সংলাপে স্বস্তি, সংলাপে শঙ্কা

4

দেশে এখন কেবলই এককথা, সংলাপ, সংলাপ আর সংলাপ। সংলাপ ছাড়া রাজনীতি নেই। সংলাপের বাইরে কোনো কথাবার্তা, ভাবনা-চিন্তা নেই। নাগরিক সব ভাবনা এখন সংলাপ নিয়ে। বাংলাদেশে আগামী সকল মুক্তি, সকল স্বস্তি, সকল শঙ্কার অবসান যেন নির্ভর করছে আজকের সংলাপের ওপর।
বাংলাদেশে যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, দেশের মানুষ চাইছিল সেই সংস্কৃতির বদল হোক। জনগণের এ চাওয়া খুবই আন্তরিক। তাদের বিশ্বাস হয়ে যায় যে, চলমান ওই সংস্কৃতির বদল না ঘটা পর্যন্ত দেশের অসহিষ্ণু, অস্থির, অশান্ত এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটবে না। এ পরিবেশের মধ্যে যত আকাশ ছোঁয়া ভবন নির্মিত হোক, যত উড়াল ব্রিজ, রাস্তা-ঘাট হোক, যত পদ্মা সেতু হোক আর মেগা মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘটুক, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু না থাকলে দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয় না।
বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যোগাযোগ, কথাবার্তা রাজনৈতিক সংলাপের কোনো সংস্কৃতি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই চালু থাকতে দেখা যায়নি। দুই পক্ষের মধ্যে দেশের জনগণ সাপে-নেউলে সম্পর্ক দেখে আসতেই অভ্যস্ত। গণতন্ত্রের অমীয় বাণী মুখে থাকলেও তারা একে অপরের মুখ দেখে, কথা বলে রাজনীতি করতে অভ্যস্ত নয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বড় বৈশিষ্ট্য নিজ দলের রাজনীতির পক্ষে বলা, অথবা নিজ আদর্শের প্রচার করা নয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করা। নিজের কথা না বলে বিরোধীদের রাজনীতির সমালোচনা করা। অন্যের ব্যর্থতা, অসারতা তুলে ধরা। বিরোধী দল, বিরোধী নেতার গুষ্টি উদ্ধার করা।
সংলাপের সূচনা এবার সম্ভবত সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে চলেছে। তার আলোকেই উপরের ভূমিকাটুকুর আশ্রয় নেয়া। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। যাকে বাংলাদেশে রাজনীতির অনন্য মাইলফলক বলছে সর্বস্তরের মানুষ, বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বলছেন, বাংলাদেশের যারা ভালো চান, তারাও। সেটি সংলাপ। বিরোধী পক্ষগুলো বিশেষ করে প্রধান বিরোধীপক্ষ বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে সরকার এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের সংলাপ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সংলাপকে নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করছেন। কেননা এই সংলাপে তৃতীয়পক্ষ বা মধ্যস্থতাকারী কোনো পক্ষ নেই। সেই ভিন দেশ যাদের আমরা দূরবর্তী বা প্রতিবেশী মোড়ল বলে জানি, তাদেরও কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।। সরাসরি, নিজেদের তাগিদে। সে কারণে এই সংলাপের গুরুত্ব সকল পক্ষের কাছেই অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ইতিপূর্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে বিদেশিদের দূতিয়ালিতে অনেক সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু বরফ গলতে দেখা যায়নি। এবার বাইরে কোনো তৃতীয় পক্ষের উদ্যোগ ছাড়াই সরাসরি এক পক্ষের উদ্যোগে আরেক পক্ষের সাড়া দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই সংলাপ সংঘটিত হয়। প্রথম দফা আলোচনা সরকার ও ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় ১ নভেম্বর। এককথায় বলা যাবে না সংলাপ ফলপ্রসূ হয়েছে। আবার সংলাপ সফল হয়নি, সেটাও একদফা আলোচনার পরই মনে করার কারণ নেই। রাজনৈতিক আলোচনার সাফল্য এ রকম একটা বৈঠকের পরই নির্ধারিত হয়ে যায় না। তবে বাংলাদেশে এতদিন রাজনৈতিক যে সংস্কৃতি চালু ছিল তা পরিবর্তনের আভাস মিলছে এই সংলাপ থেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই সংলাপ রাজনৈতিক বরফ গলার সূচনাÑ এ কথা নিশ্চিতই মনে করা যায়।
বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৮ বছরের ইতিহাসে কখনও স্বস্তিলাভ করেনি রাজনৈতিক পরিবেশ বিবেচনায়। তাদের মনে স্বস্তির আকাক্সক্ষা থাকলেও শঙ্কার বাইরে কখনই অবস্থান করতে পারেনি। সূচিত সংলাপ অবশ্যই জনমনে একটা আশাবাদের জায়গা তৈরি করবে। যদিও বাংলাদেশের জনগণের সচেতনতার যে সূচক তারা যথেষ্টভাবেই অনুধাবন করতে সক্ষম যে, স্বাধীনতার পর এত দীর্ঘদিন ধরে যে বৈরী মেঘ জমেছে, তা একদিনেই দূর হয়ে যেতে পারে না। তাই এই সংলাপে নিয়ে জনমনে একদিকে যেমন স্বস্তি বা আশাবাদের জন্ম নিয়েছে, তেমনি শঙ্কার কাঁটাও খচখচ করছে। রাজনীতিবিদেরা বাংলাদেশের জনগণের চাওয়া-পাওয়ার দিক বিবেচনায় নিয়ে কখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। গণতন্ত্রে সংসদে শাক্তিশালী বিরোধী দল জরুরি। সেটাও তারা মনে করেন না। অবাধ, নিরপেক্ষ সকল দলের অংশ গ্রহণে একটি নির্বাচনের জন আকাক্সক্ষা নিয়েও তাদের মাথাব্যথা নেই। তারা সব সময় নিজেদের লাভক্ষতির হিসাব থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যার মূল লক্ষ্য রাষ্ট্র ক্ষমতা। ক্ষমতার বাইরে তারা আর কিছু কখনও ভাবেননি।
বাংলাদেশে রাজনীতির মূল আকর্ষণের জায়গা এখন এই সংলাপ। টিভি চ্যানেলের সংবাদ, পর্যালোচনা, টকশো, পত্র-পত্রিকার সংবাদ, সম্পাদকীয়, পারিবারিক সামাজিক আলাপচারিতা সর্বত্র সংলাপ নিয়ে কথা। আসলে সংলাপ কতটা সফল হয়েছে বা হবে সেটা বড় কথা নয়, মানুষ চায় একটি ইতিবাচক ফল। মানুষ চায় রাজনীতির অঙ্গন থেকে সকল অবিশ্বাস, অস্থিরতা, সকল ধোঁয়া, অস্পষ্টতা কেটে যাক। হানাহানি, রক্তারক্তি, সহিংসতা দূর হয়ে যাক। রাজনীতিবিদদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি, ওঠাবসা, আলাপ-আলোচনা চালু থাক। যে চেতনা আদর্শ ও প্রত্যাশা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয় এবং যে স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারান, লাখ দুয়েক মা-বোন সম্ভ্রম হারান, স্বাধীনতার সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণ হোক। সেই প্রত্যাশা থেকেই মানুষ চায় একটা ফলপ্রসূ সংলাপ। শুধু সংলাপের জন্য সংলাপ নয়। কোনো শঠতা কিংবা চাতুর্যের সংলাপ নয়। সত্যিকার অর্থে বরফ গলে, নতুন সংস্কৃতির হাওয়া প্রবাহিত হয় এমন সংলাপ। গণতন্ত্রের পথ বিকশিত হয়, প্রসারিত হয় তেমন সংলাপ। কোন শঙ্কা নয়, কেবলই স্বস্তিদায়ক সংলাপ।
