print

রাজপথের আন্দোলনে সকলের অংশগ্রহণ চাই

3

মো. জামান তপন

ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও লুটেরা শ্রেণীর উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে জনজীবনে সীমাহীন দুর্গতি ও অবনতি ঘটানো হয়েছে। আদর্শবাদ, নীতি-নৈতিকতা মানবিকতার বদলে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা ও সুবিধাবাদকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। ফলে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। রাষ্ট্রীয় বড় পদগুলো তোষামোদকারী, চাটুকার ও নীতিভ্রষ্টদের নিয়ন্ত্রণে। দিনকে দিন সৎ মানুষদের সৎভাবে জীবনযাপনকে কঠিন থেকে কঠিনতর করা হচ্ছে। সাড়ে ৪ কোটি বেকারসহ সাড়ে ৯ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। অথচ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীই সম্পদ সৃষ্টি করে ও খাদ্য উৎপাদন বাড়ায়। আর শাসক লুটেরা শ্রেণী রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুন্ঠন করে দেশে-বিদেশে অর্থ পাচারে ব্যস্ত এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ায়। প্রবাসীরা বিদেশী মুদ্রা আনে আর এরা বিদেশে টাকা পাচার করে। এদের বেশির ভাগেরই পরিবার পরিজন, সন্তান-সন্ততি, সম্পদ ইত্যাদি নিয়ে তারা বিদেশে স্থায়ী করে নিয়েছে। কচ্ছপের মতো গলা বাড়িয়ে রেখেছে বাংলাদেশের জমিনে ক্ষমতা করায়ত্তে রেখে আরও সম্পদ লুটে নেবার জন্য। সেজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ প্রকৃতি ইত্যাদি ধ্বংসের মুখে পতিত হলেও তাদের তেমন মাথা ব্যথা হয়না নিছক লোকদেখানো তৎপরতা ও মনভুলানো বাণী বর্ষণ ছাড়া। নারীরা বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারী শিশুদের পক্ষে মান ইজ্জত সম্ভ্রম রক্ষা করা এমন কি নিরাপদে ঘরে বাইরে হয়রানিমুক্ত জীবনযাপন করাও দুষ্কর। ৪৮ বছর পালাক্রমে বুর্জোয়া শাসনে রাজনীতিকে নীতিহীনতার পঙ্কে ডুবানো হয়েছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক হানাহানি, খুনোখুনি, সংঘাত-সংঘর্ষ, চক্রান্ত- ষড়যন্ত্রেলিপ্ত থেকে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান পরস্পরের বিপরীত মেরুতে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাই রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ্য উদ্দেশ্য। কে কার চেয়ে কতো বেশি খারাপ তার তুলনামূলক অসার বাগবিত-া এদের জাতীয় রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের প্রাণসত্ত্বাকে গলাটিপে তারা সামরিক পোষাকী ও সিভিল পোষাকী পার্থক্য দিয়ে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রকে পরিমাপ করে। আবার কখনও উভয় পোষাকী মিলনে গণতন্ত্রের গান ধরে, সুর তোলে। নির্বাচনকে গণতন্ত্র নির্বাসনের ব্যবস্থায় দাঁড় করানো হয়েছে। শাসন কাঠামোর উচ্চ পর্যায়ে অধিকাংশ সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যবসায়ী ও নি¤œ পর্যায়ে পেশি শক্তিধারী দুর্বৃত্তদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে গেছে। আমলাতন্ত্রকে পাবলিক সার্ভেন্টের বদলে সরকারি দলের সারভেন্টে পরিণত করা হয়েছে। দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা, সততা, কর্মনিষ্ঠা, দেশপ্রেম ইত্যাদি প্রমোশনের মানদ- না হয়ে অদক্ষতা, অযোগ্যতা সত্ত্বেও প্রশ্নাতীত আনুগত্যে পদহীন প্রমোশন ঘটছে অহরহ। অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করার পাশাপাশি শাসক গোষ্ঠীর বেআইনী কাজের অংশীদার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পর্যবেক্ষকের স্তরে নামানো হয়েছে এবং সরকারের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে। বিচার বিভাগের উপরের অংশ বিচারপতি স্নিহা ট্রাজেডির পর এখনও দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে নতুন শিকল বাধা হয়েছে যাতে তারা দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দিতে হাত বাড়াতে না পারে। এগুলোসহ পাবলিক সার্ভিস কমিশন, আইন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, কমপ্রোটলার অডিটর জেনারেল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসমূহের কোনটাকেই গণতান্ত্রিক আইনগত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। এ সংস্থাগুলোকে নির্বাহী শক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা, খেয়াল খুশীর বিধান থেকে মুক্ত করতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন, সুশাসন, গণতান্ত্রিক