নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হোক সমতল মাঠে

4

এমাজউদ্দীন আহমদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক, এই দাবি দেশ-বিদেশের নানা মহল থেকে বারবারই উত্থাপিত হয়ে আসছিল। কিন্তু নানারকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সংশয়-শঙ্কা সঙ্গত কারণেই জিইয়ে ছিল। প্রশ্ন ছিল, শেষ পর্যন্ত তা কতটা পূর্ণতা পাবে। এ রকম প্রশ্নের প্রেক্ষাপট ক্ষণে ক্ষণেই তৈরিও হচ্ছিল সরকারের নানারকম প্রতিশ্রুতির পরও। তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের অংশ হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোট। একই সঙ্গে বিএনপিকে নিয়ে গঠিত এই ফ্রন্ট অর্থাৎ রাজপথের প্রধান এই বিরোধী জোট ভোট গ্রহণ এক মাস পেছানোর দাবি জানায়। নানা কারণেই তাদের এই দাবি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের তারিখ এক সপ্তাহ পিছিয়েছে। এক সপ্তাহ পেছানো যৌক্তিক হয়নি বলে মনে করি। আরও সময় বাড়ানো উচিত ছিল।
ইতিপূর্বে সংলাপের মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট নিরসনের চেষ্টা চলে। সংলাপের আয়োজন করে একটা শুভ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি তফসিল ঘোষণা করে অহেতুক জটিলতার সৃষ্টি করেছিল। ক’টা দিন পরে তফসিল ঘোষণা করলে তেমন কোনো সমস্যা হতো না। কারণ বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২৮ জানুয়ারি। কাজেই ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তো হাতে সময় রয়েছেই। যেহেতু সংলাপ ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছিল, সেহেতু একটা সমঝোতার প্রত্যাশা ছিল। নভেম্বরের শেষে তফসিল ঘোষণা করে জানুয়ারির মাঝামাঝি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলে সমস্যা হতো না বোধ করি। এই কলামেই দ্বিতীয় দফায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ অনুষ্ঠান চলাকালে লিখেছিলাম সংলাপের দরজা যেহেতু খোলা রয়েছে, সেহেতু একটা সমঝোতায় পৌঁছার পর তফসিল ঘোষণা করাটাই হবে শ্রেয়।
যা হোক, এখন প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। সবার অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে যাতে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে, সে জন্য সবরকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সরকার এখন শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবে। তারা শুধু এখন নির্বাচন কমিশনের সহযোগী শক্তি। অনেক কিছুই চলে গেছে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার সংকট রয়েছে- এই অভিযোগ নতুন নয়। তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই এই সংকট কাটাতে হবে। সংবিধানের বিধি মোতাবেক তাদের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করতে নির্মোহ ও কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কোনো কর্মকাণ্ড যেন আর কোনোরকম বিতর্কের সৃষ্টি না করে, তা নিশ্চিত করার দায়টা তারা ভুলে না গেলেই মঙ্গল। আস্থার জায়গাটা পুষ্ট করার দায় তাদেরই।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন অপরিহার্য এবং তা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত না হয়, তাহলে শুধু গণতন্ত্রই নয়, দেশের শাসনব্যবস্থাসহ প্রশাসনিক স্তর ও সামাজিক কাঠামোর অনেক কিছুই বিপন্ন হতে বাধ্য। সরকারকে স্বচ্ছতা বজায় রেখে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি পূরণে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় সংলাপে বসে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার ওপর আস্থা রাখুন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।’ মানুষ তার আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে চায়। কিন্তু এর পরও প্রধান বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই, একমাত্র রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্য ছাড়া। রাজশাহীতে ঐক্যফ্রন্টের জনসভা বাধাহীনভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি, যদিও এ ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকার ছিল কোনোরকম বাধাবিঘœ সৃষ্টি করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা তথা জনগণের জানমাল হেফাজত করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু এর দোহাই দিয়ে তো তারা কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সমর্থকদের চলাচলে কিংবা কোনো সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণে বাধা দিতে পারে না। সংবিধান অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু রাজশাহীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তো নির্বিঘ্নে তা করতে পারেনি। সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন কর্মকা- বড় ধরনের অন্তরায়।
