সোসাইটি নিয়ে যা হচ্ছে তা কাঙ্ক্ষিত নয়

6

নিউইয়র্কের মানুষ এখন শীতের কামড়, হেমন্তের নবান্ন উৎসব, পিঠাপুলি, নানা প্রকার আনন্দ-উৎসব, নির্বাচন-অভিষেক নিয়ে মেতে আছেন। হরেক রকম খবরা-খবর বাংলাভাষার পত্র-পত্রিকায়। সেসবে একদিকে যেমন আনন্দের খবর, আরেকদিকে বেদনার।
জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হয়েছেন খান’স টিউটোরিয়ালের চেয়ারপারসন শিক্ষাবিদ নাঈমা খান। কম্যুনিটির জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের একটি খবর। শিক্ষাবিদ হিসেবে শিক্ষা প্রসারে তার যে ভূমিকা, সে জন্যই তার প্রতি জাতিসংঘের এ স্বীকৃতি। একই সঙ্গে অত্যন্ত বেদনার সংবাদও রয়েছে। কম্যুনিটির অত্যন্ত প্রিয়মুখ, খুলনা সোসাইটির নেতা, মাহফুজুর রহমান মাহফুজের করুণ মৃত্যু। তার মৃত্যুতে কম্যুনিটির মানুষ অত্যন্ত ব্যথিত ও শোকাহত। দীর্ঘদিন জীবন্মৃত অবস্থায় হাসপাতাল ও রিহ্যাব সেন্টারে চিকিৎসাধীন থেকে গত ২৪ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সবাই আমরা জানি যে, স্বদেশ হোক, প্রবাস হোক, আর যেখানেই ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, দেশ-কাল ভেদে মানব জীবন হচ্ছে হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ এবং জীবন-মৃত্যুর খেলা। জীবনের এই দুই পিঠকে কারো পক্ষেই অস্বীকার করা অথবা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা তাই নাঈমা খানের জাতিসংঘের স্বীকৃতিতে যেমন আনন্দিত, একইভাবে মাহফুজের মৃত্যুতেও শোকাহত। ঠিকানা পরিবারও নাঈমা খানের সংবাদে আনন্দিত এবং তাকে জানাচ্ছি অভিনন্দন এবং মাহফুজুর রহমানের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত।
তবে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বড় খবর বুঝি বাংলাদেশ সোসাইটিকে ঘিরে। সোসাইটির নির্বাচনের খবর আমাদের প্রবাস জীবনে সবসময় উত্তেজনা ছড়ায়। অন্যান্য নির্বাচনী বছরের তুলনায় এবার, বিশেষ কয়েকটি কারণে একটু বেশিই উত্তাপের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত- এবার সোসাইটির ভোটার সংখ্যা সর্বকালের সব সংখ্যাকে ছাড়িয়ে ২৭ হাজার ৫শ’তে দাঁড়ায়। নির্বাচনে সদস্য সংগ্রহ বাবদ সোসাইটির আয়ও অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। এবার সদস্য ফি থেকে সোসাইটির আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ ডলার। মনোনয়ন ফি থেকে এসেছে আরও প্রায় সাড়ে ২১ হাজার ডলার।
