print

ঠিকানার কবিতাগুচ্ছ

20

বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও সভ্যতার বিবর্তন

শামসুল হুদা

আদিকালের মানুষ ছিল হিংস্র ও বর্বর
বসবাস ছিল বনে-জঙ্গলে গাছের কোটরে
ছিল না কোন আচ্ছাদন লজ্জাস্থান বা শরীরে
ক্ষুধা মিটাত বনজ ফল লতাপাতা খেয়ে
আর পশুপাশি জীবজন্তুর কাঁচা মাংস দিয়ে
হিংস্রতা হানাহানি মারামারি ছিল দৈনন্দিন জীবনে
ধীরে ধীরে শরীর ঢাকা শুরু গাছের বাকল পরিধানে।
অনেক পরে পাথরে পাথরে ঘষে আগুন আবিষ্কার
এ আগুন ব্যবহারে তৈরি আধা রান্না খাবার।
আগুনের ব্যবহার জানার পর আদি মানুষের শুরু পরিবর্তন
ক্রমান্বয়ে শুরু অসভ্যতার থেকে সভ্যতার আচরণ
বছরের পর বছর ক্রমাগত অগ্রগতিতে আজকের উন্নয়ন
সীমাহীন উন্নয়ন অতি উন্নয়ন এনে দিয়েছে অধঃপতন।
তাই প্রশ্ন উঠেছে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ
বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও উন্নতি অবশ্যই আশীর্বাদ।
এর অপব্যবহারই হল সমূহ দুঃখজনক অভিশাপ
ফলে পৃথিবীময় সন্ত্রাস ও সংঘাতের অনাকাঙ্খিত প্রকোপ।
কোন কোন ক্ষেত্রে এ তথাকথিত সভ্য সমাজের বর্বরতা
ছাড়িয়ে গেছে আদি ও মধ্যযুগীয় নির্মম নৃশংসতা।
দেশে দেশে মানুষ যে অত্যাধুনিকতায় সভ্য হচ্ছে
বিভিন্ন কার্যকলাপে মনে হয় যেন আদি যুগে ফিরে যাচ্ছে।
এর থেকে পরিত্রাণের উপায় বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার
সাথে সাথে পৃথিবীময় বিবাদ-বিসম্বাদ ও সংঘাত পরিহার।
জ্ঞান বিজ্ঞানে পৃথিবীর সীমাহীন উন্নতি ও অগ্রগতি
পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশের অন্য গ্রহ-উপগ্রঘের ব্যাপ্তি
বুঝা মুস্কিল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এর গতি ও পরিণতি।
ভাষাসৈনিক, সিয়াটল।

রুদ্ধ আগল খুলে

শফিক জামিল

চিরায়তই চাইনি আমি কারো হতে কিছু নিতে
গোপনে প্রকাশ্যে ইনিয়ে-বিনিয়ে বা লোকচক্ষুর অন্তরালে
হাত পেতে মুখ ফুটে বলে বা ধারকর্জ করে;
পছন্দ করি, ভালবাসি দিতে
দু’হাত উজাড় করে আঁচল ভরে উছল করে
প্রাণভরে হৃদয়ের যত রুদ্ধ আগল খুলে
প্রবহমান ঝর্ণা হয়ে উৎস হতে শেষ যেখানে;

আমি আসিনি নিতে
এসেছি দখিণা দুয়ার খুলে অবারিত যথেচ্ছাচার দিতে
অবিরত বৃষ্টিধারার মত ঝরিয়ে
বসন্তের ঝরাপাতার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে
রাতের আকাশের অগণিত তারার সমানে
সাগরের বিশাল বিপুল জলরাশির পরিমাণে
অক্লান্ত নিদ্রাহীন গভীর রজনী অবধি ধরে
আহ্নিক সময়ে যতটা সম্ভব কুলায় চাই দিতে;

আমি যেখানে থাকি বা যেখানেই যাই
আমার ঠিকানা যেখানেই হোক না ভাই
সেথা হতেই আমি দিয়ে যেতে চাই
বেঁচে থাকি যতকাল দিয়ে যেতে চাই;

