বাংলাদেশে রোহিঙ্গা : সঙ্কট কার?

2

বাংলাদেশে এখন নির্বাচনী আমেজে অনেকটাই চাপা পড়ে আছে রোহিঙ্গা ইস্যু। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মিয়ানমার-নেত্রী অং সান সু চির প্রত্যক্ষ সমর্থনে সে দেশের সেনাবাহিনীর বর্বরতার মুখে তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় না দেয়ার অনেক অপশন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসব অপশনের সুযোগ না নিয়ে, নিজ দেশের নানা সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতার দিকে না তাকিয়ে, মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন।
মানবিক এই আচরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু সঙ্কট থেকে উত্তরণের কোন লক্ষণ সামনে দেখা যাচ্ছে না। বরং সঙ্কট দিন দিন আরো জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। আজ প্রায় দু’বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ থেকে বিতাড়ণের পর। মনে করা হয়েছিল এতদিনে পূর্ণ নিরাপত্তায় সসম্মানে তারা নিজ দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও স্বদেশে ফিরে যেতে পারেনি। বরং দু-চারজন করে এখনো বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। এবং দেশে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে বাংলাদেশে, মিয়ানমারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেসব কথাবার্তা এবং কর্মকাণ্ড চলছে, তা হাস্যকর কিংবা জগৎবাসীদের আহাম্মক ভেবে তাদের চোখে ধুলো দেয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না।
বিভিন্ন মাধ্যমে রোহিঙ্গা নিয়ে যেসব কথাবার্তা শোনা যায়, তাতে উপরের ভূমিকা হিসেবে উপস্থাপন করা কথার সমর্থন মেলে। রোহিঙ্গা ইস্যু যেমন বাংলাদেশের এবং মিয়ানমারের, তেমনি মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিকও। তাই বিষয়টির প্রতি সবারই দৃষ্টি নিবদ্ধ এবং রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে সকলেরই এগিয়ে আসা জরুরি। ঠিকানার গত ১৬ নভেম্বর সংখ্যায় ২টি সংবাদ রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে। একটি ৪৪ পৃষ্ঠায়, শিরোনাম- ‘ছাড়পত্র পাওয়া রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে/প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা’ এবং ৪৬ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত দ্বিতীয় সংবাদটির শিরোনাম ছিল- ‘এবার এ্যামনেস্টিও প্রত্যাহার করলো সু চিকে দেয়া খেতাব।’ এরকম সব মিডিয়াতেই প্রতিনিয়ত অবিরাম রোহিঙ্গা সংক্রান্ত খবরাখবর প্রকাশিত হচ্ছে। সেসব সংবাদে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্ট, দুর্দশা-দুর্ভোগ এবং তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা যেমন থাকে, তেমনি থাকে মিয়ানমার সরকার এবং সেনাবাহিনীর সম্মিলিত বর্বরতার কথা। থাকে উৎপীড়ক ও অমানবিক সেনাবাহিনী ও সু চির প্রতি বিশ্ববাসীর নিন্দা, ধিক্কার। আরেক দিকে থাকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের নানা পদক্ষেপ ও উদ্যোগ, এই সঙ্কট সমাধানে। রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে, দুঃখজনক এবং অনাকাক্সিক্ষত হলেও বিভিন্ন দেশের রাজনীতির কথাও শোনা যায়, সেই শৈশবে শোনা গল্পের মত- ‘যা তোমাদের জন্য খেলা, তা আমাদের জন্য মৃত্যু!’
