আমেরিকার ইমিগ্র্যান্ট শিশুদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত

7

ঠিকানা রিপোর্ট : এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন শিশুদের শিশু হিসেবে দেখছেন। শিশুদের মায়ের কোল থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, বন্ধ করা হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে উঠা। মানবিক বৈকল্য সৃষ্টির আশঙ্কাকে নিয়ত বাড়ানো হচ্ছে। গত ডিসেম্বর মাসে সরকারি কাস্টডিতে প্রায় ১৪০০০ ইমিগ্র্যান্ট শিশুর বাস ছিল। এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরমধ্যে ৩৮০০ জনকে এক গোপন সিটির তাঁবুতে রাখা হয়েছে। ইমিগ্র্যান্ট যুবকদের কিশোর কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময় ঘুরে ফিরে সৃষ্টি করা হচ্ছে অনেক নরখাদক। কিশোরদের ক্যাম্পে যুবকদের থাকার ব্যবস্থা। এ যেন লেখিকা লাইলা থাসের মতে ভেড়ার কাপড়ে নেকড়ে বাঘ। মাইগ্রেন্ট শিশুরা সবসময় ডিফেন্সহীন অবস্থায় থাকে। কোর্ট কর্তৃক কোনো উকিল নিযুক্ত করে না শিশুদের ক্ষেত্রে।
নবম সার্কিট কোর্টে একটি মামলা আছে এ নিয়ে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে দেখা যায় ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এপ্রিল মাস থেকে ২০০ স্পন্সরকে গ্রেফতার করেছে। আর তাতে সমগ্র ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটি ভীত সন্ত্রস্ত। ডিটেনশনে শিশুরা দীর্ঘদিন আটকে থাকে। গড়ে তাদের ৫৭ দিন আটক থাকতে হয়। ২০১৫ সালে মাত্র ৩৪ দিন আটকে ছিল। সম্ভবত ইমিগ্রেশন এজেন্সি তাই চাই। যাতে ১৮ বছর পূর্ণ হলে টিনএজদের বয়স্ক জেলে পাঠানো যায়। আর গত বছর ১০০০ টিনএজারকে এভাবে বড়দের সাথে রাখা হয়েছে।
ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমান শিশু প্রটেকশনকে আক্রমণ করে চলেছে।
ট্রাম্প বলে থাকেন ডিটেনশন অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট বন্ধ করবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে ডিটেনশন, লেখাপড়া শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তার দৈহিক প্রবৃদ্ধি নষ্ট করে। হরমোনাল সিস্টেম নষ্ট করে দেয়। ইমিউন সিস্টেম ভেঙে দেয়। এমনকি ডিএনএ নষ্ট করে। আর শিশুকালে জটিলতা ক্রমাগত হার্ট সমস্যা, ক্যান্সার সমস্যা, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, লিভার সমস্যা, ও হাঁড় ভাঙার মতো সমস্যা সৃষ্টি করে।
জাতিসংঘ স্টাডিতে দেখা যায় বিশ্বের ৬০ শতাংশ শিশু সহিংসতা থেকে বাঁচার জন্য দেশ ছাড়ে মা-বাবার সাথে।
এখন নবম সার্কিট কোর্ট নির্ধারণ করবে এসব শিশুরা আইনগত প্রক্রিয়ায় সরকারি মদদে এটর্নি সহায়তা পাবে কিনা।
মার্কিন হেফাজতে আরেক শিশুর মৃত্যু
সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেন অভিবাসন প্রত্যাশীরা। বঞ্চনার জীবন থেকে উত্তরণে স্বপ্নের খোঁজে বাড়িছাড়া আরেক শিশুকে প্রাণ হারাতে হলো সীমান্তে। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে অভিবাসনপ্রত্যাশী আরেক শিশুর মার্কিন হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) জানিয়েছে, আট বছরের ছেলেশিশুটি অসুস্থতার কারণে মারা গেছে।
বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়, অবৈধ অভিবাসন চেষ্টার অভিযোগে শিশুটি তার বাবার সঙ্গে মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের প্রত্যাশায় তারা গুয়াতেমালা থেকে এসেছিল। তবে খবরে শিশুটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে বাবার সঙ্গে আটক জ্যাকলিন কাল ম্যাকুইন নামের সাত বছরের এক মেয়েশিশু মার্কিন হেফাজতে মারা যায়। তারাও গুয়াতেমালা থেকে এসেছিল। পানিশূন্যতায় শিশুটির মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়। তবে বিভিন্ন খবরে প্রকাশ হয়, ছয় দিন ধরে শিশুটি খাবার ও পানিসংকটে ছিল। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করে সিবিপি দাবি করে, তাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় বাবা ও মেয়ের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা ছিল।
