যৌন নিপীড়নে পাগলপ্রায় নারী ভারোত্তোলক

ভারোত্তোলকের পাশে আইনি সংস্থা : বিচার চান মা

5

স্পোর্টস রিপোর্ট : শহরজুড়ে অন্যতম আলোচনার বিষয় এখন ‘হ্যাশট্যাগ মি টু’। শিক্ষিত মেয়েরা তাদের গোপন কষ্ট আর গোপন করছেন না, অভিযোগের আঙুল তুলছেন নির্দিষ্ট পুরুষের দিকে। কিন্তু স্বল্পশিক্ষিতরা এখনো গুমরে কাঁদেন। বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। ফোটে যখন, তখন জীবন প্রায় বিপন্ন দেশের এক নারী ভারোত্তোলকের জীবন এমন বিপন্নতায় পৌঁছে যাওয়ার পর তাঁর পরিবার মুখ খুলেছে। বলেছে ওই ভারোত্তোলকের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা। সেই নিপীড়ন এমন ভয়াবহ যে মেয়েটি এখন পাগলপ্রায় হয়ে মানসিক হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন।
এই অঘটন ঘটেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। অভিযোগ বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশনের অফিস সহকারী সোহাগ আলীর বিরুদ্ধে। সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবে নারী ভারোত্তোলকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ২০১৫ সালে জাতীয় ক্লাব ভারোত্তোলনের সোনাজয়ী এই ভারোত্তোলকের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এই মেয়ে ক্রীড়াঙ্গনে এসেছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। দারিদ্র্য দূর করার একটা উপায় হিসেবে নিয়েছিলেন ভারোত্তোলনকে, পারফরম্যান্স দেখিয়ে একটি চাকরি জোগাড় করতে চেয়েছিলেন। গত ২২ নভেম্বর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের লবিতে দাঁড়িয়ে নির্যাতিতার মায়ের অভিযোগ, ‘১৩ সেপ্টেম্বর অনুশীলনের কথা বলে ডেকে নিয়ে সোহাগ আমার মেয়ের সর্বনাশ করেছে। সে সকালে গিয়ে প্রায় ৩টা বাজে ফিরে আসে এবং এরপর থেকেই তাকে অস্থির দেখাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর বলে, আমার শরীর ব্যথা করছে। বলে জ্বরের ওষুধ এনে দিতে। কিন্তু কী হয়েছে কিছু বলে না। অনেক পরে গত ৯ অক্টোবর আমার ফুপাতো ভাইয়ের বউয়ের কাছে সব খুলে বলে।’ এর পরও কেন মামলা করেননি? মায়ের জবাব, ‘আসলে মেয়ের একটা ভবিষ্যৎ আছে। সব কিছু জানাজানি হয়ে গেলে তার ক্ষতি হবে বলে আমরা মামলা-মোকদ্দমার দিকে যাইনি।’
পরদিন থেকেই নির্যাতিতার জীবন একদম ওলটপালট হয়ে যায়। এমন উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকে, গায়ে কোনো কাপড়ও রাখতে চাইত না বলে তার মায়ের দাবি। ওঝা দিয়ে ঝেড়ে, পানিপড়া খাইয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা বৃথা যাওয়ার পর গত ২৩ অক্টোবর এই ভারোত্তোলককে ভর্তি করা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। এক মাসেরও বেশি সময় হয়ে গেছে ওখানে। ডা. তাজুল ইসলামের অধীনে চিকিৎসা চলছে, বড় ধরনের ‘শক’ থেকে তার এই পাগলপ্রায় অবস্থা হয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসক। শুরুতে রুগিনীর অবস্থা খুব খারাপ থাকলেও এখন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত ২৫ নভেম্বর ডুকরে কেঁদে উঠে নির্যাতিতার মা বলেছেন, ‘সেদিন সোহাগকে সহায়তা করেছিল মালেক ও উন্নতি (আরেক ভারোত্তোলক)।’ দুই সাহায্যকারী ক্রীড়া পরিষদের কর্মচারী মালেক ও উন্নতি ছুটিতে থাকলেও সোহাগ আলীর দেখা মিলেছে কাল ফেডারেশনে। তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করে সোহাগ বলেছে, ‘আমি এই নামে (মেয়েটির নাম) কাউকে চিনি না। এখানে কাজ করছি তিন বছর ধরে।’ অথচ ঠিক ওই সময়ে ফেডারেশনে বসা সহসভাপতি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিনের কথায় স্পষ্ট তিনি ভারোত্তোলককে চিনতে পারছেন, ‘ওই ভারোত্তোলকের মা ও মামা গত ২৫ নভেম্বর ফেডারেশনে এসেছিল। তাদের কথা শুনেছি। ঘটনা সেপ্টেম্বরের হলে এত দিন পরে এসেছে কেন? তবে এই খবর শুনে আমাদের কয়েকজনও হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিল তাকে। যাই হোক, মেয়েটি আগে সুস্থ হয়ে উঠুক। চিকিৎসার জন্য ফেডারেশন থেকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।’
তাহলে ফেডারেশনের কর্তারা মেয়েটিকে চিনতে পারলেও সোহাগ আলী পুরো সময় ফেডারেশনে কাটিয়ে চিনতে পারছেন না। তার বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন, ‘আমি কারো সঙ্গে এ রকম করিনি। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’ কিন্তু ভারোত্তোলন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কর্নেল নজরুল ইসলাম এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে, ‘আমি মেয়েটির ঘটনার কথা শুনেছি। হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। আমরা একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি সহসভাপতি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে, কমিটিতে শাহরিয়া সুলতানা সূচিসহ আরো একজন সদস্য থাকবেন। তারা পুরো ব্যাপারটা তদন্ত করবেন, এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয় আমরা তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবো। দেশের প্রচলিত আইনেও শাস্তি হতে পারে। আর তদন্তকালীন সময়ে সোহাগের চাকরি স্থগিত থাকবে।’

