বিজয়ের মাসে আরেক বিজয় : হেসেখেলে সিরিজ জয়

4

স্পোর্টস রিপোর্ট : যাই, কেডস পরে সাইকেলটা নিয়ে ওপাড়ায় সন্ধ্যায় ব্যাডমিন্টন খেলে আসি ৮ উইকেটের জয়, তাও ৬৯ বল হাতে রেখেÑ সিরিজ জয়ের এমন মুহূর্তেও কত ভাবলেশহীন বিজয়ী মুখগুলো। অথচ আগে কত কিই হতো এক বছরে যারা তিন সিরিজের তিনটিতেই জিততে পারে, তাদের কাছে এমন ম্যাচ পাড়ার ওই ব্যাডমিন্টন খেলার মতোই আসলে বাইরের আগুন নয়, টাইগারদের অন্তরের তীব্র রিক্ততা এখন ফুটে ওঠে শুধুই মাঠে। আর সে কারণেই সৌম্য ওভাবে নিন্দয় হয়ে পাঁচটি ছক্কা হাঁকাতে পারেন, তামিম ওভাবে জয় নিশ্চিত করেই কেবল মাঠ ছাড়তে পারেন, মিরাজ ওভাবে গুনে গুনে উইকেট শিকার করতে পারেন। বছরজুড়ে তাদের এ চেহারাই তো দেখেছে বিশ্ব ক্রিকেট, বছরের শেষে এসেই বা কেন ছন্দপতন হবে। এ দিন লাক্কাতুরায় টিলার ওপাশে ডুব দেওয়া ঘোলাটে সূর্যটাও বোধহয় তাই বলে যাচ্ছিল, মনে করিয়ে দিচ্ছিল, বছর শেষের বিদায়বেলায় মিষ্টি একটি জয় দিয়ে গেলাম। কুড়িতে তেরো জয়, তিন সিরিজের তিনটিতেই ট্রফিÑ এই হিসাবই বলে দেয়, ওয়ানডেতে বছরের অ্যালবামটা কত উজ্জ্বল, কত মিষ্টি।
আসলে মিরপুরে ওই ম্যাচটি হারার পর এ দিনের অঘোষিত ফাইনালটি যে এতটা একপেশে হবে, তা অনেকেই ভাবতে পারেননি। এমনকি ক্যারিবীয় অধিনায়ক রোভম্যান পাওয়েলও না। আমরা আসলে এতটা খারাপ দল নই। এই ম্যাচে আমরা উইকেট বুঝতে ভুল করেছি। বিশ্বকাপে দেখবেন আমরা কত ভালো খেলি। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে কাচুমাচু মুখে বলছিলেন পাওয়েল। কিন্তু তিনি কি জানেন, আগের দিন কি ভুলটাই না তিনি করেছেনÑ বাংলাদেশিরা পেস বলে নড়বড়ে। এ কথাটি যে ভীমরুলের চাকে ঢিল মারার মতো বিপজ্জনক ছিল, তা বুঝতে পারেননি ক্যারিবীয়রা। মূলত ওই কথা নিয়েই ম্যাচের আগে টাইগারদের ড্রেসিংরুমে সবাইকে তাতিয়ে দেওয়া হয়। কম্বিনেশনে সৌম্যকে তিনে এনে তৈরি রাখা হয় ক্যারিবীয় পেস মোকাবেলার, সাত নম্বরে সাইফউদ্দিনকেও আনা হয় হার্ড হিটিংয়ের জন্য। সব মিলিয়ে এই ম্যাচ জেতার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন মাশরাফি। তবে তাকে অতটা টেনশন নিতে হয়নি। টস জিতে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মিরাজকে তৈরি রেখেছিলেনন ক্যারিবিয়ান টপঅর্ডার ভেঙে দেওয়ার জন্য। মাশরাফির কথায় টস জেতাটা আমাদের এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। আর বোলাররাও সারাক্ষণ তাদের চাপে রাখতে পেরেছে। ঠিক এই কৌশলটাই ছিল শুরুতে। এক দিক থেকে মিরাজকে বোলিং করিয়ে ডট দিয়ে যাও, অন্য দিক থেকে সাকিব উইকেট তুলে নেবে। এ দিন অবশ্য সাকিব নন, শুরুর দুই উইকেট নিয়েছিলেন মিরাজই। তার অমন টাইট বোলিং দেখে টানা আট ওভার করিয়ে যান মাশরাফি। মাঝে সাইফউদ্দিন এসে স্যামুয়েলসকে বোল্ড করে দিলে পরের কাজটি আরও সহজ হয় যায় অধিনায়কের। ওই মুহূর্তে রানের জন্য ছটফট করতে থাকা ক্যারিবীয়দের সামনে আবার মিরাজকে নিয়ে আসেন তিনি এবং এবার রীতিমতো জাদু। ৯৬ থেকে ৯৯ তিন উইকেট পড়ে যায় উইন্ডিজের। দেয়াল বলতে কেবল ওই শাই হোপ। ঢুবন্ত জাহাজের শেষ যাত্রী হিসেবে একা হোপই লড়ে যাচ্ছিলেন। তার অপরাজিত ১০৮ রানের ইনিংসের পর ক্যারিবীয়দের মান বাঁচলেও দুইশ পার হয়নি (১৯৮/৯)।
