রম্য: বদিতে বৌদি

6

মোস্তফা কামাল

মানুষ হতে হলে এদেরকে খেতে হয়। গায়েও মাখতে হয়। হচ্ছেও। নির্বাচনের মৌসুমে তাদের বাজারই চড়া। মানুষ তাদের বাইরে যায় না। যেতে চায় না। ভালো-মন্দ এখানে আপেক্ষিক। জোর-জুলুম, ক্ষমতাবাজি, লুটতরাজে নাম না থাকলে তাকে অযোগ্য মনে করার একটা মানসিকতাও সমাজে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত। কক্সবাজার তার একটা উদাহরণ মাত্র। বিশেষ করে, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে। সেখানে উন্নয়নের ইয়াবা চালান মনে মনে না রেখে বিকল্প নেই যেন তাদের। এই শ্রেণিকেই ‘মাননীয়’ ভাবতে অভ্যস্ত তারা।
ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, বহুল সমালোচিত বদিকে এবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তার এ ঘোষণা দিতে দেরি হলেও বদির বিকল্প হিসেবে তার প্রথম স্ত্রী শাহীন আক্তারের নাম আসতে সময় লাগেনি। বৌদিকে দিয়ে বদির প্রক্সি দেওয়ার এ মানসিকতা বা চেষ্টায় এলাকার মানুষও একাকার। বদির জন্যও এটি আশা জাগানিয়া। কিছু সময় রেস্ট বা রিলাক্স করার মতো। সুরে সুরে ‘ভাই তো ভালা না, ভাবি লইয়াই থাইকো’-গেয়ে নিতে পারেন তিনি।
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে আওয়ামী লীগের অনেকে মনে মনে বদি। ঘৃণার বদলে তাদের মধ্যেও বদি হওয়ার বাসনা। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ২১ জন। তাদের মধ্যে চারজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী। মাননীয় সংসদ সদস্য বদি তাদের একজন মাত্র। বাকি তিনজন টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম, ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভি রফিক উদ্দিন ও বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মৌলভি আজিজ উদ্দিন। তারা বেশ জনসম্পৃক্ত। অথচ সমস্যা হচ্ছে হিরো আলমকে নিয়ে। এবারের ভোটবাজারে হিরো আলম রসাত্মক আইটেম। বদিদের সঙ্গে তার তফাত অন্য জায়গায়। আলম ঋণখেলাপি বা দুর্নীতিগ্রস্ত নন। রাষ্ট্রবিরোধী কাজেও তার সম্পৃক্ততা নেই। রাজনীতি থেকে কাউকে মাইনাস করার ব্যাপারে তার ভূমিকা বা চেষ্টা ছিল না। ব্যাংক লুটের ক্ষমতা নেই। শেয়ারবাজারে থাবা দেননি তিনি। বিদেশে টাকা পাচারের অভিজ্ঞতা নেই।
নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে বাজারে কথাবার্তা বেশ সাংঘর্ষিক। যার যার সুবিধামতো। ক্রিকেট হিরো মাশরাফি সংসদ নির্বাচন করলে তার ইমেজ নষ্ট হয়, কিন্তু কবরী-মমতাজের ক্ষেত্রে হয় না। ঢাকাই ছবির ভিন্ন ক্যারেক্টার ডিপজল বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের টিকিট নিলে সমাজসেবকের আলাদা মানদ- আসে। তার ওয়ান টুতে খালাসের ডায়লগ আর অশ্লীল থাকছে না। তাকে নিয়ে সমালোচনার সময় সানডে মানডে ক্লোজের ভয়ে বুক কাঁপে। হিরো আলম যে দলভুক্ত হয়েছেন, সেখানেও রয়েছেন আরেকজন হিরো প্রার্থী। ১/১১ এর পরাক্রমশালী জ্বলজ্বলে হিরো জেনারেল (অব.) মাসুদ নৌকা এবং লাঙ্গলের মনোনয়নপত্র নিয়ে থিতু হয়েছেন লাঙ্গলে। নমিনেশন দেওয়ার সঙ্গে জেনারেল মাসুদ চৌধুরীকে এক চান্সে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যও করেছেন এরশাদ। তার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগও দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে এখন সময়টা আসলে এমন হিরোদেরই। হবেই না কেন? কোনোমতে, একবার মাননীয়ভুক্ত হলে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না-এ বিশ্বাস তাদের। প্রভাব-প্রতিপত্তির গ্যারান্টি। অর্থযোগও একেবারে কম নয়। বেতন, ব্যয় নিয়ামক ভাতা, স্বেচ্ছাধীন তহবিল, এলাকার মাসিক খরচ, পরিবহন, বার্ষিক ভ্রমণের হকহালালি অঙ্ক বিশাল। এর সঙ্গে সরকারি বাড়িতে না থাকলে বড় অঙ্কের বাড়িভাড়া, ন্যাম ভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ, বিমান ভ্রমণে বড় অঙ্কের ইন্স্যুরেন্স, সরকারি গাড়ি, ড্রাইভার, শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি, মোবাইল ফোন সেট, সরকারি প্লট। বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দের অংশ, এলাকার স্কুল-কলেজে ভর্তি বাণিজ্য, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সব সরকারি অফিসে প্রভাব বিস্তারের সুযোগের অর্থমূল্য অদৃশ্য-অজ্ঞাত।
বোবা বা কাঠের পুতুলেরও এমন সব প্রাপ্তির মোহে হাত না বাড়িয়ে পারে না। এ ধরনের চেতনাধারী ও অঙ্কে পাকারা যে কারণে নিজের সঙ্গে স্ত্রী, সন্তান, ভাই-শ্যালকসহ স্বজনদেরও তাই ‘মাননীয়ভুক্ত’ করতে চান। তাদের প্রতি মানুষেরও কাতর না হয়ে বিকল্প থাকে না। গোটা পরিস্থিতিটা মাননীয় প্রার্থীদের জন্য আশা জাগানিয়া। মানুষ না চিনুক, নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান না থাক, কোনো দলের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ততা না থাক-এমন টাইপের অনেকেও বিভিন্ন এলাকায় ঘুরছেন। টুকটাক খরচ করছেন। স্বজন-প্রতিবেশী জুগিয়ে চেষ্টা করছেন হাট-বাজারে আলোচনার খোরাক হতে। তাদের বিশ্বাস, লেগে থাকলে ফল মিলবে। এবার না হলেও পরে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here