বিভক্তির পথে আমেরিকা

ইমিগ্রেশন সংস্কার ॥ শাটডাউন ও দেয়ালের রাজনীতি ॥ ট্রাম্পের একগুঁয়েমি

8

মঈনুদ্দীন নাসের : দেশের দক্ষিণ সীমান্ত নিয়ে দেয়ালের রাজনীতি পুরো আমেরিকাকে দ্বিধাবিভক্তর পথে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের সাথে রিপাবলিকান সিনেট আর তার বিরুদ্ধে হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পলোসির ও সিনেট মাইনরিটি লিডার চাকশুমার। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এককথা তিনি ফেডারেল চাকরি বা ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতার জন্য শাটডাউন খুলবেন না। কারণ ট্রাম্প চান দেয়াল। মেক্সিকোর সীমান্ত দিয়ে এদেশে যে ড্রাগ চোরাচালানী, টেরোরিস্ট ও অন্যান্য কুচক্রী ঢুকছে তাদের প্রতিহত করতে দেয়াল এর প্রয়োজন। কিন্তু ডেমক্রেট নেতৃবৃন্দের কথা হচ্ছে দেয়াল কোনো সমাধান নয়। কারণ ন্যান্সি পলোসির ভাষায় দেয়াল এক অনৈতিক বিষয়। দেয়াল নির্মাণ নৈতিকতা বিবর্জিত একটি বিষয় যা দিয়ে সীমান্ত সমস্যা সমাধান করা যাবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দু’দফা বৈঠক করেও এর কোনো সমাধান হয়নি। এখন ডেমক্রেটরা মনে হচ্ছে কোনো আপসকামী ভূমিকা নিবে না। প্রায় তিন সপ্তাহ চলছে আংশিক শাটডাউন। ফেডারেল সরকারের ৮০০০০০ লোক বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। বেতন না নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, বর্ডার ওয়ালে অর্থ যোগান ছাড়া শাটডাউনের জন্য ফান্ড নিলে তাকে বোকার মতো দেখাবে। এক সময় তিনি বলেছেন, ‘আমি এখন গোবেচারা। আমি এখন একা।’
সুতরাং এখন প্রশ্ন ৮০০,০০০ লোকের কী হবে? সরকার এর কি কোনো দায়িত্ব নেই? কারণ ট্রাম্প বলেছেন, তিনি শাটডাউনের মেন্টল বহন করতে গৌরব বোধ করবেন। অর্থাৎ তিনি শাটডাউনের জন্য তেমন উদ্বিগ্ন নন। কোনো সময় বলেছে, বছরের পর বছর চলতে পাওে এ শাটডাউন। কোনো দায়িত্ববোধ তার নেই। (!)
ডেমক্রেটপন্থি ডেট্টয়েট নিউজ সম্প্রতি এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, ডেমক্রেটরা ট্রাম্পের মুখরক্ষা করে বিরাট লাভবান হতে পারে। প্রেসিডেন্ট দেয়ালের জন্য চাচ্ছে ৫.৬ বিলিয়ন ডলার যা তার পূর্বের চাহিদা ২৫ বিলিয়ন বা ৩০ বিলিয়ন ডলারের দাবির চাইতে ঢের কম। আর ৫.৬ বিলিয়ন ডলার উল্লেখযোগ্য পরিমাণের অর্থ হলেও তা দেশের ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বাজেটের মধ্যে মাত্র সোফা পরিবর্তনের অর্থ বলে মনে হয়।
ডেমক্রেটরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করতে পারেন এই ৫.৬ বিলিয়ন ডলার দিয়ে তিনি কী কিনতে চান। আর সে অর্থ দিলে যদি ডেমক্রেটরা ‘ডাকা’ কর্মসূচির অধীনে ড্রিমার যারা এদেশে পিতা-মাতাদের মাধ্যমে অবৈধভাবে এসেছেন তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের দাবি আদায় করতে পারে তাহলে তা একটা যুৎসই বার্গেনিং হতে পারে। ট্রাম্পও মনে করেন ডাকা (উঅঈঅ) সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু তিনি তা দরকষাকষির বিষয় করতে চান। সম্ভবত বিষয়টা এখন টেবিলে রাখার উপযুক্ত সময়। কিন্তু পেলোসী ও শুমার এভাবে কোনো সমাধানে আগ্রহী নন বলে মনে হয়। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ট্রাম্পকে পরাজিত করা। কারণ ঢের হচ্ছে তার দেনার হিসেব। ডেমক্রেট নেতারা ট্রাম্পকে থামিয়ে দিতে এত বেশি কৌশলী যে, তারা দেয়ালে অর্থায়নের মাধ্যমে ট্রাম্পকে তার ক্যাম্পেইন প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করতে দিতে চান না।
সীমান্তের বর্ডার পেট্রোল এজেন্টরা দু’সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের সাথে দেখা করে দেয়াল সীমান্ত রক্ষার জন্য কার্যকর হবে, তা বলে গেলেও দেয়ালের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বাস্তবতা হচ্ছে যে, সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার্থে কয়েক স্তরের ব্যবস্থা চাই। তারমধ্যে কয়েক স্থানে ব্যারিয়ার নির্মাণ ও অন্যান্য কৌশল রয়েছে।
এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, এতদূর গড়ানোর পর প্রেসিডেন্ট তার দেয়াল নির্মাণের দাবি ছেড়ে দিবেন। কিন্তু ট্রাম্প দরকষাকষি করতে চান বলে কঠিন সিগন্যাল দিয়েছেন।
আর তাতে বিষয়টা এমন হতে পারে যে, ট্রাম্পের দাবি ৫.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ট্রাম্পকে মানানো যাবে। রিপাবলিকানরা পরামর্শ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ২.৫ বিলিয়ন ডলারেও সেটেল করতে পারেন।
তারা ফান্ড দেয়ার পরিবর্তে অনেক বেশি ইমিগ্রেন্ট আসার সুযোগ কিংবা আরও গেস্ট ওয়ার্কার প্রোগ্রামে লোক আনার কথা বলতে পারেন। ডেমক্রেটরা এসব বিষয়কে তদের বিজয়ে এবং ট্রাম্প অর্থ নিয়ে তার বেসকে খুশি করতে পারে।
অন্যদিকে সিনেটরদের একটা অংশ এই দেয়ালকে পুরো ইমিগ্রেশন সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখার চিন্তা করছেন। দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা সংস্কারের মূলে এই দেয়াল রাজনীতির উৎপত্তি। আর ইমিগ্রেশন সংস্কারের কঠিন পথ অতিক্রমে এই সুযোগ কাজে লাগানো যায়। আর ট্রাম্প ও ডেমক্রেটরা যখন ২৫ শতাংশ সরকার বন্ধ করে দেয়াল রাজনীতি করছেন তখন এই দুই পক্ষের সিনেটর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইমিগ্রেশন বিষয়ের পুরো সংস্কার চায়।
এক সময়ের ডেমক্রেট ও বর্তমানে রিপাবলিকান সিনেটর রিচার্ড শেলবি (রিপাব-আলাবামা) বলেন, ইমিগ্রেশন বিষয়টা এবার চাঙা হয়েছে। এখন দেখা যাবে, তাতে পা গজিয়েছে কিনা? গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প ও কংগ্রেস লিডার ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি কার্স্টেন নিয়েইলসন এর সাথে বৈঠকে ইমিগ্রেশন সংস্কার বিষয়টা আবার উঠে আসে। কিন্তু ইলিনয়ের ডেমক্রেট সিনেটর ডিক ডায়াবিন বলেন, ইমিগ্রেশন সংস্কার নিয়ে ট্রাম্পের সর্বসমক্ষে পরিষ্কার ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এনিয়ে আলোচনা তিনি করতে নারাজ। ডারবিন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তবে শাটডাউন ক্লোজ করার অন্যতম উপায় ইমিগ্রেশন বলে অনেকে মনে করেন। ডেমক্রেটদের মধ্যে নতুন যারা এসেছেন তারা কঠোর পথ নিয়ে পেলোসীকে চাপ দিবেন। ট্রাম্প আবার অন্যদিকে রক্ষণশীলদের সমালোচনায় কাতর হয়ে পড়েন। কারণ এই রক্ষণশীলদের ভোট নিয়ে তিনি ক্ষমতায়। মনে হচ্ছে ট্রাম্প এ কারণে ২.৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে দরকষাকষি করতে নারাজ। তার দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা চাচ্ছেন ইমিগ্রেশন দরকষাকষির টেবিলে নিয়ে আসতে।
এদিকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সিনেটর জো মানচিন (ডেমোক্রেট) ২০১৩ সালের ইমিগ্রেশন বিল যা সিনেটে পাস হয়েছিল কিন্তু রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত হাউজে বাতিল হয়েছিল ওবামার আমলের সেই বিল আবার উত্থাপনের কথা বলেন। মানচিন একমাত্র ডেমক্রেট যিনি কভানাহকে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি পদে ভোট দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ঐ বিলে অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট পপুলেশনের নাগরিকের কথা যেমন আছে আবার ৪০ বিলিয়ন ডলার বর্ডার সিকিউরিটির অর্থের কথাও আছে।
টেনেসির রিপাবলিকান সিনেটর লামার আলেক্সান্ডার ব্যাপক ইমিগ্রেশন সংস্কারের জন্য ট্রাম্পকে দরকষাকষি করতে বলেন, যা তার জন্য নিক্সনের চীন সফরের মতো গৌরব বয়ে আনবে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট কেন তা করবেন না। কারণ আমরা এখন নতুন কংগ্রেস পেয়েছি। আর এখন সরকার দ্বিধাবিভক্ত।
মেইনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স বলেন, শেষবার ২৫ বিলিয়ন ডলার বর্ডার সিকিউরিটির জন্য ডাকা বাস্তবায়নের কথা ছিল। এই বিল পাস হয়নি কারণ গত বছর