স্কোর বোর্ডে এই পুঁজি থেকেই গ্যালারিতে আগাম জয়ের উৎসব শুরু হয়ে যায়। সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনের লাইটকে তখন মাঠের জোনাকি পোকার মতো মনে হতে থাকে। আর ওই আলোতেই যেন জ্বলে ওঠেন তামিম আর লিটন। দারুণ কিছু শটে বাউন্ডারি হাঁকানোর পর লিটন ভুল করেন পাওয়েলের শর্ট বলে। কিন্তু ৪৫ রানে ১ উইকেট খোয়ানো দলকে এর পরও একটি মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি ম্যাচে ব্যাকফুটে আছে তারা। পিচ স্পিন সহায়ক হতে পারেÑ এমনটি ভেবেই ওসানে থমাসকে বিশ্রাম দিয়ে ক্যারিবীয়রা নামিয়েছিলেন এক স্পিন অলরাউন্ডার ফ্যাবিয়েন অ্যালেনকে। কিন্তু এ দিন কারও নাম ধরে ধরে ব্যাটিং করার মতো মুড ছিল না সৌম্য সরকারের। অনেক দিন পর পছন্দের তিন নম্বরে ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়ে তার পুরোটা কাজে লাগিয়েছেন তিনি। স্যামুয়েলসকে গুনে গুনে যে ছক্কা হাঁকিয়েছেন তার মধ্যে বোধহয় লুকিয়ে ছিল তার ভেতরের সব জেদ। একটি ছক্কা তো এত বড় ছিল যে, মাঠের বাইরে চলে যায়। তামিম অবশ্য তার পরিণত ব্যাটিং স্টাইল থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন মনে করেননি। ৬২ বলে ৫০ রান করার পর তামিম কিছুটা সুযোগ দিয়েছিলেন সৌম্যকে। একসময় তো এমন অঙ্ক চলে আসে যে, দলের জয়ের জন্য দরকার ২৫ রান আর সৌম্যর সেঞ্চুরির জন্য ২১ রান তামিম ওই সময় বেশি বেশি স্ট্রাইক রোটেড করে সৌম্যকে সুযোগ দিয়েছিলেন। স্পিন খেলতে অস্বস্তি এমন অপবাদ থেকেও এদিন বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি।
তবে সেঞ্চুরি নয়, ৮১ বলে ৮০ রান করে কেমো পলের বলে বোল্ড হয়ে যান সৌম্য। এরপর মুশফিকের ছক্কা ছিল শুধুই দ্রুত ম্যাচ শেষ করার তাগিদ থেকে। আর শেষ পর্যন্ত দলকে জিতিয়ে তামিমও ৮১ রানে অপরাজিত থেকে যান। ম্যাচের পর প্রিয় নায়কদের অটোগ্রাফ নিতে ড্রেসিংরুমে ভিড় করেছিলেন অনেকে। আর তা নিয়েই অতি উৎসাহী ভলেন্টিয়ারদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন তারা। সিলেটের এ ভেন্যুতে টাইগারদের প্রথম জয় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গর্বের কমতি ছিল না। দেশের মতো সবাই তো বাংলাদেশি, এ দেশের সব মাঠই আমাদের কাছে সমান। তবে সিলেটের প্রথম জয় বলে অবশ্যই ভালো লাগছে। মাশরাফির মুখে এই কথাটুকুই যেন শোনার অপেক্ষায় ছিলেন সিলেটীরা। ম্যাচের পর মাঠের নিভে আসা বাতির মধ্যেও তাই লাক্কাতুরার টিলার মাথায় আলো ধরা পড়ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here