প্রবাসীদের নির্বাচন ভাবনা

4

ড. মো. সহিদুজ্জামান

প্রবাসে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ বাস করে। তাদের বেশির ভাগকেই সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিরাপদ জীবনের আশায় উন্নত দেশগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখা যায়। ধরা যাক, এ রকম কিছু প্রবাসী যাদের সঙ্গে সচরাচরই দেখা হয়, কথা হয় এবং জানা যায় জন্মভূমিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তাদের ভাবনা।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর প্রকৃতি ও নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ পত্রপত্রিকায় দেখে অনেকেই আশাহত হচ্ছে, শঙ্কা প্রকাশ করছে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি প্রশ্ন করলাম আপনারা তো না হয় নিজ প্রচেষ্টায় ও যোগ্যতায় এসব দেশে এসে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন ও নিরাপদ জীবন যাপন করছেন; কিন্তু যারা বিদেশে আসতে পারছে না তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কে দেখবে? কে দেবে তাদের জীবনের নিরাপত্তা? একজন আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, সবাই নিজ যোগ্যতায় বিদেশে আসে না? যারা দেশ পরিচালনা করেন, রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন, অনৈতিক সুবিধা ভোগ করে টাকার পাহাড় গড়েছেন, তারা তাদের সন্তান ও পরিবারকে এসব দেশে নিরাপদে রেখে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলছেন, তাদের সংখ্যাও কম নয়। আবার এক ধরনের বৈষম্য বা অসামঞ্জস্যতা তাদের দারুণভাবে আহত করে। কেউ বা নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠায় পরিবারকে সচ্ছল করার জন্য, অবস্থার পরিবর্তনের জন্য, সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায়, আবার কেউ বা দেশ থেকে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাঠায় সন্তান ও পরিবারের নিশ্চিত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য প্রবাসীদের উপলব্ধি আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি উন্নয়ন এমন হয়ে গেছে যেন লিফট বেয়ে ওপরে ওঠার মতো (অর্থ ও ক্ষমতায়)। যারা প্রকৃত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে চায় তাদের যে মেধা, শ্রম ও দক্ষতা অর্জন করতে হয়, তা অনেক রাজনীতিক ও সুবিধাভোগীর লাগে না। আবার এসব অনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত, অসৎ ও অযোগ্য ব্যক্তিরা ক্রমেই বেশি হয়ে ওপরের জায়গাগুলো দখল করায় নিচ থেকে সিঁড়ি বেয়ে যোগ্য ব্যক্তিরাও ওপরে উঠতে পারছে না। কিছু শ্রেণি ও পেশার মানুষ বাড়তি বা মাত্রাতিরিক্ত সুবিধা না চাইলেও পাচ্ছে, আবার অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও অসহায় পেশার মানুষজন তাদের ন্যায্য প্রাপ্যটুকুও পাচ্ছে না। এসব কারণে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে এক ধরনের সংকট বিরাজমান। এ সংকট তারুণ্যের সংকট, এ সংকট বৈষম্যের সংকট, এ সংকট সামাজিক সংকট। আমাদের রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সরকারগুলো বিভিন্ন সময় তাদের ক্ষমতা অর্জন ও পরবর্তী সময়ে তা ধরে রাখার অপচেষ্টার কারণে এবং তাদের কৃতকর্মের তুলনা করে পাল্লা দিয়ে চলায় এসব সংকট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এক রাজনৈতিক দল একটি খারাপ কিছু করে গেলে সেটির উদাহরণ দিয়ে জায়েজ করাটা আরেকটি রাজনৈতিক দল বা সরকারের পরিবর্তন বা সংস্কার নয়, এটি আত্মহনন, জাতির আত্মহনন।
এই প্রবাসীদের দেশের সঙ্গে রয়েছে আত্মার সম্পর্ক, রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। তাই দেশের প্রেক্ষাপট তাদেরও ভাবিয়ে তোলে। নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের মনে নানা সংশয়, নানা প্রশ্ন। দেশের সাধারণ মানুষ সন্তানের ভবিষ্যৎ কিভাবে গড়বে, কিভাবে কমবে দেশের বেকারত্ব, তরুণ প্রজন্ম কোথায় গিয়ে ঠাঁই পাবে? সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি বন্ধ হবে? স্বাস্থ্যসেবার মান কি উন্নত হবে? রোহিঙ্গা সমস্যা কিভাবে সমাধান হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা, মাদক, সামাজিক বৈষম্য কিভাবে দূর হবে? শিক্ষার মান, শিক্ষার পরিবেশ ও নৈতিক শিক্ষার উন্নয়নে কে হাল ধরবে? আবার প্রবাসে একটি শ্রেণি বিদ্যমান, যারা শিক্ষা ও গবেষণায় অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী, যারা দেশের উন্নয়নে কাজ করতে চায়সেই পরিবেশ কে দেবে? কে তাদের মূল্যায়ন করবে?
