বিজয় দিবসে গণপ্রত্যাশা

7

‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’। মাতৃভূমি রক্ষার এই বাসনার কথা আমরা জানি। এই মেদিনী বিশেষ এক অঞ্চলের নাম হলেও এই অঙ্গীকার সর্বজনীন রূপে উদ্ভাসিত। বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বর। এবারের নির্বাচনে সে রকম যুদ্ধেরই আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যেসব দল এবং প্রার্থীদের মাঠে দেখা যাচ্ছে তাদের কথাবার্তা, শারীরিক ভাষা, সবকিছুতে সে রকমটাই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পারস্পরিক দোষারোপ চলছে। কাউকে একচুলও ছাড় না দেওয়ার হুংকার। জনমনে আতঙ্ক দূর না হয়ে আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সামনে আরও কী হয় তা নিয়ে শঙ্কিত সবাই।
এ রকম এক আবছা পরিবেশ, শঙ্কা এবং আতঙ্কের মধ্যেই বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবস পার হয়ে ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের একাদশ নির্বাচন। বিজয় দিবসে আমাদের যে আচরণ হবে, যে অঙ্গীকার হবে সেই আচরণ অটুট অক্ষুন্ন রেখে আমরা ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন পাড়ি দিতে পারব কি না সেটাই দেখার বিষয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস বাংলাদেশের মানুষের জন্য একেবারেই অন্য রকম একদিন। তুলনাহীন আনন্দ-বেদনার মিশ্র আবেগ ও অনুভূতির দিন। স্বাধীন দেশে মুক্ত বাতাসে মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নেওয়ার দিন।
আনন্দের দিন এ কারণে যে, ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করে। স্বাধীনতার চেয়ে আর বড় কোনো গৌরব হয় না, বলেই কবির ভাষায় প্রকাশ পায় স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে’। জন্মভূমিকে আমরা মনে করি স্বর্গাদপী গরীয়সী। সেই মাতৃভূমির পরাধীনতা কেউ মেনে নিতে পারে না। তার এক ইঞ্চি মাটিও আরও দখলে থাক কোনো স্বাধীনচেতা মানুষ যেমন মেনে নেয় না, বাংলাদেশের মানুষও মেনে না নিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করে। তাই স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক-এ এক অতুলনীয় আনন্দের অর্জন। একই সঙ্গে বেদনার এবং কান্নারও। এই স্বাধীনতার বেদিমূলে ৩০ লাখ বাঙালিকে জীবন উৎসর্গ করতে হয়। দখলদার বাহিনীর লালসার শিকার হয় প্রায় ২ লাখ মা-বোন।
এ কথা আস্থার সঙ্গেই বলা যায়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণই ছিল দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করতে বাঙালিদের প্রতি প্রস্তুতি নেওয়ার প্রত্যক্ষ ডাক। ওই ভাষণে বাঙালিরা স্পষ্ট বুঝে নিতে পারে, দেশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, বঞ্চনা, অপমান, অসম্মান, নিপীড়ন থেকে মুক্ত হতে কী করতে হবে আগামী দিনে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনে বাঙালিদের করণীয় বাস্তবায়নের সময়ও এসে যায় সহসাই। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সকল শক্তি ও বর্বরতা নিয়ে যখন ঘুমন্ত বাঙালি নিধনে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে, তখন মানুষ হকচকিত হলেও করণীয় নির্ধারণে তাদের বিন্দুমাত্র সময় লাগে না। এক রাতেই বর্বর হানাদার বাহিনীর হাতে হাজার হাজার স্বজন মৃত্যুবরণ করেন। সেই স্বজন হারানোর বেদনায় বাঙালি ভেঙে না পড়ে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার তাড়নায় মনে করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের নির্দেশনা। সেই নির্দেশনা ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য বুকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ইতিহাস অবশ্য এ কথাও সমর্থন করতে বাধ্য যে বাংলার মানুষ চিরদিনই স্বাতন্ত্র্যবোধে উজ্জ্বল। তারা কারও বশ্যতা মানে না। কারও দমন-পীড়নে, নির্যাতনেও নিজেদের জাত্যাভিমান, নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট বিসর্জন দেয় না। তারা জীবন দেয়, মান দেয় না। তারা ‘জ্বলেপুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। ফসলের গোলা আর মা-বোনের ইজ্জত তাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। এ দুইকে রক্ষা করতে তারা এমন কোনো কিছু নেই, যা করতে জানে না। খুব দূর অতীতে তাকানোর প্রয়োজন নেই এ কথার সমর্থনে দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে। মাত্র আড়াই শ বছর পেছনে তাকালেই বাঙালির শৌর্য বীর্য, মাথা না নোয়ানোর অনেক দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়।
ব্রিটিশরা বণিক সেজে বাংলায় আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে ব্যবসা খুলে বসে। এটা ছিল আবরণ। আসল লক্ষ্য ছিল উপনিবেশ স্থাপন, রাজ্য বিস্তার। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তাদের সেই লক্ষ্য চূড়ান্তভাবে অর্জিত হয় পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে। ওই যুদ্ধে যেমন আত্মবিক্রীত কতিপয় দালালের নির্লজ্জ দালালি দেখা যায়, তেমনি কিছু বীর স্বাধীনতা রক্ষায় যুদ্ধ করে বীরের মরণ বরণ করেন। এরপর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ক্রমাগত যে লড়াই চলে তাতে বাঙালিদের লড়াই-সংগ্রাম ব্রিটিশের নির্যাতনের শিকার হওয়া, জীবন দান স্বাধীনতার ইতিহাসকে মহিমান্বিত করেছে। সেই ইতিহাসের পাতায় পাতায় আমরা আমাদের গৌরব খুুঁজে পাই। সেই গৌরবের প্রমাণ মেলে ১৯৪৭-এ ব্রিটিশকে তাড়িয়ে যখন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই পাকিস্তান অর্জনেও বাঙালির বীরত্বগাথা ইতিহাস স্বীকৃত।