গত ২৫ ডিসেম্বর মারা যাওয়া শিশুটির ব্যাপারে সিবিপি জানায়, গত ২৪ ডিসেম্বর সোমবার অসুস্থ হওয়ার পর ছেলেটিকে নিউ মেক্সিকো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়া হয়। প্রথমে তাকে ঠান্ডায় আক্রান্ত বলা হয়। পরে জানা যায়, সে জ্বরেও আক্রান্ত ছিল। ব্যবস্থাপত্র দিয়ে ছেলেটিকে গতকাল দুপুরের দিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রচন্ড বমির প্রবণতা শুরু হওয়ায় পরে শিশুটিকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে মধ্যরাতে তার মৃত্যু হয়।
সিবিপি জানায়, তারা এখনো মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। এর জন্য পুরো পরিস্থিতির বিস্তারিত পর্যালোচনা করতে হবে।
গুয়াতেমালা মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে এই মৃত্যুর ব্যাপারে ‘সুস্পষ্ট’ তদন্তের দাবি করেছে।
শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসনের ব্যাপারে কট্টরপন্থী। অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করতে চাইছেন। এই দেয়াল নির্মাণ ইস্যুতে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মতানৈক্যে স্থানীয় সময় গত ২৮ ডিসেম্বর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ফেডারেল সরকারে এক–চতুর্থাংশের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। সেই অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। ধারণা করা যাচ্ছে, এই সংকট নতুন বছর পর্যন্ত গড়াবে।
অভিবাসনপ্রত্যাশী দ্বিতীয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডেমক্রেটিক কংগ্রেসম্যান মার্ক ভিয়েসে। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘এই প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে আরেক শিশুর মৃত্যু। বড়দিনে এ ধরনের ভয়াবহ এক গল্প শুনতে হলো।’
নিউ মেক্সিকোর সিনেটর মার্টিন হেনরিক টুইটারে লিখেছেন, ‘হৃদয়বিদারক ও পীড়াদায়ক খবর। আমি দ্রুত এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানানোর দাবি জানাই। শিশুটির মৃত্যু এবং অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে সব মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলা ও মানুষের জীবনকে অবজ্ঞা করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।’
বিরোধীদের ওপর দায় চাপালেন ট্রাম্প
মেক্সিকো সীমান্তে মার্কিন হেফাজতে থাকা অবস্থায় শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ডেমক্র্যাটদের দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন প্রত্যাশীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ শিথিল রাখার নীতি অবলম্বন করায় তারা অবৈধভাবে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মিত হলে অভিবাসন প্রত্যাশীরা এ চেষ্টা চালাবে না বলে দাবি করেন তিনি। বিবিসি।
বিগত কয়েক মাসে অভিবাসনের প্রত্যাশায় গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস ও এল সালভাদর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে ভিড় জমিয়েছে হাজারো মানুষ। নিজ দেশে নিপীড়ন, দারিদ্র্য ও সহিংসতা থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছে তারা। তবে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের গ্রেপ্তার, বিচার ও বিতাড়ণের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন ‘আমেরিকা আগে’ নীতির প্রবর্তক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মামলা নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত প্রত্যেককে সীমান্তে আটক রাখার ব্যাপারে অনড় ট্রাম্প।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here