সব মিলে সোসাইটির তহবিল প্রায় ৬ লাখ ডলার ছুঁই ছুঁই! সোসাইটির ইতিহাসে এ যাবত এতো ডলার অতীতে আর কখনও আয় হয়নি। এতো অর্থ নিয়ে একটা নয়-ছয় হওয়ার আশঙ্কা পূর্ব থেকেই কম্যুনিটিতে ছিল। কম্যুনিটির সেই আশঙ্কার ভিত্তিতে ঠিকানা তার ২০ জুলাই ২০১৮ সংখ্যায় ‘ভোটার বানিয়ে সোসাইটির আয় ৫,৩৬,৪৬ ডলার! ব্যয়ের খাত কী?’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করে। এ আয়ের সঙ্গে অবশ্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা এবং বিভিন্ন প্রার্থিতার পক্ষে মনোনয়পত্র জমাদান বাবদ আয়কৃত অর্থ যোগ হয়নি।
সেই সম্পাদকীয়টিতে পরিষ্কারভাবে কিছু কথা বলা হয়েছিল সোসাইটির এই অর্থ ব্যয় নিয়ে এবং সোসাইটির কর্ম সক্ষমতা, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন, সেই সঙ্গে সততা আর আন্তরিকতা বিষয়ে। সোসাইটির সাধারণ সদস্য কম্যুনিটির মোট সংখ্যার চেয়ে অনেক অনেক কম। এর মধ্যে প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়- যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাদের পকেটের অর্থ দিয়েই অধিকাংশ সদস্য ফি পরিশোধ করা হয়। বহু সদস্য ভোটার কিনা- সে কথা নিজেরা নাকি ভোট দেয়ার আগ পর্যন্ত জানেনই না! যে বছর বিত্তবানরা এই নির্বাচনে প্রার্থী অথবা প্রার্থীর পক্ষে সমর্থক হিসেবে নামেন, সে বছর ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যে বছর সে রকম ঘটনা ঘটে না, সে বছর ভোটার সংখ্যাও তুলনামূলক কম হয়। এ বছরের ভোটার সংখ্যা সেরকমই একটি দৃষ্টান্ত।
প্রার্থীদের নিজেদের পকেটের ডলার খরচ করে অন্য একজন মানুষকে ভোটার বানানো এবং নিজেদের সচেতন ও সক্ষম দাবি করেও এভাবে অন্যের অর্থে সদস্য ও ভোটার হওয়ার সংস্কৃতি চালু করার পেছনে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। প্রতিবারই ভোট আসলে এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলেন অনেকে। তবে শেষ পর্যন্ত বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না।
সেসব তিক্ত ও অপ্রিয় কথায় না গিয়েও বলা যায়- সোসাইটি, সোসাইটির ভোটার সংখ্যা, সদস্য ফি বাবদ অর্জিত অর্থ কম্যুনিটির জন্য অবশ্যই একটি পজিটিভ শক্তি। এই শক্তিকে পজিটিভভাবে কাজে লাগানো গেলে, কম্যুনিটির মানুষের জন্য অবশ্যই অনেক ভালো কিছু করা সম্ভব। নির্বাচনের পূর্বে যারা প্রার্থী হন, যারা পর্দার আড়ালে প্রার্থীদের পেছনে শক্তি ও মেধার আধার হিসেবে কাজ করেন, তারা আশাবাদী হওয়ার মত নানারকম প্রতিশ্রুতিও দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর! সোসাইটির নির্বাচিত কর্মকর্তারা কম্যুনিটির জন্য কোনদিনই কোন ইউনিক কিছু করে দেখাতে পারার কোন নজির রাখতে পারেননি। কম্যুনিটির সাধারণ সদস্যদের কাছে ব্যাপারটা এমন মনে হয়েছে যে, নেতা তো হয়েই গেছি, আর কী! যুদ্ধ করার চেয়ে যদি বন্দুকখানি ঘাঁড়ে নিয়েই বীরের মর্যাদা মেলে, তবে আর যুদ্ধ করা কেন? সেবার চেয়ে নাম ফুটানোর গৌরবও কি কম!
