সামনে নির্বাচন, নতুন বছর, শুভ হোক সবকিছু

6

সামনে নির্বাচন বাংলাদেশে। সামনে নতুন বছর বিশ্বজুড়ে। তাই তো উত্তাপ-উত্তেজনা-উচ্ছ্বাস দুনিয়াব্যাপী। বাংলাদেশে তার মাত্রা একটু বেশিই নির্বাচন ঘিরে। সময়ের গতি কী দুরন্ত। সামনে তাকাতে না তাকাতেই ফুড়ুৎ ২০১৮। মনে হয়, এক নিঃশ্বাসেই এক বছরের আয়ু। ২০১৭-তে বন্ধ চোখ ২০১৮-তে খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে ২০১৯!
নতুন বছর যত দ্রুতই পুরাতন হয়ে যাক না, মানুষের মনে নতুন নতুন স্বপ্ন জাগিয়ে যায়। মানুষ নতুন নতুন প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে ওঠে। বিগত বছরের না পাওয়ার হতাশা নতুন বছরের প্রাপ্তি-প্রত্যাশায় তা পূর্ণতা পাবে। বাস্তবে যদিও কোনো দিন অঙ্কের মতো দুই আর দুইয়ে চার হয় না। কল্পনা আর বাস্তবের মিলনে মানুষের চাওয়া-পাওয়াটা কখনোই ষোলোকলায় ভরে ওঠে না। তবু নতুন বছর এলেই কত স্বপ্নের ভিড়। কত শুভ ভাবনা, শুভ স্বপ্ন। কত কল্যাণ কামনা। অথই সমুদ্রে যারা হাবুডুবু খায়, তারা তীর ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে। পঙ্গুও পাহাড় ডিঙানোর স্বপ্নে বিভোর হয়।
বাংলাদেশের মানুষও নতুন বছর নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনে চলেছে। প্রিয়জন হারিয়েও স্বপ্নবিমুখ হতে চায় না মানুষ। এবারও তো অনেক জ্ঞানী-গুণী, প্রিয়জন বিদায় নিয়েছেন। প্রতিবছরই মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে কত ফারাক, কত গরমিল থাকে। এ ছাড়া সমাজে কত পঙ্কিলতা, আবিলতা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অন্যায়-অবিচার, অসংগতি, দুর্যোগ-দুর্নীতি। সহিংসতা, খুন, রাহাজানি। সেই যে সাম্য-মৈত্রী- স্বাধীনতার মহামন্ত্রে গড়ে উঠেছিল সামাজিক চুক্তি, তা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার আবর্তে। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন এখন ধনিক-বণিক ক্ষমতাবানদের পায়ের ভৃত্য। গর্ব এখন দম্ভ, বীরত্ব বাহাদুরি। নতুন বছরে মানুষের প্রার্থনা থাকে সেই মানবিক সমাজ ফিরে পাওয়ার। মানুষ কামনা করে শান্তি ও সভ্যতার। ধ্বংস নয়, সৃষ্টির। যুদ্ধ, প্রাণহানি, রক্তপাত নয়Ñএমন একটা সমাজ, যার মূল চেতনা হবে ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’।
বাংলাদেশের মানুষের সামনে শুধু নতুন বছর নয়। সে কারণে তাদের প্রার্থনা পুরাতন বছরের পুনরাবৃত্তি নয়। তাদের সামনে নতুন বছরের পাশাপাশি নতুন একটি সরকারের প্রত্যাশা। নির্বাচন হচ্ছে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে। যে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন ৩০ লাখ মানুষ। সম্ভ্রম খোয়াতে হয় ২ লাখ মা-বোনের। সেই মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের যে তাৎপর্য, তাতে মানুষের প্রত্যাশা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী যারা এবং সমাজে ও রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যাদের, তারা বিজয়ী হোক। নতুন বছরের প্রত্যাশা পূরণে প্রতিবার ঘাটতি থাকলেও নির্বাচনে মানুষের প্রত্যাশা এবার পূরণ হয়েছে। যদিও নতুন বছরের প্রত্যাশা এবং নির্বাচনে ভোটের ফলাফল প্রত্যাশার মধ্যে অনেক তফাত থাকে। প্রতিবছর শেষেই আসে নতুন বছর। অন্যদিকে নির্বাচন আসে ৫ বছর অন্তর অন্তর। তাও অনেক নির্বাচনে সব ভোটারের ভোট দেওয়ার সুযোগ হয় না। অন্যদিকে নতুন বছরে পুরনো বছরের অপ্রাপ্তির হতাশা যেমন সব কাটে না, তেমনি নির্বাচনেও জনতার প্রত্যাশা মেটে না। নতুন বছরে হিসাবের অঙ্ক সবটা মেলে না। নির্বাচনে নাগরিক সমাজ যা প্রত্যাশা করে, কিংবা রাজনীতিবিদরা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারের সমর্থন আদায়ে যেসব কথাবার্তা বলেন, শেষ পর্যন্ত বৈতরণি পার হয়ে আর সেসব কথায় মনোযোগ দেন না।
এর মধ্য দিয়েই নতুন বছর আসে, আসে নির্বাচন। আমাদের জীবন এভাবেই বয়ে চলে মূল গন্তব্যে। মানুষের প্রাপ্তি-প্রত্যাশায় যতই গরমিল থাক, পরম গন্তব্যে পৌঁছাতে পৃথিবীর শুরু থেকে এ পর্যন্ত জীবজগতের কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রেই কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালেও নাগরিক সমাজের স্বাভাবিক যে প্রত্যাশা নির্বাচন ঘিরে, তা পূরণ হয় না। যারা আমেরিকার মানুষ, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তাদের যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশের নির্বাচন, রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের আচার-আচরণ কিছুই বুঝতে পারা যাবে না। বাংলাদেশে রাজনীতিতে, নির্বাচনে যা ঘটে, তা আমেরিকার স্বাধীনতার প্রায় আড়াই শ বছরের ইতিহাসে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। সুতরাং, আমেরিকার নাগরিকদের কাছে যা ভাবনার অগম্য, তেমন অনেক ঘটনাই বাংলাদেশের নির্বাচনে ঘটে।
