৭ নভেম্বরের পরিপ্রেক্ষিতে জিয়ার মূল্যায়ন

11

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

কঠিন প্রেক্ষাপটে আজকের কলাম
যত না আর্থসামাজিক, তার থেকে বেশি রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশের বন্ধু কারা, দেশের প্রতি বৈরী কারা- এ নিয়ে গভীর চিন্তা করা আবশ্যক। একটি পার্লামেন্ট নির্বাচনকে সামনে নিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা একান্ত জরুরি। আমাদের চিন্তাকে সুসংহত ও যুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন। এই নিরিখেই আজকের কলামটি লেখা। সময় দেখার প্রয়োজন হলে, ঘড়ি দেখতে হবে। হাতে যদি ঘড়ি না থাকে, ঘড়ি খুঁজতে হবে, অতঃপর সময় দেখতে হবে অথবা কাউকে না কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে। সময় দেখার পর যদি ওই সময়ের কাজটি করা না হয়, তার জন্য ‘সময়’ দায়ী নয়। তার জন্য দায়ী যিনি সময় দেখলেন না, অথবা যিনি দেখার পরও অবহেলা করলেন। অবহেলার মূল্য বহু দেশ সমাজ জাতি এবং ব্যক্তি দিয়েছে। আমরাও যে অবহেলার মূল্য দেইনি, সে কথা বলা যায় না। পুনরায় যেন অবহেলার মূল্য না দিতে হয়, তাই নিজেদের সাবধান হওয়া প্রয়োজন।

তথ্য এবং তথ্যের ব্যবহার
নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রতি বুধবার কলাম লিখি। হঠাৎ হঠাৎ নানা কারণে বাদ যায়, যেমনটি গত বুধবার বাদ গিয়েছে। আগামী দেড়-দুই মাসে আরো দু-একটা বুধবার বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনী এলাকায় ব্যস্ত থাকার সম্ভাবনা। এ দিকে ঘটনাক্রমে আজ ৭ নভেম্বরের সাথে বুধবার মিলে গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে যেমন পৃথিবীর বা মানবসভ্যতার জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আছে, বাংলাদেশের ইতিহাসেও দেশের মানুষের জন্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিবেচনায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আছে। এ রকম একটি তারিখ হচ্ছে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫; সিপাহি-জনতার বিপ্লব দিবস তথা বিপ্লব ও সংহতি দিবস। আজকের কলামটি এ প্রসঙ্গে। ৭ নভেম্বরের আগে-পরে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি এবং টেলিভিশনে টকশোগুলোতে আলোচনা হতেই থাকবে। সঠিক ইতিহাস জানার স্বার্থে এবং সেই ইতিহাস থেকে উপযুক্ত শিক্ষা আহরণের স্বার্থে আমাদেরকে ৭ নভেম্বর প্রসঙ্গে জানা প্রয়োজন। আমার লেখা বই ‘মিশ্র কথন’-এর পঞ্চম অধ্যায়টির নাম ‘১৯৭৫ : রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভাজন রেখা’, পুস্তকের ১৪৬ থেকে ১৯৩ পৃষ্ঠায় নভেম্বরের ঘটনাবলি নিয়েই আলোচনা। পাঠকের জন্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে উল্লেখ করলাম যে, ঢাকা মহানগরের বেইলি রোডের সাগর পাবলিশার্স, চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগরের ‘বাতিঘর’সহ অন্যান্য সুপরিচিত দোকানে সন্ধান করলেই অথবা অনলাইন বই বিক্রেতাদের কাছে সন্ধান করলেও পাওয়া যাবে। ই-বুক হিসেবেও পাওয়া যায় বইটি।

