পথ ও প্রবাসের গল্প: টেলিফোন

5

আবু রায়হান

প্রশ্ন শুনে নাসের সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ‘শ্বশুরের সাথে এখনও কথা বলতে পারিনি। সেই চিন্তায় মাথা ঠিকভাবে কাজ করছে না। খুব টেন্শনে আছি।’
‘এখনও লাইন পান নাই, বলেন কি! আপনি না কাল রাত থেকে চেষ্টা করছেন?’
‘জ্বি! অনেকে অনেক ধরনের পরামর্শ দিল, সবভাবে চেষ্টা করে দেখলাম-কিছুতেই বাংলাদেশে লাইন যায় না। আমেরিকার টেলিফোন ব্যবস্থা এত খারাপ কেনো?’
‘অভ্যন্তরিণ লাইন এত খারাপ নারে, ভাই। আগে আন্তর্জাতিক লাইনও ভালো ছিল। আপনার মত দেশে বউ রেখে বিদেশ আসা লোকদের কারণে লাইনের উপর চাপ বাড়ছে। এই শ্রেণীর প্রবাসীরা সুযোগ পেলেই বউকে ফোন করে। ফলে আজকাল দেশে লাইন পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি দুপুরে একবার চেষ্টা করে দেখেন। ভালো কথা, আপনার শ্বশুর তো আরও খেপে যাবে। কি করবেন, নাসির ভাই?’
নাসেরের কিছু করার নাই। সে সাধ্যমত চেষ্টা করছে। আসলে প্রেম করে বিয়ে করাই বিরাট ভুল হয়েছে। সে বেশি আগ্রহ দেখাতেই শ্বশুর পক্ষের লোকজনের তেল ঝরে ঝরে পড়ছে। এর চেয়ে যদি গার্জিয়ানরা দেখে শুনে পাত্রী ঠিক করতেন, তাহলে দান-দখিনাও কমবেশি পাওয়া যেতো, আর শ্বশুর মহাশয়ও তাকে ঠিকই তোয়াজ করতেন। এর নাম কন্যাদায়…। তার ভুলের কারণেই পাশার দান উল্টে গেছে। এখন তাকেই উল্টো শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে তোয়াজ করে চলতে হয়। আমেরিকার মত দেশে এসেও সারারাত টেলিফোন সামনে নিয়ে বসে থাকতে হয়। শালার ফাটা কপাল আর কাকে বলে!
বিয়ের পর তার আমেরিকা আসার তোড়জোড় চলছে, এটাও তাদের পছন্দ ছিলনা।
‘কি হবে এত দূরের দেশে গিয়ে ? বাংলাদেশে কি মানুষ বেঁচে থাকে না! তাকে বলো এসব আমাদের পছন্দ নয়।’
শাপলা অবশ্য মুখ ফুটে কিছু বলে না। ভেতরের সব খবর তার জানা। সে জানে, বহুদিন থেকে বইপত্রের সাথে নাসেরের সম্পর্ক নেই। আমেরিকা যাবে বলে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এখন বাধা দিয়ে লাভ নেই। বাধা সে দেবেই বা কেন? বরং এ ব্যাপারে তার নিজেরও সম্মতি আছে। তবে মাঝে মাঝে গুরুজনদের গোপন চিন্তা-ভাবনার কথা নাসেরের কাছে ফাঁস করে দেয়।
‘ওরা ভাবছে, তুমি আমেরিকা গিয়ে আমাকে ভুলে যাবে।’
‘তুমি কি ভাবছ?’
‘আমি কিছু ভাবছি না। আমি পড়ছি।’
‘তুমি পড়াশুনা করছ সে তো জানি। নতুন করে আবার কি পড়ছ?’
‘অনার্সে আমার পড়াশুনার সাবজেক্ট আছে আটটা। তুমি হচ্ছো আমার নবম সাবজেক্ট। পাঠ্যপুস্তকের মত আমি তোমাকেও পড়ছি, বোঝার চেষ্টা করছি।’
‘এখনো চিনতে পারোনি?’
‘একজন মানুষকে কি এত তাড়াতাড়ি চেনা যায়? কখনো সারা জীবনেও চেনাজানা সম্পূর্ণ হয় না। তোমার সাথে আমার জীবনের সবেমাত্র শুরু।’
‘তুমি বোটানি নিয়ে না পড়ে দর্শন পড়লে খুব ভালো করতে।’
শাপলা এতক্ষণ পর হাসতে শুরু করে। মন খুলে হাসলে তার উপরের মাড়ির উঁচু হয়ে থাকা একটা দাত বেরিয়ে পড়ে। এই হাসি দেখতে নাসেরের খুব ভালো লাগে। সে মুগ্ধ চোখে সদ্য বিবাহিতা জীবন সঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমেরিকা আসার পর গত দু মাসে শাপলার সাথে কথা হয়নি। সে অবশ্য একটা চিঠি লিখেছে। নীলফামারী সরকারী ডিগ্রী কলেজের ঠিকানায়। সেই চিঠি শাপলা পেয়েছে কিনা জানার উপায় নেই। পোস্ট অফিসের অনেক পিয়ন পান-সিগারেটের বিনিময়ে একজনের চিঠি আরেকজনের হাতে তুলে দেয়। পাড়া-মহল্লায় এক শ্রেণীর যুবক আছে, মেয়েদের কাছে আসা চিঠির প্রতি তাদের রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। তারা নানা প্রলোভন দেখিয়ে পিয়নকে পটিয়ে ফেলে। তার পেছনে আঠার মত লেগে থাকে। অথবা, শাপলার কোনো বান্ধবী চিঠি রিসিভ করে হারিয়ে ফেলেনি তো?
