এসাইলাম বন্ধে ট্রাম্পের আদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারে নাকচ

11

ঠিকানা রিপোর্ট : সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস চার লিবারেল জজের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবৈধ ইমিগ্রেশন আদেশ বন্ধে ক্যালিফোর্নিয়ার আপীল কোর্টের আদেশের প্রতি তার সমর্থন জানিয়েছেন। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মনোনীত এই প্রধান বিচারপতি আইনের স্বচ্ছ ব্যাখ্যায় আপীল কোর্টের সিদ্ধান্তকে বহাল রেখেছেন, ট্রাম্পের আদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, ম্যানুয়েল আলিটো, নেইল গরসাচ ও ব্রেট কাভানাহ। অন্যদিকে বিচারপতি সোটোমায়ার, স্টিফেন ব্লেয়ার, খগোন ও রুথ রাডার গীনসবার্গ কালিফোর্নিয়ার আপীল বিভাগ ট্রাম্পের আদেশ বন্ধ করার পক্ষে অবস্থান নেন। আর প্রধান বিচারপতি রবার্ট তাদের পক্ষেই নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন। কাভানাহ এই প্রথমবার রবার্টের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দেন। ট্রাম্পের অবৈধ এসাইলাম নিষেধাজ্ঞা এভাবেই প্রথম ধাক্কায় হুমড়ি খায়।
৯ নভেম্বর ট্রাম্পের আদেশের ঘোষণার সাথে সাথে ক্যালিফোর্নিয়ার বিচারক জে বাথ বি এই আদেশ বন্ধ করেন। ট্রাম্পের আদেশ ছিল, যে সব মাইগ্রেন্ট অবৈধভাবে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করেছেন অবৈধভাবে, তাদের পোর্ট অব এন্ট্রির বাইরে অন্য কোনো স্থান থেকে এসাইলাম চাওয়া নিষিদ্ধ। ফেডারেল বিচারক জে বারবি এই আদেশ রহিত করার পর তা নবম সার্কিট কোর্টের আপীল বিভাগ সম্মতি দেয়। আর পরবর্তীতে গত ২১ ডিসেম্বর সুপ্রীমকোর্ট ৫-৪ ভোটে সেই কোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
সিএনএন-এর সুপ্রীম কোর্ট বিশ্লেষক ও টেক্সাস স্কুল অব ল এর প্রফেসর স্টিভ ভøাডটেক বলেন, এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের উপর অন্যতম প্রধান আঘাত। আর তা এক সিগন্যাল এর অবকাশ রেখেছে যে, অন্তত সুপ্রীম কোর্টে ৫ জন বিচারক আছেন যারা মনে করেন যে, এসাইলাম বন্ধ করা প্রেসিডেন্টের আইনগত বৈধ বা স্যাটিউটরি কতৃত্বের পরিধি বহির্ভূত।
অন্যদিকে বিচার বিভাগের মুখপাত্র স্টিভেন স্টাফোর্ড বলেন, তারা কোর্টের এসাইলাম বন্ধ করার বিরুদ্ধে যে রায় তার বিরুদ্ধে লড়ে যাবেন।
সিএনএন এ দেয়া এক বিবৃতিতে স্টাফোর্ড বলেন, আমরা হতাশ যে, সারাদেশে অভূতপূর্ব ট্রাম্প প্রশাসনের আদেশের বিরুদ্ধে ২৫টি ইনজাঙ্কশনকে স্থগিত করেনি। কিন্তু কোর্ট এই মামলায় মেরিট নিয়েও পরিপূর্ণ বিবেচনা করেনি। তিনি বলেন, তারা নির্বাহী শাখার বৈধ কর্তৃত্বকে এসাইলামের রেয়াতী বেনিফিটের উপর স্থান দিয়ে তাকে ডিফেন্ড করবেন।
এদিকে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের এটর্নি লা জেলির্নট বলেন, সুপ্রীম কোর্টের এই রুলিং দুঃস্থ মানুষের জীবন রক্ষা করবে এবং অসহায় পরিবার ও শিশুদের নির্মম কষাঘাত থেকে বাঁচাবে। তিনি বলেন, আমরা আনন্দিত যে, কোর্ট স্বাভাবিক আপীল প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রশাসনের শর্ট সার্কিট করে সবকিছুু বন্ধ করার প্রক্রিয়াকে রদ করেছে।
ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত এই বিষয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও সুপ্রিমকোর্টের চিফ জাস্টিস রবার্ট এর মধ্যে তিক্ততার সৃষ্টি কাে; যখন ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিস্ট্রিক্ট জাজ প্রথম নির্বাহী আদেশকে ডিসমিস করে দেয়; যখন ট্রাম্প জাজ জন এম টিগারকে লক্ষ্য করে বলেন, এই রুলিং ওবামা জাজের কাজ। এরপর চিফ জাস্টিস রবার্ট এক বিবৃতি ইস্যু করেন কয়েকদিন পর যেখানে ট্রাম্পকে তিরস্কার করা হয়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের কোনো ওবামা জাজ বা ট্রাম্প জাজ, বুশ জাজ বা ক্লিন্টন জাজ নেই। স্বাধীন জুডিসিয়ারি এমন কিছু বিষয় যা নিয়ে আমাদের সবার থ্যাঙ্কফুল থাকা চাই।
এই অস্থায়ী আদেশ রদের রায় দিয়ে বিচারক টিগার এই বিষয়ে এই সপ্তাহে প্রিলিমিনারি ইঞ্জাঙ্কশন জারি করেন। জজ টিগার লিখেন, প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বে যা কিছু থাকুক না কেন, তিনি এমন কোনো কিছু নতুন করে ইমিগ্রেশন আইন সংক্রান্ত বিষয় লিখতে পারেন না যাতে এমন কোনো অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা কংগ্রেস পরিষ্কারভাবে নিষেধ করে দিয়েছে।
ট্রাম্প যে নিষেধাজ্ঞা এসাইলাম নিয়ে জারি করেছেন তা আসলে এসাইলাম ব্যবস্থাকে সংকুচিত করা, তাতে মানুষ আবেদন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে। আর তা যারা কোনভাবে এগিয়ে যেতে চায় তাদের বাধাগ্রস্ত করবে।
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা প্রতিদিন আবেদনকারীর সংখ্যা কমিয়ে আনছে আবার তারা পোর্ট অব এন্ট্রিতে অন্য কোনো লোকেশন তাদের এসাইলাম স্ট্যাটাস অনুরোধের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিচ্ছে। সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের মালিক ওমর জাজওয়াত বলেন, যদি তারা কৌশলের উভয় দিকে কাটতে পারে তাহলে বোঝা যায় এসাইলাম প্রটেকশনের কোনো ব্যবস্থা নেই।
ট্রাম্পের প্রত্যেক নতুন পলিসি আরোপের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় সীমান্তের ওপারে অবস্থিত সকল মাইগ্রেন্টের আমেরিকার আশ্রয় পাওয়া সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়রের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিচারকদের ওবামা জাজ বলে ঠাট্টা করার জবাবে বলেছেন আমেরিকার কোন ওবামা জাজ, ক্লিন্টন জাজ, ট্রাম্প জাজ, বুশ জাজ বলে কিছু নেই। সবাই উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন ও উৎসর্গীকৃত।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির খাড়ার ঘা
গত ২০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মাইগ্রেন্টদের প্রতি আরেক আঘাত হেনেছে। এই উদ্যোগ হচ্ছে এসাইলাম যারা চায় তাদের সমগ্র এসাইলাম মামলার সময়কালে মেক্সিকোতে অবস্থান করতে হবে। আর তা শেষ হতে বছরের পর বছর সময় লাগবে।
টিগারের রুলিং
