নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নতুন বছরে প্রবেশ

7

এ কে এম শাহনাওয়াজ

প্রত্যেক দেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নানা আয়োজনে বর্ষবরণ করা হয়। আমাদের বাংলাদেশে মারমা নৃগোষ্ঠীর মানুষরা সাংগ্রাই উৎসবে একটি বিশেষ আয়োজন রাখে।
এটি জল ছিটানো উৎসব। ড্রাম বা কোনো আধারে পানি রাখা হয়। একপাশে থাকে একদল তরুণ আর অন্যপাশে থাকে একদল তরুণী। ওরা পরস্পরের ওপর পানি ছিটাতে থাকে। ওদের বিশ্বাস এভাবে তারা বিগত বছরের যত পঙ্কিলতা আছে, তা এ পানিতে ধুয়েমুছে নিষ্কলঙ্ক করছে। সতেজ-শুভ্র আর পবিত্র একটি নতুন বছর যাতে শুরু করতে পারে।
আমাদের দেশের রাজনীতির যা চরিত্র, তাতে নানা জায়গায় এঁদো কাদা আর পঙ্ক জড়িয়ে আছে। বিপন্ন গণতন্ত্র। পাঁচ বছর পর নির্বাচন আসে পঙ্কমুক্ত হয়ে আবার নতুন করে দেশ ও জনগণকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে।
তাই নির্বাচনকে নিয়ে যেমন আশাবাদ থাকে, আবার শঙ্কাও থাকে। এবার সবচেয়ে আশা জাগানিয়া বিষয় হচ্ছে নির্বাচনের একদিন পরেই খ্রিস্টীয় নববর্ষ শুরু হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চয়ই কিছুটা ইঙ্গিত রাখবে বছরটি কেমন যেতে পারে।
নির্বাচনের দিন-দুপুর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয় পেতে যাচ্ছে মহাজোট, অভ্যাসমতো সরকারবিরোধী পক্ষের অনেক প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে আসছিলেন। মির্জা আব্বাসের মতো কোনো কোনো প্রার্থী ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে নিজের ভোট দেয়া থেকেও বিরত থাকছিলেন।
অথচ সরকার বা সরকারি দলের অন্যায় আচরণ প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারছিলেন না। পাশাপাশি ভোটারের দীর্ঘ লাইন ছিল ভোট কেন্দ্রে। আবার টিভি চ্যানেলগুলো দেখাচ্ছিল সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন ভোটাররা। অনেকের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক কম ভোট পাচ্ছিল ধানের শীষ মার্কায় দাঁড়ানো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা।
এতোকাল ধানের শীষকে বিএনপির প্রতীক বলেই জানতাম। এখন আর সেভাবে বলতে পারছি না। আমাদের আক্ষেপ ছিল অনেকে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা, সূর্য বা গামছা রেখে বিএনপির ধানের শীষ হয়ে গেলেন কেমন করে!
নির্বাচনের দু’দিন আগে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকে একটি ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। তিনি বলেছিলেন, ধানের শীষ বিএনপির প্রতীক নয়, এটি হচ্ছে ঐক্যেও প্রতীক।
ধানের শীষের অস্বাভাবিক কম ভোট পাওয়া নিয়ে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। অনেকে বলবেন, বিএনপির তো ৩০-৩২ ভাগ নিশ্চিত ভোট রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ভোট। ২০ দলের অন্যদের এবং ঐক্যজোটে আসা নবাগতদের অনুবীক্ষণিক ভোটের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। এমন প্রশ্নের মুখোমুখি রাজনীতিসচেতন আমার এক সাবেক ছাত্রের ব্যাখ্যা প্রণিধানযোগ্য।
ওর বিবেচনায় বিএনপির ৩০-৩২ ভাগ ভোট তো ২০০৮-এর নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। ১০ বছর পরের পরিসংখ্যান তো জানা নেই। এ দশ বছরে বিএনপি নেতৃত্ব সংগঠন সুগঠিত করার জন্য তেমন দৃশ্যমান কার্যক্রম হাতে নেয়নি। এর ওপর সরকার ও সরকারি দলের চাপ তো রয়েছেই। আর বিএনপি এমন কোনো আদর্শিক দল নয় যে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও দলের জন্য মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে সব কর্মী-সমর্থক।
