এরশাদের নাটকীয় অন্তর্ধানের নেপথ্যে

5

নিজস্ব প্রতিনিধি : দল ও জোটের মনোনয়ন-প্রক্রিয়া চলমান থাকার সময় হঠাৎ করেই জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাটকীয় অন্তর্ধান রাজনৈতিক অঙ্গনে রহস্যের জন্ম দিয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের ছোট ভাই জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে ডেকে নিয়ে রহস্যগাথা প্রকাশ করেন।
জাতীয় পার্টি সূত্রেই জানা যায়, এরশাদ কমপক্ষে ৫০ জনের কাছ থেকে জোট ও দলের মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। এদের মধ্যে ১২ জনের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা করে নিয়েছেন। কারো কারো কাছ থেকে ১০ কোটি টাকাও নিয়েছেন। নব্য রাজনীতিক, রাজনীতিতে অখ্যাত এই ব্যক্তিদের কাছে টানা হয়। কাউকে ইতিপূর্বে প্রেসিডিয়ামেও স্থান দেওয়া হয়। অন্যদের কাছ থেকে একে থেকে দুই কোটি টাকা নেওয়া হয়। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করার পেছনেও ছিল মোটা অঙ্কের বাণিজ্য। এ নিয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ থাকলেও এরশাদের সামনে তারা ছিলেন অসহায়। এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। এরশাদ কয়েকবারই বলেছেন, ৩০০ আসনে দলীয় মনোনয়ন তিনিই দেবেন। পার্টিতে মনোনয়ন বোর্ড থাকার পরও এককভাবে তালিকা করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার সাংগঠনিকভাবে এরশাদেরও নেই। এরশাদ এককভাবেই সব আসনে মনোনয়ন দেবেনÑএ কথা সাংবাদিকদের কাছে বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে যাদের সঙ্গে মনোনয়ন-বাণিজ্য হয়েছে তাদের আশ্বস্ত রাখা যে পার্টিতে কোনো বিরোধিতাই টিকবে না। তিনিই সবকিছু করবেন। এরশাদের এই ঘোষণা ও তালিকা করার ঘটনা রওশন এরশাদকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করে। তিনিও পৃথক তালিকা আগেই করে রাখেন। এ ক্ষেত্রে তিনিও বেশ কিছু ক্ষেত্রে মনোনয়ন-বাণিজ্য করেছেন বলে জাতীয় পার্টিরই অনেকের অভিযোগ।
এরশাদ প্রথমে ৮০, পরে ৭০ জন এবং সর্বশেষ ৫৪ জনের যে তালিকা মহাজোটের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেন, তার পেছনে ছিল প্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ জায়েজ করা। সরকারি দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে ৪৫-৪৭টির বেশি আসন দেওয়া সম্ভব নয় জানানোর পরও এরশাদ দর-কষাকষি করেন। যাদের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়েছেন, তাদের কাছে মুখ রক্ষার জন্যই মূলত এই দর-কষাকষি। শেষ পর্যন্ত যখন মহাজোটের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি, তখনই এরশাদ বাসা থেকে আত্মগোপন করেন। টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি, হই-হট্টগোল থেকে বাঁচার জন্যই তার এই রহস্যময়তা। শেষ পর্যন্ত তাদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে। লক্ষণীয় যে এরশাদ ময়মনসিংহে এক অপরিচিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন, যা রওশনকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করে। বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, সাতক্ষীরায় গিয়ে জনসভা করে সেখান থেকে নিজে প্রার্থী হওয়ার কথা বলেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদেরও তার একান্ত বিশ্বস্তজন বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আসেন। রাজনীতিতে অজ্ঞাত, স্থানীয়ভাবেও অখ্যাত এই ব্যক্তিরা শিল্পপতি, শত শত কোটি টাকার মালিক। এ ধরনের আরো ১০-১২ জন রয়েছেন। মহাজোটে কুলিয়ে উঠতে না পেরে এখন দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এরশাদকে এ অসাধু কার্যক্রমে সহায়তা করেন পার্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা দক্ষিণাঞ্চলের এক নেতা, নির্বাচনে যিনি নিজে এবং তার স্ত্রী জোটগত মনোনয়ন পেয়েছেন। এরশাদেরই ভাইপো একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এই অনৈতিক কাজে এরশাদের মুখ্য সহযোগী। তারাও মোটা অঙ্কের অর্থ কামিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরশাদের এই তৎপরতা সম্পর্কে সরকারপ্রধান অবগত রয়েছেন। তিনি জি এম কাদেরকে ডেকে রাজনৈতিক, নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এরশাদের এই কীর্তি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেন। এদিকে এরশাদ তার মনোনয়ন-বাণিজ্যের কাক্সিক্ষত আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ছাড় না পাওয়ায় শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেন। এমনকি দলগতভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রার্থীদের কাছে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ শুরু করেন। এরশাদের অনঢ় অবস্থানের খবর পেয়ে আওয়ামী লীগও শিথিল অবস্থানে এসে জাতীয় পার্টিকে আসনসংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। বিশাল অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার দুশ্চিন্তায়ই এরশাদ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here