খালেদার কারাবাসে সংকটে আ’লীগ

5

আবদুর রহিম : কারাগারে খালেদা জিয়া। উভয় সংকটে আওয়ামী লীগ। জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসছে। ঠিক এ মুহূর্তে দ-িত হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় ক্ষমতাসীনদের জন্য ভয়াল আকাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তি পেলেও চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হবে, অন্যদিকে কারাগারে থাকলেও আওয়ামী লীগের শক্তিতে আঘাত হানবে। ঐক্যফ্রন্টের একাধিক নেতা ও দুজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের বিশ্লেষণে এ বিষয়টি উঠে আসে।
তাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার সমর্থনে রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তে পড়েছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় জনগণের সহানুভূতি ও আন্তর্জাতিক শক্তির দারস্থ হতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি দেশের জন্য কঠিন হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় আওয়ামীবিরোধী শক্তিগুলো এখন ঐক্যফ্রন্টের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন। যারা আওয়ামী লীগে থেকে তুষ্ট হতে পারেননি, তারাও ড. কামালের ঐক্যফ্রন্টে আসছেন। কেউ আসছেন ক্ষোভে, আবার কেউবা আসছেন সবুজ ইশারায়। এর মাধ্যমে দিনদিন ঐক্যফ্রন্টের শক্তির মাঠ আরও বিস্তার হচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের বিরোধী জোট আরও শক্তিধর হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে এই ঐক্যফ্রন্টকে মোকাবিলা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া বিএনপি এবার একক শক্তি নয়, ঐক্যফ্রন্টের যৌথশক্তি নিয়েই ভোটের মাঠে নেমেছে। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও ভোটের প্রচারণার সঙ্গে সঙ্গে ব্যালট বক্স রক্ষায় দলের নেতাকর্মী ও তৃণমূলকে তৈরি করে ফেলতে পারবে বিএনপি। শেষ মুহূর্তে হয়তো প্রশাসনও ক্ষমতাসীনদের অনুকূলে থাকবে না। অন্যদিকে এ মুহূর্তে যদি খালেদা জিয়া মুক্তি পায়, তাহলেও আওয়ামী লীগের জন্য বিপদ! ঐক্যর ঘরে বড় একটা আঘাত এলেও পরিবেশ ও শক্তি বিএনপির কোর্টে চলে যাবে। পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। কারণ খালেদা জিয়া বের হয়েই ঢাকা থেকে কক্সবাজার, সেখান থেকে যদি দিনাজপুর অর্থাৎ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া লংমার্চ করেন, তাহলে লাখ লাখ নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে যাবে। যারা রাজনীতিতে সক্রিয় নয়, শেষ মুহূর্তে তারাও রাস্তায় চলে আসতে পারেন। কেউ নেমে পড়বে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে, আবার কিউবা সহানুভূতি দেখাতে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যদি ঘোষণা দেন- যারা রাস্তায় নেমেছেন, তাদের আরও দু-একদিন এভাবেই মাঠে থাকতে হবে। ব্যালট বাক্স পাহারা দেবেন। ভোট গণনা শেষে বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরবেন, তাহলে রাস্তায় নেমে পড়া লাখ লাখ লোকের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগ এবং প্রশাসন কারো হাতেই থাকবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সংসদ রেখে ক্ষমতাসীনদের নির্বাচন করা, দেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাওয়া আওয়ামী লীগের জন্য এখন অগ্নিপরীক্ষা। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে আওয়ামী লীগের জন্য শ্যাম রক্ষা করা আর কূল রক্ষা করা দুটোই অগ্নিরূপে দাঁড়িয়েছে। এদিকে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততোই বাতাসে ভাসছে নানা গুঞ্জন। নির্বাচনের অনিশ্চয়তা, খালেদা জিয়ার মুক্তি, ঐক্যর গতিপথ কোন দিকে?
