তিন ভূবনের ওপার থেকে

6

কমল কলি

সিদ্ধান্তটা দ্রুতই নিয়েছিল ইকবাল। মুক্তিযুদ্ধে সে যোগ দেবে। দেশের এই ক্রান্তিকালে ঘরে থাকার মতো মানুষ সে নয়। দুটি হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে উঠেছে। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায় ইকবাল।

সঙ্গী-সাথীরা অনেকেই গোপনে দেশছাড়া হযেছে। জুলাই মাসের প্রথম অব্দি খবর পেয়েছে, শেষ পর্যন্ত নকীবও মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে।
নকীব সেই হালকা পাতালা কলেজে প্রথমবর্ষে পড়–য়া ছেলেটা, সেও যুদ্ধে চলে গেল, আর ইকবাল এখনো ঘরে বসে আছে সে একজন পূর্ণ বয়সী মানুষ। পড়াশোনা শেষ করে বিয়ের পাট চুকিয়ে চাকরিজীবী একজন মানুষ সে। কেমন হাত গুটিয়ে বসে আছে। নিজেই ধিক্কার দেয়, ছি:।

এই মফস্বল শহরেও ত্রাস ছড়িয়েছে পাক-হায়েনাদের দল। প্রায় নিঃশব্দেই যেন এই একতলা বাড়িটাতে বাস করছে পাঁচ-ছ’জন মানুষ। অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বড় ভাই আর সে নিজে। কারণ রাস্তা থেকে প্রায়ই লোকজনকে ট্রাকে তুলে নিচ্ছে পাক সেনাবাহিনীর সৈন্যরা। পরে, তাদের আর কোনো খবর মিলছে না। ভাবি, মা, ভানু, ইকবাল নিজে, স্ত্রী মধু, আর বড় ভাইয়ের ছোট্ট পাঁচ বছরের মিলিকে নিয়েই পার করছে দিনগুলো।

বরং এখন বাড়ির সবাই ভাবছে, গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়া যায় কি না।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্লানটা অন্তত মধুকে বলতেই হবে। বাড়ির আর কাউকেই বলা যাবে না। মা, বড় ভাই কেউই যেতে দেবে না। কিন্তু যারা দেশে ঘটছে নিত্যদিন- ইকবাল ক্রোধে, দুঃখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ভয়ঙ্কর এক ধরনের ঘৃণা বোধ করছে। তীব্র ঘৃণার থুথু ছিটিয়ে দিতে চাইছে এই রক্তপিপাসু পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে।

মধুকে আর না বলে পারেনি সেদিন।
তোমাকে কেমন অস্থির লাগছে গো।
তাই মনে হচ্ছে তোমার মধু?
হ্যাঁ, তাই, কি হয়েছে?

শোনো মধু, আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেব। আমাকে বাধা দিও না।
খানিকক্ষণ অবাক হয়ে স্বামীর দিকে চেয়ে থেকে মধু বলে, আমি এ যুগের মেয়ে, দেশের এই কঠিন অবস্থা। শোনো, আমি যদি তোমার বয়সী কিংবা আরো কম বয়সী ছেলে হতাম, কবেই যুদ্ধে চলে যেতাম।
মধু! বিস্মিত ইকবাল।

‘হ্যাঁ, শোনো বাড়ির সবাই তোমাকে না করছে যুদ্ধে যেতে। আমি চুপ করে থাকি। আমি গরিব বাবা-মায়ের মেয়ে। বলতে নেই অনেকেই বলে, রূপের জোরে তোমাদের বাড়িতে বৌ হয়ে এসেছি। কিন্তু কিছু বলার অধিকার আমার নেই। আজ যদি তোমার মনে হয়ে থাকে, তুমি যুদ্ধে চলে যেতে পারো। দু’চোখ ছল ছল করে উঠেছে মধুর। গভীর মমতায় স্ত্রীকে কাছে টেনে নেয় ইকবাল।

লক্ষ্মী বৌ আমার আমি ঠিক ফিরে আসবো। ওই শয়তানদের হাত থেকে এদেশ মুক্ত করবোই আমরা। এই এইতো বীরের মতো কথা।
আগামীকাল খুব ভোরেই চলে যাব। সবার জেগে ওঠার আগে।

বেশ তো, আঁচলে চোখ মুছেছে মধু। চেষ্টা করছে, নিজেকে শক্ত রাখতে।…
বাড়ির সবাই দুদিন পরেই বুঝতে পারে। শাশুড়ি-ভাশুরের জেরার মুখে স্বীকার না করে পারেনি মধু।
আমাদের কেন বলোনি বৌমা। আমরা যেতে দিতাম না। এ কথার কোনো উত্তর নেই মধুর কাছে। আজ যদি আমার ছেলের কিছু হয়। তার মূল্য তোমাকে দিতে হবে। জেনে রেখো।

মধু শুধু বলে, মা, দেশের এই অবস্থায় কত ছেলেরাই তো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তাদেরও তো সংসার আছে। বাবা-মা আছে।
চুপ করো, একটা কথাও বলবে না ভাশুর আঙ্গুল তুলেছিল।..