অন্তহীন অসীম আরো সম্প্রসারিত করে
দিতে চাই, দিতে চাই, দিতে চাই- চাই দিয়ে যেতে;

মানবতার হিতাকাঙ্খী হয়ে সেবা দিতে চাই
মানুষ হয়ে মানুষের যত দুঃখ-কষ্ট দূর করতে চাই;

মানুষের কাজ শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা নয়
বাছবিচারহীন লাজলজ্জা ভুলে নিতে নয়;

আমি দিতে চাই- নিতে নয়,
কোন সাত-পাঁচ ভেবে নয়
কোন কালো-সাদা, জাতি-ধর্ম বেছে নয়;

আমি দিতে এসেছি- দিয়ে যেতে চাই
আমি দিতে ভালবাসি- দিয়ে যাব তাই।
-নিউ ইয়র্ক।

অসমাপ্ত

সাহেরা আফজা

বহুকাল আগে শৈশব কৈশোর পেরিয়ে
নব যৌবনে উদ্দাম আবেগাপ্লুত দুঃসাহসে
সূচনা করেছিলেম শিরোনামহীন এক কবিতা
সে কবিতার প্রথম শব্দ ছিলে তুমি
প্রথম চরণ সেখানেও তুমি; আমার হৃদয়ের
গোপন গহীনে নিঃশব্দ জলতরঙ্গ
অবিরাম যে বেজেছো তুমি!
আমার কবিতায় শব্দেরা ছিল না সালঙ্কারা
ছন্দে ছিল না কোন মিল, শুধু জানি তুমি ছিলে
আমার সমগ্র চেতনায় সুগভীর অনুভবে!
না বলা কথায় নীরবে গাঁথা কত কথামালা
মৌন বসে পাশাপাশি, শুধু কাছে থাকা কিছুক্ষণ;
চোখের তারায় বুঝে নেয়া স্বপ্নের ভাষা
না দেখা বিরহে অধীর পথ চাওয়া
অর্থহীন কত কথা মান অভিমান কত!
জাগতিক নিয়মে গড়িয়েছে কালের চাকা –
কত যে বন্ধুর পথ চলেছি একাকী
তবু ছন্দবিহীন আমার কবিতার গতি
এতটুকুও হয়নি শিথিল —
অকস্মাৎ একদিন কোন এক অজানা, অচেনা
ঊীভৎস প্রলয় তার উন্মত্ত উন্মাদ উল্লাসে
জড়িয়ে নিল অসমাপ্ত আমার কবিতার পাতাগুলি
হারিয়ে গেল আমার কবিতা থমকে গেলে লেখা
তাই আজ অসমাপ্তিই রয়ে গেল আমার কবিতা
সেদিনের তুমি ময় সেই কবিতা।
পেনসিলভেনিয়া।

বাস্তবতা

শামীম আরা ডোরা

প্রখর রোদ। বিছানায় শুয়ে একই স্বপ্ন
আমি আমারই প্রশ্ন?
জীবন কি চৈত্রের তাপদাহ?
অথবা শীত সকালের ফিলাডেলফিয়া?
কেমন করে বলব আমি?
কিছু মনে করে নেওয়া।
গোলাপের যদি আছে কাঁটা
মানুষের জোয়ার ভাটা
বৈশাখের যদি প্রচন্ড ঝড়
শীতের শৈত্য কেন হবে রাতের আঁধার
শরতের শুভ্রতা
যেখানে জাগ্রত আত্মা
এক মুহূর্তের ছন্দে
বাংলা ভাষার কবিতা
ভাবাবেগে তাড়িত আমি
জীবনের ঘূর্ণায়মান বাস্তবতা।
নির্মোহ নিখুঁত প্রাঞ্জল গভীরতা
সবাই কি চায়, পায়?
চাকরি না থাকলে কেউ খোঁজে বেকারভাতা
অভিজ্ঞতা না থাকলে নেই কোন বড় দাতা
জীবন কি চায়ের কাপে ঝড়?
অথবা দুর্বল আড্ডার আসর?
জীবনের সংজ্ঞা কেউ দিতে পারে না
দিন যায়, রাত আসে অবিন্যস্ত যাতনা।
ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকবে মানবের গুপ্ত আয়ু
চলছে চলবে জীবনের জলবায়ু
জীবনের জয়গান
জীবনেরই চেতনা
আগামীর অপেক্ষা?
নিজেও তা জানি না?
-নিউইয়র্ক।

এভাবেই কী চলছে স্বদেশ?