রোহিঙ্গাদের জন্য এই মৃত্যু, দুর্ভোগ, দুর্দশা নিয়ে যে যতই ভাবুক, সমাধানের প্রয়াস দেখাক, আশ্রয় দিয়ে মানবিক মূল্যাবোধের পরিচয় দিক, এই সঙ্কটের একমাত্র সমাধান তখনই হতে পারে, যখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের আশ্রিতের জীবন ছেড়ে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্ন মুক্ত হয়ে, নির্ভয়ে-সসম্মানে জানমালের পূর্ণ নিশ্চয়তা নিয়ে নিজ দেশে, নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে। জমি-জমা, বিষয়-সম্পত্তি ফিরে পাবে। নিজ দেশে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হবে। তার পূর্বে যে যেভাবেই তাদের সাহায্য করুক, স্বপ্ন দেখাক, সাহস দিক, আশ্রয় দিকÑ এ সঙ্কটের সমাধান হবে না।
এখন পর্যন্ত সে রকম কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রকাশিত খবরের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, যে প্রক্রিয়ায় তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়াস চলছেÑ তা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। এমনকি সঙ্কট নিরসনে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক যে সব কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা, চুক্তি হচ্ছে, তাকে রোহিঙ্গারা এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য এবং নৈতিক বলে গ্রহণ করতে পারছে না। স্বদেশে নিরাপত্তা, বাড়িঘর ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার কথা একেবারেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা যায় না। এ ছাড়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে একশো-দুইশো করে শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবসম্মত হয়, সেটাও খুব বড় একটা প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
বাস্তব অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, যে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার ছাড়পত্র পাওয়া রোহিঙ্গারা দেশে না গিয়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ নভেম্বর দুই দেশ- বাংলাদেশ-মিয়ানামরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি গ্রুপের দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাড়পত্র পাওয়া রোহিঙ্গারা অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এর দায়ভারও মিয়ানমার চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে বাংলাদেশের উপর। তাদের অভিযোগ- বাংলাদেশের কারণেই এই প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না। আসলে কথায় যে আছে- দুর্জনের অজুহাতের অভাব ঘটে না। মিয়ানামরেরও অজুহাতের অভাব নেই, সত্যকে অস্বীকার করার। নিজেদের অপকর্ম ঢাকা দেয়ার। দুর্জনের দুর্বৃত্তপনার সমর্থনও জোটে নানা স্বার্থের হিসেব-নিকেশে।
তবে দুষ্কর্মের পরিণতি কোন না কোনভাবে সবাইকেই ভোগ করতে হয়। আর কোন শাস্তি না জুটলেও নিন্দা-ধিক্কার-অসম্মান ঠিকই জোটে। কেননা বিশ্বে অনেক কিছুর অভাব থাকলেও এখনও মূল্যবোধ, মানবিকতা, নৈতিকতা সবার মধ্য থেকে একেবারে উধাও হয়ে যায়নি। এখনও সব মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে বসেনি। তাইতো মিয়ানমারের ঘাতক সেনাবাহিনীকে নিবৃত্ত করা না গেলেও তাদের প্রতি বিশ্বব্যাপী ধিক্কার কম জুটছে না। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জাতিগত নির্যাতানের জন্য সে দেশের সেনাবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়ার জন্য সে দেশের নেত্রী অং সান সু চিকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। এবং সেজন্য ৬জনের মত জেনারেলকে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সু চির বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। জাতিসংঘ, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান একদা যে নেত্রীকে গণতন্ত্রের কন্যা হিসেবে বিভিন্ন সম্মানে এবং খেতাবে ভূষিত করেছিল, তারা সেসব উপাধী ও সম্মান প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন- এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত ১২ নভেম্বর এক ঘোষণায় সু চির খেতাব প্রত্যাহার করা সংক্রান্ত বিবৃতিতে বলেছে- সু চি তার এক সময়কার নৈতিক অবস্থান থেকে লজ্জাজনকভাবে সরে যাওয়ার কারণে তাদের খেতাব প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া নিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানরা জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে সু চির বিরুদ্ধে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের খেতাব প্রত্যাহার নেয়ার আগেও কানাডার পার্লামেন্টে দেয়া সম্মানসূচক নাগরিকত্ব, বৃটেনের অক্সফোর্ড শহরের দেয়া সম্মাননা, গ্লাসগো নগর কাউন্সিলের দেয়া ফ্রিডম অব সিটি খেতাবও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। অবশ্য স্বার্থের বেড়াজাল এমনই অন্ধ করে দেয় মানুষকে যে তারা মনুষ্যত্ব, মানবতা সব হারিয়ে ফেলে। সু চির ক্ষেত্রেও ঠিক যেনো তা-ই ঘটেছে।
অবশ্য সু চির প্রতি আন্তর্জাতিক ধিক্কার উচ্চারিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দূর হবে না। দেশে ফিরে যাওয়ার নিরাপদ রাস্তাও তৈরি হবে না। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের জন্য যে সমস্যা ও সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তারও অবসান ঘটবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে তা পালনে মিয়ানমারকে বাধ্য করা না যায়। আমেরিকার মতো দেশও আজ অবৈধ কোন ইমিগ্র্যান্টকে দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না। দেয়াল তুলে, সীমান্তে সৈন্য পাঠিয়ে অভিবাসী ঠেকানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে নিশ্চয় কোন অপরাধ করেনি। সুতরাং বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের ধারণায় বাংলাদেশের আজকের যে সঙ্কট, সে সঙ্কট কেবলই বাংলাদেশের ভাবা ঠিক হবে না। এ সঙ্কট যেমন রোহিঙ্গাদের, তেমনি বাংলাদেশের, একই সঙ্গে বিশ্ব মানবতারও।
তাই বিশ্ব মানবতা রক্ষার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, বিশ্ব মানবতায় বিশ্বাসী সবাইকে নিয়েই এ সঙ্কট সমাধানের পথ বের করতে হবে। দানবের কাছে মানবতার পরাজয় কখনও ঘটতে পারে না। আমাদেরও প্রত্যাশা ও প্রার্থনা- মানবতার জয় হোক। দানবের হোক পরাজয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here