১৯৭৫-এর আগস্টের পেছনের কথা
পঁচাত্তরের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনাবলির উৎপত্তি বা শিকড় নভেম্বরেই নিহিত নয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে একদলীয় ব্যবস্থা বাকশাল কায়েম হয়েছিল। কাজটা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। এর পরের সপ্তাহ এবং মাসগুলো আপাতদৃষ্টিতে বা ওপরে ওপরে ভালো বা শান্ত ছিল, কিন্তু গভীরে ভালো ছিল না; শান্ত ছিল না। এখন পেছনের দিকে তাকিয়ে পরিণত বয়সে জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, ওই আমলের বাংলাদেশের রাজনীতির স্রোত, জনমতের স্রোত ও প্রশাসনের আনুগত্যের স্রোত দু’টি ভিন্ন দিকে যাচ্ছিল। দৃশ্যমান ওপরের অংশ এক দিকে বহমান ছিল; অদৃশ্যমান গভীর জলের অংশ উল্টো দিকে বহমান ছিল। তৎকালীন মিডিয়ায় এবং মিডিয়ার বাইরে ব্যক্তি ও সমষ্টিগত পর্যায়ে সরকারের বন্দনা বেশি হতো, সমালোচনা হতো কম। আমরা ১৯৭৫ সালের কথা বলছি। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে আগস্ট মাস এসে গিয়েছিল। দেশের ভেতরের কিছু ষড়যন্ত্র এবং দেশের বাইরের কিছু ষড়যন্ত্রমূলক কারণ মিলে একটি শক্ত আকৃতি নিয়েছিল। সব কিছুর ফলে যা ঘটেছিল, তাতে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ তারিখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় সপরিবারে নিহত হন; যা নিদারুণ শোকাবহ ঘটনা ও শোকাবহ দিন।

সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ ভঙ্গ
১৫ আগস্টের ঘটনার সংঘটক বা খলনায়ক একজন নয়; সংখ্যায় একাধিক এবং একাধিক অঙ্গনের। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যম ও কনিষ্ঠ সারির কিছু অফিসার একটি আঙ্গিক ও অঙ্গনের সংঘটক বা খলনায়ক। তৎকালীন ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের সংগঠনভুক্ত, তথা ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল বীর বিক্রমের কমান্ডের অধীনে থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি এই ঘটনাবলিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল, কিন্তু ব্রিগেড কমান্ডারের অগোচরে। সেনাবাহিনী সদর দফতর বা আর্মি হেডকোয়ার্টারের চিফ অব দি জেনারেল স্টাফ (সংক্ষেপে সিজিএস)-এর কমান্ডের অধীনে বা সিজিএসের সরাসরি অধীনস্থ থাকা অবস্থায়, তৎকালীন সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের অগোচরে বা গোপনে গোপনে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিয়েছিল ও বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল একটি সাঁজোয়া ইউনিট বা আর্মার্ড কোরের রেজিমেন্ট, যার নাম ছিল প্রথম বেঙ্গল ল্যান্সার।

তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত কিছু অফিসার। অন্য একটি আঙ্গিকের কথা বলি। স্বাধীনতার আগেকার পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই দশকের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও সহচর ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুর নামের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ছিলেন খন্দকার মোশতাক। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন কেবিনেটের অন্যতম সদস্যও ছিলেন তিনি। এই খন্দকার মোশতাকের সঙ্গী দুই শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য ছিলেন আরেকটি আঙ্গিকের সংঘটক বা নায়ক। বিদেশী খলনায়কেরা তো ছিলই। তবে সেনাবাহিনী থেকে যারা জড়িত ছিলেন, তাদেরকে নিয়ে যত কথাবার্তা হয়েছে এবং বিদেশী নায়ক বা নায়কমণ্ডলী নিয়ে যত কথাবার্তা হয়েছে, তার চেয়ে বহু অংশে কম আলোচনা সমালোচনা পর্যালোচনা হয়েছে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন, বঙ্গবন্ধুবিরোধী ও ১৫ আগস্ট-পরবর্তী আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় সদস্যদের নিয়ে।

১৯৭৫-এর তিনটি ব্যস্ত মাস
আমরা ১৯৭৫ সালের কথা বলছি। ওই আমলের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও, অর্থাৎ ’৭৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ অংশ বা সেনাবাহিনীর উচ্চতম পর্যায়ের অফিসাররা ব্যস্ত ও তৎপর ছিলেন তাদের ওইসব সদস্যকে নিয়ে, যারা ১৫ আগস্টের সাথে ছিলেন জড়িত। সেই আমলের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ এবং মধ্যম সারির বেশির ভাগ কর্মকর্তার চিন্তা ছিল, সেনাবাহিনীর অফিসারদের ভেঙে যাওয়া চেইন অব কমান্ডকে জোড়া লাগানো বা পুনঃস্থাপন করা। পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, কেন? যেহেতু ১৫ আগস্টের ঘটনায় জড়িত অফিসাররা, তাদের ওপরস্থ জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের অনুমতি ছাড়াই সে ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাদের কী পরিণতি হবে, এটাই ছিল বিবেচ্য বিষয়। আগস্টের ২৪ তারিখ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। সেনাবাহিনী অত্যন্ত ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছিল।