নির্বাচন নিয়ে আড্ডা দিতে আমার ক’জন সহকর্মী বন্ধু এসেছিলেন। একটি প্রচলিত কথা আছে ‘ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে!’ তেমন দশা হয়েছে আমার। বন্ধুরা মনে করিয়ে দিলেন ২০০৮-এর নির্বাচনের দু’দিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকের এক কলামে আমি মহাজোটের বিপুল বিজয়ের সম্ভাবনার কথা বলে একটি পরিসংখ্যান দিয়েছিলাম।
অনেকের কাছে সেটি অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। এ বন্ধুদের একজন সে সময় হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে মহাজোটের পাওয়া আসন আমার পরিসংখ্যানের সঙ্গে অনেকটাই মিলে গিয়েছিল।
আমার ধারণা, সে সময়ের বিপুল বিজয়ে আওয়ামী লীগের নেতারাও অবাক হয়েছিলেন। এবারও আমার হিসাবে ছিল বিএনপির প্রাপ্তি খুব বেশি হবে না। ড. কামাল হোসেনের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ এক বন্ধু বললেন, সরকার যদি বিরোধী দল দমন না করে নিরপেক্ষ ভোটের সুযোগ করে দেয়, তবে পাত্তা পাবে না মহাজোট।
একটি জাতীয় দৈনিকে অতি সম্প্রতি আমার একটি কলাম প্রকাশিত হয়েছে তাতে আমি ঐক্যফ্রন্টের সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করেছিলাম। সেটি যদি মিলে যায়, এবারও সংকটে পড়বে বিএনপি। এবারও আমার বন্ধু বাঁকা চোখে তাকালেন। আমি বললাম এ জন্য জ্যোতিষী হওয়ার দরকার নেই।
বিএনপির ভেতরের দুর্দশা তো বিএনপি নেতাদের জবানিতেই স্পষ্ট হয়েছে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও বরকতউল্লাহ বুলুর ফাঁস হওয়া টেলিফোন সংলাপে তা অনেকটা স্পষ্ট। সেখানে নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ সংকট ও হতাশার কথা আছে।
এক পর্যায়ে মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, ঐক্যফ্রন্ট (অথবা বিএনপি) ২০-২২-৩০টি সিট পেতে পারে। অর্থাৎ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র নেতারও এর চেয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল না। আমি বলব এটি খুব বাস্তব হিসাব ছিল।
২০১৪-এর নির্বাচনী ট্রেন হেলায় মিস করার পর একটি দায়িত্বশীল দলের যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন বিএনপি নেতারা। দলকে তৃণমূল পর্যন্ত যখন পুনর্গঠন করা প্রয়োজন ছিল, তখন নেতারা ঢাকায় বসে নিয়মমতো গৎবাঁধা বিবৃতি পাঠের মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখলেন। বিএনপির এ দুর্বল দশাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারল সরকারপক্ষ।
রাজনীতি বা অপরাজনীতি যেভাবেই বলি, ‘কৌশল’ প্রয়োগ করে মামলা-হামলায় মনোবল ভেঙে দিতে লাগল বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের। একে পাল্টা নিজস্ব কৌশলে মোকাবেলা করতে পারেনি বিএনপি। সে চেষ্টাও আমরা দেখিনি।
যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন শানিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা, তখন নেতারা শুধু হতাশা ব্যক্ত করে দায়িত্ব শেষ করতেন। ‘পথে বেরোলেই সরকারের পুলিশ দমন-পীড়ন করে। গ্রেফতার চলতে থাকে। জনসভার অনুমতি দেয় না।’ তাই তারা ঘরেই আটকে আছেন। শুনে মনে হতো তারা এইমাত্র অমরাবতী থেকে এই নরকে এসে সবকিছু দেখে হতাশ ও সন্ত্রস্ত! সরকারে থেকে বিএনপি কি আওয়ামী লীগের ওপর কম দমন-পীড়ন করেছে?
অপারেশন ক্লিনহার্ট কম গুম-খুন করেছে! তারপরও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমেছেন। পুলিশের লাঠিতে রক্তাক্ত হয়েছেনÑ তবু রাজপথ ছাড়েননি। আমি এ প্রসঙ্গে প্রায়ই কিছুটা কড়া শব্দেই লিখিÑ নানা ঘাট থেকে আসা সুবিধান্বেষী স্যুট-টাই পরা নেতাদের দিয়ে মাঠের রাজনীতি সম্ভব নয়। এ কারণে গত দশ বছরে খাঁচার ভেতরেই ফোঁসফাঁস করলেন। বাইরে বেরোতে পারলেন না। ফলে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য অংশ সেভাবে আর দল-অন্তঃপ্রাণ থাকতে পারলেন না। তাই ৩০-৩২ শতাংশ নিশ্চিত ভোটারের হিসাব এই দশ বছরে ভেঙেচুরে কোথায় এসে ঠেকেছে, সে হিসাব তো কেউ করেননি!
