ঠিকানার কবিতাগুচ্ছ

5

রেখে যাই চিহ্ন

শফিক জামিল

ছিলাম আছি এবং থাকতে চাই
প্রতিদিন প্রতিরাত প্রতিক্ষণ
এখানে সেখানে তোমরা যে যেথায় যেখানে,
তাই রেখে যাই চিহ্ন তোমাদের লোকালয়ে
অশুভ হটিয়ে শুভর সমাগম ঘটাতে;

ভেবে করি কাজ পাছে নাহি পড়ি লাজে
তবুও ঘটে কত শত ভুল অনিচ্ছা অগোচরে
তবে জেনো আমার অভিসন্ধি ছিল না তাতে
দোষ ধরো নাকো দেখো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে
যেমন দোষ ধর না শিশুর বিরূপ আচরণে;

আবার আছে মতলববাজ অনেকে
যত ভালোই করো দোষ ধরবে সব কিছুতে
দুরভিসন্ধি পুষে রাখে তাদের মননে অন্তরে
বিড়ম্বিত করে ভালোদের নিজেরাও বিড়ম্বনায় পড়ে
ধ্বংসের পথে চালায় অন্যরে নিজেরাও না পারে বাঁচতে;

মনে রেখো ক্ষমতা দিও না কখনো এদেরকে
যদি না বুঝে না হিসাব করে চলো চলার পথে
নিজেরা প্রজা হও রাজা বানাও এদের কাউকে
বানাবে তোমাদের জন্য দোযখখানা পৃথিবীতে
বানাবে কিছু সুরম্য অট্টালিকা সে দোযখের ভিতরে
ভিনদেশীরা ভাববে আছো তোমরা সুখে
তারাও দেখাবে রেখেছে তোমাদের মহা সুখে;
আলোর ঝলকানি চাকচিক্য ও কংক্রিটের ভিতরে
মজবুতভাবে ফেঁসে জ্বলবে সবে লাল নীল দহনে;

ছিলাম আছি এবং থাকতে চাই
প্রতিদিন প্রতিরাত প্রতিক্ষণ
এখানে সেখানে তোমরা যে যেথায় যেখানে,
তাই রেখে যাই চিহ্ন তোমাদের লোকালয়ে
অশুভ হটিয়ে শুভর সমাগম ঘটাতে;

খোঁজ তোমরা মন্দের ভিতরে ভালো কে,
বেশি খোঁজ কমল হৃদয়ের কাউকে
যে বা যারা অন্যদের দোষ ক্ষমা করে
বদলা নেই না প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে;
যারা প্রথমে শান্তি পরে উন্নয়নের কথা বলে
বানাবে নেতা তেমন নিজেদের জন্যে ভূপৃষ্ঠে,
নুন ভাত যদিও খাও তবুও বেহেশতি শান্তি পাবে
নচেত অশান্তির অনলে পুড়বে সারা জীবন
সর্বস্বান্ত করবে ফলে পস্তাবে রোহিঙ্গাদের মত।
নিউ ইয়র্ক।

সৃষ্টির উপাদান স্বীয় মাতৃগর্ভে

এইচ বি রিতা

বীর্য হতে আলাকা-মাংসপিন্ডে ফলন প্রতি চল্লিশ দিনে,
অতঃপর রুহু ফুঁকেন মালিক,
এখন জঠর ফেঁটে গর্ভবিমুক্তির পালা,
একটি নয় দু’টি নয়, গুনে গুনে শরীরের কুড়িটি হাড়
একই সময়ে ফাঁটল ধরানো বেদনা নিয়ে,
অঙ্কুরোদগমের পরক্ষণেই ভুলে যান যিনি দশ মাস দশ দিন,
তিনিই আমার মা! আমাদের মা।
হাত-পা ছুড়ে নবজাতক কাঁদে
গুম হয়ে যায় তার ঘুম, ঘুমের নামে ছলচাতুরি
নবজাতক তখনো রয় মায়ের বুক জুড়ে, ঘুমঘুম সোহাগী
ভরে যায় জোয়ারে তার শুষ্ক খাল-বিল, স্রোতস্বিনী; অতঃপর
ক্লান্তিহীন চোখে তিনি দেখেন, নিদ্রোত্থিত পূষা।
নবজাতক তখন অবুঝ শিশু, বোঝেনা কিছু
সিনায় সিনায় গিঁট লেগে গেল মমতা
আঙ্গুলের ডগায় মুঠি করে কচি নরম হাত
শিশু চলে মায়ের বলে সাহসী কদম ফেলে,
এক পা-দু’পা! পড়ে গেল, ব্যথা পেল
ঘোর মমতায় তার আঁখি ভরে এলো!
ব্যথা ছিনিয়ে ব্যথা সয়ে যিনি আঁচলে ভরেন সুখ;
তিনিই আমার মা! আমাদের মা।
একদিন শিশু বড় হল, মায়ের মনে হলো
সন্তান আমার খায়নি গতরাতে, গায়ে বুঝি জ্বর ছিল!
সন্তানের প্রিয় ডাল চচ্চরি-ট্যাংরার ঝোল,
কত রকম রসনাবিলাস!
সন্তান খেতে বসে, মা পাশে আসন পেতে
তালপাতার পাখা নাড়ে, কমজোর হাত ঢলে পড়ে
বেহুদা আরামে প্রিয় সন্তানের পিঠ ছুঁয়ে যান তিনি
উদরপূর্তি শেষে অবুঝ সন্তান উঠে পড়ে বাসন ঠেলে;
তখনো সে বুঝেনি আগুন তাপে মা পুড়ে যাচ্ছিল!
এমনই শতক ক্ষুদ্র বৃহৎ
বিশুদ্ধ ভালবাসা রং মাখিয়ে মেঘের কোলে রঙধনু ডাকেন যিনি;
তিনিই আমার মা! আমাদের মা।
বয়োবৃদ্ধ অবুঝ সন্তান আমি যখন রোগে-শোকে কাতর
তখনো দেখি মা আমার ক্লান্তিহীন সেবা দিয়ে যান অবিরত
আমি বলি,
মা আমার! ঢের হয়েছে মমতার সূতোয় এপাশ-ওপাশ নকশিবুনন
দাঁড় টানা শিথিল করো, এবার বিশ্রাম নাও
ইত্যুত্তরে মা বলেন,
মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে! অসুখটা বেড়েছে বুঝি!
বিস্ময় চোখে তারপর দেখি,
কুঁচকে যাওয়া শীর্ণ দু’টি হাত উঠে আসে পিঠে, তারপর মুখে
কি নিদারুণ দায়বদ্ধতায় মাতৃস্নেহ ছুঁয়ে যায় আমায়
অতঃপর, আরো একবার নবজাতক বেশে;
আমি ঘুমিয়ে পরি আশ্বস্ততার ছায়ায়, নির্বিঘ্নে।
এই আমার মা! আমাদের মা।
সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামূল্যবান জহর; আমার মা।
নিউ ইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here