নির্বাচন কোনো খেলা নয়

4

হাসান আজিজুল হক

ড. কামাল হোসেন আমাদের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম। তিনি একজন খ্যাতিমান আইনজ্ঞও বটে। কেন এবং কী কারণে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ত্যাগ করে অন্য দল গঠন করেন, তো জানি না। তার সাম্প্রতিক উত্থাপিত নতুন কিছু বিষয় মনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটিয়েছে। শুনেছি, তিনি সম্প্রতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সম্পর্কে জনগণকে নাকি সতর্ক করে বলেছেন, ওদেরকে যদি আপনারা ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আর সহ্য করতে পারবেন না। এ রকম পরস্পর বৈরিতা কিংবা বিদ্বেষমূলক কথা আমাদের দেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু না হলেও প্রশ্ন হচ্ছেÑ রাজনীতিবিদরা তো জনগণকে ধমক দিতে পারেন না। দেশ-জাতির সংকটে ড. কামাল হোসেনের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা কতটা কী রয়েছে, তা নিয়ে নানা রকম কথা আছে। এ নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশের মন্দের ভালো সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশে দৃষ্টান্ত দেওয়ার মতো কিছু বিষয় সামনে এসেছে।
আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে যেখানে একে অন্যের মুখ দেখাদেখিটাই প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং বিদ্বেষের ছায়া ক্রম বিস্তৃত হচ্ছিল ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকট ক্রম পুষ্ট রূপ নিচ্ছিল, তখন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। ড. কামাল হোসেন যখন বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে তার নেতৃত্বে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনাকে চিঠি দিলেন, তখন তিনি সময়ক্ষেপণ না করে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। একবার নয়, দুবার তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। একই সঙ্গে আলোচনায় বসলেন অন্যান্য জোট এবং দলের সঙ্গেও। বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুবাতাস বইল। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের যে প্রত্যাশা দেশ-বিদেশের নানা মহলের ছিল, তা এর পূর্ণতা পেল। ঘোষিত হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। তারপর চার দিনের মাথায় নির্বাচন কমিশন প্রধান বিরোধী পক্ষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচন এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তফসিল পুনর্নির্ধারণ করে নির্বাচন এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিল।
১৩ নভেম্বর পত্রিকায় দেখলাম, ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে চান গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি ১০ জনের এমন একটি তালিকা বিএনপিকেও দিয়েছেন বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ। পত্রিকায়ই দেখেছি এই তালিকায় রয়েছেন- ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. আকবর আলি খান, সুলতানা কামাল, শাহ্দীন মালিক, আলী ইমাম মজুমদার, ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, মইনুল হোসেন প্রমুখ। এর মধ্যে শেষ দুজন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে এমনিতেই যুক্ত আছেন। জানি না, ড. কামাল হোসেন যাদের নাম প্রকাশ করেছেন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে (এটা তার একটা প্রস্তাব), তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে তার আলোচনা হয়েছে কি না। তাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত কয়েকটি দলের আদর্শগত একেবারেই কোনো মিল থাকার কথা নয়। ড. কামাল হোসেনের এই প্রস্তাব নতুন করে একটি কিন্তু সৃষ্টিতে কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি না অথবা অন্য কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করবে কি না জানি না। হয়তো বিষয়টি তাদের কারো কারোর জন্য হতে পারে বিব্রতকরও। যাক, ড. কামাল হোসেনের এসব দেখেশুনে একটি কথাই মনে পড়ছে- আকাশে স্বপন করেছ বপন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে এ রকম বহুবিধ সমীকরণ হয়তো আরও ঘটতেই থাকবে। তবে আমাদের প্রত্যাশা হলো, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও প্রশ্নমুক্তভাবে সম্পন্ন হোক। নির্বাচনের ব্যাপারে এখন নির্বাচন কমিশনই (যেহেতু তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে) সর্বেসর্বা এবং নির্বাচনকালীন সরকার শুধু নির্বাচন কমিশনের সহযোগী শক্তি। অনেক কিছুই এখন চলে গেছে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে এবং বিধি মোতাবেক তাদের আদেশ অমান্য করার অবকাশ নির্বাচনকালীন সরকারের নেই। সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা একটি অবাধ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যাতে হয়, এ জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। এ কথা তফসিল ঘোষণার আগেই সংলাপে বসে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ অন্যান্য দল ও জোট নেতাদের তিনি বলেছেন। তার যদি সদিচ্ছা কিংবা এ ব্যাপারে আন্তরিকতা না থাকত, তাহলে আলোচনার দরজা খোলা রাখতেন না। তিনি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক এর পরিচয় ইতোমধ্যে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মধ্য দিয়েই দিয়েছেন।
বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অবস্থান নানা সূচকে বিশ্বে অন্য এক উচ্চতার পৌঁছেছে। উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাত্রা আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি কেড়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো এত বড় একটা সংকট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যেভাবে মোকাবেলা করেছে, এর প্রশংসা আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত করতে বাধ্য হয়েছে। সু চি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি মানববাদী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অথচ তার সরকারের শাসনামলে মিয়ানমারে যে নিধনযজ্ঞ হলো, এর বোঝাটা বইতে হলো বাংলাদেশকে এবং এবারই যে তা প্রথম ঘটল, তা তো নয়। বাংলাদেশ একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি অবশ্যই সহানুভূতিশীল; কিন্তু দীর্ঘদিন এ বোঝা বইবার সাধ্য তো আমাদের নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, যা ১৫ নভেম্বর শুরু হওয়ার কথা ছিল। প্রসঙ্গটা এ কারণেই উল্লেখ করলাম, এ ব্যাপারেও শেখ হাসিনা শুরু থেকেই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় সচেতন ভোটারদের হিসাব-নিকাশে আসবে কি না, সেটা বড় কথা নয়। কথা হলো, এমন একটা পরিস্থিতিতে দেশের সরকারপ্রধানের প্রজ্ঞা কিংবা দূরদর্শিতার বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।
কথা উঠেছে, এই যে নির্বাচন এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবি এর মধ্যে একটা ষড়যন্ত্র আছে কিংবা এক সপ্তাহ যে পিছিয়ে দেওয়া হলো, তাতে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাত করেছে। কেউ কেউ এ-ও বলেছেন, এ নাকি গোঁজামিলের তফসিল। একটা বিষয় একটু মনে করিয়ে দিতে চাই। রাজনীতির মাঠে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারা আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে বলে আসছেন, এখনই নির্বাচন দিয়ে দেখুন কটা আসন পান। এ রকম কথা তারা কয়েক মাস আগেও বলেছেন। ধরে নিলাম, রাজনীতিতে এমন কথা হয়েই থাকে। একটা জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন কম কথা নয়। তা ছাড়া ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সংসদের মেয়াদ থাকলেও ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হলে হাতে সময় কি খুব একটা থাকে? নির্বাচনের ফলাফল আসার পর গেজেট প্রকাশসহ নানারকম প্রক্রিয়া আছে, যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এমতাবস্থায় তারিখ আর না পিছিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় নির্বিঘ্নে কিভাবে নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়, এই বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশাটা সবারই ছিল। যেহেতু এই প্রত্যাশা পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে, সেহেতু এখন লক্ষ্য থাকুক- এবারের নির্বাচন যাতে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
জাতীয় নির্বাচন কেন, কোনো নির্বাচনই খেলা নয়। নির্বাচন মানে ভোটারের রায় নেওয়া। তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা। নীতির পাঠই তো হলো রাজনীতি। নেতাকর্মীদের জন্য নির্বাচন বড় রকমের পরীক্ষাও বটে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে রাজনীতির নামে জ্বালাও-পোড়াও, ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষ হত্যা- এসব তো কম হয়নি। ভোটের নামে তামাশাও কম হয়নি। মাগুরাসহ এমন ভোটের আরও কু-দৃষ্টান্ত কি আমাদের সামনে নেই? ইতিহাস থেকে কিছুই মুছে ফেলা যায় না। এ দেশের সিংহভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়। গণতন্ত্রপ্রিয়ও। এ দেশের মানুষ ভোট উৎসবে অন্যরকমভাবে জেগে ওঠে। স্বাধীন বাংলাদেশে দৃষ্টান্তযোগ্য নির্বাচনের নজির আমাদের সামনে আছে; আবার এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। এবারের নির্বাচন নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। এবার দলীয় সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন এলেই সহিংসতা, কালো টাকার ছড়াছড়ি, সমাজবিরোধীদের অপতৎপরতা বেড়ে যায়- এসবও আমাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে। এমন কোনো কিছু যাতে না ঘটতে পারে, এ জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সংখ্যালঘুরা নির্বাচন এলেই আতঙ্কে থাকেন এবং বহুবার তারা নানারকম বৈরী পরিস্থিতির শিকারও হয়েছেন, যা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। এসবের দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার হয়নি অনেক ক্ষেত্রেই। এমন কোনো কিছু যাতে না ঘটে, এর পূর্ণ নিশ্চয়তা চাই। সারা দেশে ভোটের আবহ সৃষ্টি হলেও সংখ্যালঘুরা নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় আছেন- এই মন্তব্য করেছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। তিনি ১৬ নভেম্বর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেছেন। তার এই মন্তব্য উড়িয়ে না দিয়ে আমলে নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কলঙ্কের দাগ যেন আর মোটা না হয়।
দলীয় সরকারের অধীনেও যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, প্রশ্নমুক্ত ও দৃষ্টান্তযোগ্য হতে পারে, এই উদাহরণ সৃষ্টি করাই নির্বাচন কমিশনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সবার সমানাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অবস্থান হতে হবে পক্ষপাতহীন ও কঠোর। ১৩ নভেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফিং অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা স্বচ্ছ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করে ইতিহাস গড়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। সঙ্গতই মনে করি, তার এই আহ্বান কথার কথা নয়। কাজের মধ্য দিয়েই প্রমাণ করতে হবে অঙ্গীকার প্রতিশ্রুতি পালনে তাদের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। লক্ষ্য রাখতে হবে, সামনের দিনগুলোয় যেন এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, যা নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। নির্বাচন কমিশন তো বটেই, একই সঙ্গে সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরও নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে দায় রয়েছে। কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here