জাজ টিগারের রুলিং অন্যতম এক অসামান্য পদক্ষেপ, যে সব পদক্ষেপ সমূহে ট্রাম্প প্রশাসন- ট্রান্সজেন্ডার অধিকার সংক্রান্ত ইয়ং ইমিগ্র্যান্টদের সুরক্ষা সংক্রান্ত, ট্রাম্প কি তার হোয়াইট হাউজে বসে লাভজনক ব্যবসা করছে, পরবর্তী শুমারিতে সিটিজেনশীপ নিয়ে প্রশ্ন সন্নিবেশিত হবে কিনা? -তারই আদেশ। নবম সার্কিট কোর্ট টিগারের পর্যবেক্ষণ বদলাতে নারাজ। তিন জাজের প্যানেলে দু’জন এই রায় দেন। সংখ্যাধিক্য রায় লিখেন জর্জ বুশের মনোনীত জজ জে বারবি। সেজন্য ট্রাম্প তাকেও টার্গেট করেন। জজ বারবি লিখেন, আমরা নিখুঁতভাবে আমাদের ইমিগ্রেশন আইন প্রয়োগের সংকট সম্পর্কে জানি। অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ইস্যুগুলো মোকাবিলায় দায়িত্ব আমাদের সার্কিটের উপর বর্তায়। আমরা মনে করি এটাই প্রজ্ঞার পরিচয় হবে যে, যদি আইন বদলানো যায়। কিন্তু আইন বদলানোর কার্যত দায়িত্ব সেই শাখার উপর বর্তায় যে শাখা আইন তৈরি করেছে অর্থাৎ প্রথম স্থান বলতে হয় কংগ্রেসকে।
প্রশাসন বার বার সুপ্রিমকোর্টকে এই বিষয়ে মধ্যস্থতা করতে বলেছে, কিন্তু তা তেমন সফল হয়নি। ইতিপূর্বে কোর্টের রক্ষণশীল সদস্য বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, ম্যানুয়েল এ আলিটো ও নেইল এম গরসাচ এর আপত্তির মুখে ইঞ্জাঙ্কশন স্থগিত করার অনুরোধ বাতিল হয়ে যায়। জাস্টিস কাভানাহ সে সব ক্ষেত্রে কোনো ডিসেন্ট দেননি। তিনি প্রধান বিচারপতি রবার্টস এর নেতৃত্ব মেনে কাজ করছিলেন। কিন্তু কাভানাহ গত ২১ ডিসেম্বর শুক্রবার সেখান থেকে সরে এসে কোর্টে নতুনত্বের সূত্রপাত করেন। সুপ্রীমকোর্ট সংক্ষিপ্ত আদেশে কোনো কারণ দেয়নি। সাধারণত স্টে অর্ডার দিতে সুপ্রীম কোর্ট সময় নেয়। এই মামলা প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। মেরিট নিয়ে কথা হয়নি। আর তা নি¤œ আদালতে গড়াবে। পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে নবম সার্কিট কোর্ট জজ টিগার এর প্রাথমিক ইঞ্জাঙ্কশনের উপর শুনানী অনুষ্ঠান করবে। যদি এই ইঞ্জাঙ্কশন আপীল কোর্টে বহাল থাকে, তাহলে জজ টিগার তার ইঞ্জাঙ্কশন স্থায়ী করার জন্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন। এই সংক্রান্ত ফেডারেল আইন বলে, কোনো বিদেশি যদি শারীরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত থাকেন অথবা যুক্তরাষ্ট্রে আগমন করেন, আর তা কোনো নির্ধারিত পোর্ট অব এরাইভাল এর চৌহদ্দিতে হোক না হোক তিনি এসাইলামের আবেদন করতে পারেন।
আর এই আইনের ভাষা মামলাটাকে সহজ করেছে বলে সেন্ট লুইস এর অবস্থিত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদালয়ের আইনের প্রফেসর স্টিফেন লেগমস্কি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আইনের ভাষা এতই পরিষ্কার যে, আমার কাছে আশ্চর্য মনে হচ্ছে, চারজন বিচারক ইঞ্জাঙ্কশন স্টে করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রীম কোর্টকে বিচারক টিগারের ইঞ্জাঙ্কশন স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য নতুন পলিসি চাপিয়ে দিতে কর্তৃত্ব সম্পন্ন।
সলিসিটর জেনারেল পায়েল জে ফ্রান্সিসকো লিখেন, যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত বহু সংখ্যক পরদেশিকে দেখেছে যারা মেক্সিকো থেকে অবৈধভাবে এসেছেন এবং ধরা পড়লে তারা এসাইলাম চায়। আর এদেশে থেকে যান মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। যা এসাইলাম পেতে সাহায্য করে না। প্রেসিডেন্ট মনে করেন এই সমস্যা আমেরিকার জন্য ভয়ঙ্কর। অবৈধ বর্ডার ক্রসিং দিয়ে অস্থায়ীভাবে এদেশে প্রবেশ না করতে দেয়া জাতীয় স্বার্থের পক্ষে।
কিন্তু কংগ্রেস ভিন্ন কথা বলেছে। বলেছে একমাত্র কংগ্রেসই তা পরিবর্তন করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here