এ প্রশ্নগুলোর মিশ্র উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনের ১০-১২ দিন আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তির গুঞ্জন এখন ঐক্যফ্রন্টে। এ নিয়ে আতঙ্কে মাহমুদুর রহমান মান্না ও আসম আবদুর রবরা। তাদের ধারণা খালেদা জিয়ার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে যাবে। বিএনপির কেউ আর খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে ড. কামালকে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা হিসেবে মানবে না। ঐক্যকে ভাঙার জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গই এখন ঐক্যফ্রন্টে আলোচনার হুমকি অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খালেদার মুক্তিতে ঐক্য ভাঙতে সরকারের চূড়ান্ত ফাঁদ হতে পারে বলেও ধারণা ঐক্যর ঘরে। তবে এরই মধ্যে ঐক্যের মিছিল থেকে শেখ হাসিনার দিকেও একটি অংশ চলে যেতে পারে বলে গুঞ্জন উঠেছে। শেষ সময়ে যেসব ঐক্যর নেতারা অতৃপ্ত থাকবে, তারা সরকারের সংসারে গেলে মন ভরবে বলেও ধারণা একটি অংশের। বিএনপির চূড়ান্ত আসনের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই ঐক্যফ্রন্টের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে আলাপ হয়। ওই নেতার ভাষ্য, খালেদা মুক্তি পেলে বিএনপি চাঙ্গা হলেও ঐক্য না থাকলে ক্ষতিটা বিএনপিরই হবে। নির্বাচনের পরিবেশ অন্যদিকে মোড় নেবে। বিএনপি এখন যে অবস্থানে রয়েছে, সব নেতারা কথা বলছেন, কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না, গুলশান এবং পল্টন কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ভিড় বিএনপির, এ পরিবেশের পেছনে ঐক্যফ্রন্টের অবদান রয়েছে। যদিও শেষ মুহূর্তে এসে আসন লাভে ঐক্যের মন ভরছে না। তবুও ঐক্য টিকিয়ে রেখে বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠে রাখতে চাচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের বড় একটি অংশ।
ঐক্যফ্রন্টের দুই নেতার অসমর্থিত ভাষ্য, বিএনপি এখনো বক্রচিন্তায়। শেষ মুহূর্তে এসেও যদি খালেদা জিয়ার মুক্তি না মেলে, তাহলে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন বয়কট করবে। তবে নির্বাচনে থাকতে অনড় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি যখনই আন্দোলন চায়, তখনই ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বিএনপির কাছে আন্দোলনের রূপরেখা চায়। তখন বিএনপি রূপরেখা দিতে পারে না।
ঐক্যফ্রন্টের এক নেতার মতে, আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বিএনপি আন্দোলন চায়, কিন্তু আন্দোলন কিভাবে করবে তা জানে না! যদিও ঐক্যফ্রন্ট থেকে এখনো একটি আন্দোলনের ছক আছে, তা হলো ৫ থেকে ১০ লাখ লোক নিয়ে ঢাকাতে বৃহৎ অবস্থান কর্মসূচি এবং একই সঙ্গে এই কর্মসূচি ঢাকার সঙ্গে বিভাগ-জেলাতেও থাকবে।
বিএনপির নির্বাচনে আগ্রহ নেই কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আগ্রহী এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি আন্দোলনমুখী দল। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশের শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। বিএনপি এবার নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও আন্দোলনের অংশ হিসেবে। বিএনপি নির্বাচন চায় না বিষয়টি এভাবে বলা ঠিক নয়, খালেদা জিয়াকে কারগারে রেখে বিএনপি নির্বাচন করতে ইচ্ছুক নয়, বিষয় হলো এটা। আর ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন চাইবে এটা স্বাভাবিক বিষয়। বিএনপির মাধ্যমে তারা বড় একটা আসন পাওয়ার সুযোগ হয়েছে। যেটা ঐক্য না হলে কখনোই সম্ভব নয়।
বর্তমানে ঐক্যফ্রন্টের অবস্থায় কার্যত দৃষ্টি এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দেখা যাক না ড. কামাল সাহেবরা কতদূর যেতে পারেন, আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না। আমাদের সিনিয়র লিডার যারা, তারাই এ বিষয়ে কথা বলবেন।’
খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি তো আর আদালতে হচ্ছে না, তা হচ্ছে হাসিনার আদালতে। হাসিনা যখন ইচ্ছে করবে তখনই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আটকে রাখা হয়েছে। তাকে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। তবে তার বিশ্বাস খালেদা জিয়ার মুক্তি আইনিভাবেই সম্ভব হয়ে যাবে। রাজনৈতিক পদক্ষেপ পর্যন্ত হয়তো যাওয়া লাগবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here