আসার সময় শাপলা তার কলেজের ফোন নাম্বার দিয়েছে। সেই ফোনে কল করতে মিনিটে দু ডলার লাগে। সে এর মধ্যে দু বার চেষ্টা করেছে। চার পাঁচ বার রিং হবার পর এন্গেজ টোন আসে। কেউ ফোন ধরেনি, কারো সাথে কথা বলা হয়নি, কিন্তু ফোনের বিল ঠিকই চলে এসেছে। নাসের আর কল করতে সাহসী হয়নি। মোটামুটি বেকার একজন মানুষের এতো বিলাসিতা করা পোষাবে না।
তাই চারদিন আগে ঘরে ঢুকে যখন শোনে তার নামে দেশ থেকে চিঠি এসেছে, তার সারা অস্তিত্ব চমকে উঠে। নিশ্চয়ই শাপলার চিঠি! সে জুতো খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু চিঠি হাতে নিয়ে কিছুটা দমে যায়। শাপলা নয়, চিঠি লিখেছেন শ্বশুর মহাশয় স্বয়ং। খামের উপরে শ্বশুরের নাম দেখে একটা অদ্ভুত অভিমান এসে ভরে করে। তার তো ত্রিকূলে স্বজন বলতে কেউ নেই, চিঠি লিখবে কে? জন্মের পর থেকে সে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে একা, ছন্নছাড়া। কেউ বলার নেই, বাধা দেবার কেউ নেই। যা খুশী কর, যেদিকে চোখ যায়, চলো। তার এই স্বভাবের কারণে শ্বশুর সাহেব বিয়েতে রাজি হতে চাননি। তিনি লোকজনের কাছে বলতেন, ‘আবু নাসের হচ্ছে আল্লাহ্র ষাঁড়। যখন খুশী ইচ্ছেমতো বেড়া ভেঙ্গে অন্য মানুষের জমিতে ঢুকে পড়ে। গাছগাছালি ভেঙ্গে নষ্ট করে। ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেলে।’
শ্বশুরের কথা ভাবতে গিয়ে নাসেরের মনে পড়ে, যতটুকু স্বাধীনতা এ জীবনে পেয়েছে, অত বেশি সে চায়নি। মানুষকে অত স্বাধীন করে সৃষ্টি করা হয়নি। শিকড়ের সাথে সে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়ে থাকে। ঘুরে ফিরে শিকড়ের কাছে ফিরে যেতে চায়। তার হাতে ধরা চিঠিই এর প্রমাণ। এই মুহূর্তে তার নিজেকে অত বেশি একাকী লাগছে না। কেউ একজন অন্তত পেছন থেকে সূতা ধরে টানছে।
‘আমরা স্বাধীনতা পেয়ে গেলে পরাধীন হতে ভালবাসি।’ কোন্ কবিতার লাইন এটা! কবির নাম কি? সে মানব স্বভাবের বিপরীতমুখী দ্বন্দ্বের কথা ভাবতে ভাবতে চিঠিতে মনোযোগ দেয়।
‘স্নেহের বাবা আবু নাসের, দোয়া নিও। তুমি আমেরিকা চলিয়া যাইবার পর প্রায় দুই মাস পার হইয়া গেল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সংবাদাদি পাইলাম না। শাপলাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, সে-ও তোমার খবর জানে না। বড়ই চিন্তিত আছি। পত্র পাইবা মাত্র বিলম্ব না করিয়া অতি সত্বর যোগাযোগ করিও।
আমি আল¬াহ্ পাকের দোয়ায় আগামী মাসের মাঝামাঝি ঢাকা শহরে বেড়াইতে যাইব। সেখানে এক আত্মীয়ের বাসায় দুইদিন থাকিব। তাহাদের বাসায় ফোন আছে। নম্বর ৮১৩…। তুমি আগামী মাসের ১৭ অথবা ১৮ তারিখে উক্ত নম্বরে অতি অবশ্যই ফোন করিবে।’
গতকাল ছিল ১৭ তারিখ। শ্বশুরের বেধে দেয়া নির্দিষ্ট দু দিনের প্রথম দিন। রুমমেটদের পরামর্শে নাসের রাত দশটার দিকে টেলিফোন সামনে নিয়ে বসে। প্রথমে শূন্য, তারপর আমেরিকার কান্ট্রি কোড, বাংলাদেশের কোড, ঢাকা শহরের কোড, সবশেষে বাসার ফোন নাম্বার। সুত্র অনুযায়ী নাম্বার টিপে সে দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করে। কে প্রথম ফোন ধরবে, পুরুষ না রমণী? তাকে ভদ্রভাবে সালাম দিতে হবে।
‘হ্যালো! আমি আমেরিকা থেকে আবু নাসের বলছি। আমার শ্বশুর রশিদুল ইসলামের এই বাসার থাকার কথা। আমি কি তার সাথে কথা বলতে পারি?’
শ্বশুর সাহেবের সাথে কিভাবে কথা শুরু করা যায়? তার সাথে মোহরের কখনো সামনা সামনি কথাবার্তা হয়নি। তারা দুজন দূর থেকেই একে অপরকে চেনে। বিয়ের রাতে কনে সম্প্রদানের ক্ষণে সে ক্ষণিকের জন্য শ্বশুরের দিকে তাকিয়েছিল। তার মুখ দেখে মনে হয়েছে তিনি খুব অনিচ্ছার সাথে নিজ কন্যাকে সম্প্রদান করছেন। সে তড়িঘড়ি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আমেরিকা আসার আগে ভয়ে আর কখনো মুখোমুখি হয়নি।
সম্পর্কের এই আড়ষ্টতার মধ্যে কিভাবে কথা শুরু করা যায়? প্রথমে অবশ্যই সালাম দেবে। তারপর কি? আব্বা আপনি কেমন আছেন ? নাকি, আব্বা আপনার শরীর কেমন? দুটো বাক্যের মধ্যে কোনটা বেশি আন্তরিক? তার আন্তরিকতায় কমতি থাকলে চলবে না। সে দীর্ঘ কথোপকথনের জন্য বসে বসে কথার মালা সাজাতে থাকে। কিন্তু ফোন থেকে কোনো সাড়া শব্দ আসছে না কেন? তবে কি নাম্বার ডায়াল করতে ভুল হয়েছে? সে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আবার ডায়াল করে। এবার খুব সাবধানে, প্রতিটি সংখ্যার প্রতি আলাদা গুরুত্ব দিয়ে। তারপর আবার মনে মনে কথার রিহার্সেল শুরু করে। সে যখন শ্বশুর মহাশয়ের সাথে প্রায় এক হাজার রাত্রি কথোপকথন চালিয়ে যাবার মত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে, তখন টেলিফোন থেকে বার্তা ভেসে আসে, ‘অত্যন্ত হাই কল ভল্যুমের কারণে এই মুহূর্তে তোমার নাম্বারে সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। তুমি দয়া করে পরে চেষ্টা করো।’
কতক্ষণ পরে ফোন করলে সংযোগ পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা না থাকায় নাসের লাইন কেটে দিয়ে আবার ডায়াল করে। আবার প্রথম কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর সেই ম্যাসেজ বাজে। আবার ডায়াল, আবার মেসেজ। আবার মেসেজ, আবার ডায়াল। এভাবে অনেকক্ষণ চলার পর এটিএন্ডটি টেলিফোন কোম্পানির বার্তা বিভাগ নাসেরের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে মেসেজ বাজানো বন্ধ করে। তারপর অখন্ড নীরবতা…।
টেলিফোন সামনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের আবিষ্কৃত যন্ত্র বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, বোঝার উপায় নেই। কারা এতো রাত জেগে দেশে ফোন করে। তাদের কথা শেষ হয় না? অন্তত একজন কথা বলা বন্ধ করলেও তার লাইনটা দেশে ঢোকার সুযোগ পায়।
