বিদ্রোহী কবিতার জীবনবৃত্তান্ত

4

ওয়াকিল আহমদ

ভাব পরিক্রমা : কবিতা একটি সাজানো বাগানের ফুলের মতো; কবিকে নানা কৌশল অবলম্বন করে সে বাগান সাজাতে ও ফুল ফোটাতে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ভাব, ভাষা, ছন্দ, অলঙ্কার ও আঙ্গিকগত নানা কৌশল অবলম্বন করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা-কুসুমটি প্রস্ফুটিত করেছেন। আমরা বলেছি, কবিতার মূল সুর বিদ্রোহ। কবিতার অধিকাংশ স্থান জুড়ে ‘যুদ্ধের দামামা ও অসির ঝনঝনা’ রয়েছে। কবি কার বিরুদ্ধে কিভাবে বিদ্রোহ করেছেন, কবিতায় তার বেশি উল্লেখ নেই। কেবল মাঝখানে এক স্থলে বলেছেন- “যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত।” কবি তাদের উৎপীড়ক ও অত্যাচারি বলে চিহ্নিত করেছেন। কবির কালের যারা উৎপীড়ক ও অত্যাচারী ছিল, তিনি তাদের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
বিদেশি ইংরেজ প্রায় দুশো বছর ধরে এদেশের মানুষকে শাসন-শোষণ,পীড়ন-নির্যাতন করে আসছে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার অবসান ছাড়া মুক্তির কোন পথ খোলা নেই। তাই কবির প্রথম ও প্রধান বিদ্রোহ শাসক ইংরেজের বিরুদ্ধে। ‘রাওলট আইনের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে দেশব্যাপী ‘অসহযোগ আন্দোলন’ (১৯২০-১৯২২) চলছিল। এই আইনবলে ভারতবাসীর ওপর দমনমূলক নানা বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। ন্যূনতম প্রমাণ ব্যতিরেকে সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার, কয়েদ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অনুমতি দেওয়া হয় সেনা ও পুলিশ বাহিনীকে। এরূপ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মনে রেখে সংগত কারণেই কবি শাসক ইংরেজদের নাম উচ্চারণ না করে শুধু বলেছেন- “আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।” পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচন ও স্বাধীনতা-অর্জন কবির লক্ষ্য ছিল।
বিদেশি শাসকের রাজনৈতক ও অর্থনৈতিক শাসন-শোষণের পাশাপাশি ছিল স্বদেশি মানুষের নানা প্রকার ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার, সামাজিক ভেদাভেদ ও অন্যায়-অবিচার। ‘আমি অপমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা’, ‘আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর’, ‘আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের’ ইত্যাদি উক্তির মধ্যে কবি সামাজিক অনিয়ম-অবিচার-বঞ্চনার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। এ সবের বিরুদ্ধেও কবির এই বিদ্রোহ। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করেন-
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি নাকো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো,
আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
