যানজট সমাধানে ওয়াটার ট্যাক্সি

6

চট্টগ্রাম : সড়ক রাস্তাঘাটে যানজট নিত্যদিন। মানুষের ভোগান্তি সীমাহীন। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো অনিশ্চিত। প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে হরেক ক্ষেত্রে অগণিত কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা। রাজধানী ঢাকার মতোই দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং আশপাশে শহরতলীর এলাকাগুলোতে যানজট সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এতে করে আমদানি-রফতানি পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিটি রুটে মান্ধাতা আমলের লক্কড়-ঝক্কড় বাস-মিনিবাস চলাচল করছে, তাও আবার গণপরিবহন চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত। এ কারণে কর্মমুখী হাজারো মানুষের সকাল-দুপুর-বিকেলে সড়কের মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং হঠাৎ করে একটি বাস-মিনিবাস স্টপেজে আসা মাত্রই যাত্রীদের তীব্র হুড়োহুড়ি আর ভিড়ের চাপের দৃশ্যগুলো প্রতিদিনই চোখে পড়ছে। সড়কে গণপরিবহন ও যানজটের এহেন নাজুক দশায় উত্তম বিকল্প হিসেবে বর্তমানে চট্টগ্রামে সচেতন নাগরিক মহলে আলোচিত বিষয় হচ্ছে নৌপথের বাহনে সহজ যোগাযোগ। নিত্যদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য ওয়াটার ট্যাক্সি সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে দেখছেন পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞগণ। তারা মনে করেন, পাহাড়ি খর ¯্রােতা নদী কর্ণফুলী যেহেতু প্রকৃতির আপন নিয়মে সবসময়েই নাব্য থাকে, সেই সুবাদে নদীপথে পতেঙ্গায় চলাচল করা যায় খুব সহজেই। কালুরঘাট ব্রিজ ও কর্ণফুলী সেতুর কিনারে এমনকি আরও উজানের দিক থেকে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা হয়ে পতেঙ্গায় নগরীর শেষ প্রান্তসীমা পর্যন্ত অনায়াসে ওয়াটার ট্যাক্সিযোগে যাতায়াত করা যাবে। এরফলে প্রতিদিন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকবে। যাতায়াতে খরচও অনেকাংশে কমবে। তাছাড়া ওয়াটার ট্যাক্সিযোগে আসা-যাওয়ার পথে বেশ কয়েকটি স্টপেজে প্রয়োজন অনুযায়ী যাত্রীরা ওঠানামা করার সুযোগও পাবেন। সড়কপথে তীব্র যানজটের মতো পানিপথে আদৌ থাকবে না যাত্রী ওঠানামায় দুর্ভোগ। পানিপথে টেকসই উন্নয়ন গবেষক অধ্যাপক সরওয়ার জাহান চট্টগ্রাম মহানগরীতে গণপরিবহন সমস্যা, যানজট ও যাত্রীদের নিত্য-নৈমিত্তিক ভোগান্তি প্রসঙ্গে বলেন, বাড়িঘর থেকে বের হতেই সবার মাঝে এক অনিশ্চয়তা। ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবো তো? প্রতিনিয়ত যারা জীবিকার তাগিদে বের হন তারাই জানেন যানজটের কারণে কতটা দুর্বিষহ কষ্ট সহ্য করে গন্তব্যে যেতে হয়। আধাঘণ্টার পথ যেতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মিত হলেও তেমন সুফল বয়ে আনেনি বলেই মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদগণ। এই দুঃসহ যানজটের কষ্ট থেকে কিছুটা স্বস্তির পথ দেখাতে পারে ওয়াটার ট্যাক্সি। সড়কপথের বিকল্প হিসেবে নৌপথকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হলে যানজট এড়ানো যাবে। তাছাড়া হারিয়ে যাওয়া নৌপথগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে কর্ণফুলী নতুনব্রিজ থেকে পতেঙ্গা বিমানবন্দর পয়েন্ট পর্যন্ত নৌপথে ওয়াটার ট্যাক্সি চালু করা যেতে পারে। এরফলে সড়কপথের ওপর চাপ কমবে। তদুপরি পর্যটনের সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। চট্টগ্রাম নগরীতে বিনোদন কেন্দ্রের অভাব রয়েছে। যেগুলো আছে যানজটের কারণে মানুষ তাও উপভোগ করতে পারে না। চট্টগ্রাম ভৌগোলিকভাবে খুব সুন্দর এক নগরী। একই সাথে পাহাড়-নদী-সাগরের মিলনে এ সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সময়ের দাবি হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীর জন্য নৌপথের বাহন বা ওয়াটার ট্যাক্সি হতে পারে নতুন সংযোজন। ওয়াটার ট্যাক্সিতে ভ্রমণ যেমন খুবই উপভোগ্য তেমনি কম সময়েই গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকে। ফলে যাত্রীদের প্রথম পছন্দ থাকবে এই ওয়াটার ট্যাক্সি। চট্টগ্রাম নগরীটি নদী ও খাল বেষ্টিত। যাতায়াতের জন্য খুব সহজেই কর্ণফুলী নদীসহ খালগুলো কাজে লাগানো যায়। কালুরঘাট, নতুন ব্রিজ থেকে সদরঘাট হয়ে পতেঙ্গা বিমানবন্দর পর্যন্ত পানিপথে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না। অথচ এখন সড়কপথে লাগছে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। এ ব্যাপারে পরিকল্পিত উদ্যোগ নগরবাসীর দাবি। ওয়াটার ট্যাক্সির সুবিধা হলো কম সময়েই স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন যাত্রীরা। পৃথিবীর অনেক দেশ নগরীগুলোতে নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সফলতা পেয়েছে। ভেনিসসহ অনেক নগর নদীপথ ব্যবহার করে একদিকে যেমন শহরের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে তেমনি ভ্রমণকে মানুষের কাছে বিনোদন হিসেবে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। অধ্যাপক সরওয়ার জাহান মনে করেন, ওয়াটার ট্যাক্সি চালু করা হলে এক বছরের মধ্যে যাত্রী সংখ্যা দ্বিগুণ এবং বাহন তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে। দুই শিফটে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে দুপুর আড়াইটা এবং আড়াইটা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত নৌযানগুলো চলাচল করতে পারে। সব মিলিয়ে কমবেশি ২০ থেকে ৩০ জন চেকার ও কাউন্টার মাস্টার ওয়াটার ট্যাক্সিগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি উদ্যোগে যদি অবকাঠামো সুবিধা তৈরি করে তাহলে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিয়ে ওয়াটার ট্যাক্সি পরিচালনা করা সম্ভব। এতে করে খুব সহজেই এ ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। ওয়াটার ট্যাক্সির যাত্রী ধারণক্ষমতা হতে পারে বিভিন্ন ধরনের। যেমন ৩০, ৪০ কিংবা ৫০ সিটের। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ থেকে পতেঙ্গা বিমানবন্দর পর্যন্ত এই দূরত্বে প্রতি শিফটে চলাচলকারী একটি ওয়াটার ট্যাক্সিতে দৈনিক জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হবে ১৫ থেকে ২০ লিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাত্রী ওঠানামার জন্য ৩ থেকে ৫টি টার্মিনাল নির্ধারণ করা যেতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here