‘শোনেন প্রবাসী ভাইয়েরা, এটা একটা ইমার্জেন্সী অবস্থা। আমার শ্বশুর মহাশয়ের সাথে কথা বলতে না পারলে ঝামেলা হবে। তিনি খুব অসন্তুষ্টি নিয়ে কন্যা সম্প্রদান করেছেন। অসন্তুষ্টি আরো বাড়লে সেই দান তিনি ফিরিয়ে নিতে পারেন। তখন আমি বড় বিপদে পড়ে যাবো। পৃথিবীতে আপন বলতে আমার খুব বেশী মানুষ নেই। প্রবাসী ভাইয়েরা, আপনাদের কাছে আমার আকুল আবেদন…।
বোধ হয়, তার আবেদনে সাড়া দিয়েই ফোন থেকে খরখর শব্দ ভেসে আসে। সে উত্তেজনায় শিড়দাঁড়া সোজা করে বসে। গলা খাকাড়ি দিয়ে জমে থাকা শে¬ষ্মা পরিষ্কার করে। হয়তো এবারে কথা বলার সুযোগ হবে। কিন্তু খরখর শব্দ থামার লক্ষণ নেই। এক সময় সেই আওয়াজ বদলে গিয়ে পিপিপি… করে বাজতে থাকে। এই শব্দে কানে তালা ধরার আগেই সে লাইন কেটে দিয়ে আবার ডায়াল করে। এবারে ফোনের ভেতর ঘূর্ণিঝড়ের শো শো আওয়াজ শুরু হয়। এইসব বিচিত্র আওয়াজ শুনতে শুনতে ভোররাতে সে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুম থেকে উঠে আবার ফোন নিয়ে বসে পড়ে। শ্বশুরের বেঁধে দেয়া সময় শেষ হতে অল্পকিছু বাকী আছে। এখন কথা বলতে পারলেও মান ইজ্জত রক্ষা পাবে। কিন্তু টেলিফোন লাইনের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সেখানে এখনো বিচিত্র শব্দমালার আনাগোনার বিরাম নেই। সে যখন খুব মনোযোগ দিয়ে জলতরঙ্গ টাইপের একটা মিষ্টি শব্দ শুনছিল, তখন কিচেনে রুটি পোড়া গিয়ে ফায়ার এ্যালার্ম বাজতে শুরু করে। ঘর থেকে ধোয়ার গন্ধ দূর হয়ে গেলে সে আবার ফোন নিয়ে বসে। রুমমেটদের কাছে শেখা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে নাম্বার ডায়াল করে। কিন্তু কিছুতেই দেশের লাইন পাওয়া যায় না।
‘শাপলা,
সতের এবং আঠারো তারিখ সারাদিন, সারারাত আব্বার দেয়া নাম্বারে ফোন করতে চেষ্টা করেছি। কিছুতেই লাইন পাওয়া গেল না। আব্বা কি মনে করবেন, বলতো? জামাই হিসেবে আমার র্যাংকিং বোধ হয় আরো ডাউন হয়ে গেলো। ভালো কথা, তোমার আব্বার জামাইদের মধ্যে আমার ক্রমিক নম্বর কত, জানিও। নিউইয়র্কের টেলিফোনের হাল চাল দেখে মনে হচ্ছে চিঠি-পত্রকেই যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে নিতে হবে। তুমি এখনো লিখছো না কেন?’
তার লেখার মাঝখানে রুমমেট তুহীন এসে পিছনে দাঁড়ায়।
‘কোনো কাজ না থাকলে চলেন ম্যান্হাটন থেকে ঘুরে আসি।’
‘কি কাজ ম্যানহাটনে?’
‘গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনে যাবো। ওখানে স্প্যানিশরা কম পয়সায় দেশে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়। ওদের কারো দেখা পেলে বউয়ের সাথে কথা বলবো।’
‘কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি একা যান।’
‘চলেন না ভাই, প্লিজ! আপনি তো এখনো গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশন দেখেন নি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেল স্টেশন। মাটির নিচে এলাহি কারবার। তাছাড়া ওখানে গিয়ে ফোন করার হাল চাল বুঝে আসেন। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।’
সেই স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে নাসের রুমমেটের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। কখনো সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে, কখনোবা নিচে নামে। বাক ঘোরার শেষ নেই, মনে হয় একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এভাবে মিনিট দশকে হাঁটার পর তারা এক নিরিবিলি কোনে এসে উপস্থিত হয়। সেখানে সারি সারি টেলিফোন বুথ। লোকজন ব্যস্তসমস্ত ভঙ্গিতে কথা বলছে, তবে বেশিরভাগই বুথই ফাকা। তুহীনের অনুসন্ধিসু দৃষ্টি বিশেষ কাউকে খুঁজে বেড়ায়।
‘নাসের ভাই, তারা কেউ এখনো আসেনি। অপেক্ষা করতে হবে।’
‘কখন আসবে?’
‘কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। এমনও হতে পারে, আজ আসবে না। তবে এত কষ্ট করে এলাম যখন, ঘণ্টাখানেক দেখে যাই।’
তুহিন লোকজনের ভীড় থেকে একটু দূরে দেয়ালে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে। হাত ইশারা করে তাকেও পাশে বসতে বলে। মেঝেতে বসতে নাসেরের খুব সঙ্কোচ লাগে। কিন্তু অনেকেই এভাবে বসে আছে দেখে সে-ও বসে পড়ে। স্টেশনের এই প্রান্তে ভ্যাপসা গরম, অনেক দূর হেঁটে আসায় আরও বেশি গরম লাগছে। সে জ্যাকেটের বোতাম খুলে দেয়, তারপর তুহীনের দেখাদেখি চোখ বন্ধ করে।
খানিক পর ‘অ্যামিগো, টেলিফোনো?’ বাক্য শুনে সে চোখ মেলে। তার সামনে পাতলা সূতী শার্ট গায়ে এক মেক্সিকান যুবক দাঁড়িয়ে। নাসের কথা না বলে চুপচাপ তাদের দর কষাকষি শোনে। তুহীন প্রথমে ছাদের দিকে আঙ্গুল দিয়ে অনেক দূরের দেশ ইঙ্গিত করে, ‘বাংলাদেশ। হাউ মাচ?’
‘টুয়েণ্টি দলার’
‘নো নো, টু মাচ (অনেক বেশি চাইছো)। নো জব, নো মনি, অ্যামিগো!’
‘ওকে! ফিফ্টিন দলার, নো লেস্। ওকে?’ মেক্সিকান যুবক তার ফাইনাল দাম জানিয়ে দেয়। তুহিন এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। সে পকেট থেকে টেলিফোন নাম্বার লেখা এক টুকরো কাগজ বের করে মেক্সিকানের হাতে গুঁজে দেয়। যুবক সবচেয়ে ডান দিকের বুথে ঢুকে নাম্বার ডায়াল করা শুরু করে।
‘পনের ডলারে কতক্ষণ কথা বলা যাবে?’
‘লাইন না কাটা পর্যন্ত। কখনও দু মিনিট পরে লাইন কাটে। আবার কখনও একঘণ্টা পরেও কাটে না। ভাগ্যের উপর নির্ভর করে।’
মেক্সিকান যুবক বুথের ভিতর থেকে হাত ইশারা করে ডাকছে। তার মানে, লাইন পাওয়া গেছে। তার হাত থেকে রিসিভার নেয়ার আগে তুহীন পাওনা পরিশোধ করে। নাসের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে। বিরহী দম্পতির কথোপকথন কতক্ষণে শেষ হবে, কে জানে!
