বিদ্রোহী কবিতার জীবনবৃত্তান্ত

6

ওয়াকিল আহমদ

রবীন্দ্র-নজরুল প্রসঙ্গঃ নজরুল ইসলামের সমসাময়িক অনেক সুধী, যাঁরা কবির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন, বিদ্রোহী কবিতা রচনা ও প্রকাশোত্তর ঘটনাবলী সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন, তাঁরা পরবর্তীকালে স্মৃতিকথায় ও অনান্য্য রচনায় মতামত ব্যক্ত করেছেন। প্রথমেই আসে নোবেল-লরেট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা।
বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে নজরুল ইসলাম জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে গিয়েছিলেন; তিনি কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করে শোনান। অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের লেখার সূত্র ধরে মুজফ্ফর আহমদ বলেন, ‘‘কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে পড়ে শোনানোর পরে তিনি নজরুলকে বুকে চেপে ধরেছিলেন।’’ (ঐ, পৃ. ২৪০)
ষাটোর্ধ বয়সের প্রবীণ ও নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাংলা কাব্যাঙ্গনে সদ্য আগত তরুণ কবি নজরুল ইসলামের মধ্যে এই সাক্ষাৎকালে কি কথাবার্তা হয়েছিল? অনুমিত হয়, অবিনাশচন্দ্র কবিকে রবীন্দ্র-সন্দর্শনে নিয়ে যান। নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় অস্ত্রের ঝনঝনানি আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ সূত্র ধরে নজরুলকে ‘তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা’র কথা বলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মুজফ্ফর আহমদ বলেন, ‘‘আমি নজরুলের মুখে যা শুনেছিলাম তা হচ্ছে এই যে সাক্ষাতের প্রথম দিনেই রবীন্দ্রনাথ কথাটা নজরুলকে বলেছিলেন।… নজরুল কবি, কাব্যচর্চাই তার পেশা হওয়া উচিত, রাজনীতিতে তার যাওয়া উচিত নয়,- এই সব ভেবেই তিনি তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছার কথাটা বলেছিলেন। অন্ততঃ নজরুল তাই বুঝেছিলেন।’’ (ঐ, পৃ. ৩০০)
‘তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা’র প্রসঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্যটি ছিল এরূপ ঃ “সেদিন সকালে আমি আর নজরুল দুজনে গিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের কাছে। নজরুলকে তার স্বরচিত গান শোনাতে বললেন রবীন্দ্রনাথ। নজরুল গাইলো ‘চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল’, ‘ধ্বংসপথের যাত্রীদল’ আর ‘শিকল পরার ছল’। রবীন্দ্রনাথ খুশী হলেন গান শুনে।… সেদিন দুচারটি কথার পর নজরুলকে বললেন- শুনছি তুমি নাকি মন-যোগানো লেখা লিখতে শুরু করেছো। বিধাতা তোমাকে পাঠিয়েছেন তরোয়াল হাতে, সে তরোয়াল কি তিনি তোমার হাতে দিয়েছেন দাড়ি চাঁছবার জন্যে ? রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলি নিয়ে নজরুল একটা কবিতা লিখেছিলো। তার কবিতা প্রমাণ করলো যে সে রবীন্দ্রনাথের কথার অর্থ ধরতে পারেনি।” [উদ্ধৃতি গৃহীত, নজরুল-চরিতমানস, পৃ. ৮০]
সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯০১-১৯৭৪) ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র। তিনি বামধারা রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন; শ্রমিক-কৃষক দলের মুখপত্র ‘লাঙল’ প্রকাশিত হলে মুজফ্ফর ও নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় ও হৃদ্যতা জন্মে। লাঙলে তাঁর কয়েকটি লেখাও প্রকাশিত হয়। নজরুল ইসলাম ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের উক্ত কথার প্রসঙ্গ টেনে লিখেন- “গুরু কন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচা।” কৈফিয়তে অনুযোগের সুর থাকবেই। ‘তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচা’ প্রসঙ্গটি কবি আজীবন ভুলতে পারেন নি। প্রায় ২০ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অশীতি-বার্ষিকী’ (৭ মে ১৯৪১) জন্মোৎসব উপলক্ষে রচিত ‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি’ কবিতায় এর পুনরাবৃত্তি করে নজরুল বলেন,
মনে পড়ে? বলেছিলে হেসে একদিন,
“তরবারি দিয়ে তুমি চাঁছিতেছ দাড়ি।
যে জ্যোতি করিতে পারে জ্যোতির্ময় ধরা
সে জ্যোতিরে অগ্নি করি হলে পুচ্ছ-কেতু?”