সাধারণ মানুষ চায় নিরাপদে বাঁচতে, মৌলিক অধিকারটুকু পেতে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলে ভালো-খারাপ দুই ধরনেরই মানুষ আছে। নিজ দল করলে অতি নিকৃষ্টকেও আমরা ভালো বলে থাকি, আবার অনুগত না হলে অথবা প্রতিবাদ ও সত্যকে প্রকাশ করলে অতি উত্তমকেও নিকৃষ্ট আখ্যা দিই। আমরা জনগণের আত্মপ্রচেষ্টার সফলতাকে উন্নয়নের ক্রেডিট হিসেবে নিতে যেমন পছন্দ করি, তেমনি সৃষ্ট সংকটের দায়ভার অন্যের ওপর চাপাতেও পছন্দ করি। এগুলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। যাই হোক, ভালো কাজ করে আত্মবিশ্বাস তৈরি হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে প্রত্যাশিত রায় পাওয়া সম্ভব যেকোনো রাজনৈতিক দলের। অন্যথায় সাধারণ জনগণ ও রাজনীতিকদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর নমুনা আমরা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছি।
আমার মেয়েটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তে পেরে পার্থক্য করার সুযোগ পেয়েছে। প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, বাবা আমাদের দেশে পড়াশোনা এত কঠিন কেন? এত বই কেন, ব্যাগ বোঝাই করে প্রতিদিন অনেক বইপত্র নিতে হয় কেন? এত কিছু পড়তে ও মুখস্থ করতে হয় কেন? কেন আমি বাংলাদেশে স্কুলে যেতে চাইতাম না? এখানে কেন প্রতিদিন স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে? এখানে কেন প্রাইভেট পড়তে হয় না? কেন ছাত্রছাত্রীরা আত্মহত্যা করে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের রাজনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক, সামাজিক ও চারিত্রিক শিক্ষা থাকলে তাকে আমরা সুশিক্ষিত বলে থাকি। শিক্ষা মানুষের নৈতিক চক্ষুকে খুলে দেয়, উন্নত চিন্তা-চেতনার দুয়ার উন্মোচন করে, বিশ্লেষণ করতে শেখায়, উদারতা সৃষ্টি করে। তাই সুশিক্ষিত প্রার্থী নির্বাচন সমাজ ও রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন।
হিরো আলমের মতো প্রার্থীদের যদি সুশিক্ষা থাকে, তাদের দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধিত হতে পারে। আবার উচ্চশিক্ষিত ও বড় বড় ডিগ্রিধারীর যদি সুশিক্ষার অভাব থাকে, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয় তা অনুমেয়। প্রতিটি স্তরে নৈতিক অবক্ষয় ও দুষ্টের লালন সমাজ ও রাষ্ট্রকে কোথায় নিয়ে যায়, তা আমাদের ভাবার সময় এসেছে। দেশের পরিবর্তন আনতে গেলে দেশের মানুষকে পরিবর্তন হতে হবে। নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ও মার্কা বা দল দেখে নয়, যোগ্য, সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে নেতা নির্বাচন করতে সম্মিলিত প্রয়াস থাকতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ যাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বা হবে তারা কারা? কাদের আমরা ভোট দিচ্ছি, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি, তাদের সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই জানতে হবে। বুঝেশুনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের কোমলমতি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অতি সম্প্রতি রাস্তায় নেমে দেশ সংস্কারের কাজের যে নমুনা দেখিয়েছিল, সেখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। তা না হলে এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে না।
লেখক : ফুলব্রাইট ভিজিটিং ফেলো, টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র ও
অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here