শুধু এই স্টেশনেই নয়, কাজের অবসরে সুযোগ মিললে তারা সবাই দল বেধে শহরের বিভিন্ন জায়গায় হানা দেয়। উদ্দেশ্য, যদি কম পয়সায় দেশে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। ম্যানহাটনে ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টবহুল এলাকায়, জ্যাকসন হাইট্সে বাংলাদেশী দোকানপাটের আশেপাশে, লা-গুয়ারডিয়া এয়ারপোর্টে, সাবওয়ে স্টেশনের আশেপাশে অভিজ্ঞ স্প্যানিশরা উপমহাদেশীয় খদ্দেরের আশায় ওঁৎ পেতে থাকে। তাদের কল্যাণে দশ, বিশ ডলার খরচ করে সন্তোষজনক পরিমাণে কথা বলা যায়। এখন পর্যন্ত নাসেরের সেই সামর্থ নেই। তাই সে প্রতিদিন মেইল বক্সের দিকে তাকিয়ে থাকে। যদি একটা চিঠি আসে!
তারপর প্রথম যেদিন শাপলার চিঠি আসে, তার আনন্দ ধরে না। সে অনেকক্ষণ চিঠি হাতে বসে থাকে। যেন নীল বর্ডার দেয়া সেই খামের ভিতরে আনন্দ বার্তা লুকিয়ে আছে, খাম খুললেই তারা হারিয়ে যাবে। তারপর রুমমেটদেরকে লুকিয়ে বার বার চিঠি পড়ে।
‘তোমার লেখা দুটো চিঠি পেয়েছি। তোমার ঠিকানার ব্যাপারে শিওর না হয়ে লিখতে মন চাইছিল না। তাই দেরী হয়ে গেল। অ্যাই, তুমি কেমন আছো!
তোমার ক্রমিক নাম্বারের ব্যাপারে আব্বাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। তিনি যদি মন্দ কিছু বলেন, তাহলে আমার খুব মন খারাপ হবে, তাই। কারণ, একদিন জানি তুমি তার সবচেয়ে প্রিয় আদরের জামাই হবে। আমার নসু কি কখনো কোনো কিছুতে দ্বিতীয় হয়েছে? জানো, পড়াশুনা ভালো হচ্ছে না। আমার সেই নবম সাবজেক্ট একদম পড়তে পারছি না। আমার বান্ধবী শীলাদের বাসায় ফোন আছে। নীলফামারী এক্সচেঞ্জে ফোন করে একশ চৌদ্দ নম্বর চাইলেই হবে। তিরিশ তারিখে সকাল দশটায় ফোন করো।’
আমার নসু! নাসেরের মুখে হাসি ফুটে উঠে। মা মাঝে মাঝে আদর করে এই নামে ডাকতো। সে শাপলার কাছে গল্প করেছে। এখন শাপলা চুপি চুপি এই নামে ডাকে। সবার অগোচরে কানের কাছে মুখ এনে ছড়া বানিয়ে শোনায়,
‘আমার আছে এক গৃহপালিত পশু
সবার কাছে আবু নাসের সে, আমার কাছে নসু।’
আরো কত অদ্ভুত কথা যে বলে শাপলা! কত অদ্ভুত কান্ড করে। বিয়ের রাতে আর একটু হলে সে নাসেরের ঘাড় ভেঙ্গে দিতো।
খুব দায়সারা ভাবে তাদের বিয়ে শেষ হলো। নাসেরের সাথে বরযাত্রী খুব একটা আসেনি। তিনখানা রিক্শা তাদের বাহন। শাপলাদের বাড়ির দুই মাইল দক্ষিণে নাসেরের বাড়ি। সে রাতে থালার মত বড় একটা চাঁদ উঠেছিল। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় রিক্শা বারবার ঝাকি খায়। সে শাপলার হাত ধরে চুপচাপ চাঁদের দিকে তাকিয়েছিল। বিয়ের বরযাত্রী সেজে চাঁদটাও তাদের সাথে যাচ্ছে। রিকশা মাঝামাঝি পথ অতিক্রম করলে শাপলা ঘোমটার আড়াল থেকে মুখ বের করে তার হাতে চাপ দেয়।
‘এত চুপচাপ কি দেখছো?’
‘চাঁদ দেখছি।’
‘অত পুরানো চাঁদকে দেখার কি আছে! আমি নতুন! আমাকে দেখো।’ এই বলে সে হাত বাড়িয়ে তার ঘাড় ধরে নিজের দিকে আকর্ষণ করে।
ঘটনার আকস্মিকতায় নাসের হকচকিয়ে যায়। এতগুলো মানুষের সামনে একি পাগলামি। আর একটু জোরে টান পড়লে ঘাড় মটকে যেত।
বিয়ের পর বাংলাদেশে যে স্বল্পকালীন সময় কেটেছে তার বেশিরভাগ ছোটাছুটির উপর থাকতে হয়েছে। নীলফামারী থেকে ঢাকা অনেক দূরের পথ। দূরপাল্লার বাসে পথ শেষ হতে চায় না। বাসের জানালা দিয়ে অপসৃয়মান গাছপালা, ঘরবাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। দূরের এইসব দৃশ্যের উপরে এক ধরনের ধোয়াটে ভাব থাকে। মনে হয়, রহস্যে ঘেরা রূপকথার অচিন জগত। বাইরে তাকিয়ে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে বই পড়া…। সে হয়তো একমনে বাইরে তাকিয়ে আছে, অথবা মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছেÑআচমকা ঘাড়ে হ্যাচকা টান-‘বাইরে তাকিয়ে কি দেখো ? এত মনোযোগ দিয়ে কি পড়?’
একদিন ঘাড়ে ব্যথা পেয়ে নাসের বলেছিল, ‘হ্যাচকা টান মারা না থামালে খুব শিগগির তোমাকে অকাল বৈধব্য বরণ করতে হবে।’
‘তুমিও অকাল মৃত্যু না চাইলে অন্যদিকে তাকাবে না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে।’
সেই শাপলাকে অনেকদিন দেখা হয় না। নাসের এত দূরে থেকেও ঘাড়ের পাশে তার স্পর্শ অনুভব করে।
বান্ধবী শীলার বাসায় ফোন করার জন্য নাসেরকে অপারেটরের সাহায্য নিতে হয়। প্রথমে একা একা নীলফামারী এক্সচেঞ্জের লাইন পেতে চেষ্টা করে। কিন্তু সে শুধু শক্তির অপচয়। ফোনে নানা ধরনের শব্দ হয়, কিন্তু রিং হয় না। তবে কি শাপলার সাথে কথা বলা সম্ভব হবে না! আজও কি সেদিনের মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। অবশেষে রুমমেটদের পরামর্শে সে এটিএ্যান্ডটি কোম্পানিতে ফোন করে। তাদেরকে সমস্যার কথা খুলে বলে।
‘বাংলাদেশে বউয়ের সাথে কথা বলতে চাই। কিছুতেই লাইন পাচ্ছি না। তুমি কি লাইন পেতে সাহায্য করতে পারো?’