এ হলো ‘আমি’র বিধ্বংসী রুদ্ররূপ, যে দেশের ও সমাজের বিদ্যমান সব বন্ধন ও শৃঙ্খল ভাঙবে। এখন প্রশ্ন হলো এ বিদ্রোহ করবে কে? সমাজ থেকে জগদ্দল পাথরকে উৎখাত করতে হলে একজন অসীম সাহসী ‘বীর’ আবশ্যক। বিদ্রোহী কবিতায় নানা গুণের সমাহারে এই বীর পুরুষকেই নির্মাণ করেছেন কবি। তিনি প্রথম কয়েকটি ছত্রে বীরের স্বরূপটি এভাবে চিত্রিত করেছেন-
বল বীর- / বল উন্নত মম শির।
শির নেহারি’ আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির।
মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’/ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দুলোক গোলক ভেদিয়া,/ খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর।
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটিকা দীপ্ত জয়শ্রীর।
এটি বীরের প্রতীক ‘আমি’র মহিমান্বিত রূপ। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন উচ্চকণ্ঠে, এমন জোরালো ভাষায়, অভিনব ছন্দে পূর্বে কেউ কিছু বলেন নি। একজন তরুণ ও নবীন কবিকণ্ঠে এরূপ দ্রোহের কথা সেদিন সকলকে হতচকিত করে দিয়েছিল। এর দু-তিন বছর পরে রচিত ও ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আমি সৈনিক’ (১৪ কার্তিক,১৩২৯) নামে স্বদেশপ্রেমমূলক একটি প্রবন্ধে ‘মহা-সেনাপতি’র কথা বলেছেন কবি। তাঁর উক্তিঃ “আমরা যে আশা করে বসে আছি, কখন সে মহা-সেনাপতি আসবে যার ইঙ্গিতে আমাদের মত শত কোটি সৈনিক বহ্নিমুখে পতঙ্গের মত তার ছত্রতলে গিয়ে হাজির হাজির বলে হাজির হবে। কৈ হে আমার অজানা প্রলয়ঙ্কর মহা-সেনানী, তোমায় আমি দেখি নাই, কিন্তু তোমার আদেশ আমি শুনেছি। আমায় যুদ্ধ ঘোষণার যে তূর্যবাদনের ভার আমায় দিয়েছ, সে ভার আমি মাথা পেতে নিয়েছি।” বিদ্রোহী বীর আর এই ‘মহ-সেনাপতি’ অভিন্ন পুরুষ। কবি এক পর্যায়ে বীরের দ্বৈতসত্তার কথা বলেছেন-
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাঁতে চাঁদ ভালে সূর্য,
মম এক হাঁতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাঁতে রণ-তূর্য।
চাঁদ ও সূর্য, বাঁশরী ও রণতূর্য দুই বিপরীতধর্মী বস্তু। চাঁদ স্নিগ্ধ আলোর এবং বাঁশরী সুমিষ্ট সুরের প্রতীক। অনুরূপ সূর্য শক্তির এবং রণতূর্য যুদ্ধের প্রতীক। এক কথায় বলা যায়, এরূপ সাদৃশ্য কল্পনায় প্রেম ও প্রতাপের দ্যোতনা আছে। এখানে প্রেম অর্থে মানবপ্রেমের কথাই বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ ও মানবপ্রেমের মধ্যে বিরোধ নয়, ঐক্য দেখে থাকেন। নারায়ণ চৌধুরী বলেন, “খতিয়ে দেখলে, নজরুলের বিদ্রোহ ও মানবপ্রেম অভিন্ন। একই উৎস থেকে এই দুই বস্তুর উদ্ভব। কেন না, কোন কবি গুরুতররূপে মানবপেমী না হলে বিদ্রোহী হতে পারেন না। মানবপ্রেমই তাঁর বিদ্রোহের সঞ্চালিকা শক্তি। অন্তরে মানুষের প্রতি অপরিমেয় প্রেমের সঞ্চয় যখন সংসারের অযুত অবিচার-অন্যায়-শোষণ ও অত্যাচারের দৃষ্টান্তে বিপর্যস্ত হবার উপক্রম হয়, তখন মনের ভেতর জাগে ওই সব অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বাসনা আর সেই প্রতিবাদের আবেগেই মানুষকে বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়। বিদ্রোহ প্রতিকারের সন্ধান করে, প্রতিবিধানের রাস্তা খোঁজে। কাজী নজরুলের ক্ষেত্রেও এই রকমটাই হয়েছিল।” [নজরুল-চর্চা, পৃ. ১৯]