১৯৭২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হওয়া জাতীয় রক্ষীবাহিনী বা জেআরবি নামক সংগঠনটিকে ভেঙে দেয়া হয়নি বা বাতিল করা হয়নি; তাদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যেই বা সেনাবাহিনীর ভেতরে একীভূত বা আত্তীকৃত করে ফেলা হয়েছিল। উল্লেখ্য, রক্ষীবাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য রণাঙ্গনের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের সাথে যেসব স্টাফ অফিসার কাজ করছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলাম আমি নিজে। ওই সুবাদে বলছি, সময় খুব ব্যস্ত এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ছিল। এর মধ্যে চাপা অবস্থায় বিরাজমান ছিল ওই দ্বন্দ্ব। তা কী? দ্বন্দ্বটি হলো যারা ১৫ আগস্ট সংঘটিত করে ফেলেছে, তারা কোথায় যাবে, কোন অবস্থায় থাকবে, কোন দায়িত্বে থাকবে? নাকি, তাদের দ্বারা কৃতকর্মটিকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা হিসেবে বিবেচনা করে সেটার বিহিত করা হবে? সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না; ঐকমত্য সৃষ্টিতে বা সিনিয়র অফিসারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছিল।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থান
এরূপ পরিস্থিতিতেই সেনাবাহিনীর সদর দফতরে কর্মরত, সুনামধারী, মেধাবী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাহসী সেক্টর কমান্ডার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি প্রতিবাদী অথবা কারো কারো দৃষ্টিতে সংশোধনমূলক ঘটনা সংঘটিত হয়। সামরিক পরিভাষায় বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি ছিল একটি কু-দ্যতা। বাংলায় বলা যেতে পারে ‘সামরিক অভ্যুত্থান’। অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম তার ওপরস্থ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেছিলেন। অভ্যুত্থানের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ১৫ আগস্টের সশস্ত্র নায়কেরা, ঢাকা মহানগরের কেন্দ্রীয় জেলখানায় বন্দী অবস্থায় থাকা চারজন জাতীয় নেতাকে হত্যা করেন অথবা করান।

অভ্যুত্থানের ফলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে নতুন রাষ্ট্রপতিরূপে নিয়োগ করা হয়েছিল; মোশতাক কর্তৃক জারি করা সামরিক শাসন অব্যাহত ছিল। বাস্তবে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহটি আসলেই ভারতপন্থী ছিল, নাকি ভারতপন্থী ছিল না সেটা কঠোর প্রশ্ন, কঠিন প্রশ্ন এবং এর উত্তর বের করা দীর্ঘ বিশ্লেষণের ব্যাপার। কিন্তু ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এর দু-এক দিনের মধ্যেই কিছু লক্ষণের কারণে, খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানটি রাজনৈতিক অঙ্গনে, সচেতন জনগণের মনে এবং তৎকালীন বাংলাদেশ সৈনিকদের মনের ভেতরে, একটি ‘ভারতপন্থী’ অভ্যুত্থান হিসেবে রঙ পায়। সচেতন জনগণ ও সৈনিকেরা এটা পছন্দ করেনি। পরবর্তীকালে বিষয়টি মোটামুটি স্পষ্ট হয়েছিল; কিন্তু তত দিনে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা, লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার বীর উত্তমের মতো মুক্তিযোদ্ধারা চিরদিনের জন্য বিগত হয়ে গেছেন।

