print

রাজনীতির দাবা খেলায়

0

মহিউদ্দিন খান মোহন

ঘটনাটি ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা অনেকেই ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি এবং আকস্মিকভাবে ঘটবে, তা কারোরই ধারণায় ছিল না। গত ১৩ অক্টোবর যখন খবর প্রচারিত হলো, বি. চৌধুরীকে বাদ দিয়েই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে, তখন অনেকেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছেন। কেননা, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন বিকল্পধারা সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তাকে বাইরে রেখে সে জোট গঠিত হতে পারেÑ এ যেন বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই হয়েছে। আর এর পেছনের যেসব খবর গণমাধ্যমে এসেছে, সেগুলো বেশ চাঞ্চল্যকর। শোনা যায়, বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে কোনো ধরনের ফ্রন্ট বা জোট গঠনে একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব ও বি. চৌধুরী তনয় মাহী বি. চৌধুরী। অনেকেই বলেছেন, পুত্র মাহী চৌধুরীর ইচ্ছা পূরণের জন্য বলি হতে হলো পিতা বি. চৌধুরীকে।
তাকে বাদ রেখে যেদিন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়, সেদিন নিজ বাসায় ডা. বি. চৌধুরী পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে তিনি যেসব কথা বলেছেন, তাতে অনেকেরই মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর চক্রান্তে বিকল্পধারা নেই। তার এ মন্তব্য গণমাধ্যমে আসার পর সর্বত্র প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কাদের ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি? আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের বিষয়টিকে তিনি যখন চক্রান্ত বলে আখ্যায়িত করছেন, তাহলে প্রশ্নÑ সে চক্রান্তের কি তিনিও অংশীদার ছিলেন না?
দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক অধ্যাপক বি. চৌধুরীর বর্তমান অবস্থান যে মোটেও সুখকর নয়, সেটা বলে বোঝানোর দরকার পড়ে না। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় একজন পেশাজীবী থেকে রাজনীতিকের কাতারে শামিল হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে প্রথম সারির রাজনীতিকের তালিকায়ও নাম তুলতে পেরেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ দুই যুগের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধূলিসাৎ হয়ে যায় রাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দেওয়ার পর। স্বদলের বিরাগভাজন হয়ে ২০০২ সালে যখন তিনি বঙ্গভবন ছাড়েন তখন বলেছিলেন, রাজনীতি আর নয়। তবে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে নিজের অভিজ্ঞতা ও মেধা দিয়ে কেউ চাইলে সহযোগিতা করবেন। পদত্যাগের দুই বছরের মাথায় নানা ঘটনা-রটনার জন্ম দিয়ে তৈরি করেন নতুন দল বিকল্পধারা বাংলাদেশ। এরপর ড. কামাল হোসেন ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে গঠন করেন তিন দলীয় ঐক্যজোট। তবে তা বেশিদূর এগোতে পারেনি। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর গঠন করেন নতুন আরেকটি দল। সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন বিএনপিতে থাকাকালীন বৈরী সম্পর্ক ছিল যার সঙ্গে সেই কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে। গঠন করেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-এলডিপি। চেয়ারম্যান হন বি. চৌধুরী আর কর্নেল অলি হন কো-চেয়ারম্যান। সে সময় রাজনৈতিক সচেতন মহলে সংশয় দেখা দিয়েছিল দুই মহারথীর গড়া দল কত দিন টিকে থাকবে। সে সংশয়কে সত্যি প্রমাণ করে মাত্র ছয় মাসের মাথায় তারা আলাদা পথে যাত্রা শুরু করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘর ভাঙার ঘোষণা দিয়ে তারা পৃথক হয়ে যান ২০০৭ সালের জুলাই মাসে। বি. চৌধুরী তার পূর্বতন দল বিকল্পধারা পুনরুজ্জীবিত করেন আর কর্নেল অলি এলডিপি নামটি দখলে রাখেন। সেটা ছিল ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের জরুরি সরকারের সময়কালের কথা।
বিএনপি থেকে বেরিয়ে বি. চৌধুরী রাজনীতির মাঠে আশ্রয় কম খোঁজেননি। শুধু বিএনপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার মানসে তিনি স্বমুখে হাজারবার নিন্দা করেছেন যাদের, তাদের কাছে ধরনা দিতেও দ্বিধা করেননি। ২০০৫ সালের ১৫ মে পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় যোগ দিয়েছিলেন বি. চৌধুরী। তা তিনি যোগ দিতেই পারেন। তাতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সভামঞ্চে তিনি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় হাঁটু গেড়ে যেভাবে কথা বলেছিলেন, সে ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। (সূত্র : প্রথম আলো, ১৬ মে, ২০০৫)। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির এহেন নতজানু মনোবৃত্তি অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তারপর ডা. বি. চৌধুরী আওয়ামী লীগের নৌকায় চড়ে রাজনীতির সাগর পাড়ি দেওয়ার অনেক কসরত করেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে নৌকার চড়নদার করেনি। সম্ভবত আওয়ামী লীগ বৈঠা (ভোটার, সমর্থক ও কর্মী) বিহীন কাউকে নৌকায় চড়িয়ে অযথা বোঝা বাড়াতে চায়নি। ২০০৬ সালে যখন টালমাটাল অবস্থা চলছে, তখন বিএনপিবিরোধী মহাজোট গঠনের আহ্বান সংবলিত শেখ হাসিনার চিঠি নিয়ে আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাসায় বার্তাবাহক হয়ে যেতেও কুণ্ঠিত হননি বি. চৌধুরী। সে সময় বেশ কিছুদিন আওয়ামী লীগের দরবারে যাতায়াত করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের শিকে তার ছেঁড়েনি। ঠাঁই হয়নি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর চিঠি নিয়ে তিনি যার কাছে গেলেন, তিনি ঠিকই ঠাঁই পেয়েছেন।