দেওয়ান নাসের রাজা

এভাবেই কী চলছে স্বদেশ?
সাপের বিষে জ্বলছি তবু-
মিথ্যে হাসি মিথ্যে লেবাস!

এভাবেই কী চলছে স্বদেশ?
একই ছন্দে একই তালে-
ধূষর মেঘে ঢাকা আকাশ!

এভাবেই কী বুকের পাজর?
ভাঙ্গতে ক্রুর আঘাত হানে-
ভাঙ্গলো তার প্রিয় নিবাস!

এভাবেই কী চলবে স্বদেশ?
বাসে ট্রেনে আগুন জ্বলে-
পাড়ার মোড়ে পড়বে কী লাশ!
নিউইয়র্ক।

আমার মা বাবা এবং আমার ছেলে মেয়ে

দিল আফরোজ কাজী রহমান চাঁপা

আমার ছেলেমেয়েরা আমার গৃহে
আসে দক্ষিণা বাতাসের মতো ।
মিষ্টি বাতাসে প্রাণ যায় জুড়িয়ে ।
তারপর কখন যেন ধীরে ধীরে,
সময় গুলো যেতে থাকে ফুরিয়ে।
তখন তারা সন্ধ্যার মতো আস্তে
দূর থেকে দূরে সরে যায় ধীরে ।
আমি সেই মিষ্টি সময়গুলোকে
স্মৃতির সূতোয় বেঁধে রাখি সযতনে ….
নীরবে হৃদয়ে নিভৃত কোণে ।

আমার ভালোবাসারা পাখা মেলে –
আমার ফেলে আসা সেই সুদূর অতীতে,
আমার শৈশবের নীল সমুদ্র উপকূলে ।
আমি স্বপ্নের মতো দেখতে থাকি ….
আমার হারিয়ে যাওয়া মায়াবী অতীত …
হরিণীর মতো মায়াবী ব্যাকুল নয়ন মেলে ।
যেখানে আমার বাবামায়ে ব্যাকুল চোখ,
প্রতীক্ষারত ব্যাকুল মন আমাকে দেখার জন্য ।
মনে পড়ে মায়ের ব্যাকুল বাহুর কথা ….
বাবার স্নেহমাখা হাতের মায়াবী স্পর্শের কথা ।

এক গভীর ভালোবাসা আমাকে আচ্ছন্ন করে,
আর আমি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি ।
সেই অতীতের স্মৃতিতে আমি ডুবে থাকি ।
আর আমার দু’চোখে তখন,
অশ্রুর বন্যা নামে ব্যাকুল ধারায় ।

ঐ এক কাপ চায়ের মূল্য কত?

ডক্টর ওয়াল্টার দিলু বিশ্বাস

বন্ধু,
যে দিন তোমার ঘরে এক কাপ চা খেয়েছিলাম,
সে দিন হতে আমি তোমার কাছে চিরঋণী;
চিরকৃতজ্ঞ। আমি তোমার চিরমঙ্গলাকাঙ্খী,
তাই আমা দ্বারা তোমার মঙ্গল বই ক্ষতি হবে না
কোনদিন, এমনকি যদি তুমি কোন কারণে
আমাকে ভুল বুঝে ক্রোধে, রোষে খেপে উঠে
বিশ্রী গালাগালিসহ আমার মুখের উপরে
ঘুষি মার, তথাপি আমি তোমাকে
বলবো, “দিলেম ক্ষমা কওে,” যা হচ্ছে
সেই এক কাপ চায়ের মূল্য!
নিউ ইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here