সমান্তরাল

6

বিপ্লব দত্ত

বাইরে থেকে দেখলে অঙ্কুশের জীবনযাত্রা অন্যদের মতই। সকাল-বিকাল গতানুগতিক অফিস-কাজ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘরে ফিরে বই পড়া, টিভি দেখা খাওয়া-দাওয়া, ঘুম। অভিযোগহীন, নির্ঝঞ্ঝাট দিনাতিপাত। তারপরও একটা ভাগশেষ থেকে যায়।
অনেকের মধ্যে থেকেও তার নিঃসঙ্গ এবং বেখাপ্লা সত্তাটি সদাজাগ্রত। কেউ বোঝে না, একসঙ্গে চলন-বলনের ভেতরেও কখনো সে ঢুকে পড়ে তার মগ্নচৈতন্যের একান্ত জগতে। এ যেন চেনাজানা পৃথিবীর সমান্তরালে অন্য এক অদৃশ্যমান পৃথিবী যা তার নিয়ত অবচেতন মননের কক্ষপথে আবর্তিত।
আজ সায়ন্তিকার সাথে তার প্রতিশ্রুতি ছিল- অপরাহ্নে, স্বাধীনতা পার্কে। অথচ কথাভঙ্গ করে অঙ্কুশ সময়টা কাটায় পত্রিকা অফিসের সাহিত্য আড্ডায়। কোন কবি-লেখক হওয়ার জন্য নয়; শুধু আবেগ উপচানো দু’চার লাইন লেখালেখির প্রচেষ্টা। বৈপরীত্যই তার কাছে বরাবর আকর্ষণীয়।
রাতে ফোনালাপে প্রিয়তমা এর কৈফিয়ত চাইলে ভরঘুরে প্রত্যুত্তরে বলল- ভুলে গেছি গো, একদম ভুল হয়ে গেছে; অন্তত এ অজুহাতে সম্পর্কটা ভুলুণ্ঠিত করো না, প্লিজ! বিনিময়ে ওপাশ থেকে ভেসে আসে অকথ্য গালাগালি আর সম্পর্কচ্ছেদের তেতো বুলি।
আমার সাথে তার সখ্য অনেকদিনের, স্বভাবেরও। গল্প-কবিতায় পাওয়া এ ধরনের উদ্ভট চরিত্রের সাথে বন্ধুবরের মিলে যায় বটে। বুদ্ধিমানের মত এ দ্বৈরথ তাই সুকৌশলে এড়িয়ে যাই- না জিজ্ঞাস্য, না মন্তব্য।
ছুটির বিকেলে কর্ণফুলির পাড়ে আমাদের সাপ্তাহিক আড্ডা জমে। খোশগল্পের মাঝেও প্রিয় বন্ধুর অন্যমনস্কতা চোখে পড়ে। অথচ সবাই এ বিষয়ে প্রশ্নহীন। কিন্তু কখন যে কৌতূহল ছাপিয়ে সায়ন্তিকার প্রসঙ্গ এসে পড়ে। এখান থেকেই অঙ্কুশের শৌর্য-বীর্য ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয় এবং অবশ্যই বিপ্রতীপ কোণে খিস্তি-খেউর, হাতাহাতি থেকে কিছুটা রক্তারক্তি। অন্য গ্রহের ভাবুক, এতদিনের ভরঘুরে, বিচ্ছেদের অনলে দগ্ধ হয়ে আজ হঠাৎ বনে যায় একেবারে আত্মঘাতী গুণ্ডা।
অবশেষে সিদ্ধান্ত মোতাবেক তার সাথে মাখামাখি এবং কথাবার্তা বন্ধ। প্রিয় বন্ধুকে ছাড়াই জমে সাপ্তাহিক আড্ডা। বাকি দিন যে যার কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি। ভুলে যাই অঙ্কুশ এবং তার সঙ্গিনীর কথা। কিন্তু দু’দিন আগে এক সন্ধ্যায় পাগল-বন্ধু পড়িমরি করে আমার কাছে ছুটে আসে। কার্যকারণটা এই- সায়ন্তিকার মুখোমুখি হয়ে আপাত বিরহটা মিষ্টি মিলনে রূপান্তরিত করতে চায়। দ্বিধা সত্ত্বেও বন্ধুকে নিয়ে তার প্রেমিকার সম্মুখে দাঁড়াই।
আর কোন কথাবার্তা কিংবা সহানুভূতি ছাড়াই কপালে জোটে প্রত্যাখ্যান। শুধু তাই নয়, অতি সারাংশে জানায় যে এখন অন্যের বাগদত্তা!
এমন ফলাফলে অঙ্কুশের শৌর্য অনেকটা বীর্যহীন হয়ে পাগলপ্রায়। ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ে তার অবচৈতণ্যের পৃথিবী- বাস্তব হয়ে যায় নিঃস্ব, নিসঙ্গ। এখানেই ফুলস্টপ হয়ে গেলে ভাল হত। হয়নি-। এর রেশ ধরে দুই ভুবনের সমান্তরালে জেগে ওঠে অঙ্কুশের অন্য এক কদর্য জগত যা কারো কল্পনাতেও ছিল না।
কিছুদিন পর এক বেনামী ফেসবুক একাউন্টে সায়ন্তিকার এক নগ্ন ভিডিও ভাইরাল হয়। ভেঙে যায় অত্যাসন্ন বিয়ে। বাইরে সে মুখ দেখাতে পারে না, বাবা-মার সাথে অশান্তি- সর্বদা নিজের ঘরে স্বেচ্ছাবন্দী। অকস্মাৎ বজ্রপাতে নোণা অশ্রুজল শুকিয়ে যেন মরা কাঠ!
পুলিশ রিমান্ডে অঙ্কুশ তার সব কুকীর্তির কথা স্বীকার করে।
প্রতিহিংসা-! প্রতিশোধপরায়ণ এক যবনিকা। অঙ্কুশ-স্ববিরোধী চরিত্রের এক শিরোনাম। বাস্তবতার সমান্তরালে প্রথমে সে পেয়েছিল স্বপ্ন-রঙিন এক অবচৈতন্যের এক পৃথিবী; পরে আয়ত্ত্বে নেয় প্রতিশোধপরায়ণতা। শেষাঙ্কে তার জীবনে জোটে ঘৃণা আর কদর্য অন্ধকারের এক জগত।
আমরা বন্ধুরা সমবেত হয়ে শুধু ঐ প্রার্থনাই করি, যত ভ্রান্তি আর মোহ কাটিয়ে মাটিতেই ফিরে আসুক মৃন্ময়ী সেই মানুষটি।
হিউস্টন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here