সময় ক্রমশ চলে গেছে। অনেকে ত্যাগ তিতিক্ষার পরে বিজয় অর্জিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে চলে যাওয়া কতজন ফিরে এসেছিল আশপাশের একটা দূরের বাড়িগুলোতে। দু’একজন ফেরেনি। ইকবালও ফিরে আসেনি।

রশীদ নামের ছেলেটা। সে খবর দেয়, খুলনা সেক্টরে তারা এক সাথেই ছিল। একটা বড় অপারেশনের সময় ইকবাল গুলিবিদ্ধ হয়। যেখান থেকে তাকে সরিয়ে ফেলে তাদেরই লোকজন, তারপর আর সে জানে না।

পাথরের মতোই ঘরের মধ্যে গুম হয়ে বসে থাকে মধু। ভাশুরের তর্জন গর্জন। শাশুড়ি, জায়ের অশ্রুপাত সবকিছুই তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। নিঃশব্দে কাঁদে মধু, তুমি সত্যি চলে গেলে, এভাবে তো তোমার চলে যাওয়ার কথা ছিল না।

বড় বাজারের ওদিকে বাড়ি নজমুলের, মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল সেও। পেটে গুলি লেগেও বেঁচে ফিরেছে। মধুর ভাশুরের সাথে দেখা হয়েছে রাস্তায়। জানো নাকি তোমার ভাইয়ের খবর? প্রবল আকুতি রাশেদের। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে বলে ছেলেটা সে তো আর নেই ভাইয়া, পেটে আর পায়ে গুলি লেগেছিল। পরে মারা যায়। রাস্তার ধারে লাশ রেখে সবাই ফিরে গিয়েছিল ব্যারাকে অপারেশন শেষ করে।

তুমি জানলে কি করে?
ওই অপারেশনে আমিও ছিলাম।

আহাজারিতে ভেঙে পড়ে রাশেদ। ইকবাল আর বেঁচে নেই। সে কোনদিন ফিরবে না। অবিশ্বাস্য এই সংবাদে কান্নায় ভেঙে পড়েছে বাড়ির সবাই।
শোকের মাতম থামেনি। তার মধ্যেই মধুর বাপের বাড়িতে খবর দেয়া হয়েছে। বৃদ্ধ বাবা তার বড় ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন মধুর শ্বশুরবাড়িতে। জামাইয়ের শহীদি মরণের খবর জেনে হাহাকার করে উঠেছেন।

শাশুড়ি বলে, যে স্ত্রী তার স্বামীকে যুদ্ধে যেতে নিষেধ করে না। বরং উৎসাহ দেয়। প্রকারান্তরে সে স্বামীর মৃত্যুই কামনা করে।
না, মা, না। প্রবল আকুতিতে ভেঙে পড়ে মধু। মেয়েকে নিয়ে যান। দ্যাখেন। কত দায়। বোবাবা হয়ে গেছেন আফাজ উদ্দিন। ভাইও স্থবির যেন। কুটুম বাড়ির আহার মুখে যেন আর রোচেনি তাদের।

দুটো বছর এরমধ্যে চলে গেছে। কেন যেন, বাপের বাড়ির সদর দরজায় ফিরে ফিরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মধু। ওই মানুষটা যদি ফিরে আসে। মা কাছে এসে দাঁড়ান। কার অপেক্ষা করিস মা, দুটো বছর পার হয়ে গেল, যে যাওয়ার সে তো চলেই গেল। তোর শ্বশুরবাড়ির লোকও তো আর কোনো খবর নিল না।
মা, আমার কেন যেন বিশ্বাস হয় না। মা চুপ করে থাকেন। কি করে বলবেন, যে চলে যায়, সে আর ফেরে না।

এদিকে তার ছেলে বৌদের সাংসারে। এ সংসারেও আছে টানাটনি। ভালোই বিয়ে হয়েছিল মধুর। কিন্তু বিয়ে দু’বছরের মধ্যেই কি ঘটে গেল। দু’ভাই আর বাবা-মা বসে আলোচনা করে। মধুর একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। ভালো সম্বন্ধ মা বোবা হয়ে গেছেন।

মা, কি বলো, এভাবে তো দিন যায় না। মধুর তো বিয়ে দিতে হয়। তারও তো জীবন আছে। এদিকে বয়সও বাড়ছে।
বুঝিরে বাবারা, কিন্ত মেয়েটা যে আজও আশা করে আছে।

