নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি কি?

45

মঈনুদ্দীন নাসের

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম যেদিন দায়িত্ব পেলেন, সেদিন মনে মনে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। বয়সে পক্ব মনে হলেও এখন কিন্তু তাকে মনে হচ্ছে প্রাক্বতার সীমারেখা ছুঁতে তার অনেক বাকি রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা তাদের লক্ষ্য, আর শতভাগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বিশ্বের কোনো দেশে হয় না।’ অর্থাৎ পার্শ্ববর্তী ভারত, ইউরোপের পশ্চিমা গণতন্ত্র কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কোথায়ও কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। এ জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই গণতান্ত্রিক নির্বাচন তার মতে। তবে কথাটা বলার আগে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠী কি। তা নির্ণয় করলে কি ভালো হতো না? আমার সরাসরি প্রশ্ন নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠী কি? যেখানে গণতন্ত্র বিদ্যমান সেখানে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আইনের শাসনদাতা নির্ণিত। আইনের শাসন যেখানে রয়েছে সেখানে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠে না।
নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম তার উক্তির মাধ্যমে প্রথমেই স্বীকার করে নিলেন যে, বাংলাদেশে আইনের শাসন নেই। কাজেই এক ‘গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচনই গণতান্ত্রিক নির্বাচন আর তা আপনাকে মেনে নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সবকিছু করবেন। কিন্তু বিষয়টা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার মতো নয় কি? অর্থাৎ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই তা গ্রহণযোগ্য। আর এখন বলা হচ্ছে সুষ্ঠু আর না হোক তা গ্রহণযোগ্য করে তোলা হবে। কবিতা খানমের তত্ত্ব শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু তিনি আসল কথাটা এমনভাবে বলেছেন যেন নিজেকে অনেক চতুরতার সাথে প্রকাশ করেছেন। যেন বলে দিয়েছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, তবে নির্বাচন কমিশন যদি বলে দেয় ঠিক আছে সব কিছু তাহলেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়ে গেল। চমৎকার কবিতা খানম। কিন্তু আপনার সচতুর উক্তিটা আপনার অবয়বের সাথে মানায় না। কারণ এ যেন মনে হয় মা নয় ‘সৎ মা’র নির্বাচন বা ‘সৎ মা’র গণতন্ত্র। মনে হয় ফুটো গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা। মনে হয় আপনার আত্মপ্রবর্তনার গ্রহণযোগ্যতা। মনে হয় নির্বাচন নয়, মাত্র ভোটের দিন তারিখ পার করানো।
কবিতা খানম একদিকে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নিজের তত্ত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের সচিব (যিনি মুখ্যত নির্বাচনের ফল প্রকাশ করবেন না নিয়ন্ত্রণ করবেন বোঝা মুষ্কিল) বলেছেন, নির্বাচনের পরিদর্শনের জন পরিদর্শকদের অনুমতি দেয়া হবে। কিন্তু তারা কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না। তারা ‘বিবিসি’র বন্ধু কামাল আহমদের ভাষায় একজন মূর্তি চায়।’ অর্থাৎ চুরি করবে। ডাকাতি করবে, তাও আবার ভোট ডাকাতি, অস্ত্রবাজি, দাঙ্গাবাজি, ষ-াবাজি, ক্ষমতাবাজি মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদেরের বেহিসাবি উক্তি বিরোধী নেতাদের সম্পর্কে সবকিছু চলবে কিন্তু নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মানতে হবে আর তাই অগ্রীম বলে ছিলেন কবিতা খানম। বড় বেশি সময়েই বলেছেন। এ কথা আগে বললে ভুল হতো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ‘বানাতে’। নির্বাচন কমিশনের কাজ যেন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ‘বানানো’। যদি পরিদর্শকদের নির্বাচনের মাপকাঠি না হয়, গ্রহণযোগ্যতার মাফকাঠি বা ইয়ার্ডস্টিক না হয় তাহলে কিভাবে মাপকাঠি ‘বানানো’ যায় বা কাকে মাপকাঠির নিয়ামক করা যায় তা কি কবিতা খানমের জানা আছে? জনগণের তো আছেই। গায়ের জোরে, ‘মুখের জোরে, অস্ত্রের