গণপ্রতিনিধিত্বমূলক স্তরায়িত শাসনকাঠামো কোন কিছুই দাঁড় করানো যাবেনা। আর্থিক ব্যবস্থাপনাকেও অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিতাহীন করে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংঙ্কের উপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের খরবদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংঙ্কে শাসক দলের নানা পদবঞ্চিত ব্যক্তিদের সন্তুষ্টি পুরস্কার হিসাবে পরিচালনা পর্ষদে ঢোকানো, আর্থিক সক্ষমতা, চাহিদা ও কার্যকারিতার নিরিখে বিবেচনা না করে শাসক দল ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মালিকানায় ব্যাংঙ্কের পর ব্যাংঙ্ক স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে আর্থিক গতি সঞ্চারের বদলে খেলাপী লুটপাটের পরিমাণ ও পরিধি বৃদ্ধি করে চলেছে। যেমন বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরুতে অর্থাৎ ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংঙ্কের খেলাপী ঋণ ছিল ৫%, ২০১৪ সালে এসে তা ৬৮% হয়ে যায়। এই সময়কালে শাসক দলের পছন্দসই ক্ষমতাধর ব্যক্তি আব্দুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান ছিলেন। বাজেট থেকে ৩০০০ কোটি টাকা দিয়েও বেসিক ব্যাংঙ্কের উন্নতি হয়নি। সরকার দলীয় এক নেতার পরিচালনায় ফার্মার্সব্যাংঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হতে না হতেই দেউলে। অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। শেয়ার বাজার থেকে ২০/ ৩০ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংঙ্ক থেকে টাকা পাচার হওয়া তদন্তের রিপোর্টও আলোর মুখ দেখেনি। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এখন পুকুর চুরি হচ্ছে না, সাগর চুরি হচ্ছে। সাদা অর্থনীতির চেয়ে কালো অর্থনীতি বহুগুণ বড় ইত্যাদি। কিন্তুকথা বলেই তার কাজ শেষ! এখন দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাকে একই অবস্থায় রেখে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। শাসক দল স্বতপ্রণোদিত হয়ে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ রচনা করে দেবে তা সম্ভব নয়। কারণ তারা উন্নয়নের উচ্চতা যত উপরে দেখাচ্ছে তাদের জনপ্রিয়তা তার চেয়ে অনেক বেশি নিম্নগামী হয়ে পড়েছে। এটা তারা জানে এবং জানে বিধায় ঝুঁকিতে যাবেনা। শাসন প্রশাসনের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কলুষিত হয়ে পড়লেও সকল ক্ষেত্রে অসংখ্য মানুষ তা থেকে বেরোতে চান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুশাসনে জীবন জীবিকা নিয়ে বাঁচতে চান। কিন্তু শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে তারা অসহায় অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্বৃত্তদের দাপট ক্রমবর্ধমান। ফলে এখন প্রয়োজন গণতান্ত্রিক শাসনের উপযোগী আমূল সংস্কার। শাসন, প্রশাসন, প্রথা-প্রতিষ্ঠান, আইন, বিধি-বিধান, আদালত, নির্বাচন কমিশন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক জাগরণ, শিক্ষাকে বহুমুখী বিকৃত ধারা থেকে রক্ষা, স্বাস্থ্য সেবাকে জনগণের নাগালে আনা, দলবাজদের কর্তৃত্বের স্থান থেকে অপসারণ ইত্যাদি অনেক কাজ। এর জন্য যারাই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার কথা বলবেন, গণতান্ত্রিক শাসন প্রশাসন প্রতিষ্ঠানের কথা বলবেন, সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ এর কথা তুলবেন শ্রমিক-কৃষক মেহনতী মানুষের জীবনকে দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্ত করার কথা ভাববেন, আঞ্চলিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, কালোটাকা, পেশী শক্তির দাপট মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন চাইবেন তাদের শুধু ক্ষমতা বদলের কথা বললে চলবেনা, ব্যবস্থা বদলের লক্ষ্যে ক্ষমতা বদলের ধ্বনি তুলতে হবে। বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। গণতান্ত্রিক শাসন প্রত্যাশী সকল শক্তিকে মিলিতভাবে অথবা যার যার অবস্থান থেকেই রাজপথে আন্দোলনে নামতে হবে। জনগণের ঐক্যের শক্তিকে শাসক গোষ্ঠীর অশুভ পরিকল্পনা বাবস্তবায়নের শক্তি ও ক্ষমতার চেয়ে বড় করে গড়ে তুলতে হবে যাতে জনগণের আন্দোলনের শক্তিতে শাসকদেরকে গণদাবী মানতে বাধ্য করা যায় এবং তাদের যে কোন জাল-জালিয়াতি, কেনা বেচা, হামলা-মামলা, ভয়-ভীতি ও চক্রান্ত পরাভূত করা যায়।
নিউ ইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here