কার জন্য মা, কেন আশা করে আছে। বড় ভাই ক্ষিপ্ত যেন। ওই বাড়ির মানুষগুলো আমার বোনটাকে বাড়ির বার করে দিল। কি একটা অদ্ভুত কারণে। এতটুকু মায়া করলো না। কত ছেলেই তো যুদ্ধে গিয়ে আর ফেরেনি। এ দিকে দ্যাখো, দু’বছরও পেরিয়েছে, ইকবাল বেঁচে থাকলে ঠিকই ফিরতো। খবর যা পেয়েছি তাতো ভুল নয় নিশ্চয়ই।

তাই মনে হয়। বাবা মা তার বেশি আর কথা বলতে পারেন না।
তারপরেও আরো ছ’টা মাস কেটে গেছে। এক সময় প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মধুর বিয়ে দিয়ে দিল ভাইয়েরা।

অনেক অবস্থাপন্ন ঘরে মধুর বিয়ে হলো। জামাইয়ের আগের স্ত্রী মারা গেছে বছর খানেক আগে। ছোট দুটি সন্তান আছে তার। মধুকে তারা আদর করেই ঘরে নিয়েছিল।

মাস ছয় কেটে গেছে। মায়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে মধু। একাই এসেছ। যেদিন বিকেল বেলা, বড় ভাই একটা ইলিশ মাছ কিনে এনেছে। আঁশ চকচকে তাজা ইলিশ মাছ। দৌড়িয়ে গিয়ে মাছটা হাতে নেয় মধু। ভাইজান দাও। আমি কাটি মাছটা।

আমি জানি তো তুই-ই কাটবি। কারণ তোর যে পছন্দের মাছ ইলিশ।
উঠোনের একপাশে কাঁঠাল গাছটা ডাল পাতা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বটি পিঁড়ি নিয়ে গাছের নিচেই বসে শুধু। মাও এসে বসেন বারান্দায়।

ঠক ঠক বাইরে সদর দরজায় কেউ টোকা দিল। আমি দেখছি, মেঝ ভাই এগিয়ে গেছে। দরজা খুলে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় কথা বলতেও ভুলে গেছে।
খুব পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর কানে এসে বাজে মধুর, ভাইজান, ভেতরে যেতে বলবেন না? অবাক হয়ে গেছেন, তাই না?

কে কার গলা? মাছ বঁটি ফেলে উঠে দাঁড়ায় মধু।
তুমি! বিস্ময় জড়িয়ে আছে মেঝ ভাইয়ের কণ্ঠে, হ্যাঁ। আমি বাড়িতে ফিরেছি গতকাল। বাড়ির সবাই খুব অবাক হয়ে গেছে ভাইজান। মধু সেখানে নেই জেনে আজ সকালের ট্রেন ধরে সিরাজগঞ্জে এলাম।
সবই শুনছে মধু। মাও নেমে এসেছেন উঠোনে।

আড়াইটা বছর তোমার কোনো খোঁজ নেই ইকবাল। খবর পেয়েছিলাম আমরা তুমি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়ে গেছ।

সবাই তাই জানে ভাইজান। মরেই গিয়েছিলাম প্রায়। আমাকে জঙ্গলের পাশে ফেলে বাকি সবাই চলে যায়। আমার বেশ কয়েক দিন নাকি জ্ঞান ছিল না। একজন কৃষক আমায় বাঁচিয়েছিল। সেই বলেছে, কত কিছু মনে করতে পারতাম না। সেই কৃষকের নাম আহাদ আলী। তার ঋণ আমি কোনদিনই শোধ করতে পারবো না। পরে কোলকাতায় পাঠিয়ে আমার চিকিৎসা করিয়েছে। সুস্থ হতে কতদিন লেগে গেল। কিন্তু দ্যাখেন, একটা পা হারিয়েছি। ক্র্যাচ নিয়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে।

হ্যাঁ তাই, কিন্তু…
কিন্তু কি ভাইজান? মধু কই?
মধু আছে তো, কিন্তু…
হঠাৎ সদর দরজা হাট করে খুলে গেছে। উঠোনে এসে দাঁড়ায়, ইকবাল।

মা ডুকরে কেঁদে ওঠেন। থর থর করে কেঁপে উঠেছে মধু। বুঝি বহুদূর থেকে, তিন ভূবনের ওপার থেকে সেই চেনা কণ্ঠ তাকে ডাক দিয়ে গেল- মধু
আঁশ বঁটি পড়ে রইল পায়ের কাছে। সরে যেতেও ভুলে গিয়েছে এ বাড়ির মেয়েটা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here