বিজয়ের অভিনন্দন শেখ হাসিনা : এবার নাগরিক প্রত্যাশা পূরণের পালা

3

অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, সব হানাহানি, সন্ত্রাস-সহিংসতার পথ পাড়ি দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের মানুষ একই সঙ্গে পেল একটি নতুন বছর ২০১৯ এবং আরেকটি নতুন সরকার। বাংলাদেশে চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এবং মুক্তিযুদ্ধের পরম্পরায় জনগণ তাদের প্রত্যাশিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তিকেই নির্বাচিত করেছে।
আমরা তাই নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষকে, নতুন সরকার এবং বিজয়ী মহাজোট এবং তার নেত্রীÑউন্নয়নের নেত্রী, একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানাই প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ঠিকানার পক্ষ হতে বিজয়ের লাল গোলাপ শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন। পাশাপাশি বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট এবং তাদের নেতাদের ধন্যবাদ, তারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ করে দিয়ে গণতন্ত্রের সুমহান ঐতিহ্য রক্ষায় সহায়তা করা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য। এ রকম একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। উন্নয়নের চলমান ধারাও অব্যাহত থাকবে এবং প্রত্যাশা করা যায় তার সুফল দেশের মানুষ ভোগ করতে পারবে।
এখন নতুন বছরে নতুন সরকারের কাছে বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশা পূরণে নিয়োজিত করাই হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের দ্বারা মনোনীত সরকার ও সরকারপ্রধানের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। নির্বাচনের পূর্বে তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং নির্বাচনী প্রচারণায় যে অঙ্গীকার করেছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা রক্ষা করা। গত দুটি নির্বাচনে সুশাসন আর রাষ্ট্র পরিচালিত গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, পুলিশ, দলীয় ক্যাডারদের বাড়াবাড়ি নিয়ে জনমনে যত প্রশ্ন এবং ক্ষোভ থাক, এবার মানুষ সেসবের আর পুনরাবৃত্তি ঘটাবে নাÑএই বিশ্বাস নিয়েই ভোট দিয়ে তাদের তৃতীয় বারের মতো নির্বাচিত করেছে, এ কথাটা শাসকগোষ্ঠীর মনে রাখতে হবে। নইলে বনে যে একদিন সত্যি সত্যি বাঘ এসেছিল এবং সেই রাখাল বালকের কী পরিণতি হয়েছিল, সেই গল্পের কথাটাও মনে রাখতে হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা টানা তিনবারের মতো সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ পরিচালনা করতে চলেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ এক মহা গৌরবের রেকর্ড। বাংলাদেশের যিনি স্থপতি, যার ডাকে বাংলার কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা, সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল, জাতির সেই জনক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাসে আর কোনো শাসককেই বাংলাদেশের মানুষ এ গৌরব লাভের সুযোগ দেয়নি। তিনি বাংলাদেশকে তার পিতার স্বপ্নের বাংলায় রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ। এবার সেই প্রতিশ্রুতি সুসম্পন্ন করার পালা। তিনি উন্নয়নের মহাযাত্রা শুরু করেছেন, দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলেছেন। মানুষ আশা করে, তিনি এবার তার অঙ্গীকার রক্ষা করে সেই যাত্রাকে গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে নেবেন। যার সুফল পাবে সবাই।
পাশাপাশি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনীতির মাপকাঠিতে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার পাশাপাশি, রাজনীতির বিচারে এবং গণতন্ত্রের সূচকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াসে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন। অতীতে রাষ্ট্রপরিচালনা ও গণতন্ত্র নিয়ে, মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতি নিয়ে, পুলিশ-র‌্যাবের ক্ষমতার বাড়াবাড়ি ও অপব্যবহার নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক কথা, অনেক সমালোচনা হয়েছে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার, সংবিধান, বিচার বিভাগ, ইসি-দুদককে সরকার কর্তৃক নিজেদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা নিয়ে হাজারো কথাবার্তা হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের আচরণ, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন, নৈরাজ্য সৃষ্টি নিয়েও কথার শেষ ছিল না।
রাজনীতিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান মতে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন না করে কোনো সরকারের সমালোচনা করা এবং নৈতিক-অনৈতিক যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা করা অত্যন্ত অসৎ ভাবনা। একজন সৎ নাগরিকের পরিপন্থী কাজ। এ কাজ পরিহার করে বিরোধী দলকে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করা উচিত এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নিজেদের ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি জনগণের সামনে হাজির করে তাদের সমর্থন আদায় করে সামনের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
মনে রাখতে হবে, ধ্বংসাত্মক কোনো আন্দোলন, নেতিবাচক রাজনীতি আজকের এই যুগে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ নয়। সে পথ জনগণ কখনোই সমর্থন করবে না। গত ১০ বছর করেওনি। সে কারণেই জনগণ সরকারের অনেক কর্মসূচি সমর্থন করতে না পারলেও বিরোধী দলের পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধা করেছে, ভয় পেয়েছে।