ভারোত্তোলকের পাশে আইনি সংস্থা

স্পোর্টস রিপোর্ট : গত ২৬ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে যৌন নিপীড়নে পাগলপ্রায় ভারোত্তোলকের খবর প্রকাশের পরই আর অভিযুক্ত নিপীড়ক সোহাগ আলীর খবর মিলছে না। এই অফিস সহকারীর খোঁজ মেলেনি ফেডারেশনে গিয়ে। তবে ভারোত্তোলকের পরিবার ফেডারেশনের কাছে প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে যৌন নির্যাতনের বিচার চেয়ে। ওই দুর্ভাগা নারী ভারোত্তোলকের পাশে দাঁড়াতে চায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (এএসকে)।
ওই পত্রিকায় গত ২৬ নভেম্বর এই রিপোর্ট প্রকাশের পরপরই ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয় নানামুখী প্রতিক্রিয়া। এমন অঘটনের খবরে সবাই কমবেশি বিস্মিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে মেয়েরা পদক জিতলেও দেশের এই ক্রীড়াঙ্গন তাদের জন্য কতটা নিরাপদ, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আবার অনেকের সন্দেহ, ফেডারেশনের কোনো কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে অফিস সহকারী এতটা দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে কি না। ২৩ বছর বয়সী সোহাগ আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কর্নেল নজরুল ইসলাম আগের দিন উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদকে তদন্ত কমিটির প্রধান করে একটি কমিটি গঠনের কথা বললেও কাল সেটা বদলে গেছে। ফেডারেশনের আরেক সহসভাপতি আতিকুজ্জামান চৌধুরীকে চেয়ারম্যান ও হাসান ইমামকে সদস্যসচিব করে নবগঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিতে আছেন মজিবুর রহমান। সদস্যসচিব হাসান ইমাম বলেছেন, ‘সাধারণ সম্পাদক সাহেব ফোনে আমাকে বলেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব করার কথা। আনুষ্ঠানিক চিঠিও পেয়েছি। আমরা চেষ্টা করব সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে শতভাগ প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার।’
নির্যাতিত ভারোত্তোলকের মায়ের বর্ণনা অনুযায়ী অঘটন ঘটেছে ১৩ সেপ্টেম্বর। প্রায় এক মাস পর ৯ অক্টোবর ১৭ বছর বয়সী ওই মেয়ে সব খুলে বলেন তার পরিবারের এক ঘনিষ্ঠজনের কাছে। এর পর থেকে তার মানসিক বিকার শুরু হয়, যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া বৃথা যাওয়ার পর ২৩ অক্টোবর নির্যাতিতাকে নিয়ে আসা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে। শেরেবাংলা নগরের সেই হাসপাতালে এক মাস চিকিৎসায় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো তার আচার-আচরণ স্বাভাবিক নয়। ঘটনার পর তিন মাসের বেশি সময় কেটে গেলেও মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তায় তার দরিদ্র পরিবার আইনের দ্বারস্থ হয়নি। এত দিন মৌখিকভাবে ফেডারেশনকে জানানোর পর গত ২৬ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে ‘যৌন নির্যাতনের বিচার চেয়ে’। এ দিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র আগ্রহ প্রকাশ করেছে নির্যাতিতকে আইনি সহায়তা দিতে। অ্যাডভোকেট নিনা গোস্বামী বলেছেন, ‘আমরা আগ্রহী। গত ২৭ নভেম্বর আমাদের লোকজনও যাবে হাসপাতালে। ভারোত্তোলকের পরিবারের তরফ থেকেও সুবিচার চাওয়ার আগ্রহ থাকতে হবে।’