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও জাসদ
৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এর ঘটনার পর, আরেকটা গোপন গোষ্ঠী সক্রিয় হয়। তৎকালীন জাসদের অনুপ্রেরণায়, পৃষ্ঠপোষকতায়, আগ্রহে আর প্রয়োজনে (১৯৭৩-এর শেষাংশ থেকে) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে একটি গোপন সংগঠন কাজ করত। এর নাম ছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। এর সাথে যোগাযোগ ছিল সেনাবাহিনীর বাইরের একটি সংগঠনের, সেটি ছিল জাসদ নামক রাজনৈতিক দলের গোপন অঙ্গসংগঠন, যার নাম ছিল ‘গণবাহিনী’। জাসদের আনুষ্ঠানিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও আরো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই প্রক্রিয়ায় ছিলেন জড়িত। তিনি ছিলেন জাসদের গণবাহিনীর প্রধান, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, অন্যতম মেধাবী ও সাহসী সেনাকর্মকর্তা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম এ তাহের বীর উত্তম। জাসদ, গণবাহিনী এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা চাচ্ছিল একটা বড় ধরনের বিপ্লব সংঘটিত হোক। এই লক্ষ্যে তারা কাজ করছিলেন অনেক দিন ধরেই। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর ঘটনার পর তারা সচকিত হয়ে উঠলেন। অতঃপর, তাদের অগোচরে ৩ নভেম্বরের ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তারা সবাই অস্থির হয়ে পড়েন এবং মনে করলেন ‘আবার না জানি কোন অপরিকল্পিত ঘটনা হঠাৎ এসে তাদের বিপ্লবের পথে বাধার সৃষ্টি করে।’ তাই, তারা স্থির করলেন ৭ নভেম্বর তারিখে তাদের কাজটি করে ফেলবেন। তাদের মধ্যে যারা চরমপন্থী বা উগ্রপন্থী তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, সেনাবাহিনী হতে হবে অফিসারমুক্ত। তারা ঘোষণা দিলেন- ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই।’

জিয়াকে মুক্ত করার প্রেক্ষাপট
একই সময়ে, অর্থাৎ ৩ নভেম্বরের পরপর দিনগুলোতে অন্যান্য স্তরে প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে আলোচনা ও চিন্তাভাবনা চলছিল, জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে হবে। জিয়াকে বন্দী করা সাধারণ সৈনিকরা কোনো মতেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি; তারা বেদনাহত হয়েছিলেন। সঠিক হোক বা বেঠিক হোক, ৪ ও ৫ নভেম্বর তারিখের মধ্যেই ধারণা জন্মে গিয়েছিল, যদি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা না যায়, তাহলে দেশ চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে অথবা অনাকাক্সিক্ষত সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। অতএব, জিয়াকে মুক্ত করতেই হবে। বলা বাহুল্য, জিয়াউর রহমান দেশবাসীর কাছে সুপরিচিত ছিলেন, প্রথমে নিজের নামে এবং পরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কারণে। জিয়া সুপরিচিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সেনাপতি হিসেবে। তিনি সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন একজন ডায়নামিক ও ক্যারিশমেটিক সেনাবাহিনী উপপ্রধান এবং পরবর্তীকালে প্রধান হিসেবে। ১৯৭২-এর এপ্রিলে সবাই আশা করেছিল, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান হবেন। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক তখনকার সরকার তাকে সেনাপ্রধান বানায়নি। বানিয়েছিল তারই ব্যাচমেট বা কোর্সমেট কিন্তু জ্যেষ্ঠতার তালিকায় জুনিয়র, তুলনামূলক কম পরিচিত ও তুলনামূলকভাবে কম ক্যারিশমেটিক তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার কে এম সফিউল্লাহকে। জিয়াকে বানানো হয়েছিল উপসেনাবাহিনী প্রধান। যথাক্রমে সেনাবাহিনী প্রধান বা উপপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার কিছু দিন পর সফিউল্লাহ ও জিয়াউর রহমান উভয়েই মেজর জেনারেল হলেন। সৈনিকদের এরূপ মানসিক প্রেক্ষাপটে, ৩ নভেম্বরের পর থেকেই নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী, জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার কাজটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছিলেন সাধারণ সৈনিকেরা।

৭ নভেম্বরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড
খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের নিয়ম মোতাবেক, ৬ নভেম্বর দিনের শেষে রাত ১২টায় তারিখ বদলে যায়। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ শুরু হলে সৈনিকদের বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই সৈনিকদের বিপ্লবটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। বড় অংশ ছিল অরাজনৈতিক মনোভাবসম্পন্ন নিখাদ বাংলাদেশ-প্রেমিক, জিয়া-প্রেমিক সৈনিকেরা। ছোট অংশ ছিল জাসদের প্রভাবিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য ও অনুসারীরা। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই ঢাকা মহানগরের জনগণ জড়িত হতে থাকেন এতে। সূর্যোদয়ের ঘণ্টা দুয়েক আগে থেকেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে সৈনিকেরা মহানগরে ছড়িয়ে পড়েন। রাতের মধ্যেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন অংশে, একাধিক অফিসার ও অফিসারের পতœী বিদ্রোহী বা বিপ্লবী সৈনিকদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। তবে নিহত ব্যক্তিরা পরিচিত হলেও হত্যাকারীদের শনাক্ত করা মুশকিল ছিল। ব্যক্তিগতভাবে এ পর্যায়ে আমার মুক্তিযুদ্ধকালীন ব্যাটালিয়ন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে উপস্থিত থেকে ঘটনাবলির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকেরা কোনো কিছুর সাতে-পাঁচে ছিলেন না।