বীর যখন বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সে শক্তি ও সৌর্যের প্রতীক; আর যখন প্রেমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সৌন্দর্য ও মাধুর্যের প্রতীক। উভয়ের মিলনে অখন্ড বীরের মূর্তি রচিত হয়েছে বিদ্রোহী কবিতায়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, অভিমান ও ক্রোধ থেকে এই বিদ্রোহের জন্ম। তাঁর ভাষায়- “একদিকে অভিমান, অন্যদিকে ক্রোধ। এই দুইয়ের সংযোগে সৃষ্টি হয়েছে তাঁর সেই বহুল আলোচিত বিদ্রোহ।” তিনি আরও বলেছেন, “সুন্দরের তাড়নাতেই অসুন্দরের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহ।” [নজরুল জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ, পৃ. ১৭৯]। বৃহত্তর অর্থে এ কথার সত্যতা রয়েছে। নজরুল ইসলাম পরে রচিত একাধিক রচনায় সুন্দর-অসুন্দরের প্রসঙ্গ এনেছেন। তিনি সুন্দরের পূজারী, অসুন্দরের ঘোর বিরোধী।
‘আমি’র পরিচয় দিতে গিয়ে নজরুল ইসলাম যেসব উপমা, উল্লেখ, প্রতীক, রূপক, চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন, সেসব সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে দুটি নয়, চারটি ভাবস্তর দৃষ্টিগোচর হয়। ড. ক্ষেত্র গুপ্তের ভাষায় এগুলি হলো- ১. গৌরবে বিশালতায় শক্তিতে এক মহিমান্বিত ‘আমি’; ২. অমঙ্গলরূপী ও ধ্বংসরূপী ‘আমি’; ৩. কমনীয় কোমল লাবণ্যময় ‘আমি’; ৪. শান্তি ও কল্যাণ স্রষ্টা ‘আমি’। বীরের এসব ভাবমূর্তি স্তবক-পরম্পরায় স্থাপিত হয় নি, কোথাও মিশ্রভাবে কোথাও অমিশ্রভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। এগুলির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কবিতায় দ্বিতীয় তৃতীয় এবং চতুর্থ স্তরের কল্পনা প্রতিটি স্বতন্ত্র, স্বয়ংসম্পূর্ণ,- আবার এক ‘আমি’ বিচিত্র উপলব্ধি হিসেবে পরস্পর সম্বন্ধ এবং তারই ফল কবির অভ্রভেদী সামগ্রিক মহিমান্বিত ‘আমি’র অনুভব; কবিতার প্রথম এবং শেষ স্তবকে যা শব্দবিদ্ধ, তা কল্যাণ-অকল্যাণ নিরপেক্ষ এক প্রচন্ড শক্তির উত্থান।” [নজরুলের কবিতাঃ অসংযমের শিল্প, ১৯৯৭, পৃ. ৮-৯]।
এই চারটি ভাবস্তর এক অর্থে কবির চিন্তার প্যাটার্ন বা কাঠামোকে নির্দেশ করে। ফরাসি নৃবিজ্ঞানী লেভি ক্লদ-স্টাউস গঠনবাদের সংজ্ঞা সম্পর্কে বলেন, ংবধৎপয ভড়ৎ ঃযব ঁহফবৎষুরহম ঢ়ধঃঃবৎহং ড়ভ ঃযড়ঁমযঃ রহ ধষষ ভড়ৎসং ড়ভ যঁসধহ ধপঃরারঃু. বিদ্রোহী কবিতার স্তবক-সংখ্যা ১১; চরণ-সংখ্যা ১৩৮। স্তবক থেকে স্তবকান্তরে চিন্তার বিস্তার ঘটেছে, যা ঐ চতুর্বিধ ভাবস্তরের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে, ভাববলয় অতিক্রম করে যায় নি। “বল বীর/ বল উন্নত মম শির।” দিয়ে কবিতার আরম্ভ; এটি কবির প্রস্তাব। “আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির।” বাক্য দিয়ে কবিতার সমাপ্তি; এটি কবির সিদ্ধান্ত। মাঝের আরও তিনটি স্তবকে চরণটি ধুয়ার মতো পুনরাবৃত্ত হয়েছে। অতএব কবির চিন্তার মধ্যে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা অসচ্ছতা নেই।
ভার্জিনিয়া ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here