নির্বাচন কমিশনকে এসব ব্যাপারে অবশ্যই নির্মোহ এবং পক্ষপাতহীন দৃষ্টি দিতে হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করাটাই তাদের এখন সবচেয়ে বড় দায়। দায়িত্বশীলদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির পরও রাজশাহীতে যে চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়- এ কেমন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড? শুধু যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই বৈরী আচরণ করেছেন তা তো নয়, পরিবহন শ্রমিকরা কথিত ধর্মঘটের নামে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে রাজশাহীকে দু’দিন প্রায় বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন। সরকার যখন সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে, তখন এ রকম পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি করা হলো? সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাইলে এমন অপকৌশল বর্জন করে সবার জন্য সর্বাগ্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অর্থাৎ সমতল ভূমি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেসব খণ্ডাতে হবে তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। সিইসি তার ভাষণে বলেছেন, ‘সবার জন্য অভিন্ন আচরণ ও সমান সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।’ এটা যেন শুধু কথার কথা না হয়। কাজের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। বিগত সিটি নির্বাচনের সময়ও সিইসির তরফে এমন অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে অত্যন্ত অপ্রীতিকর দৃশ্য ফুটে উঠেছিল, যেগুলোর যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত হয়নি। উপরন্তু বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে এসবের পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, এই নির্বাচন শুধু অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্যই নয়, নির্বাচন কমিশনের জন্যও বড় ধরনের পরীক্ষা। সংবিধান তাদের কাছে ভোটারের যে আমানত রেখেছে এর রক্ষার দায়দায়িত্ব তাদের। অনাচার-অনিয়ম-দুর্বৃত্তদের লম্ফঝম্ফ সবই তাদের দমন করতে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আর এ জন্য সরকারকে সবরকম সহযোগিতা করতে হবে। নির্বাচন যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব না হয়, তাহলে এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব জনপ্রত্যাশার অপমৃত্যু ঘটাবে এবং তা দেশ-জাতির ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে। তাই আশা করি, স্বচ্ছতা বজায় রেখে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হবে সংশ্লিষ্ট মহল, সবার সমানাধিকার নিশ্চিত করে। সবকিছু নির্ভর করছে ইসির ওপর। এক কথায় নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হোক সমতল মাঠে। নির্বাচন সর্বোচ্চ মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক হবে, এটাই তো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রত্যাশা। নির্বাচনকেন্দ্রিক কোন্দল-সংঘাত ঠেকাতে সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
সবাই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, এটা ইতিবাচক সংবাদ। তবে এই অংশ নেওয়াটা তখনই অর্থবহ হবে, যখন নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অবাধ হবে। আর নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অবাধ হওয়ার কিছু অপরিহার্য শর্ত রয়েছে। এর অন্যতম হলো সবার সমানাধিকার অর্থাৎ সবার জন্য সমতল মাঠ। এ বিষয়টির ওপর সর্বাধিক নজর দিতে হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক যত রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, মূলত এ থেকেই প্রথমত এর প্রেক্ষাপটটা তৈরি হয়। নির্বাচনে যাতে পেশিশক্তি কিংবা টাকার খেলা না হয়, কেউ যাতে ক্ষমতার দাপট খাটাতে না পারে, সরকারি দল যাতে বিশেষ সুবিধা ভোগ করতে না পারে, এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর দৃষ্টি দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি সে রকম অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোরও তাদেরকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে যাওয়া উচিত। প্রতিহিংসার রাজনীতি বর্জন করতে হবে। প্রতিযোগিতা থাকুক, তবে কোনোভাবেই যেন অসুস্থ প্রতিযোগিতা না হয়। সুস্থ ধারার রাজনীতির চর্চা হলে অনেক নেতিবাচকতার অবসান এমনিতেই ঘটবে। নির্বাচন অর্থবহ করার জন্য শুধু বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণই যথেষ্ট নয়, সবাই যাতে সঠিকভাবে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে, সেই রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায় মুখ্যত নির্বাচন কমিশনের।
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার প্রতিফলন তাদেরই ঘটাতে হবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে আবহের দরকার, তা নিশ্চিত হোক। বাংলাদেশের জনগণ বরাবরই উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চায়; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় না। খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, বিগত সিটি নির্বাচনেও অনেক ভোটারই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এসব নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন বিষয়টি আমলে রেখে এসব ব্যাপারে তাদের করণীয় আগে থেকেই নিশ্চিত করুক। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here