৭ তারিখের প্রথম প্রহর তথা রাত একটা-দেড়টা থেকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাপন্থী অর্থাৎ ‘বিপ্লবী’ সৈনিকেরা শান্তিপ্রিয় ও শৃঙ্খলাপন্থী দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিন দিক থেকে বৈরী প্রচারণা এবং আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে শুরু করে দেয়। উপস্থিত জ্যেষ্ঠতম অফিসার হিসেবে আমি পুরো ব্যাটালিয়নকে নিয়ন্ত্রণে রাখি। জাসদপন্থী সৈনিকেরা যেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সীমানায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করি। কোনো অবস্থাতেই যেন, যে যে পন্থীই হোক না কেন, সৈনিকে-সৈনিকে পারস্পরিক গোলাগুলি বিনিময় না হয়, সেটা নিশ্চিত করার পন্থা আবিষ্কার করলাম। অতঃপর দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকদের সিপাহি-জনতার বিপ্লবে যোগদানে সহায়তা করি। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫। জাসদপন্থী সৈনিকদের ও জাসদ কর্মীদের বিপ্লব সূর্যোদয়ের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই, পানিতে যেমন চিনি গলে যায় ওইভাবে বিলীন হয়ে যায়। অপর দিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে জিয়ার অনুরাগী হাজার হাজার সৈনিকের এবং হাজার হাজার লোকের সম্মিলিত বিপ্লব। সেই থেকে এই দিনের নাম হয়েছে সৈনিক-জনতার বিপ্লব বা সিপাহি-জনতার বিপ্লব তথা বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ৭ নভেম্বর জাসদপন্থী সৈনিকদের পরিকল্পিত এবং আংশিকভাবে বাস্তবায়িত বিপ্লব ছিল জাতীয় সংহতি বিধ্বংসী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিধ্বংসী এবং রাষ্ট্রবিধ্বংসী। সাধারণ সৈনিক ও জনগণ মিলে প্রথমে জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে মুক্ত করেন, অতঃপর তার নেতৃত্ব মেনে ও তারই দিকনির্দেশনায় জাতীয় সংহতি পুনঃস্থাপন করেন। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডও পুনঃস্থাপন করেন।

জিয়ার ভূমিকার মূল্যায়ন
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে শুরু হওয়া, প্রায় আড়াই-তিন মাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির শেষে এক অগ্নিগর্ভ মুহূর্তে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর দায়িত্বের অতিরিক্ত কিন্তু অবশ্যই পরোক্ষভাবে, পুরো দেশ ও জাতির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বিভক্ত জাতিকে সংহত করার কঠিন প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। ৭ নভেম্বর বিকেল থেকেই পরবর্তী দেড়-দুই দিনের চ্যালেঞ্জ ছিল, সৈনিকদের হাতে হাতে ঘুরছিল যে অস্ত্র, সে অস্ত্রকে অস্ত্রাগারে ফেরত আনা এবং পথে পথে ঘুরছিলেন যে সৈনিক, তাদের ব্যারাকে ফেরত আনা। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় মনোভাব ও বক্তব্যের মাধ্যমে সৈনিকদের ওপর অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃস্থাপনের কাজটি শুরু করেন। সৈনিকেরা যেন অস্ত্র জমা দেন, সেটি নিশ্চিত করেন। সৈনিকদের মনের ভেতরে পুঞ্জীভূত কষ্টগুলো দূর করার জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আমরা যদি ৭ তারিখের প্রশাসনের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখব, দুই দিন পুরনো একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন যথা ৫ নভেম্বর সকালে নিযুক্ত প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। কিন্তু সেই প্রেসিডেন্টের কোনো মন্ত্রিসভা ছিল না।