নির্বাচনের ডামাডোলের আগে বিএনপি-প্রধান বেগম জিয়ার দুর্নীতির কারণে দ-িত হয়ে কারারুদ্ধ হওয়া ছিল সরকারের আরেকটি কৌশলী রাজনীতির সাফল্য। একই সঙ্গে বিএনপির আরেকটি পরাজয় দ-িত প্রবাসী নেতা তারেক জিয়াকে ভারপ্রাপ্ত দলীয় সভাপতি বানানো। বিএনপি নেতারা মাঠের রাজনীতি যদি তেমনভাবে করতে পারতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন সাধারণ সমর্থকদের কাছে তারেক রহমানের গ্রহণযোগ্যতা আগের মতো নেই।
অবশ্য এর বাইরে যাওয়ারও উপায় ছিল না। এক ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত দলের ভেতরে কা-ারী হওয়ার মতো নেতৃত্ব গড়েও ওঠেনি।
নির্বাচনের মাঠে বিএনপির আরেকটি ক্ষতি হয়েছে নিবন্ধন হারানো যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের নেতাদের ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করানোর কারণ। বিএনপি নেতাদের হয়তো নানা কারণে জামায়াতকে ত্যাগ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা কর্মী-সমর্থকরা তা বুঝতে যাবেন কেন? বিশেষ কওে প্রায় আড়াই কোটি তরুণ ভোটারকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ভোলাবেন কেমন করে? ক্ষমতায় থাকার সময় কিশোর বয়সে এদের মনে মুক্তিযুদ্ধকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলার যে প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় তা শুধু ব্যর্থই হয়নি, বিএনপির জন্য বুমেরাংও হয়েছে। ফলে সরকারপক্ষের বিরুদ্ধে ধোঁয়াশা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষোভ থাকলেও জামায়াতনিয়ন্ত্রিত বা প্রভাবিত বিএনপির জন্য সহানুভূতিপ্রবণ হওয়া তাদের অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়নি।
এখন শুধু তরুণ ভোটারই নয়, সাধারণ মুক্তচিন্তার ভোটারও রাজনৈতিক বক্তৃতায় মোহাবিষ্ট হয়ে যায় না। যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে চেষ্টা করে। আমি অনেককে বলতে দেখেছি, হাসিনা সরকারের আমলে দুর্নীতি-সন্ত্রাস থাকলেও গত দশ বছরে দেশের ও মানুষের উন্নয়নে অনেক কাজ হয়েছে। খেয়ে পরে অনেক ভালো আছে মানুষ। চাকরিজীবী, কৃষক, শ্রমিক সবাই যার যার জায়গায় তুলনামূলকভাবে ভালো থাকা উপভোগ করছে। একই সঙ্গে বিএনপি শাসনামলের সরকারি সাফল্য তেমনভাবে মনে করতে পারছে না। তাই বলব, সাধারণ মানুষের ভোট পাওয়ার মতো দৃশ্যমান কোনো কারণ নিয়ে বিএনপি দাঁড়াতে পারেনি।
এমন একটি অবস্থায় নতুন দৃশ্য ছিল সাবেক কিছু আওয়ামী লীগ নেতা নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা। আমি অনেক শিক্ষিত-স্বল্পশিক্ষিত মানুষকে প্রশ্ন করেছি মুক্তিযুদ্ধস্নাত একটি দেশে কেন এবং কোন আদর্শের কারণে বিএনপি নামের দলটিতে যুক্ত হয়েছেন?
অনেকের কাছ থেকে উত্তর পেয়েছি আওয়ামী লীগের প্রতি নিদারুণ ক্ষোভের কারণে তাদের এ শিবিরে আসা। এ ধারার একটি উল্লেখযোগ্য ভোটার ধানের শীষে সাবেক আওয়ামী লীগারদের দেখে স্বস্তি পায়নি।
শেষ কথা হচ্ছে, মহাজোটের ২৮৮ আসনের বিপরীতে ঐক্যফ্রন্টের ৭ আসন ভূমিধসেরই নামান্তর। অনেকে নানা সন্দেহে মাথা দোলাতেও পারেন। কিন্তু ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত রায় বা কোনো ধরনের গড়াপেটা, তা প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যা ঐক্যফ্রন্ট এখনও পারেনি। অংশগ্রহণমূলক এ নির্বাচনে ব্যাপকভাবে মানুষ ভোট দিয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও মোটের ওপর অখুশি নন। সাধারণ মানুষ জানে এ দেশে নির্বাচনের ফলাফলের পর পরাজিত পক্ষ রায় বর্জন করে। ফলে বিরোধী দলের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার প্রভাব তেমন পড়বে না।
ফলাফলের বাস্তবতাটি মেনে নিতেই হবে। এ বাস্তবতার উঠোনে দাঁড়িয়ে আমরা অভিনন্দন জানাতে চাই নতুন সংসদ সদস্যদের। আশা করব, অচিরেই নতুন সরকার গঠিত হবে। নতুন বছরের শুরুতে প্রত্যাশা করব, বিগত সময়ের মহাজোট সরকারের বড় দুর্বলতাগুলো এবার কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন নতুন নেতৃত্ব। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে শুরু হবে নতুন যুদ্ধ।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here