বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক

54

শামীম আরা ডোরা : বউ এবং শাশুড়ি- এ দু’টি শব্দের মধ্যে এতো বেশি স্পেস নেই যে, কাকে বেশি নম্বর দেয়া যেতে পারে। দু’টি শব্দই এতোই স্পর্শকাতর যে, প্রতিটি পরিবারই সম্পর্কটি অনুভব করতে পারে। এক সময়, আমার মনে হয় অনেক পরিবারেই ‘সহিষ্ণুতা’ শব্দটি অনুপস্থিত ছিলো, ফলে প্রায়ই শোনা যেতো বউ বাটকি শাশুড়ি অথবা শাশুড়ি বাটকি বউ। একবিংশ শতাব্দীতে সেই তিক্ত শব্দগুলোর বাক্য রচনায় সংশোধিত হচ্ছে। বউ-শাশুড়ি তিক্ততার সম্পর্ক যে একেবারেই নেই, আমি এমনটি বলবো না। কিন্তু পুরোনো ধারাবাহিকতায় অসুস্থ সম্পর্ক থেকে মানুষ ক্রমশই সরে আসছে। শাশুড়ি অথবা বউ কারোর একার পক্ষেই সুন্দর সম্পর্ক অর্জন সম্ভব নয়। দু’জনেরই সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। সময়ের দাবিতে একবিংশ শতাব্দীতে সুস্থ সংস্কৃতি ও মানষিকতা বউ-শাশুড়ির বিরোধের দূরত্ব অনেক কমিয়ে এনেছে।
কোলে-পিঠে মানুষ করেন যে মা, এমনকি নিজে না খেয়ে ছেলেকে বড় করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন, কোনোভাবেই সেই ছেলেকে সরে যেতে দিতে পারেন না। চিরাচরিত মায়ের ভূমিকায় সব মা-ই চাইবেন অদম্য বাসনা নিয়ে ছেলে যেনো মায়ের বুকেই থাকে। কিন্তু বউ ঘরে আসা মাত্রই যেনো হিসেব-নিকেশ শুরু হয়ে যায়। বউ-শাশুড়ির মাঝে একটি লম্বা দৌড় শুরু হয়ে যায়! সে দৌড়ে অবশ্য কে প্রথম, কে দ্বিতীয় বলা মুশকিল। দু’জনেই সমান্তরালে চলতে থাকে। দু’জনকেই উপলব্ধি করতে হবে দু’জনের অবস্থান, সে অবস্থান থেকে অবশ্যই দু’জন মূল্যায়িত হবেন।
এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে ছেলেটির। কারণ, একজন ছেলে বা কারো স্বামী বউ-শাশুড়ির প্রতিকূল পরিবেশকে অনুকূল করে তোলার প্রাণান্ত প্রয়াসে নিয়োজিত থাকবেন। ছেলে হয়ে অবশ্যই মাকে বোঝাতে হবে, কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না। এই প্রতিশ্রুতি ধারণ করলেই পরিবারে সুখ ও শান্তি আসবে। ছেলের কাছে মায়ের গুরুত্ব সর্বাধিক কোনো সন্দেহ নেই, তবে বউকে আপন করে নেয়ার দায়িত্ব একটি পরিবারের মা ও ছেলের উভয়েরই। একটি পরিবারে প্রতিনিয়ত কী ঘটছে, সেই পরিবারের বা মায়ের ব্যবহারের মাধ্যমেই তার প্রমাণ মিলবে। পাশাপাশি নতুন বউটিকেও আপন করে নেয়ার দায়িত্ব সবার উপর ন্যস্ত থাকবে। কারণ একটি পরিবারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, বউ বা শাশুড়ি কেউই কারোটা মেনে নিতে চাইবে না। পারিবারিক স্বার্থকে সবকিছুর উর্ধ্বে রেখে এগিয়ে যেতে পারলে বউ-শাশুড়ি বিরোধের ক্ষেত্র তৈরি হয় না। যে শাশুড়িটি আজকে শাশুড়ি, একদিন তিনিও বউ হয়ে এসেছিলেন। আবার যে বউটি আজকে নববধূ, তিনিও একদিন শাশুড়ি হয়ে এমন পরিস্থিতির শিকার হবেন। তাই দু’জনকেই ছাড় দিতে হবে সংসারে। আর তা না হলেই বিভেদের বিষ দু’জনকেই খাবে। ছেলে হয়ে মায়ের স্বপ্নপূরণ করা, আর স্বামী হয়ে বউয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাÑ সংসারে এই নেতৃত্ব অবশ্যই একজন ছেলেকে সুযোগ করে দিতে হবে।
একজন ছেলেকে লটারি হাতে নিয়ে জন্মাতে হবে না আগামী দিনে। কাজে লাগবে তার সুনিপুণ বুদ্ধিমত্তা। এখন বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
একজন বউ যখন শশুরবাড়িতে প্রথম পদার্পণ করে, তখন সবাই তার কাছে অপরিচিত। মানুষগুলোতো অপরিচিত বটেই, এমন কি হয়তোবা কাউকে সে কখনোই দেখেনি। অনেক সময় কোন কথা বলার সাহসও থাকে না। অনেকগুলো নতুন মানুষকে একই সাথে সন্তুষ্ট করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন পরিবেশে যেটা করা দরকার, অনেক সময় সেটা করা হয়ে ওঠে না। এমন পরিস্থিতিতে বউ-শাশুড়ি দু’পক্ষকেই সমঝোতার প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে ছেলেটিকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক অবশ্যই সহজতর মনে হবে, যদি দু’পক্ষই একজন আরেকজনকে প্রতিপক্ষ বা জান-প্রাণের শত্রু না মনে করেন। ধৈর্য্য, ধৈর্য্য এবং ধৈর্য্যই বউ-শাশুড়ির সম্পর্কের কুয়াশা সরিয়ে একটি সম্পর্কের অস্তিত্বকে উঁচু থেকে আরো উঁচুতে ওঠাতে কোনরকম দ্বিধা করবে না।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, সহিষ্ণুতার কোনো প্রতিপক্ষ থাকে না, বরং পরিবারের মনকে কিভাবে প্রভাবিত করা যায়, ক্রমশ সেই ইতিবাচক শক্তি প্রমাণিত হয়।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক এটর্নি জেনারেল। বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here