তবু বাংলাদেশ, যে দেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত এবং যে যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ ও ২ লাখ মা-বোন নিজেদের সম্ভাবনাময় জীবন-সম্ভ্রম উৎসর্গ করে স্বদেশের মানুষকে স্বাধীন একটি দেশ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিয়ে গেছেন, সেই দেশটি সব বাধা পেরিয়ে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে চলেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কৃষি-শিল্প-নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন, মাথাপিছু আয়Ñসব সূচকেই বাংলাদেশের অগ্রগতি দৃশ্যমান। মুক্তিযুদ্ধের অপরিমেয় ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে দেশের ভেতরে এবং বাইরে রাজনৈতিক এবং প্রাকৃতিক বড় বড় ঝড়-ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে দেশের অগ্রসরমানতার গতি অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশের অগ্রগতির ভিত্তি কতটা মজবুত, তার স্বীকৃতি মেলে দেশ-বিদেশের সর্বমহল থেকেই। তাই তো বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ আজ তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ মুছে দিয়ে উন্নয়নের রোল মডেল।
বাংলাদেশে ইংরেজি নতুন বছর ২০১৯ বরণ নিয়ে যেমন সর্বস্তরে সাড়ম্বর উচ্ছ্বাস-আনন্দ, তেমনি এবার রাজনৈতিক দল ও ভোটারের অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়ায় তার উত্তাপ-উত্তেজনার মাত্রাও ভিন্ন। নাগরিক সমাজের আশা, নির্বাচনে এবার সহিংসতার জায়গা নেবে উৎসব। এই উৎসবের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে তরুণ নতুন ভোটারদের প্রথমবারের মতো ভোটদানের আনন্দ। এবার নতুন প্রজন্মের ভোটার প্রায় আড়াই কোটি। যারা প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তারা দেশ গড়ার শপথ নিয়ে আগামী শতকের উপযুক্ত এক বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্নে ভোট দেবেন। তারা সহিংসতা চান না। আধুনিক গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র চান।
সব দেশের সব নাগরিকই মুক্ত পরিবেশে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। বাংলাদেশের ভোটাররাও এর ব্যতিক্রম নন। তারাও ভয়ভীতিহীন পরিবেশে যাকে খুশি তাকে ভোট দিতে চান এবং আশা করেন তাদের ভোট দেওয়া প্রার্থীদের পক্ষেই ভোট গণনা এবং ফলাফল প্রকাশ করা হবে। এই প্রত্যাশার মাত্রাহীন ব্যত্যয় ঘটলে ভোটাররা তাকে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন বলে গ্রহণ করতে চান না। এবার অন্তত এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। সব পক্ষই একটি অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের মানুষ এই অঙ্গীকারের ওপর আস্থা রাখতে চান। বিশেষ করে সরকারি দলের ওপর। অনেকেই বিশ্বাস করেন, সরকারি দল বা জোট নিজেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো আর কোনো নির্বাচন চান না। নেহাত সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তারা ওই রকম একটি নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করছেন, সরকার পক্ষ এবার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার রক্ষা করতে নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চভাবে সহযোগিতা করবে।
আমরাও আশা করি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এবং সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনও এবার সুন্দর, সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের অঙ্গীকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর থাকবে। বিরোধী দলও শুধু অভিযোগের খাতিরে অভিযোগ না করে সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত থাকবে বলে আশা করব।
আমরা স্বপ্ন দেখি নতুন বছর ২০১৯ সাল বিশ্ববাসীর জন্য বয়ে আনুক শুভ বারতা। পূরণ হোক তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। সব হতাশা কেটে গিয়ে নব-আশার সুবাসে ভরে উঠুক তাদের বুক। দূর হয়ে যাক সকল জীর্ণ পুরাতন। ভেসে যাক যত গ্লানি, আবর্জনা, অবিশ্বাস। অবসান ঘটুক হানাহানি, সহিংসতা, রক্তপাত, ধ্বংস, যুদ্ধের।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হয়ে উঠুক নতুন আশা, নতুন স্বপ্নের সারথি।
সবশেষে বাংলাদেশে সহিংসতামুক্ত একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রার্থনা নিয়ে ২০১৯ সাল সবার জন্য বয়ে আনুক শান্তি, স্বস্তি ও সাফল্যÑএই কামনা। ঠিকানার সব পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা, অভিনন্দন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here