শেষ ভালো যার, সব ভালো তার, মানুষ দেখতে পাবে তো

6

বাংলাদেশ দিন গুনতে গুনতে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে-প্রবাসে সর্বত্র এখন নির্বাচন নিয়ে সরব আলোচনা। সূচনাটা শুভই হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করেছে বলে মনে করা যায়। আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির সঙ্গে আর কোনো কথা নয়-বারবার বলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একাধিকবার সংলাপ হয়েছে, যা অবশ্যই পজিটিভ ও শুভ লক্ষণ।
কোনো সংলাপেই শতভাগ সুফল মেলে না। বাংলাদেশের মানুষও তাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপে শতভাগ প্রত্যাশা মিটেছে দাবি করছে না। তবে বড় একটা প্রত্যাশা অবশ্যই পূরণ হয়েছে, যা কোনো পক্ষেরই অস্বীকার করার উপায় নেই। সংলাপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতিকদের মধ্যে এত দিন যে কথা বলা, মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল, তার বরফ গলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ মনে হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র ব্যতিক্রমী একটি দেশ, যেখানে দলাদলি, রেষারেষি এমন এক পর্যায়ে যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ একে অপরের মধ্যে কথা বলাবলি নেই, সামাজিক ওঠাবসা নেই। বাংলাদেশের মানুষ অনেক দিন থেকেই রাজনৈতিক এই অচলাবস্থার অবসান ঘটুক প্রত্যাশা করে আসছিল। রাজনীতিবিদদের মধ্যে সাম্প্রতিক সংলাপের মধ্য দিয়ে মানুষের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ এখন শেষ ভালো দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। কথায় আছে ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’। মানুষ তাদের প্রত্যাশার কাছাকাছি মোটামুটি ভালো একটা নির্বাচন দেখতে আগ্রহী। মোটামুটি ভালো বলতে একশ ভাগ ভালো যে হবে না, তা বুঝে নিয়েছে অথবা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে পাবলিককে। নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সদস্য বেগম কবিতা খানম জনগণের শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশায় ইতিমধ্যেই পানি ঢেলে দিয়েছেন ‘শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না’ এ কথা বলে। সংবিধান যাদের দায়িত্ব এবং ক্ষমতা দুই-ই দিয়েছে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য, তারা কীভাবে যে এ রকম কথা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সে কথার অর্থ বোঝার সাধ্য নেই। তবে কি নির্বাচনে নয়-ছয় হলে কমিশনের সদস্যরা বলবেন, ‘আমরা তো আগেই বলে দিয়েছিলাম, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না?’ কথাটা বলা যে সংবিধানের পবিত্রতাকে কলঙ্কিত করাÑসে কথা কি দেশের শতভাগ মানুষের আস্থাপ্রাপ্ত কমিশনাররা বুঝতে পারেন? নাকি ভবিষ্যতে নিজেরাই আস্থাভঙ্গের কারণ ঘটিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা? যে কারণে আগে থেকেই সেই পথ তৈরি করে রাখা!
যা হোক, মানুষের মোটামুটি একটা ভালো নির্বাচনের প্রত্যাশা হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যেন তারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়। ভোটের ফলাফলে যেন জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে। কারচুপি যেন প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে না দাঁড়ায়। নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতিত্ব যেন সকল সীমা অতিক্রম না করে। আন্তর্জাতিক দরবারে যেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশে না যায়। সংলাপের মধ্য দিয়ে হতাশার অন্ধকার সম্পূর্ণ দূর না হলেও, আশার আলো কিছুটা হলেও দেখা যাচ্ছে। সেটাকে যেন আরও প্রসারিত, আরও উজ্জ্বল করা যায়। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যেন মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন গণতন্ত্রের পথে চলার সুযোগ পায়।
সংলাপে ড. কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দেওয়ায় মানুষের আস্থার জায়গাটা বেড়েছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলেছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস আস্থায় নিতে চাই। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে, অর্থাৎ তিনি ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করছেন। জনগণ আশা করে, তিনি প্রমাণ করবেন ক্ষমতায় থেকেও একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে মানুষের যে ভয়, সংশয়, আস্থাহীনতা তা তিনি দূর করতে সক্ষম হবেন বলেই বিশ্বাস করতে চাই। এবং তিনি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, যাতে ভবিষ্যতেও যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তারা আজকের সরকারের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে চলতে পারে। মানুষও নিঃসংশয়ে সেই সরকারের সততা ও আন্তরিকতার ওপর আস্থা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে যেন আর কখনো নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে জ্বালাও-পোড়াওয়ে মানুষকে লিপ্ত হতে না হয়। আর যেন জানমালের কোনো ক্ষতির মধ্যে মানুষকে পড়তে না হয়।