তবু সেই গৌরবের স্বীকৃতি মিলল না পাকিস্তানি শাসককুলের কাছেও। উল্টো বুটের তলায় তা মলিন হলো। বাঙালির রক্ত-মাংস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, ভাষা-সংস্কৃতি সব চিবিয়ে খাওয়া শুরু করল। তাদের আক্রোশ আর বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হলো মাতৃভাষা বাংলা। বাঙালি বীরের জাতি এবং মাথা না নোয়ানোর জাতিÑএ ইতিহাস তারা ভুলে গেল, বাঙালি ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিতে অর্জিত পাকিস্তানের শাসককুলকে স্মরণ করিয়ে দিল রক্ত এবং জীবনের বিনিময়ে। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল-২৪ বছর। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বঞ্চনা-বৈষম্য অসম্মান আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালিদের লড়াই-সংগ্রাম করে করে জীবন দিতে দিতে অবশেষে শেষবারের মতো না বলা। ঘুরে দাঁড়াল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শেষ আঘাত আর বাঙালিদের শেষ প্রতিরোধ।
এক পক্ষে কামান-বন্দুক, মারণাস্ত্র। একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সকল আয়োজন। অন্যদিকে বজ্রকণ্ঠ জীবনের জয়গান। জীবন দিয়ে জীবন লাভের আহ্বান ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ৭ মার্চ ১৯৭১। রেসকোর্সের মহাসমুদ্রে মানুষের মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর শীত বিকেল। রাজধানীর রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, পুলিশ লাইনে রক্ত¯্রােত থেকে রেসকোর্সে বিজয়োল্লাস। জীবনের কাছে মৃত্যুও, স্বাধীনতার কাছে পরাধীনতার পরাজয়। মানুষের জীবনসংগ্রামের অগ্রযাত্রা রোধ করার সাধ্য কার। ইতিহাস মানুষের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, শুভর পক্ষে। মানবের কাছে দানবের হার-সেই তো শাশ্বত ফয়সালা। তাইতো দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ- অনুসারীরা ‘ইসলাম গেল’ চিৎকারে কণ্ঠে রক্ত তুললেও শেষ রক্ষা হয় না মানুষের মুক্তির তাড়নার কাছে। স্বাধীনতা আনতে গিয়ে ৩০ লাখ মানুষ গৌরবের মৃত্যুবরণ করলেও দখলদার বাহিনীকে প্রায় ৯৫ হাজার সৈন্য ও গোলাবারুদসহ লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করতে হয়।
এত আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সেই স্বাধীনতার এবার ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। বাঙালিরা আত্মমর্যাদা নিয়ে গর্বিত। তাই তাদের এত অহংকার। সেই অহংকারে উজ্জীবিত বাঙালিরা আজকের বাংলাদেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন অগ্রগতিতে আনন্দিত এবং আশাবাদী। আবার মৌলিক কতকগুলো বিষয়ে শাসকগোষ্ঠীর অমনোযোগিতা ও অবহেলায় পিছিয়ে থাকায় গভীরভাবে হতাশও। যুবসমাজের একটা চাহিদা থাকে। তারা একটা আধুনিক রাষ্ট্র চায়। বর্তমান সময়ের উপযোগী একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করা কখনোই সম্ভব হবে না, যদি দেশে অসুস্থ রাজনীতির চর্চা পরিহার করা না যায়। এ জন্য চাই রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহনশীলতা, অসাম্প্রদায়িক সামাজিক সম্পর্ক সম্পন্ন শক্ত সামাজিক ভিত্তি। যাদের আমরা সংখ্যালঘু বলে চিহ্নিত করি তারা এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর পূর্ণ নিরাপত্তা।
এবার ডিসেম্বর মাস শুধু বিজয়ের মাস নয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেরও মাস। সেই নির্বাচন ঘিরে দেশব্যাপী ডামাডোল। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজয় দিবস উদ্্যাপন করতে গিয়ে এবার অনেক রকম প্রশ্ন আসবে। ’৭১ এর দিনগুলো এবং ’৭১ পূর্ববর্তী অবস্থা নিয়েও কথা হবে। মুক্তিযুদ্ধের ৪ স্তম্ভ, ’৭০ এর নির্বাচনকালীন সব প্রতিশ্রুতির কথাও উঠবে। এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব পাওয়া না পাওয়া ভোটের ফলাফলে অনেক প্রভাব ফেলবে বলে সমাজ চিন্তকরা মনে করছেন। এছাড়া স্বাধীন দেশের ইতিহাস রচনাতেও এসবের জবাব থাকা জরুরি।
প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদ্্যাপনের পূর্বে মনে পড়ে যায় ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস। এদিন জাতিকে মেধাশূন্য করে দেওয়ার ঘৃণিত উদ্দেশ্যে জাতির সেরা সন্তানদের হত্যা করে রাজাকার আলবদররা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় শহীদ-গাজী সকল মুক্তিযোদ্ধা, স¤্র¢মহারা, মা-বোনকে স্মরণ করার পাশাপাশি শহীদ বুদ্ধিজীবীদেরও স্মরণ করছি। প্রত্যাশা করছি এবারের বিজয় দিবস উদ্্যাপনের মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে যাব প্রকৃত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের পথে।
প্রবাস, স্বদেশ সবাইকে এবং ঠিকানার অগণিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আসুন, স্বাধীনতার মহিমা ও বিজয়ের গৌরব আমরা ছড়িয়ে দিই বিশ্বময়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here