সম্ভবত, অপারেটর একজন ফিমেল জেন্ডার বলেই তার দিলে রহম হয়। হাজারো হোক, তিনিও তো কারো না কারো বউ, নিদেনপক্ষে বান্ধবী। নাসের তাকে নীলফামারী টেলিফোন এক্সচেঞ্জের নাম্বার বলে।
‘এই নাম্বারে যোগাযোগ হলে ওদেরকে ওয়ান ওয়ান ফোর নাম্বারে সংযোগ দিতে বলবে। আমি শীলা নামে একজনের সাথে কথা বলতে চাই।’
একটু দেরীতে হলেও অপারেটর পুরো ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। ‘ও… তোমার এটা তাহলে একটা রিংডাউন নাম্বার?’
‘যাহ্ শালা!’ নাসেরের ভিতরে মোচড় দিয়ে উঠে। নতুন সমস্যা শুরু হয় বুঝি! ‘কি নাম্বার বললে?’
‘রিং ডাউন নাম্বার। কোনো নাম্বারে যখন সরাসরি ফোন করা যায় না, অন্য নাম্বারে ভায়া হয়ে যোগাযোগ করতে হয়, আমরা সেটাকে রিং ডাউন নাম্বার বলি।’
‘সেই নাম্বার হলে কি হয়?’
‘চার্জ একটু বেশি হয়।’
এমনিতেই মিনিটে দুই ডলার। তার উপর আবার রিং ডাউন নাম্বারের প্যাচ। তাই যখন বহুদূর থেকে মেয়েলি কণ্ঠে হ্যালো, হ্যালো ডাক ভেসে আসে, তখনও তার হৃদয় শিহরিত হয় না।
‘নাসের ভাই! আমি শীলা! শাপলার বান্ধবী। কেমন আছেন আপনি? সেই যে আমার বান্ধবীকে ছেড়ে চলে গেলেন, তারপর আর খোঁজ খবর নাই…।’
‘শাপলা কি এখানে আছে?’
‘আছে, আছে। আরে, এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন? বউ তো পালিয়ে যাচ্ছে না। আগে আমার সাথে আলাপ পরিচয় হোক…।’
বেকায়দামতো ফেঁসে গিয়ে নাসের ছটফট করতে থাকে। মিনিটে আড়াই ডলার খরচ করে কারো সাথে পরিচিত হবার মত সামর্থ তার নেই। টেলিফোন রেট আরো কমলে, তখন পরিচিত হলে হয় না! খুব ছটফটে ভাব দেখিয়েও দুই বান্ধবীর কাছ থেকে দশ মিনিটের আগে ছাড়া পাওয়া যায় না। ফোন রেখে দিয়ে এ নিয়ে তার মনে আফসোসের সীমা থাকে না। এখন এতগুলো টাকা সে কিভাবে শোধ করবে। টেলিফোন বিল চলে আসার আগে তাকে অবশ্যই একটা ভালো কাজ যোগাড় করতে হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশে ফোন করার কথা মুখে আনা যাবেনা…। তার এইসব খেদোক্তি মোতালেব মিয়ার কানে যায়। তিনি আমেরিকায় তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে নাসেরকে সান্ত্বনা দেন-
‘ও নাসের ভাই, এত আফসোস্ করছেন ক্যান ? মানুষ এর চেয়ে বেশি রেটে হারাম জিনিসের সাথে কথা বলে। আর আপনে তো মিয়া হালাল জেনানার সাথে…’
নাসের কিছু বুঝতে পারে না। কথা বলার মধ্যে আবার হারাম হালাল কি! সে এদেশে নতুন এসেছে, খোঁজ খবর বেশি একটা রাখে না। তাই মোতালেব মিয়া তার জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়।
এদেশে সিগারেট কিনলে সাথে ফ্রি ম্যাচ পাওয়া যায়। সেই ম্যাচের উপর বিশাল বক্ষা রমণীদের ছবি থাকে। রাস্তাঘাটে চলার পথে অনেকে হাতে ফ্লেয়ার ধরিয়ে দেয়। কিছু কিছু ফ্লেয়ারে চোখ ধাঁধানো সুন্দরীর ছবি থাকে। পাশে ফোন নাম্বার দেয়া। প্রতি মিনিটে কথা বলার রেটÑতিন ডলার। লোকজন যৌন সুড়সুড়ি পাবার আশায় সেই নাম্বারে ফোন করে। সুন্দরীরা আদি রসাত্মক কথা বলে তাদের জ্বালা কমিয়ে দেয়।
মোতালেব মিয়া উপসংহার টানেন, ‘পাপ! পুরাটাই পাপ! আর আপনি তো মিয়া বিয়ে করা হালাল স্ত্রীর সঙ্গে মাত্র আড়াই ডলার রেটে কথা বলেছেন। তাই নিয়ে এত আফসোস!’
একদিন মোতালেব মিয়া রাস্তা থেকে একজন স্প্যানিশ ধরে নিয়ে আসে। সেই মেক্সিকানের কাছে লোভনীয় অফার আছে। সে ঘরের ফোন থেকে বাংলাদেশে সংযোগ পাইয়ে দেবে। সোফায় আরাম করে বসে আত্মীয়-স্বজনের সাথে কথা বলা যাবে। সংযোগ ফি মাত্র বিশ ডলার।
দেশে ফোন করার ব্যাপারে তুহিনের আগ্রহ সবচেয়ে বেশী। সে অনেকদিন থেকে দেশে যেতে পারে না। বউ বাচ্চার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম চিঠিপত্র ও টেলিফোন। কিন্তু চিঠিপত্র লেখার কাজ তাকে দিয়ে হয়ে উঠে না। সুতরাং টেলিফোনই একমাত্র ভরসা। কাজ করে যে আয় করে; তার সিংহভাগই চলে যায় ফোন বিল দিতে। মেক্সিকানের বিশ ডলারের প্রস্তাব সেই আগে লুফে নেয়। বারবার ফোন করে বউকে গভীর ঘুম থেকে ডেকে তোলে।
‘নাহিদ, হাত মুখ ধুয়ে আরাম করে বসো। আজ অনেকক্ষণ কথা বলব।’
বাংলাদেশে তখন সবেমাত্র মধ্যরাত। নাহিদা জামান স্বামীর পাগলামিতে বিরক্ত হয়। কিন্তু দূর প্রবাসের পরিবার কাতর একজন মানুষের অনুরোধ ফেলতে পারে না। একঘণ্টা রিসিভার ধরে রাখার কারণে তার হাত ব্যথা শুরু হয়। কথোপকথনের সমাপ্তি টানতে চায়। কিন্তু এই সুযোগ চলে গেলে আবার কবে আসবে! তুহীন তার কথায় কর্ণপাত করে না।
‘এক হাতে ব্যথা হলে অন্য হাত দিয়ে ধরো। আল¬াহ পাক দুটো হাত দিয়েছে কিসের জন্য ? কই গেলেন নাসের ভাই, এদিকে আসেন। আপনার ভাবীর সাথে কথা বলেন। হ্যালো, নাহিদ! নাসেরের সাথে কথা বলো। মাত্র দুই মাস আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। খুব ভালো ছেলে।’
তুহীন জোর জবরদস্তি করে সব রুমমেটদের সাথে বউকে কথা বলতে বাধ্য করে। কিন্তু বউয়ের অমতে কাজ করলে তার ফল যে শুভ হয় না সেটা পরের মাসে তুহীন হাড়ে হাড়ে টের পায়। টেলিফোন বিল দেখে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। মেক্সিকান তার সাথে চরম প্রতারণা করেছে। সে কৌশলে ঘরের রেগুলার লাইন থেকে তুহীনকে সংযোগ করে দিয়ে মুফতে বিশ ডলার মুনাফা করেছে। বউয়ের ঘুম নষ্ট করে কথা বলার খেসারত হিসেবে ঐ কলের বিল এসেছে ছয়শ’ চব্বিশ ডলার। এত টাকা সে কোত্থেকে দেবে!
