নবতর এ যাত্রা শুভ হোক

7

বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন শেষ হয়েছে। নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণ ও নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বার এবং মোট চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। নির্বাচনের ডামাডোল এখন অনেকখানি থিতিয়ে এসেছে। নির্বাচনের বিস্ময় জাগানিয়া ফলাফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে রেকর্ড ২৫৯ আসনে জয়ী হয়েছে। এ বিজয় দলগত আসন এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ফলাফলের হিসেবে এক কথায় ভূমিধস। জোটগতভাবে আওয়ামী লীগ ২৮৮টি আসন পেয়ে ইতিহাস রচনা করে নতুন সরকার নিয়ে নবতর যাত্রা শুরু করেছে। নির্বাচনী সহিংসতায় ১৩ জন, যার অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক, নিহত এবং কয়েক শ আহত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের বিজয়ীরা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছেন। এখন বিজয় ও পরাজয়ের নেপথ্য কারণ নিয়ে নানা কথা চালাচালি হচ্ছে। দেশে-প্রবাসে আমরা এখন প্রায় সবাই রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ।
সবাই এখন মহাজোটের মহাবিজয় এবং ঐক্যফ্রন্টের মহাবিপর্যয় নিয়ে পোস্টমর্টেম করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ দেশে-প্রবাসে বিজয় উদ্্যাপন ও মিষ্টি খাওয়াখাওয়ি করছে। অন্যদিকে পরাজিত ঐক্যফ্রন্টের নেতা-সমর্থকরা নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটছে। আর প্রবাসে ‘মানি না, মানব না’ স্লোগানে প্রতিবাদ-সমাবেশ করে চলেছে। কিছুদিন দুই পক্ষেই একটু বাড়াবাড়ি রকমের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ হতে দেখা যাবে। পরে থিতিয়ে আসবে। এটাই সাধারণত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বহু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। এবার সব রাজনৈতিক দল মূলত দুটি জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। প্রার্থীও ছিলেন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। জামানতও হারিয়েছেন সর্বাধিক প্রার্থী। ধানের শীষেরই ১৬৩ জন প্রার্থীর জামানত খোয়া গেছে। নির্বাচনের ফলাফলকে অনেকেই অভাবিত বলে আখ্যায়িত করছেন। নির্বাচনের ইতিহাসে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ড হয়েছে। নবম সংসদে বিএনপির মাত্র ১৪ জন প্রার্থী জামানত হারান। ওই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের ৪ জন প্রার্থীও জামানত হারিয়েছিলেন। এবার অধিকাংশ আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও জামানত রক্ষা করতে পারেননি ধানের শীষের প্রার্থীরা। অনেকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন, বিএনপি যে ভোটবিপ্লবের প্রত্যাশা করেছিল, তাদের অনুকূলে সেই বিপ্লব না হয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোটবিপ্লব হয়েছে। পরাজিত হয়েছেন বিপ্লবীরা। অবশ্য নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে বাংলাদেশে অনেক রকম কথাবার্তা শোনা যায় পরাজিতদের কণ্ঠে। এটাই চল।
এ প্রসঙ্গে ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বুলানো যেতে পারে। অখ- পাকিস্তানে ১৯৫৪ সালে ও ১৯৭০ সালে দুটি ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দল মিলে শেরেবাংলা ফজলুল হক, আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচন করেছিল। যুক্তফ্রন্টের মার্কা ছিল নৌকা এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মার্কা ছিল নৌকা। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মোট ৩০৯টি আসনের মধ্যে ৩০০টি আসনে এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করেছিল। ওই বিজয়কে অবশ্যই ভূমিধস এবং রেকর্ড বিজয় বলা যায়। বিজয়ী হয়েও ওই দুটি নির্বাচনে বাঙালিরা রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পায়নি। ১৯৫৪ সালে কিছুদিন সরকার পরিচালনার পরই কেন্দ্র ৯২-ক ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বাতিল করে দেয়। আর ১৯৭০ সালে ভূমিধস বিজয়ের পরও পাকিস্তানে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি আওয়ামী লীগকে। যার ফল মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু এ কথা কখনো ওঠেনি যে আওয়ামী লীগ ভোট ডাকাতি করে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে।
