলেছিলাম। তবে ক্যান্সার পাওয়া যায়নি।
– একই তো কথা ডাক্তার। আজ না হলেও আরো কয়দিন পরে হবে।
যৌবনে নেভিতে কাজ করতো ট্রয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় মার্কিন বহরে ছিল তার ডেস্ট্রয়ার। ট্রয়ের কাজ ছিল বয়লার রুমে। প্রচ- গরমে কায়িক শ্রমের কাজ। থাকার জায়গা ছিল ঘুপসি ঘরে গাদাগাদি করা বাঙ্ক বেডে। হৈ হুল্লোড়ে বেচারা ঘুমাতে পারতো না। বয়লারের এক পাশে খুঁজে বের করলো একটা স্টোর রুম। সেখানে রাখা থাকতো অগ্নিরোধক এসবেস্টস ক্যানভাসের রোল। চুপিসারে ঘুমানোর জন্য এটাই বেছে নিলো সে। একটা রোলে মাথা রেখে আরেকটা রোল কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো। তখন ভাবেনি এই এসবেস্টসের ধুলো বুকের ভেতরে মরণব্যাধির জন্ম দেবে একসময়। এখন বিষয়টা জানে। নিজের শরীরের অবস্থাও জানে। বউকে অনেক কিছুই বলে না। নার্স বউ টের পেয়ে যাবে।
মাস খানিক পরেই আবার ভর্তি হাসপাতালে। শ্বাসকষ্ট আর প্রচ- ব্যথা। না, বুকে পানি নেই এবার। তবে স্ক্যানে দেখা গেলো নতুন কয়েকটা নডিউল আর ফুসফুসের ওপরের পর্দাটা অস্বাভাবিক মোটা। আমার সন্দেহ গাঢ়তর হলো। সরাসরি বুঝিয়ে বললাম ট্রয়কে।
-আমার মনে হয় তোমার মেলিগনেন্ট মেসথেলিওমা। মোটেও ভালো ডায়াগনোসিস নয়। তাড়াতাড়ি কিমোথেরাপি দরকার। তার আগে আবার একটা বায়োপসি করব।
উইলমা বিষয়টা ভালোভাবে নিলো না। ঠিক হলো সেকেন্ড অপিনিয়ন নেয়া হবে। ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে পাঠালাম। আবারো সার্জারি। এবার থোরাসিক সার্জনের হাতে। আশ্চর্য। বায়োপসি রেজাল্টে এবারো বলা হলো কোন ক্যান্সার নেই। এদিকে ট্রয়ের অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ওজন কমছে দ্রুত। খাবার রুচি নেই। কড়া ব্যথার ওষুধ দিতে হচ্ছে। স্ক্যানে নডিউলগুলো দেখা যাচ্ছে।
– আমার মনে হয় তুমিই ঠিক ডাক্তার। কিমোথেরাপিতেই পাঠাও।
– পাঠাবো কি করে? বায়োপসি তো সমর্থন করে না। আর উইলমাও রাজি হবে না।
শেষমেষ ঠিক করলাম বায়োপসিগুলোরই সেকেন্ড অপিনিয়ন নেবো। বিষয়টা আমার জন্য নাজুক। দু জায়গায় দু সময়ে বায়োপসি হয়েছে, দু প্যাথোলস্টি একই কথা বলছে। এরপর সেকেন্ড অপিনিয়ন কেন। হাসপাতাল…
থেকে অনুমতি পাওয়া যাবে না। ইন্সুরেন্স মানবে না। স্বপ্রণোদিত হয়েই কাজটা করলাম। শার্লিকে বললাম, স্লাইডগুলো যোগাড় করে নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে। পাঠালাম বিখ্যাত একটা জায়গায়। মেসোথিলিওমা নিয়ে গবেষণা করে এমন একজন প্যাথলজিস্টের কাছে। কিছুদিনের ভেতরেই উত্তর আসলো। সব ঠিক মনে হলেও দুটো স্লাইডেই কিছু চিহ্ন আছে, যা বলে দেয় এটা মেলিগনেন্ট মেসোথিলওমা। সঙ্গে বিস্তারিত বর্ণনা, বিশ্লেষণ আর রেফারেন্স।
ট্রয় চুপ করে শুনলো আমার কথা। কোন ভাবান্তর নেই। যেনো আগে থেকেই জানতো।
– আমার মনে হয় কিছুতেই কাজ হবে না আর। তবু যদি বলো তো কিমোথেরাপি নেবো।
ট্রয় ঠিক বলেছিল। কিমোথেরাপি নিয়েছে। শেষ করতে পারেনি। তার আগেই মারা যায়।
উইলমা এখন আমার রোগি। স্বামী মারা যাওয়ার কিছুদিন পরেই কাজ ছেড়ে দেয়। ছয় মাস পর পর আমার ক্লিনিকে আসে। প্রতিবারেই ট্রয়ের কথা ওঠে। সেদিন দুঃখ করে বললাম ট্রয়ের সঙ্গে আমার কোনো ছবি নেই। কি করে যে হলো এটা!
রাতে বাসায় ফিরে দেখি উইলমা ট্রয়ের কয়েকটা ছবি রেখে গেছে আমার জন্য। সঙ্গে একটা কার্ড।
ছবিতে নেভির পোশাক পরা যুবক ট্রয়। পাইপ মুখে হাস্যোজ্জ্বল ট্রয়। হেঁটে হেঁটে গেলাম বাড়ির সেই অংশটাতে, যেখানে দেয়াল কেটে স্যুভিনির রাখার একটা জায়গা করা আছে। এটা ট্রয় নিজ হাতে বানিয়েছিল। তার মাথা থেকেই এসেছিল আইডিয়াটা। ওখানে একটা ফায়ার প্লেসের জায়গা ছিল আগে। ওটা ঢেকে দেয়াল দেয়ার কথা। ট্রয় বুদ্ধি দিল, দেয়াল না দিয়ে বরং ফাঁকা জায়গাটাতে একট সেলফ তৈরি করে দিই। ছবি রাখতে পারবে।
ওখানেই সাজিয়ে রাখলাম ছবিগুলো। মনে হলো ট্রয় আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
– দেখেছো তো এবার, কেন বলেছিলাম!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here