মানুষ মনে করে, রাজনীতিবিদরা যদি আন্তরিকতা আর সততার সঙ্গে একটা ফলপ্রসূ সংলাপ চান, তবে অনেক কঠিন সমস্যারও সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আমরা ১৯৭১ এ পাকিস্তানের শঠতা ও চাতুর্যের সংলাপ দেখেছি, তার পরিণতির কথাও আমাদের মনে আছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের নিজেদের শঠতা এবং ধোঁকাবাজির সংলাপের মূল্য চুকিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানকে হারিয়ে। আমরা ৩০ লাখ মানুষের জীবন ও ২ লাখের মতো মা-বোনের সম্ভম হারিয়ে পেয়েছি পরম প্রত্যাশিত স্বাধীনতা। এখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নেই। তবে বাঙালি শাসকদের মধ্যে পাকিস্তানি শাসকদের সেই শঠতার ছায়া মানুষ দেখতে পায়। এই শঠতা নিয়ে বাঙালিরাই বাঙালিদের শোষণ করছে। শাসন ক্ষমতায় গিয়ে স্বাধীনতার শহীদদের আত্মত্যাগের অবমাননা করতে কোনো শাসকদলই দ্বিধা করেননি। শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতায় গিয়ে সবাই ভুলে গেছেন তাদের ওয়াদা। স্বাধীনতার স্বপ্ন হয়েছে ভূলুষ্ঠিত। আর রাজনীতির প্রতি, শাসকদের প্রতি আস্থা হারিয়েছে মানুষ।
যে সংলাপ নতুন করে শুরু হয়েছে সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ নিয়ে, তাতেও মানুষের আস্থার ভাগ কমই পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্বস্তির চেয়ে শঙ্কাই দেখা যাচ্ছে বেশি। তবু মানুষ শঙ্কা চাপিয়ে রেখে আশাবাদী হতে চায় বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার আশায়। তার জন্য সরকার এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যকার প্রথম সংলাপ রুদ্ধ সংস্কৃতির দুয়ার খোলার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে খুব বেশি আশাবাদের জন্ম দিতে না পারলেও মানুষ একই সঙ্গে স্বস্তি ও শঙ্কা নিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকবে। আরও দল ও জোটের সঙ্গেও সরকারের আলোচনার কর্মসূচি রয়েছে। এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গেও আরও আলোচনা হবে এমন আভাসও দেয়া হয়েছে। সব পক্ষকেই মনে রাখতে হবে, নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে গিয়ে যেন আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি সমাধান খুঁজে পাওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কারও ইগো সংকট কিংবা অতিলোভে সেই পুরো প্রক্রিয়াটাই নষ্ট হয়ে না যায়। সামনে যেন শঙ্কার পথ সঙ্কুচিত হয়ে স্বস্তির পথ প্রশস্ত হতে থাকে।
এই সংলাপ সফল করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নয়া ইতিহাস রচনার সুযোগ এসেছে। এ কারণে সংলাপ আইওয়াশ হলে চলবে না। খোলামনে আন্তরিক অর্থে সংলাপ সফল করে তুলতে হবে। সংলাপ সুন্দরভাবে শুরু হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা সংলাপ শেষও হবে সফলতার মধ্য দিয়ে। সকলের শোভন ও সংযত ভাষা ব্যবহারও একটি ইতিবাচক লক্ষণ। শিষ্টাচারের এই সংস্কৃতি রাজনীতিতে প্রতিহিংসার বিষ্পাপ ছড়ানোর পরিবর্তে সৌরভ ছড়াবেÑআশা করা হচ্ছে। ৪৮ বছরের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে জনগণের যে স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা ছিল মুক্তিযুদ্ধ করে একটি স্বাধীন দেশ পাওয়া, সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও যেন সেই স্বপ্ন পূরণ হয়।
শেষ কথা, সূচিত সংলাপে শেষ পর্যন্ত যেন গণতন্ত্র ও জনগণের জয় হয়। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here