মানুষের মন জয় করতে হলে মানুষের কল্যাণ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের কর্মসূচি চাই। মানুষকে বাদ দিয়ে জনস্বার্থ-রাষ্ট্রস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কেউ যদি কেবলই ক্ষমতা ক্ষমতা করে এবং সেই ক্ষমতা অর্জনের জন্য রাষ্ট্রের বাইরে কোনো শক্তির মদদ কামনা করে, তবে তারা সাময়িক সময়ের জন্য সফল হলেও, আলটিমেটলি তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী হয় না। এর দৃষ্টান্ত একটি-দুটি নয়, ইতিহাসে ভূরি ভূরি। এমনকি যাদের মদদ নিয়ে ক্ষমতা লাভ হয়, একসময় তারাই ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়। একসময়কার শত্রু বা প্রতিপক্ষকে তারা বুকে টেনে নিতে একটুও দ্বিধা করে না তাদের নিজেদের স্বার্থে।
সে কারণে রাজনীতির ক্ষেত্রে সব পক্ষেরই উচিত দেশের স্বার্থে, জনস্বার্থে রাজনীতি করা। যে দেশের রাজনীতিতে জনগণ সম্পৃক্ত নয়, সে দেশের মানুষ ক্ষমতাসীনদের অবজ্ঞা, অবহেলা, অসম্মানের শিকার হয়, সেই দেশের মানুষ উন্নাসিকতায় আক্রান্ত হয়, সরকারের প্রতি উদাসীন থাকে। এতে সরকার উল্লসিত হলেও পরিণাম কখনো ভালো হয় না। ক্ষমতায় থেকে সরকার তার পায়ের নিচের মাটিতে যে ধস সৃষ্টি হয়, তা টের পায় না। একদিন সমূলে তলিয়ে যায়। উদ্ধারের আর কোনো উপায় থাকে না।
আমরা সবাই আধুনিক রাষ্ট্রের কথা বলি। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারি কি না বুঝি না। গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার, জনগণ লেখা, কথা বলা, চিন্তা-ভাবনায় স্বাধীনতা কতটুকু ভোগ করার সুযোগ পায়, তার পরিমাপের ওপর একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ভর করে। স্বাধীনতার গত ৪৭ বছর ধরে গণতন্ত্র ও সুশাসনের এসব শর্ত নিয়ে জনমনে এবং দেশের বাইরেও অনেক প্রশ্ন ছিল। সেসব প্রশ্নের বাস্তব ভিত্তিও ছিল। ৪৭ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই নির্বাচন এসেছে এবং সেই নির্বাচন যখন ক্ষমতাসীনদের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে, তখন ব্যতিক্রমহীনভাবে ক্ষমতাসীনরাই জয়ী হয়েছে, নির্বাচনে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে।
সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চার পরিবেশ সম্প্রসারণে সব পক্ষের উদ্যোগ থাকতে হবে। শুধু রাজনীতির গণতন্ত্রায়ণ নয়, প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সংস্কৃতিচর্চার গণতন্ত্রায়ণও খুব জরুরি। সর্বক্ষেত্রে অবাধ গণতন্ত্রচর্চার পরিবেশ থাকলে একটি রাষ্ট্র অনেক সংকট থেকে মুক্ত থাকতে পারে। বিশেষ করে, গুজব এবং বিদেশি শক্তির অনুপ্রবেশ থেকে সৃষ্ট সংকট থেকে।
অতি সাধারণ মানুষ, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ঘোরতর সমর্থক মানুষেরও কিছু মৌলিক প্রত্যাশা রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের কাছে। তাদের সেই প্রত্যাশা মেটাতে সরকারকে ইতিবাচক এবং অর্থপূর্ণ প্রয়াস দেখাতে হবে। সব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীভাবে গড়ে ওঠার এবং স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির কথা বলার পাশাপাশি সবকিছু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ অবারিত করে দিতে না পারলে আগামী প্রজন্ম মুুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
নতুন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া যা ৪৭ বছরেও অপূর্ণ রয়ে গেছে, তা পূর্ণ করা। সেই অপূর্ণ চাওয়াটি হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে আস্থায় নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং বিরোধী দলেরও সরকারের বিরুদ্ধে সকাল-বিকেল অভিযোগের প্রবণতা থেকে মুক্ত হওয়া। উভয় পক্ষকেই মনে রাখতে হবে, যেটা নিজের পক্ষে সেটাই গণতন্ত্র নয়। যা জনগণের পক্ষে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজেদের স্বার্থে যা অনুমোদন করে, সেটাই গণতন্ত্র। এবার তাই গণপ্রত্যাশা পূরণই হবে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধানতম লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে আমরা সরকার এবং বিরোধী উভয় পক্ষেই আন্তরিক প্রয়াস দেখতে চাই।
আমরা বিশ্বাস করতে চাইব, এবারের নির্বাচন থেকে দেশের বাইরে এই প্রশ্ন, সন্দেহ ও সংশয়ের অবসান ঘটবে। ২০১৮-এর নির্বাচনের পর থেকে ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হলেও কোনো জায়গা থেকেই যেন প্রশ্ন না ওঠে যে ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। এমনকি বিরোধী পক্ষ পরাজয় মেনে নেবে, কিন্তু নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এমন সন্দেহ যেন প্রকাশ করতে না পারে।
২০১৮ সালে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের এই নির্বাচন হোক বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচনের এক নবতর যাত্রা। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনে যত ময়লা-আবর্জনা জমেছিল, সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাক। রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের মনে যত নেতিবাচক প্রশ্ন, রাজনীতিবিদদের নিয়ে যত সন্দেহ-সংশয় সবকিছুর অবসান ঘটবে-সাধারণ মানুষের এই প্রত্যয়, প্রত্যাশা সত্য হোক। পূর্ব দিগন্তের নতুন সূর্যতাপে রাজনীতি, নির্বাচন, সর্বস্তরের মানুষ, কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, আমলা-সবাই শুদ্ধ হোক, ঋদ্ধ হোক। বিরোধী দল, সরকারি দল একে অপরের পরিপূরক হয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশের জন্য দশের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করুক। আমরা সবাই মিলে উন্নয়নের অভিযাত্রায় শরিক হই।
আবারও সবাইকে ইংরেজি নববর্ষ ২০১৯-এর শুভেচ্ছা এবং নির্বাচনে বিজয়ী ও বিজিত সবাইকে অভিনন্দন ঠিকানার পক্ষ থেকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here