হাসিয়া কহিলে পরে, “এই যশ-খ্যাতি
মাতালের নিত্য সান্ধ্য নেশার মতন।…
মধু-র ভৃঙ্গারে কেন কর মদ্যপান?” [নতুন চাঁদ, ১৯৪৫]।
উল্লেখযোগ্য যে, উক্তিটিতে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি নজরুলের ‘একটা কবিতা’র কথা বলেন, যা পড়ে তাঁর মনে হয়েছিল যে, নজরুল রবীন্দ্রনাথের কথার মর্মোপলব্ধি করতে পারেন নি। কবিতাটি সম্ভবত ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যের অন্তর্গত ‘কিশোর রবি’। রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখেছেন উচ্চবিত্ত ও উচ্চশিক্ষিত পাঠকের জন্য; সমাজের নিচুস্তরের হতভাগ্য ও চিরবঞ্চিত শ্রেণির জন্য নয়। তাই নজরুল এ কবিতায় তাদের জন্য কবিগুরুর কাছে কিছু করুণাবারি বর্ষণ করার আবেদন করেছেন।
ঊর্ধে যারা তাহারা পাইল তোমার পরম দান
নিম্নের যারা, তাদের এবার কর গো পরিত্রাণ।
মরে আছে যারা তারা আজ তব অমৃত নাহি পায়।
তোমার রুদ্র আঘাতে এদের ঘুম যেন টুটে যায়।
শুধু বেণু আর বীণা লয়ে তুমি আস নাই ধরা ‘পরে
দেখেছি শঙ্খ চক্র বিষাণ বজ্র তোমার করে।…
হে রবি, তোমায় নারায়ণরূপে এ ভারত পূজা করে,
যাইবার আগে, জাগাইয়া তুমি যাও সেইরূপ ধরে।…
হউক শান্তিনিকেতন এই অশান্তিময় ধরা,
চিরতরে দূর হোক তব বরে নিরাশা-ক্লৈব্য-জরা।
এই আবেদন-অনুরোধের মধ্যে মিছরির ছুরির মতো অতি সূক্ষ্ম ও ক্ষুরধার অনুযোগও রয়েছে কবির।
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লিখে নজরুল ইসলাম ইংরেজ সরকারের কোপদৃষ্টিতে পড়ে প্রথমে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী হন। ১৭ জানুয়ারি তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে আনা হয়। ১০ ফাল্গুন ১৩২৯ সনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য প্রকাশিত হয়। তিনি গ্রন্থখানি কেবল নজরুলের নামে উৎসর্গ করেই ক্ষান্ত হন নি, নাটকের একটি কপি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে নজরুলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ-পত্রে লিখেন- ‘‘শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু, ১০ই ফাল্গুন, ১৩২৯।’’ বসন্ত ঋতুনাট্যে ‘প্রজ্বলন্ত যৌবনধর্মের অমিত প্রাণশক্তি ও বিদ্রোহের তেজকে বন্দিত’ করা হয়েছে। তিনি তারুণ্যদীপ্ত নজরুলের ব্যক্তিজীবনে ও কবিতায় এসবের চিহ্ন দেখেছিলেন; এজন্য তাঁকেই উপযুক্ত ভেবে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি।
নজরুলকে ‘কবি’ আখ্যা দানের বিষয়টি রবীন্দ্রানুরাগী কোনো কোনো ভক্ত পচ্ছন্দ করেন নি। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ কিছু নিজস্ব মন্তব্য ব্যক্ত করেন। পুরো বিষয়টির ওপর আলোকপাত করে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন- ‘‘জাতীয় জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি।…. উৎসর্গপত্রে তাকে কবি বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কাব্য না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছো। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র। কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এও তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি করে, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈ কি! আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও ঐ সুর বাজত। জনপ্রিয়তা কাব্য বিচারের স্থায়ী নিরিখ নয়, কিন্তু যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য।’’ [‘কবি স্বীকৃতি’, নজরুল জন্মজয়ন্তীঃ রবীন্দ্র সদন, কলকাতা, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৬১]।