এ কারণেই সোসাইটি কম্যুনিটির মানুষের জন্য শক্তির যে প্রতীক হয়ে ওঠার কথা ছিল, তা হতে পারেনি। একদিকে কম্যুনিটির মানুষদের নিজেদের ভোটার হওয়ার গুরুত্ব, নিজ তাগিদে এবং নিজ অর্থে ভোটার হওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারার ব্যর্থতা, অন্যদিকে যারা নিজের অর্থে ভোটার বানিয়ে নেতা হতে চান, তাদেরও যে দায়িত্ব পালন করার কথা এবং যে দায়িত্ব পালন করা উচিত, সে সম্পর্কে সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। এ কথা যদিও খুব বেশি নির্মম যে, আত্মপরিচয়ের সংকট ঘোঁচাতে যারা নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয়ে সোসাইটির নেতা হতে চান, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা পূরণের আশা করা যায় না। আর সে কারণেই দেখা যায়, সোসাইটিতে নির্বাচিত হয়ে মৌলিক কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সফলতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। সে কারণে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের অনেক কাজের মাঝে সদস্যদের পছন্দ নয়, এমন অনেক কাজও করতে দেখা যায়। তার মধ্যে অন্যতম অপছন্দের কাজ- মামলাবাজি। যে কেউ অবশ্যই বলতে পারেন, আমেরিকা আইনের দেশ। কেউ যদি মনে করেন যে, তিনি একজনের অন্যায় আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তিনি আইনের আশ্রয় নিতেই পারেন। এবং এতে নিন্দা-মন্দের কিছু নেই। ন্যায়বিচার প্রাপ্তি সবার অধিকার। যারা আইন-আদালতের আশ্রয় গ্রহণকে ভাল চোখে দেখেন না, তারা আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন না। কথা সত্য। তা সত্ত্বেও সোসাইটির ক্ষেত্রে যারা আইনের আশ্রয় নেন, মামলা করেন, সাধারণ সদস্যরা তাদের ভালো চোখে দেখেন না।
মনে করা হয় যে, সংগঠনটির সঙ্গে প্রিয় স্বদেশের নাম যুক্ত, সেরকম একটি সামাজিক সংগঠনে মামলা যারা করেন, তারা মানুষের ভালবাসা এবং সমর্থন দুই-ই হারান। কেননা মামলা-মোকদ্দমায় দুর্নাম, সমালোচনা আর অর্থ ব্যয় ছাড়া আর কিছু অর্জিত হয় না। এত কথা বলা হচ্ছে, সোসাইটি আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তার প্রেক্ষিতে। দুটি মামলা সোসাইটির বিরুদ্ধে। নির্বাচন স্থগিত। কবে হবে ঠিক নেই। গত ৩০ অক্টোবর একটি তারিখ ছিল। সবাই আশা করছিলেন ঐদিনই আদালত হয়তো নির্বাচনের নতুন তারিখ দিয়ে দেবেন। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। শুনানির নতুন তারিখ দিয়েছেন ২৭ নভেম্বর। সোসাইটির নেতৃত্বে যারা আছেন, ট্রাস্টি বোর্ডের যারা সদস্য, যারা উপদেষ্টা- তাদের নিয়ে, সত্য-মিথ্যা যাই হোক, কম্যুনিটিতে অনেক কথা বলাবলি আছে। খুব যে ইতিবাচক কথা, বলা যাবে না। যাদের নিয়ে কথা, তারা বলতে পারেন মানুষের সেবা করতে গেলে, কথা কিছু শুনতেই হয়। অতটুকু হলে কথা ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য নিয়েই অনেকের প্রশ্ন। তারা প্রকৃত অর্থেই কম্যুনিটির সেবা করতে চান, নাকি শুধু নেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা চান?
যদি সত্যি সত্যি আত্মপরিচয়ের সঙ্কট ঘোচানোর জন্য এসব করা হয়- সে ক্ষেত্রে বলার কিছু নেই। তবে আমাদের আজকের মর্যাদা যাই হোক, পরিচয়ের মূলে রয়েছে- বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত। যে ব্যাপারটাতে আমরা খুবই সংবেদনশীল। নিজেদের আত্মমর্যাদা রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে রক্ষা করতে হবে। যারা মামলা-মোকদ্দমা করেছেন এবং যারা তাদের পেছনে উৎসাহ যোগাচ্ছেন, ভোটার এবং কম্যুনিটির মানুষ কাউকেই সমর্থন যোগাবে বলে মনে হয় না। তাহলে লাভের গুড় সব পিঁপড়াতে খেয়ে যাবে। অর্থ ব্যয়ে আনন্দ আছে। তবে মানব কল্যাণে ব্যয় হলে তাতে আনন্দ অনাবিল। সোসাইটির সঞ্চিত অর্থ যেনো আমাদের মাথা বিগড়ে না দেয়। সাড়ে ২৭ হাজার মানুষের আমানতের কথাটা মনে রাখতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here