তখন প্রেসিডেন্ট সায়েম বাংলাদেশ কিভাবে পরিচালনা করতেন, সেটি একটি গবেষণার বিষয়। সেই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট সায়েম, জিয়াউর রহমানসহ বাহিনী প্রধানদের সহায়তা গ্রহণ করেন এবং বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক কারণেই বৃহত্তম বাহিনী তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যিনি প্রধান, সেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সহায়তা তিনি সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করেছেন। অনেক দিন ধরে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট তথা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক সায়েম এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ তিনজন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মিলেই সরকারের নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি কঠোর ও গভীর গভর্ন্যান্স ক্রাইসিস থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করেছিলেন জিয়াউর রহমান ও তার সহকর্মীরা। উদারভাবে মূল্যায়ন করলে, এটা বলাই যায়, একান্তভাবেই হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব। তাই অভিনন্দন জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাপ্য।

২০১৮ সালের সাথে সম্পর্ক কী?
৪৩ বছর পর ওই ঘটনাবলি সম্বন্ধে ওপরের অনুচ্ছেদগুলোতে অতি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করলাম। উদ্দেশ্য, আমাদের জাতিকে সুসংহত করার কাজে অতীতের অভিজ্ঞতা যেন উচ্চপদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী উচ্চপদের ব্যক্তিত্বদের কাজে লাগে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নদীতে দু’টি স্রোত। একটি স্রোত সরকারের অনুকূলে, একটি স্রোত সরকারের প্রতিকূলে। এই প্রতিকূলের স্রোতে জনসম্পৃক্ততা বেশি। অনেকে মনে করেন, দৃশ্যমান স্রোতের নিচে অদৃশ্য যে স্রোত, সে স্রোতটি সরকারের অনুকূলে নয়; বরং প্রতিকূলে। বঙ্গবন্ধুর আমলে বিদেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শুভাকাক্সক্ষী যে ছিল এবং তার প্রতি বৈরিতা ও অশুভাকাক্সক্ষী যে রকম ছিল, তেমনি বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও আছে। তবে বর্তমান আমলে, বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশী রাষ্ট্রগুলো এবং বৈরীভাবাপন্ন বিদেশী রাষ্ট্রগুলো প্রত্যেকেই নিজ নিজ নিয়মে অনেক বেশি সচেতন, সজাগ, সতর্ক ও গোছানো। বঙ্গবন্ধুর আমলে রাজনৈতিক ময়দান ছিল সীমিত। বঙ্গবন্ধুর কন্যার আমলে রাজনৈতিক ময়দান অনেক বেশি বিস্তৃত। খেলার মাঠ বড় হলে অনেকগুলো টিম মাঠের একেক অংশে খেলতে পারে। অনেক লোক একসাথে খেললে বা অনেক টিম এক মাঠে খেললে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে বেশি সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন
এরূপ প্রেক্ষাপটে আমরা কী করতে পারি? সম্মানিত পাঠক, প্রিয় দেশবাসী, সবাই মিলে চিন্তা করতে হবে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? আমি রণাঙ্গনের সৈনিক ছিলাম, অতঃপর ২৭ বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছি। অবসর জীবনে প্রথম ১০ বছর (১৯৯৭-২০০৭) বেসামরিক জগতে তথা সুশীল জগতে তথা নাগরিক সমাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিলেমিশে চলেছি। অতঃপর একজন কর্মী হিসেবে রাজনীতির মাঠে পথচলা শুরু করেছি। অবসর জীবনের ২২টি বছর ধরে আজকের কলাম পর্যন্ত আমি কলমসৈনিকও বটে। মাথার চিন্তা, বুকের সাহস, হাঁটার শক্তি, সাধারণ মানুষকে বুকে টেনে নেয়ার সহজাত অভ্যাস আমাকে শক্তি জোগাচ্ছে রাজনীতির অঙ্গনে; মহান আল্লাহর দয়ায় সর্বাবস্থায় সিক্ত হয়ে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের কর্মীদেরই এ দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের রাজনীতিতে বহু আঙ্গিকে, গুণগত পরিবর্তন অতি প্রয়োজনীয়। যদি এই পরিবর্তন আনতে আমরা চেষ্টা না করি, দেশের ক্ষতি হবে অপূরণীয়; ‘রাজনীতি’ নামক শব্দটির সংজ্ঞা অভিধানে নতুন করে লিখতে হবে।
লেখক : মেজর জেনারেল অব:; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com.bd

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here