জোরে, ‘জোরে জোরে’ ‘ভণ্ড’ নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য’ বানানোর কাজটা নির্বাচন কমিশন করবেন। দেশি-বিদেশি পরিদর্শকরা যদি জাল ভোট নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারেন, যদি নির্বাচন ‘বুঝে’ বেপরোয়াশীল মায়ার বিষয়কে ধরতে না পারেন, যদি সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পরিদর্শকদেরও সমানে পিঠায় বা সরকারি দলের হেলমেটধারী কিংবা ডা-াবাজরা তাদের নিগৃহীত করে তাহলেও কি পরিদর্শকরা কোন প্রশ্ন করতে পারবেন না? তাহলেও কি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বলে পরিদর্শকদের সাধুবাদ দিতে হবে নির্বাচন কমিশনের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে। হিন্দি গানের কলি: ‘মেরা লবজ তেরা লবজ এক হো গোয়া’। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ও সরকারি লবজ এক হলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, কবিতা খানম সেই লবজের কথা স্মরণ করে দিয়েছেন। নির্বাচনের শুরুতেই নির্বাচন কমিশন খেল দেখিয়েছেন। ঢাকা থেকে এক বন্ধু টেলিফোনে জানালেন, নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকে, বিএনপি’র নির্বাচনে যোগ দেয়ার ঘোষণার আগ পর্যন্ত ঢাকা শহরে সরকারি দলের নির্বাচনের আবেদন জমা দেয়ার জন্য ঢোল, বাধ্য-বাজনায় সুর চলছিল হরদমে। টেলিভিশনে দেখেছি, হুণ্ডা, ডাণ্ডা ও গুণ্ডার মহড়া। আর ঢাকা থেকে শুনেছি মধ্যরাত পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় ঢোলের বাজনায় মানুষের সুখে আকাল ছিল। কিন্তু যেই ঐক্য প্রক্রিয়ার নির্বাচনের যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো তখনই ঢোলের বাজনা বন্ধ হয়ে গেল নিশ্চল-নিশ্চুপ। কিন্তু যেদিন বিএনপি অফিসে মহড়া শুরু হলো তখন নির্বাচন কমিশন সেই ছক পিটালো। হেলমেট বাহিনীকে গয়েশ্বর রায়ের পুত্রবধূ ‘লগি’ হাতে নিয়েও ঠেকাতে পারেনি। তারা ভাঙচুর করলো, গাড়ি ভাঙলো, আর ধরা পড়লো নিপুন রায় (গয়শ্বরের পুত্রবধূ) নির্বাচন কমিশনের লবজ ও সরকারি লবজ মিলে গেলো। নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা নির্বিকারভাবে কাম সারলো। আর এইতো চাই লবজের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি। লবজতে লবজ মিলে দু’লবজ এক হয়ে যায়। আর এক হয়ে গেলে যেন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য।
কিন্তু প্রশ্ন এক না হলে কি হবে? যেমন ধরুন শত বাজনা বাজিয়েও মানুষের সায় পাওয়া গেল না। জীবন দিয়ে কারচুপি রুখল, ভোটের কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোট গণনা হলো, ফলাফল ‘বিপথে’ গেল আর ‘লবজে লবজ’ মিলল না। দুই লবজ এক হলো না। ‘ঘির গ্যায়া লবজের মিল।’ তাহলে গ্রহণযোগ্যতার কি হবে। নির্বাচন কমিশনের কি হবে। কুর্নীশ ফিসসা যদি বরবাদ হয়ে যায় তাহলে? তাহলে কিছুই না। বিষয়টা যেন অবান্তর।
কবিতা খানমের কাছে তাই প্রশ্ন রুখতে চাই।
(ক) নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি স্থির করেছেন কি?
(খ) কয়টি মহলকে তা পরিমাপ করতে হবে?
(গ) সরকারি দল যদি জিতে যায় আপনার বিচারে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে, তাহলে নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি কি হবে?
(ঘ) অন্যদিকে বিরোধী দল যদি জিতে যায় (বা হলে লবজে লবজ মিলবে কিনা সন্দেহ) তাহলে পরবর্তীতে কি হবে?
(ঙ) বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবশিষ্ট কিছুই নেই। যেমন আইনের শাসন নেই, মহিলার নিরাপত্তা নেই, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নেই, অঙ্গ প্রতিবন্ধীদের নিরাপত্তা নেই। মা’র কোলে ছেলেকে বসিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হলে নিয়ে যেতে হয়। সেখানে কোন কৌনিক সরণ পরিমাপের ১৮০ ডিগ্রির কম্পাস ব্যবহার হবে। গ্রহণযোগ্যতা তার কোন ফলক সেখানে থাকবে?
কবিতা খানম, আসলে বড়ই দুর্ভাগ্য বাংলাদেশ, মানুষকে ভুলানোর ছেলেবেলার ছড়া আজও যেন জাতিকে ভুলিয়ে রাখে। কবিতা খানমের কথাটা ছেলে ভুলানোর ছড়ার মতোই শোনায়। আশা করি তার ব্যতিক্রম হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here