বিশ্বকবি এখানেই থেমে যান নি। ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল নজরুল ইসলামকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। ঐদিনই বন্দিদের প্রতি জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হয়ে নজরুল ইসলামকে অনশন ভাঙার জন্য অনুরোধ করে টেলিগ্রাম পাঠান। টেলিগ্রামের ভাষা ছিল এরূপঃ “এরাব ঁঢ় যঁহমবৎ ংঃৎরশব, ড়ঁৎ ষরঃবৎধঃঁৎব পষধরসং ুড়ঁ.” এটি ভুলবশত প্রেসিডেন্সি জেলের ঠিকানায় গেলে “ঞযব ধফফৎবংংবব হড়ঃ ভড়ঁহফ” বলে ফেরত আসে।
সমকালের এক শ্রেণির পাঠক নজরুলের কবিতায় ‘অস্ত্রের ঝনঝনানি’ দেখেছিলেন, তাঁর কবিতার ‘রূপ ও রসে’র সন্ধান করেন নি। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃত রূপ ও রসের সন্ধান পেয়েছিলেন বলেই উৎসর্গপত্রে নজরুলকে ‘কবি’ এবং তাঁর কবিতাকে ‘মহাকাব্য’ বলে আখ্যাত করেন। কবিগুরুর নজরুল-প্রীতি ও কবি-স্বীকৃতি যে কত আন্তরিক ও অকৃত্রিম ছিল, তা তাঁর এরূপ অভিব্যক্তির ও কার্যকলাপের মধ্যে ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সত্যদ্রষ্টা। রবীন্দ্র-নজরুলের উক্ত সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে সৌম্যেন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন, “নজরুল চলে যাবার পর আমাকে বল্লেন- নজরুলের নিজস্ব একটি জোরালো ধরন আছে।” [পূর্বোক্ত, পৃ. ৮০]। এসব উপলব্ধি থেকেই তিনি অল্পকাল পরে প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’ (২৬ শ্রাবণ, ১৩২৯) পত্রিকার উদ্বোধনী বাণীতে কবিকে লক্ষ্য করে বলেন,
আয় চলে আয় ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/ উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলক্ষণের তিলক রেখা/রাতের কালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে/আছে যারা অর্ধচেতন।
(২২ শ্রাবণ, ১৩২৯)
এতে নজরুলের বিদ্রোহী ভাবমূর্তিরই বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎকার, কথোপকথন, ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ ইত্যাদি বিষয় নজরুল ইসলামও ভুলতে পারেন নি, তাঁর স্মৃতিলোকে আজীবন অক্ষয় হয়ে ছিল। কবিদর্শন ও স্নেহপ্রীতির মধুর স্মৃতিচারণ করে পূর্বোক্ত ‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি’ কবিতায় তিনি লিখেন,
ধ্যান-শান্ত মৌন তব কাব্য রবি-লোকে
সহসা আসিনু আমি ধুমকেতু সম
রুদ্রের দুরন্ত দূত, ছিন্ন হর-জটা,
কক্ষচ্যুত উপগ্রহ। বক্ষে ধরি তুমি
ললাট চুমিয়ে মোর দানিলে আশিসি।
দেখেছিল যারা শুধু মোর উগ্ররূপ,
অশান্ত রোদন সেথা দেখিছিলে তুমি।
হে সুন্দর, বহ্নি-দগ্ধ মোর বুকে তাই
দিয়াছিলে ‘বসন্তের’ পুষ্পিত মালিকা।
ভার্জিনিয়া ।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here