তিরানব্বই সালের জুন মাসের শেষে টেলিফোন বিল দিতে গিয়ে ঝামেলা চরমে উঠে। তুহীনের এক কথা, তার কাছে এত টাকা নেই, প্রতিমাসে অল্প অল্প করে দেবে। টেলিফোন লাইন মোতালেব মিয়ার নামে, সুতরাং তার দায়বদ্ধতা বেশি। সময়মতো বিল পরিশোধ না করলে টেলিফোন কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল লাইন কেটে দেবে। জরুরী প্রয়োজনে দেশে আত্মীয়-স্বজনের সাথে যোগাযোগের উপায় থাকবে না। তাছাড়া, তুহীনের স্বভাবই এই। প্রতি মাসে ফোন বিল নিয়ে ফ্যাকড়া বাঁধাবে। মোতালেব মেজাজ কি রাখতে পারে না।
‘এই মিয়া! দেশে কথা বলার সময় হুঁশ জ্ঞান থাকে না? বিল দেবার সময় এত ঝামেলা করেন ক্যান? কে আপনাকে বউয়ের ঘুম ভাঙ্গিয়ে চার ঘণ্টা কথা বলতে বলেছে! তখন খেয়াল ছিল না?’
‘দোষ একা আমার! আমি একা কথা বলেছি! আপনি আমার বউয়ের সাথে কথা বলেন নাই? হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করেন নাই, ভাবী কেমন আছেন? এই বাসার সবাই কথা বলেছে। এখন সবাই মিলে আমার সাথে বিল শেয়ার করেন।’
তুহীনের উত্তর শুনে মোতালেব চুপ মেরে যায়। সে মাসে বিল না দেবার কারণে ইন্টারন্যাশনাল লাইন কাটা পড়ে। ঘর থেকে দেশে ফোন করা একদম বন্ধ। তাতে অবশ্য নাসেরের কোনো অসুবিধে হয় না। সে পঞ্চাশ পয়সা দামের বেশ কিছু ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাম্প কিনে এনেছে। এর একটি স্ট্যাম্প দিয়েই দেশে চিঠি পাঠানো যায়। সে রাত জেগে বন্ধু বান্ধবের কাছে চিঠি লেখে। ভাল লাগার কথা, অনুভূতির কথা, প্রবাস জীবনের চাওয়া, না পাওয়ার কথা। মন খারাপ হলে শাপলার চিঠি বের করে পড়ে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাতের লেখা দেখে, খামের সাইজ দেখে। নীলফামারীতে বোধ হয় বেশি দামের স্ট্যাম্প পাওয়া যায় নাÑসব এক টাকার স্ট্যাম্প।
পনেরটা স্ট্যাম্প খামের উপরে লাগানো সম্ভব নয়। তাতে নাম ঠিকানা লেখার জায়গা থাকে না। তাই খামের পুরো পেছন দিক ঢাকা পড়ে যায় স্ট্যাম্প দিয়ে। কখনো খামের কোনা ছেড়া থাকে। চিঠির মুখ বন্ধ করার আঠা আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকে। পুরো খাম না ছিঁড়ে চিঠি বের করা যায় না। তাতে কি! এই চিঠির সাথে থাকে হৃদয়ের ছোঁয়া। নাসেরের মতে, চিঠিতে যত আবেগ অনুভূতি থাকে, টেলিফোনের কথোপকথনে সেটা খুঁজে পাওয়া যায় না। আধুনিক যন্ত্র মানুষের অনুভূতিকেও যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলে। তাই প্রতিদিন ঘরে ফেরার সময় মেইল বক্স খোলার আগে ফুটো দিয়ে তাকিয়ে দেখে, লাল নীল বর্ডার দেয়া চিঠি এসেছে কিনা। প্রবাসের এই কঠিন সময়ে প্রিয়জনের চিঠি ছাড়া অন্যকিছুতে সে অতটা খুশি হয় না।
এক রাতে সে বিছানায় উপুড় হয়ে এক বন্ধুকে চিঠি লিখছিল। এমন সময় মোতালেব মিয়া হাঁক ছাড়ে।
‘ও নাছির ভাই, কি করেন?’
‘চিঠি লিখি।’
‘ভালো ঝামেলাতেই পড়লাম দেখি। তুহীন ফোনের বিল শোধ করছে না। গত দুই মাসে মাত্র দেড়শ’ ডলার দিয়েছে। কতদিন আর অন্যের বাসায় গিয়ে দেশে ফোন করা যায়? কি করি, বলেন তো?’
‘আমার মতো চিঠিপত্র লেখা শুরু করেন।’
‘কি যে কন, নাছির ভাই। লেখাপড়ার ভয়ে দেশ ছেড়েছি। বই খাতার সাথে বহুদিন সম্পর্ক নাই। আপনি পোলাপান মানুষ। লেখাপড়া কইরা মজা পান, আপনি লেখেন। আমার দ্বারা ঐ কাজ সম্ভব না।’
‘একটা কথা মোতালেব ভাই, আপনি সব সময় নাছির বলে ডাকেন কেনো? আমার নাম কিন্তু নাছির নয়, নাসের। আবু নাসের।’
‘নাসের আর নাছির তো একই জিনিস। পার্থক্য কোথায়?’
‘পার্থক্য অনেক-বানানে, উচ্চারণে, দৈহিক আকার আকৃতিতে। তবে মূল পার্থক্য হচ্ছে পদ-পদবীতে। একজন হলেন মিসরের শাসনকর্তাÑপ্রেসিডেন্ট নাসের। আর অন্যজন হলেন কৌতুককার-মোল্লা নাসিরুদ্দিন। মাথায় গোল টুপি, থুতনিতে ছাগলা দাড়ি। এগুলি কি বড় পার্থক্য না?’
