আজও জাতীয়তাবাদে বিভক্ত জাতি

2

শফিকুজ্জামান

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৭ বছর হলো। অথচ আজও জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে বিভক্তই রয়ে গেল জাতি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করতে গিয়ে দিতে হয়েছে অনেক রক্ত, হারাতে হয়েছে লাখো মা বোনের সম্ভ্রম। সন্তান হয়েছে পিতা হারা, স্ত্রী হয়েছে স্বামী হারা, মা হয়েছে সন্তান হারা। অনাহারে-অর্ধাহারে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষ। শিয়াল শকুনে কামড়ে, ঠুকরে খেয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিবিদ্ধ পবিত্র দেহ। বিশ্ব ইতিহাসের জঘণ্যতম পৈশাচিকতাকে হার মানিয়ে বাঙালি জাতি পাকিস্তানি হায়েনাদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছে প্রিয় স্বাধীনতার লাল সবুজ পতাকা। মুক্ত করে এনেছে অবরুদ্ধ, রক্তাক্ত বাংলা মাকে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও ধ্রুব সত্য, আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠিত হয়নি গণতন্ত্র, আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, প্রতিষ্ঠিত হয়নি শোষণমুক্ত সমাজ গঠন তথা সমাজতন্ত্র। বিচারের বাণী আজ আর নীরবে কাঁদে না, কান্না শুনা যায় প্রকাশ্যেই। আইনের শাসন আজও ফাইলবন্দীই রয়ে গেছে। ’৭১-পরবর্তী সরকার থেকে আজ পর্যন্ত সর্বকালের ধারাবাহিকতার সাক্ষী হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়, থাকবে অনন্তকাল। ঐতিহাসিক ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ১৯৮১-এর ৩০ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতি। সব ঘটনা দুর্ঘটনা, সত্য মিথ্যা, উত্থান-পতন আজ ইতিহাসের ফ্রেমে বাঁধানো। স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঢিলেঢালাভাবে হলেও দেশ পরিচালিত হয়েছিল। ৭৫ থেকে ৮১ সাল পর্যন্ত আমরা দেখেছি ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করা, দেখেছি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কালো বিষদাঁত। বাঙালি জাতীয়তাবাদের জায়গায় দেখেছি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ৮২ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত দেখেছি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত করা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম। ধর্মীয় মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের বিষবাষ্প ছড়ানো হয়েছে। সেনা ছাউনি থেকে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় আবারো সংগ্রাম, আন্দোলন, রক্ত। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্ত ঝড়ার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধার হলো সামরিক বন্দিশালা থেকে, মূলত যেখানে ৭৫ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত বন্দী ছিল গণতন্ত্র। ৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আবারো প্রতিষ্ঠিত হলো একটি গণতান্ত্রিক সরকার। সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার কায়েম করা হলো। বাংলার মানুষ ভেবেছিল এবার বুঝি আমরা ফিরে যাবো ৭১ আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, ঘুরে দাঁড়াবো মাথা উঁচু করে। কিন্তু না, আমাদের আশা আকাক্সক্ষা অবিশ্বাস্যভাবে নিষ্ফলই রয়ে গেল। আমরা আবারো হয়ে গেলাম বাংলাদেশি। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে উত্থান হলো ধর্মীয় জঙ্গিবাদের, শুরু হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ৯৬ সালে আরেকটি নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্বের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটি সরকার গঠন করে স্বল্পসময়ের জন্য ক্ষমতায় ছিল। অনাকাক্সিক্ষত হলেও ৯৬ সালে আবারো একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সে নির্বাচনে নতুন করে একটি রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করল। সাথে সাথেই ৭১-এর মতো আমরা আবারো হয়ে গেলাম বাঙালি। ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনায় ফিরে গেলাম। অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থাকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হলো। দেখতে থাকলাম মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে গড়ে তোলার স্বপ্ন। যথারীতি ৫ বছর পর ২০০১ সালে আবারো জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সে নির্বাচনে বিজয়ীদল সরকার গঠন করার সাথে সাথেই আমরা আবারো হয়ে গেলাম বাংলাদেশি। ধর্মীয় মৌলবাদ জঙ্গিবাদ আবারো গা ঝারা দিয়ে, কোমড় বেঁধে মাঠে নেমে পড়ল। পুরনোদের পাশাপাশি নতুন করে জন্ম হলো বাংলা ভাই, উর্দু ভাইদের। বাংলাদেশের মানুষসহ সারা বিশ্ববাসী দেখলো পবিত্র ধর্মের নামে মানুষের ওপর দমন-নিপীড়ন। বাংলাদেশের ৬৩টি জেলায় একই সাথে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে তাদের শক্তির মহড়া প্রদর্শিত হলো। শুরু হলো সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা, নেমে এলো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার নির্যাতন। এভাবেই সরকারের ৫ বছর কেটেছে। জাতির সামনে আবারো হাজির জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের মতপার্থক্য থাকার সুযোগ নিয়ে, আবারো শাসন ক্ষমতায় এলো সেনা সমর্থিত সরকার। স্বাধীন বাঙালি জাতির ওপর আবারো চেপে বসলো সেনা শাসন। ৯০ দিনের জায়গায় দীর্ঘ দুই বছর ক্ষমতায় থেকে গেল তারা। গ্রেপ্তার করা হলো দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে। ২০০৯ সালে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমরা পেলাম একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলার জনগণ ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনলো আওয়ামী জোটকে। আবারো আমরা বাঙালি হয়ে গেলাম। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমাজ পরিচালিত হতে থাকল। বাঙালি সংস্কৃতিতে জীবনযাত্রা শুরু হলো আবার, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হলো সব ধর্মপ্রাণ মানুষ। শুরু হলো ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার। সরকারের ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় আবারো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ৫ জানুয়ারি ২০১৪। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আবারো সরকার গঠন করল পূর্বের রাজনৈতিক জোট। দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে, জাতিকে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করল তারা। আবারো অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, আবারো বাঙালি, আবারো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি। সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারী পুরুষের ন্যায্য অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, শিক্ষিত জাতি গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ আরো নানা বিষয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। সব কিছুর পরেও অপূর্ণতা থেকেই যায় আমাদের মানবিক মূল্যবোধের এবং বিশ্বাসের দুদুল্যপনার কারণে। আমাদের মানসিক চেতনায় আর বিশ্বাসে একটি বিষয়কেই ধারণ করতে হবে। সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এ চেতনার ভিত্তিকে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের চেতনায় ধারণ এবং নির্ধারণ করতে হবে- আমরা বাঙালি নাকি বাংলাদেশি চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করবো? আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নাকি ধর্মীয় মৌলবাদে বিশ্বাসী? আমরা ৭১-এর পরাজিত শত্রুদের বর্জন করবো- নাকি আশ্রয় প্রশ্রয় আর মন্ত্রিত্ব দেবো? ক্ষমতায় যাওয়ার চেয়েও দেশকে ভালোবাসতে হবে সবার আগে। সত্যিকারের দেশপ্রেম তৈরি হলে কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না এ দেশের একচুল পরিমাণ ক্ষতি করা। যারা বাংলাদেশকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করবে, ভালোবাসবে- তারাই দেশ পরিচালনা করবে। যারা আমার বাংলা মাকে আর রক্তাক্ত হতে দেবে না কখনো, তারাই শুধু থাকবে এ মায়ের বুকে। আজ জাতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয়তাবাদ কোনটি? বাঙালি আর বাংলাদেশির মতো অনেক কঠিন কঠিন প্রশ্ন- তাই এর সমাধান এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার উপযুক্ত সময় এখনই। কারণ বাঙালি আর বাংলাদেশি বিতর্কে সারা জাতি আজ বড়ই বিভক্ত-লজ্জিত ও বিভ্রান্ত।
লেখক : সাংবাদিক ও সিনিয়র সাব এডিটর, দৈনিক আমার সংবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here