বাংলাদেশে এখন অবশ্য একটি কালচার জন্ম নিয়েছেÑহারলেই কারচুপির অভিযোগ। কেউ আর নিজেদের ভুলত্রুটি-দুর্বলতার দায় নিতে চায় না। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাও রাখে না। সংগঠনের শক্তি থাক না-থাক, মানুষের গ্রহণ করার মতো রাজনীতি থাক না-থাক, নেতৃত্বের মেধা, দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা থাক না-থাক, হারলেই কারচুপির অভিযোগ। এতে সাময়িক সান্ত¡না কতটা জোটে কে জানে, তবে ভবিষ্যতে সাফল্যের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় না। আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে হলে বিএনপি ও তার মিত্রদের এসব বিষয় নিয়ে পজিটিভ ভাবনা ভাবতে হবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা আবারও নতুন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে প্রায় অর্ধশত সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পরপরই বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি সব মানুষের প্রধানমন্ত্রী।’ কথাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তবে কথাটা বলা যত সহজ, বাস্তবে তা করে দেখানো ততটাই কঠিন। আমরা আশা করি, এত বিপুল সমর্থন নিয়ে যিনি জয়ী হয়েছেন, তার পক্ষে বাস্তবে তার প্রমাণ রাখাটা কঠিন হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই বোঝেন যে নিরঙ্কুশ বিজয় যেমন নিরঙ্কুশ ভালো কাজের শক্তি জোগায়, তেমনি নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাচারিতার পথও প্রশস্ত করে দেয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন (‘আমি সব মানুষের প্রধানমন্ত্রী’- ঠিকানা, পৃষ্ঠা ৩৯, তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০১৯), আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১০ বছরের উন্নয়নের সুফল পাওয়ার জনগণ আবারও নৌকায় ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এ কথাটাও অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে গত ১০ বছরে সুফলভোগী কিছু চাটুকার এবং তোষামোদকারী গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। তোষামোদ এবং চাটুকারিতা অনেক আদর্শবাদী এবং দৃঢ়চেতা নেতাকেও ভুল পথে পা বাড়াতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের মানুষ আশা করে, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা যেমন জনগণকে নানা উসকানি এবং ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকতে বলেছেন, তেমনি তিনি নিজেও চাটুকার, মোসাহেব সম্পর্কে সজাগ থাকবেন এবং সবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করে তার প্রমাণ রাখবেন। তিনি নতুন যে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, সেই মন্ত্রিসভাও যাতে জনগণের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে, সেদিকে নজর রাখবেন। মানুষ যেন দৃশ্যমানভাবে অনুধাবন করতে পারেন-তিনি প্রকৃত অর্থেই সবার প্রধানমন্ত্রী। কোনো প্রতিহিংসাপরায়ণতায় আক্রান্ত নন।
আগামী পাঁচ বছর মেয়াদে উন্নয়নের পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসনের উন্নয়ন দেখতে চাইবে মানুষ। ক্ষমতার হানিমুন কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ প্রধানত ক্ষমতাসীনদেরই সমালোচনা করে। তাই তিনি তার মন্ত্রীদেরও জনগণের জবাবদিহির মধ্যে থাকতে বাধ্য করবেন। মানুষকে খুশি করা পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ। মানুষের প্রত্যাশা কখনো শেষ হয় না। স্বপ্ন দেখাও শেষ হয় না। এবার বিশেষ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনার ‘জিরো টলারেন্সের’ অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন সবাই দেখতে চাইবে।
আর শেষ কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমরা প্রত্যাশা করি, আপনি কেবল বাংলাদেশের সবার প্রধানমন্ত্রী হবেন না, প্রবাসী বাঙালিদেরও আপনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাক, তারা বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেই নিজেদের মনে করে। তাদের অনেক আশা, অনেক প্রত্যাশা, যা অপূর্ণই রয়ে গেছে। প্রবাসীদের এসব প্রত্যাশা অবাস্তব বা অযৌক্তিক নয়। আপনি এবারের টার্মে অন্তত সেসব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবেন।
আপনার নবতর এ যাত্রা শুভ হোক, নিষ্কণ্টক হোক। আপনার সাফল্য, সুস্থতা ও দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here