কাকে ভোট দেবো

3

এম এ খালেক

একাদশ জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। সবকিছু ঠিক থাকলে ৩০ ডিসেম্বর বহুল প্রত্যাশিত এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো এরই মধ্যে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এবারের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ নিবন্ধিত প্রায় সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সব দলের অংশগ্রহণের ফলে নির্বাচনটি কোনোভাবেই ২০১৪ সালের মতো একতরফা এবং ভোটারবিহীন নির্বাচন হবে না।
নানা কারণেই আগামী জাতীয় নির্বাচন দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করবেন। বর্তমানে যারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন- তারাই আরও পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, নাকি অন্য কোনো দল বা জোট রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবে, তা নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘের রেটিং অনুসারে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশ তার উন্নয়নের ধারা টেকসই এবং বহাল রাখতে পারলে ২০২৪ সালের মধ্যে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করবে। কাজেই যেকোনোভাবেই হোক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বেগবান এবং গতিশীল রাখতে হবে।
বর্তমান সরকারের আমলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একই সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরে ব্যাপক দুর্নীতি এবং অনাচারের বিস্তার ঘটেছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে তাদের আমলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, তা ভোটারদের নিকট তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে ভোট প্রার্থনা করবেন। কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, দেশের কোনো নাগরিকই দুর্নীতি এবং অনাচারের বিনিময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কামনা করে না। তারা আন্তরিকভাবেই চায়- অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সুনীতি পরস্পর হাত ধরে চলুক। কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষম হয় না।
অনেকেই আছেন, যারা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নানা ধরনের দুর্নীতি আর অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। এদের অপকর্মের দায়ভার চূড়ান্তভাবে সরকারকেই বহন করতে হয়। আমাদের মতো দেশের কোনো সরকারই জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। ফলে পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ পরিবর্তন কামনা করে। মানুষ যে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সুকর্মের কারণে তাদের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ভোট প্রদান করে, তা নয়। তারা বিদ্যমান সরকারের নানা অন্যায় এবং অপকর্মে বিরক্ত হয়ে প্রতিশোধমূলকভাবে বিরোধী দলকে ভোট দেয়। বর্তমান সরকারের আমলে দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নানা ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সেই উন্নতির সুফল কি সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে? এসব বিষয় আগামী নির্বাচনে বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
আগামী নির্বাচনে সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করাটা নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। আমাদের দেশে এবারই প্রথম দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জাতীয় সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই কোনো কারণে যদি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে আগামী দিনে আর কোনো নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে না। কাজেই নির্বাচন যাতে মোটামুটি স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকেই নানাভাবে ভোটারদের কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুকূলে ভোট প্রদানের জন্য উৎসাহিত এবং প্রলুব্ধ করছেন। সেদিন একজন রাজনৈতিক কলামিস্টের প্রতিবেদন পাঠ করে বিস্মিত হলাম। তার পছন্দের রাজনৈতিক দলটি যেহেতু কোনো কোনো ক্ষেত্রে অযোগ্য এবং বিতর্কিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে; তাই তিনি লিখেছেন- এবার প্রার্থী দেখে নয়, মার্কা (প্রতীক) দেখে ভোট দিন। তার এই বক্তব্য বা আহ্বান কতটা যৌক্তিক, তা বিবেচনার দাবি রাখে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক ভালো হলেই যে সেই দলের খারাপ প্রার্থীও ভালো কাজ করতে পারবেন, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
প্রতীক কোনো ব্যক্তিকে মহৎ করে না বা তার কাজকে প্রভাবিত করতে পারে না; বরং ব্যক্তিই প্রতীককে মহৎ করে। কাজেই একমাত্র নির্বোধ ব্যক্তি ছাড়া কেউই শুধু প্রতীক দেখে ভোট দিতে পারেন না। কোনো অবস্থাতেই শুধু প্রতীক দেখে কাউকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না। প্রতীকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা। কয়েক দশক আগে একটি সেøাগান আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সেøাগানটি হচ্ছে- ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে ইচ্ছা তাকে দেবো।’ এই সেøাগানের মধ্যেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ‘আমার ভোট আমি দেবো, যোগ্য লোক দেখে দেবো’- সেøাগানটি এমন হলে বরং ভালো হতো। কারণ ভোট জনগণের একটি পবিত্র আমানত। সেই আমানত যাকে-তাকে দেয়া যায় না। আমি যদি কোনো বাজে লোককে ভোট দেই এবং নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি খারাপ কাজ করেন, জনগণের ‘হক’ নষ্ট করেন; তাহলে সেই অপরাধের কিছুটা দায়ভার আমার ওপরও বর্তাবে। কারণ ভোটদানের মাধ্যমে আমি তাকে অপকর্ম করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছি। আবার আমি যদি কোনো ভালো মানুষকে ভোট দেই এবং তিনি নির্বাচিত হয়ে জনগণের সেবায় ভালো কাজ করেন, সেই ভালো কাজের সওয়াব আমি কিছুটা হলেও পাবো। কারণ আমিই তাকে এই ভালো কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছি। কাজেই ভোট প্রদানের সময় আমাদের সবাইকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে, যাতে আমার ভোটে কোনো বাজে লোক নির্বাচিত হতে না পারে।