‘আপনাকে দেখে কিন্তু রাজা বাদশা গোত্রের মনে হয় না, বরং আপনাকে দেখলে আমার খুব হাসি পায়। তাই আমি সব সময় আপনাকে এই নামেই ডাকবো, বুঝলেন নাছির ভাই?’
দুদিন পরে শেষ রাতে বাসায় ফিরে তুহীন মোতালেবকে ঘুম থেকে তুলে খবর দেয়, তাদের বাসার কাছে সাবওয়ের নিচে এক স্প্যানিশ বাংলাদেশে লাইন করে দিচ্ছে। তুহীন কথা বলা শেষ করেছে। স্প্যানিশ অপেক্ষা করতে চায়নি, সে অনেক বলে কয়ে তাকে অপেক্ষা করিয়ে রেখেছে। ফোন করতে চাইলে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
মোতালেব মিয়া রাতে লুঙ্গি ফতুয়া পরে ঘুমিয়েছিল। তার ঘুম তখনো পুরোপুরি ভাঙ্গেনি। আজ বাইরে চমৎকার আবহাওয়া। তাছাড়া এই বিল্ডিংয়ের দরজা খুললেই সাবওয়ের রাস্তা। রাস্তায় নামতে দেরী হলে হয়তো কথা বলার সুযোগ ভেস্তে যাবে। অনেকদিন থেকে পরিবারের কুশলাদি জানা হয় না। এই সব ভেবে সে শার্ট প্যান্ট খোঁজার ঝামেলায় না গিয়ে লুঙ্গি ফতুয়া পড়েই ঘরের বাইরে পা রাখে।
নাসের এসবের কিছুই জানে না। সে তখন গভীর ঘুমে অচেতন। বাসার দরজায় দমাদম পেটানোর আওয়াজ শুনে তার ঘুম ভাঙ্গে। সে দরজা খুলে দেখে মোতালেব মিয়া দাঁড়িয়ে আছে। তার ডান হাতের কনুই থেকে রক্ত ঝরছে। সে অবাক হয়ে আরও লক্ষ্য করে, তার শরীরের নীচের অংশে কাপড় নেই, বাম হাতে ফতুয়া টেনে সবকিছু ঢাকার চেষ্টা করছে। তুহিন ঘুমের ঘোরেই তাকে জিজ্ঞেস করে।
‘এতো রাতে লুঙ্গি না পড়ে আপনি কই গিয়েছিলেন?’
মোতালেব মিয়া ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে খেকিয়ে ওঠে, ‘দরজা থেকে সরেন, মিয়া! ভেতরে ঢুকতে দেন।’
নাসের থতমত খেয়ে সরে দাঁড়ায়। মোতালেব নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। ওয়ারড্রোব ঘেটে নতুন লুঙ্গি বের করে। তারপর ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আহত হাত চেপে ধরে কাতরাতে থাকে। তার কাতর অবস্থা দেখে নাসের নিজের অপমান ভুলে যায়। সে কিচেন কেবিনেট থেকে ডেটলের শিশি বের করে। পেপার টাওয়েলে ডেটল লাগিয়ে ক্ষতস্থানে চেপে ধরে। জ্বলুনীর চোটে মোতালেব উচ্চস্বরে উহু… আহা… করতে থাকে।
ঘরের ভিতরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির আভাস পেয়ে তুহীন বাথরুম সময় সংক্ষিপ্ত করে বেড়িয়ে আসে। সে তখনো লুঙ্গি হরণের ঘটনা কিছুই জানে না। মোতালেবের ছড়ে যাওয়া কনুই আর মেঝেতে রক্তাক্ত পেপার টাওয়েল দেখে তার শেভিং রেজর হাত থেকে পড়ে যায়।
‘মোতালেব ভাই! কিভাবে হাত কাটলো। আছাড় খেয়েছেন নাকি?’
‘নারে ভাই, আছাড় খাই নাই। উহু-হু…। লুঙ্গি পড়ে বাইরে যাওয়া মহা বোকামি হয়েছে…’
মোতালেব মিয়া নিচে নেমে ঠিকই স্প্যানিশের দেখা পায়। সে দশ ডলারের বিনিময়ে দেশে ফোনের সংযোগ পাইয়ে দেয়। অনেকদিন পর স্ত্রী-পুত্রের সাথে কথা বলতে বেশ ভালো লাগছিল। শেষ রাতের রাস্তায় লোকজনের চলাচল তেমন ছিল না। এমন সময় মাথার উপর স্টেশনে ট্রেন এসে থামে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে একমাত্র যাত্রী- একজন দক্ষিণ আমেরিকান। লুঙ্গিপড়া মোতালেবকে দেখে তার ভিতরে সম্ভবত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যায়। সে খুব স্বাভাবিকভাবে কাছে এসে তাকে ধাক্কা মারে।
ধাক্কা খেয়ে মোতালেব মিয়া রাস্তায় চিৎ হয়ে পড়ে। পেভমেন্টের সাথে ঘষা খেয়ে কনুই ছড়ে যায়। তার ভয় হতে থাকে যে, স্প্যানিশ তাকে মেরে ফেলবে। গত কিছুদিন ধরে এষ্টোরিয়া এলাকায় ছোট্ট আকারের জাতিগত দাঙ্গা চলছে। বীর বাঙালি বনাম স্প্যানিশ ভাষী দক্ষিণ আমেরিকান। স্প্যানিশরা চিপাচাপায় একলা পেয়ে সমানে মারছে, আর বাংলাদেশীরা খুব দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তার পরিচিতি একজনের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। আজকের এই ঘটনাও বোধহয় তারই জের।
স্প্যানিশকে দাঁত মুখ খিচিয়ে তেড়ে আসতে দেখে সে সভয়ে চোখ বন্ধ করে। এইবার বুঝি পৈত্রিক প্রাণটা যায়! কিন্তু সে জাতীয় কিছু ঘটে না, কোনো শারীরিক আক্রমণ আসে না। সাহস করে চোখ মেলে দেখে দুর্বৃত্ত তার লুঙ্গি ধরে টানছে। সে কিছু বুঝে উঠার আগেই লুঙ্গি খুলে নিয়ে, দে ছুট…। প্রাণ যায়নি, শুধু লুঙ্গি গেছে।
তার দুর্দশার কথা শুনে সহমর্মিতায় নাসেরের গলা আর্দ্র হয়ে আসে।
‘আপনি পুলিশ কল করলেন না কেন?’