এরপরই চৌধুরী সাহেব তার কেবলা পরিবর্তনের চেষ্টা শুরু করেন। বিএনপির মধ্যে থাকা তার কিছু গুণগ্রাহীর মাধ্যমে কসরত করতে থাকেন সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য। আর এ ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করতে থাকেন দলটির বর্তমান মহাসচিব স্বয়ং। দাওয়াত পেতে থাকেন ইফতার মাহফিলসহ নানা অনুষ্ঠানে। এমনকি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও প্রধান অতিথি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। বছরখানেক আগে তিনি আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য নিয়ে গঠন করেন যুক্তফ্রন্ট। কিন্তু দেশের সমকালীন রাজনীতিতে তা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টায় শামিল হন। নানা ঘটনার পরম্পরায় শেষ পর্যন্ত সে ঐক্যজোট গঠিত হলেও তাতেও থাকতে পারলেন না বি. চৌধুরী।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে না থাকার পেছনে দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বিকল্পধারার নেতারা। বি. চৌধুরী বলেছেন, ষড়যন্ত্র করে তার দলকে বাদ দেওয়া হয়েছে আর তার পুত্র মাহী চৌধুরী বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও তাদের সহযোগীদের সঙ্গে তারা ঐক্য করতে রাজি ছিলেন না। এ বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ১৯৯১ সালে বিএনপি যখন জামায়াতের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল, সে সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন বি. চৌধুরী। আবার ২০০০ সালে বিএনপি যখন জামায়াতকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে, তখন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি। এমনকি ২০০১ সালের নির্বাচনে সেই চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হওয়ার পর প্রথমে জোট সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন বি. চৌধুরী, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ছিল একেবারেই প্রকাশ্য। কই, তখন তো তাকে কোনো প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি কিংবা মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণে আপত্তি করেননি তাহলে এখন কেন এ বাগড়া? সম্ভবত এ অবস্থানকেই কর্নেল অলি তুলনা করেছেন গোশত হারাম ঝোল হালাল প্রবাদের সঙ্গে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে যে প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হচ্ছে তাহলো, অধ্যাপক বি. চৌধুরীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। এমনিতেই তার দল বিকল্পধারা নড়বড়ে সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে চলছিল। দেশের জেলা-উপজেলায় কমিটি দূরে থাক, খোদ কেন্দ্রীয় কমিটিও পূর্ণাঙ্গ ছিল না। গঠনতন্ত্রে ৭১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির কথা বলা থাকলেও সক্রিয় ছিলেন ২৫-২৬ জন। তাদের মধ্যে ১৭-১৮ জন নবগঠিত কমিটির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এমতাবস্থায় এই ভাঙাচোরা দল নিয়ে বি. চৌধুরী কতদূর এগোতে পারবেন? এ দিকে তার মহাসচিবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান গ্রহণ এবং ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে তিনি আত্মসাৎ করেছেন প্রায় হাজার কোটি টাকা। দুদক ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। এসব অভিযোগে যেকোনো মুহূর্তে তিনি আইনের আওতায় চলে যেতে পারেন। ফলে আগামী দিনে রাজনৈতিক সঙ্গী খুঁজে পাওয়া বি. চৌধুরীর জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
১৯৭৮ সালে বিএনপির মহাসচিব হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর। ৩২ বছর ওই দলের সঙ্গে থেকে নিজেকে দেশের শীর্ষ রাজনীতিকদের কাতারে শামিল করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আজ দীর্ঘ ৪০ বছর পরে তার সে ভাবমূর্তি অনেকটাই মøান হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের মতে, রাজনীতির দাবা খেলায় কিস্তিমাত করতে চেয়েছিলেন বি. চৌধুরী। কিন্তু ভুল ঘুঁটি দিয়ে ভুল চাল দিয়েছিলেন তিনি। যার ফলে কিস্তিমাত তো দূরের কথা, উল্টো রাজা-উজির হারিয়ে তিনিই হলেন পরাস্ত। রাজনীতির দাবা খেলা বোধ করি একেই বলে।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here