বিচার চান মা

স্পোর্টস রিপোর্ট : নির্যাতিত ভারোত্তোলকের মায়ের হয়েছে যত জ্বালা। কারণ মেয়েটি তার আগের ঘরের। মেয়ের দুই বছর বয়সে তার সংসার ভাঙে। সেই স্বামীও আরেকটি বিয়ে করেছে। “আমার এই মেয়েটি অসহায়, এতিমের মতো। এই খেলাটা খেলে সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। সেটা আর হয়নি। এই খেলাই তার জীবন শেষ করে দিয়েছে। পাগলামি চরমে উঠলে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘এই জিমে আর যামু না’”বলতে বলতেই মায়ের চোখ গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।
তিন বছর আগে দুর্ভাগা মেয়েটিকে ভারোত্তোলনে নিয়ে আসেন তার মামা। তিনি চেয়েছিলেন ভাগ্নিকে ভালোভাবে বাঁচার একটা অবলম্বন দিতে। ভালো করতে গিয়ে ভাগ্নির জীবনটাকে পৌঁছে দিয়েছেন সর্বনাশের দোরগোড়ায়। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে মেয়েটি এখন শেরেবাংলা নগরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। ৯ অক্টোবর রাতে সেই নিপীড়নের কথা খুলে বলার পর থেকেই মেয়েটির মানসিক বিকার শুরু হয়। সংগ্রাম শুরু হয় মায়ের, তিনি নিজের ভাষাতেই বলে যান, ‘১০ তারিখে বাজার থিকা আইসা দেখি হাজার হাজার মানুষ আমার ঘরের দরজার সামনে। আমি তো ভয় পাইয়া গেলাম। ঘরের পেছনে গিয়া দেখি অনেক মহিলা। দেখলাম আমার মেয়ে উলঙ্গ হইয়া ঘরের পাশের ডোবায় ঝাঁপ দিসে। তখন সবাই দেইখা চিল্লাচিল্লি করতেসে। কেউ বাঁচাইতে পারতেসে না। যারাই বাঁচাইতে গেসে, তারেই উল্টা টাইনা নিয়া যাইতেসে। আমি যখন বাঁচাইতে গেসি, তখন ও আমারেও টাইনা নিয়া যাইতাসে। তারপর অন্যদের সহায়তায় কোনোক্রমে রুমে নিয়া আইসা গোসল করাইসি। এরপর আবারও দুপুরে এমন পাগলামি শুরু করসে।’ এর পরই তারা কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ওঝা-কবিরাজের শরণ নেয়, কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি ১৫ দিনে।
এরপর তার আশ্রয় হয় শেরেবাংলা নগরের মানসিক হাসপাতালে। এখনো সুস্থ হননি, লড়ছেন নিজের সঙ্গে। ভারসাম্যহীনের ভারোত্তোলনের লড়াই শেষ। শুধু মনে পড়ছে নাকি সেই ১৩ সেপ্টেম্বরের কথা। ‘উন্নতি ও মালেক আমারে সোহাগের কাছে নিয়া গেছে লিফটে করে (এনএসসি ভবনের ১৬ তলায়)। ওরা বিস্কুট ও জুস খাওয়াইয়া আমার মাথা ঘুরাই দিসে। মাঝে মধ্যে চিল্লাইয়া এই কথাই কয় আমার মাইয়া। আমি দোষীদের শাস্তি চাই।’ বলেন ওই অভাগী মা। ভারোত্তোলনের দেওয়া এই দুঃস্বপ্ন হয়তো এই সপ্তদশীর সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে গেল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here