একে তো ডেটলের জ্বলুনী, তার উপর… লুঙ্গিটা প্রায় নতুন ছিল! মোতালেব মিয়ার সমস্ত ক্ষোভ নাসেরের উপর বর্ষিত হয়।
‘অই মিয়া, বেকুবের মত কথা বলেন কেন? পুলিশ এসে ন্যাংটো অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে সবার আগে আমাকেই অ্যারেষ্ট করতো না! তাছাড়া এটা পুলিশকে জানানোর মত একটা বিষয় হলো?’ এরপর তারা সবাই মিলে আলোচনায় বসে, স্প্যানিশ কেন এই কাজ করলো! একেক জনের মতামত একেক রকম। নাসেরের তখন চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কাচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না। তার পালা এলে সে বলে, ‘হয়তো লুঙ্গিকে আমরা যাতে এদেশের জাতীয় ড্রেসে পরিণত না করতে পারি, সেজন্য স্প্যানিশরা প্রতিরোধ সংগ্রামে নেমেছে।’
তাকে মোতালেবের রোষের হাত থেকে বাঁচাতে তুহীন তড়িঘড়ি অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা করে।

শাপলা চিঠিতে আবার কথা বলার জন্য তারিখ দিয়েছে। আগের বার কথা বলে নাকি মন ভরেনি। এবারে আরেকটু বেশি সময় নিয়ে কথা বলতে হবে। সেই নির্দিষ্ট তারিখের এখনো দু’সপ্তাহ বাকী আছে। নাসের হন্যে হয়ে দেশে ফোন করার উপায় খুঁজতে থাকে।
কথায় আছে, মন দিয়ে খুঁজলে নাকি প্রার্থিত বস্তুর দেখা মেলে। নাসেরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না। সে যখন একদিন পরিচিত গ্রোসারীতে কেনাকাটা করছিল তখন গ্রোসারীর বাংলাদেশী মালিক জানান, তারা দোকানে নতুন ধরনের একটি পোর্টেবল ফোন সেট এনেছেন। এটি দিয়ে সস্তায় দেশে কথা বলা যাবে। নাসের যেন পরিচিতদের মাঝে এই খবর ছড়িয়ে দেয়।
এতদিনে দেশে কথা বলার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম পাওয়া যায়। এই ফোনের রেটও নাসেরের আয়ত্তের মধ্যে-ঘণ্টায় বিশ ডলার। শুধু একটাই অসুবিধে, কথা বলার জন্য দোকানে লাইন দিয়ে বসে থাকতে হয়। ওদিকে শাপলা বান্ধবীর বাসায় গিয়ে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বসে থাকে। কিছুদিন পর সেই গ্রোসারী মালিক তাদেরকে আরো ভালো প্রস্তাব দেয়।
‘দোকান রাত দশটায় বন্ধ হয়। তারপর সারা রাত ফোনটা অকেজো পড়ে থাকে। আপনারা দশটায় এসে ফোন নিয়ে যাবেন। সারারাত কথা বলে সকাল আটটায় ফেরত দিয়ে যাবেন। সারা রাতের জন্য একশ’ ডলার দেবেন।’যারা এই ফোন বাসায় নিয়ে যান, তারা আবার অন্যদেরকে খবর দেন, ‘আমার বাসায় এসে কথা বলে যান। ঘণ্টায় মাত্র বিশ ডলার।’
সেই বাসায় সমবেত লোকজন একে অপরের কুশল জিজ্ঞেস করেন। অপরিচিতের সাথে পরিচিত হন। একজন ঘরের দরজা লাগিয়ে ফোনে কথা বলেন, বাকীরা ড্রইংরুমে বসে আড্ডা দেন। দেশে কথা বলা উপলক্ষে ছোটখাট উৎসব হয়ে যায়। ওদিকে তখন বাংলাদেশে আত্মীয়-পরিজনেরা উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করেন, কখন আমেরিকা থেকে ফোন আসবে।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের দুর্দশা ঘুচিয়ে দিতে এমসিআই নামে অন্য একটি কোম্পানি এগিয়ে এলো। তারা দুই ডলারের পরিবর্তে প্রতি মিনিটে এক ডলার তেত্রিশ সেন্টে কথা বলার অফার দেয়। প্রবাসীদের কাছ থেকে আশাতীত সাড়া পাওয়ায় সেই রেট কমে এক ডলার এবং পরবর্তীতে সেটা ঊনআশি সেন্টে নেমে দাঁড়ায়। ইন্টারন্যাশনাল ফোনের সম্ভাবনাময় বিশাল ক্ষেত্র চোখে পড়ায় পরবর্তীতে অন্যান্য কোম্পানিও এগিয়ে আসে। ফলে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়-কে কত কম দামে গ্রাহক সেবা দিতে পারে।
ফোন কোম্পানিগুলোর এই প্রতিযোগিতার ভীড়ে কলিং কার্ড কোম্পানিগুলোও পিছিয়ে রইল না। তারা আরো লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এলো। দুই ডলারের প্রিপেইড কার্ড কিনলে বাংলাদেশে বিশ মিনিট কথা বলা যায়। কালক্রমে সেই বিশ মিনিট বেড়ে দাঁড়ায় চল্লিশ মিনিট এবং এক সময় সেটা পুরোপুরি একঘণ্টা। একবার কথা শুরু করলে সময় শেষ হতে চায় না।
তারপর, সবশেষে এলো মোবাইলের যুগ। ফোন আর ঘরের কোনে তার দিয়ে বাধা রইল না। এখন ফোন থাকে পকেটে, কোমরের বেল্টে, গাড়ির ড্রয়ারে। প্রিয়জনের সাথে কথা বলার জন্য ল্যান্ড লাইনের উপরে ভরসা করে থাকতে হয় না। যখন খুশী, যেথায় খুশী! টেক্নোলজীর কি অচিন্তনীয় অগ্রগতি। বারো হাজার মাইল দূরের অধরা মানুষেরা চলে এলো খুব কাছে। ভাবের আদান-প্রদান সহজতর হওয়ায় স্বজনেরা স্বস্তি পেল। আমেরিকা নামের অনেক দূরের দেশ আর ততটা দূরে রইল না।
টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্ময়কর অগ্রগতি আর আধুনিকতার চাপে হারিয়ে গেল কাগজে লেখা চিঠি। নাসের এক সময় গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতো, কখন চিঠি আসবে। তার প্রতিদিনই মনে হতো, আজ নির্ঘাত শাপলার চিঠি পাবে। তারপর মেইল বক্স খুলে যখন বাংলাদেশ এয়ার মেইল লেখা চিঠি বের হতো, তখন কি যে উচ্ছ্বাস! সে পরম মমতা দিয়ে চিঠিটাকে ছুয়ে দেখতো। এ তো শুধু এক টুকরো কাগজ নয়! এতে লেগে আছে প্রিয়জনের স্পর্শ, ফেলে আসা স্বজনের মমতা। পথের মোড়ে বুড়ো বটগাছের নিচে ডাকঘরের স্মৃতি।
মোবাইল ফোনের উৎপাতে ‘বাংলাদেশ এয়ার মেইল’ লেখা সেই চিঠি আর আসে না। মধ্যরাতে লেখা চিঠি যতœ করে আর মধ্যরাতে পড়া হয় না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here