একটি সমাজ নানা ধরনের মূল্যবোধ এবং আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। এই আদর্শ বা মূল্যবোধ অত্যন্ত যতœ করে লালন করতে হয়। আমাদের দেশ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতীয় চেতনা গড়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। অর্থনৈতিক অর্জনের সুফল সবার জন্য ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্তির ব্যবস্থাকরণ। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় চেতনা ছিল জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করা। সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই চেতনাগুলো কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে ভোটপ্রাপ্তির আশায় স্বাধীনতাবিরোধী, স্বৈরাচারী, এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে হাত মেলাতে দ্বিধা করছে না। আমরাই স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে রাষ্ট্রীয় পতাকা তুলে দিয়েছি। এসব অনৈতিক কাজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি অনেক দিন ধরেই। কাজেই আমাদের মুখে নীতিবোধের কথা কতটা মানায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ আছে বৈকি!
নির্বাচনে আমি ভোট দেবো, এটা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু তাই বলে অন্যকে প্রভাবিত করার কোনো অধিকার আমার নেই। আমি তাই বলতে পারি না, আপনি কাকে ভোট দেবেন। কারণ একজন লেখক হিসেবে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীর মতো আচরণ করতে পারি না। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, কাকে ভোট দেবো। আগেই বলা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নানা কারণেই রাষ্ট্রীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে অমীমাংসিত অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। নির্বাচনে আমি এমন একজনকে বেছে নেবো, যিনি সব বিবেচনায় উপযুক্ত এবং সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণ করতে সক্ষম।
আমি সেই ব্যক্তিকে ভোট দেবো না, যিনি যুদ্ধাপরাধী; যার বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ খেলাপের অভিযোগ রয়েছে বা কোনো ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। এমন ব্যক্তিকে কোনোভাবেই সমর্থন করব না, কোনো ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই অবধারিতভাবে যার নাম চলে আসে। যারা সমাজে চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের জন্ম দেয়, তাদের আমি সমর্থনের কথা চিন্তাও করি না। যেসব প্রার্থী নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেই দলবদল করেন, এমন রাজনৈতিক নীতিহীনদের আমি সমর্থন করতে পারি না।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় এলেই তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তারা নির্বাচিত হলে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে যান। কাজেই নির্বাচনে কোন দল কী প্রতিশ্রুতি দিলো, তা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। দলটির নেতানেত্রীদের অতীত আচরণ, তাদের সততা, আন্তরিকতা, দেশপ্রেম, তারা কি অর্থের পেছনে ছুটেন, না কি সাধ্যমতো জনকল্যাণ করতে চান- ভোট প্রদানের সময় সেসব বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার। মার্কা দেখে ভোট প্রদানের আহ্বান নির্বোধের প্রলাপ ব্যতীত আর কিছু নয়। কারণ মার্কা কখনোই একজন ব্যক্তির আচার-আচরণ এবং চরিত্র পরিবর্তন করতে পারে না। তাই মার্কা দেখে ভোট প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।
যারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই পুরনো রাজনীতিক। কাজেই তাদের চরিত্র ও আচার-আচরণ আমরা মোটামুটি জানি। সেই জানাকে ভিত্তি করেই ভোট প্রদান করতে হবে। ভোট এলে সবাই মিষ্টি কথা বলেন। তাই বলে তাদের সেই মিষ্টি কথায় ভুললে চলবে না। নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা কাজে লাগিয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে। মানুষ সাধারণত দুই সময় খুব ভালো হয়ে যায়। একটি হচ্ছে নির্বাচনের আগে। আর দ্বিতীয়টি- মানুষ যদি তার মৃত্যুর দিনক্ষণ জানতে পারে, তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খুব ভালো থাকার চেষ্টা করে।
কাজেই নির্বাচনের আগে যারাই ভালো কথা বলুক না কেন, তাতে ভুললে চলবে না। কয়েকদিন আগে এক এলাকার এমপি প্রার্থী তার সংগঠনের সদস্যদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। এটা ভালো সংবাদ। কিন্তু অন্যায় করে ক্ষমা চাইলেই কি সব শেষ হয়ে গেল? আবার নির্বাচিত হলে তিনি যে এর চেয়েও বেশি অপকর্ম করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী?
কে কোন দল সমর্থন করলেন, তা যত না বিবেচ্য বিষয়; তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেমন? ভোট আমার পবিত্র আমানত। সেই আমানত আমি সঠিকভাবে উপযুক্ত ব্যক্তির অনুকূলে প্রয়োগ করব।
লেখক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here