এখন মানুষের এই প্রত্যাশা পূরণে সব পক্ষের দিক থেকেই যেটা সবচেয়ে জরুরি, তা হলো কেউ যেন তালগাছটা নিজেদের দিকে রাখার জন্য গোঁ না ধরে। কিংবা যেকোনোভাবে তালগাছটার মালিক হওয়ার জন্য কেউ কোনো ছল-চাতুরীর আশ্রয় না নেয়। বাংলাদেশে এ যাবৎ যত যত গন্ডগোল, সহিংসতা, হানাহানি, ভাঙচুর জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা-গুম, বাড়াবাড়ি সব এই তালগাছটা দখলে রাখার অর্থাৎ ক্ষমতা ছেড়ে না যাওয়ার আকাক্সক্ষা থেকে। মুক্তিযুদ্ধ বলি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ৩০ লাখ মানুষের জীবনদান, প্রায় ২ লাখ মা- বোনের সম্ভ্রমহানি, গণতন্ত্রের স্বপ্ন, দেশের স্বাধীনতা, সংবিধান, রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার সবকিছু এতদিন মূল্যহীন হয়েছে, এই তালগাছ অর্থাৎ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার আকাক্সক্ষা থেকেই।
বাংলাদেশের মানুষ একবারই বিজয়ী হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তারা বিজয়ী হয়েছে বহু ত্যাগের বিনিময়ে। জান-মাল-সম্ভ্রম সবকিছু দিয়ে। এরপর তাদের বিজয় হাতছাড়া হয়েছে তাদেরই যারা আদর্শ ছিল, সেই রাজনীতিবিদদের কাছে। তারা যা বলেছেন তা রক্ষা করেননি। মানুষকে যে ওয়াদা দিয়েছেন, বারবার সে ওয়াদা ভুলে গেছেন। যারা দল করেন, রাজনীতি করেন, তারা জনগণকে বিজয়ী দেখতে চাননি। কেবল নিজেরা জিততে চেয়েছেন। নিজেদের জেতার জন্য ন্যায়-অন্যায় কিছু বিবেচনা করেননি। মানুষ জিতুক, দল জিতুক, গণতন্ত্র, মানবতা, মূল্যবোধকে জেতানোর জন্য রাজনীতিকদের দায়বোধ লক্ষ করা যায়নি। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা ধরে রেখে সম্পদের মালিক হতে চেয়েছেন। ক্ষমতার ছায়ায় থেকে তারা নিজেদের সে আকাক্সক্ষা পূরণও করেছেন। ক্ষমতায় থেকে তারা জনগণকে শাসন করতে চেয়েছেন। তারা মানুষকে শাসন করেছেন, সেবা করেননি। সে কারণে তারা সেবক না হয়ে শাসক হয়েছেন।
বাংলাদেশের মানুষ এবার নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। এত দিনের আশাভঙ্গের হতাশা থেকে বের হয়ে আসার স্বপ্ন দেখছে নতুন করে। প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারকে মানুষ অত্যন্ত পজিটিভভাবেই দেখছে বলে মনে হচ্ছে। সরকারি দল এবং বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের মধ্যেও পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতির সংস্কৃতিচর্চার প্রবণতা কম লক্ষ করা যাচ্ছে। জনগণের ভোট নিয়ে এবার বিজয়ী হতে চাচ্ছেন সবাই। সবাই ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ১৯৯০-এ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের মতোই গণতন্ত্রের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠার তাগিদ প্রকাশ পাচ্ছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে নির্বাচন সামনে রেখে এমন উৎসবমুখর পরিবেশ আর কখনো দেখা গেছে বলে মনে হয় না।
তবে শেষ পর্যন্ত শেষটা ভালো হলে তবেই ভালো। কথায় বলে, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। বাংলাদেশের মানুষ ঘর পোড়া গরুর মতো সিঁদুরে মেঘ দেখলে আঁতকে ওঠে। তাই শেষ ভালোর প্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাক-আমাদেরও প্রত্যাশা। শেষ ভালোর এই প্রত্যাশা পূরণ বেশিটাই নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশন কতটা সাবালক হয়ে উঠতে পেরেছে তার ওপর। এই সাবালকত্ব এর আগে কেউ দেখাতে পারেনি। এবারের নির্বাচন কমিশন যদি দেখাতে পারে, তবে তারাও ইতিহাসের অংশীদার হয়ে থাকবে।
দেশের নাগরিক ও সুশীল সমাজ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশ এবং জাতিসংঘ সবাই চায় বাংলাদেশে একটা ভালো অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। দেশের মানুষ স্বস্তি ও সুশাসন লাভ করবে। সবার এই চাওয়ার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের চাওয়া মিলবে তো? নাকি তাদের চাওয়া অন্য কিছু? তাই যে যা চাক, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার-নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের চাওয়ার ওপর। নির্বাচন কমিশনের ওপর নাগরিক সমাজ আস্থা রাখতে পারে এমন অবস্থা লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং নির্বাচন কমিশনকে অধিক থেকে অধিকতর প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেওয়া যাচ্ছে, যা মানুষের মনে আশা জাগাচ্ছে না, উল্টো সংশয় সৃষ্টি করছে।
এ রকম পরিস্থিতি-পরিবেশে শেষ ভালোটা যে শেষ পর্যন্ত কার হবে, কে জানে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here