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি তা মানেননি এবং ট্রাম্প তাতে ভেটো দেওয়ার হুমকি দেন। ওহাইওর সিনেটর রিপাবলিকান রব ডিপার্টম্যানও একই কথা বলেন।
নতুন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসী গত বছর বলেছিলেন দুটি দুই ইস্যু। ডারবন বলেন, ট্রাম্প ইমিগ্রেশন সংস্কারের কথা বলেছিলেন, এখন তিনি তা করতে পারবেন।
কংগ্রেসে ট্রাম্পের চিঠি
গত ৪ জানুয়ারি শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, কংগ্রেস সদস্যদের কাছে এক চিঠি পাঠান। তিনি চিঠিতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে কার্যকর সীমান্ত নিরাপত্তার কথা বলেন। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে তিনি অনেক কথা বলেন, এরপর গত শনিবার কংগ্রেস স্টাফ ও হোয়াইট হাউজ স্টাফ ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারির সাথে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসীর বাদানুবাদের মধ্যে বৈঠক শেষ হয় কোনো কার্যকরী উদ্যোগ না নিয়ে। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল পেন্সও সেখানে ছিলেন। পেলোসী নেইল কার্স্টেন এর পরিবেশিত তথ্যকে বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প তার চিঠিতে বিশেষ করে যা বলেছিলেন তা হলো :
* ২০১৮ অর্থ বছরের সীমান্তে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন ১৭০০০ বয়স্ক ক্রিমিনাল রেকর্ডধারীকে গ্রেফতার করেছে।
* ২০১৭ ও ২০১৮ অর্থবছরে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) অন্তত ২৩৫,০০০ বিদেশিকে বিভিন্ন ক্রিমিনাল অভিযোগ অথবা যুক্তরাষ্টের মধ্যে দ-িত লোককে গ্রেফতার করেছে। তারমধ্যে প্রায় ১০০,০০০ মারামারির জন্য, ৩০,০০০ যৌন অপরাধের জন্য এবং ৪০০০ হত্যাকা-ের জন্য।
* বর্তমানে দক্ষিণ সীমান্তে গড়ে ৬০,০০০ অবৈধ ও প্রবেশ অনুপযুক্ত লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
* গত মাসে একাই ২০,০০০ শিশুকে আমেরিকায় পাচার করে আনা হয়েছে। (তার কোনো ভিত্তি নেই)।
* ইমিগ্রেশন কোর্টে ৮০০,০০০ মামলা জমাট হয়ে রয়েছে।
* গত পাঁচ বছরে এসাইলাম আবেদন ২০০০ শতাংশ বেড়েছে। অধিকাংশ আসছে মধ্য আমেরিকা থেকে। আর ১০ জনে ৯ জন এসাইলাম আবেদনকারী যারা মধ্য আমেরিকার তাদের আবেদন এসাইলাম কোর্ট নাকচ করছে। আর আবেদনকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
* ২০১৭ অর্থবছরে ১৩৫,০০০ অবৈধ এবং প্রবেশ অনুপযুক্ত লোক মধ্য আমেরিকা থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে ২ শতাংশেরও কম এদেশ থেকে সফলভাবে বিতাড়ন সম্ভব হয়েছে। তার কারণ সম্পদ স্বল্পতা ও ফেডারেল আইনে অসঙ্গতি।
* ২০১৯ সালে দেখা গেছে ২০১৮ সাল থেকে ক্যাসিলি ইউনিটে ২৮০ শতাংশ বৃদ্ধি।
* ৩০০ আমেরিকান হিরোইন থেকে মারা যায়। তাদের মধ্যে আমাদের দক্ষিণ সীমান্তে ৯০ শতাংশ মৃত্যুবরণ করেছে।
* অবৈধ ইমিগ্রেশন মানবিক সমস্যা। ৩ জনের মধ্যে একজন যৌন নীপিড়নের শিকার। আমেরিকায় আসার পথে যৌন পীড়নের শিকার হয়েছেন। ৫০ জন অবৈধ মাইগ্রেন্টকে প্রতি সপ্তাহে এ কারণে মেডিকেল রেফারেল দেয়া হয়েছে। কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন প্রতিবছর ৪৩০০ লোককে ভয়ঙ্কর ও বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে রক্ষা করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট প্রগতিশীল নয়। সকল ব্যবস্থায় তা অবৈধ। অন্যায় ও দিকনির্দেশনাহীনও নির্মম। অনেক লোক তাতে মারা যায়। কিন্তু তার চিঠিতে এসব নিরসনে দেয়াল কিংবা ফেন্স নির্মাণের কোনো কথা বলা হয়নি।
তিনি এসবের সমাধানে (১) ফ্লোরস সেটলমেন্ট চুক্তি যে চুক্তি রিম্যুভালের মাধ্যমে একসাথে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে তা বাতিলের কথা বলেন। (২) ট্রাফিকিং ভিকটিম প্রটেকশন রিঅথরাইজেশন এক্ট (ঞঠচঘঅ) সংশোধন করে অবৈধদের নিরাপদ বহু মানবিকভাবে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার কথা বলেন।
তিনি এ বিষয়ে উভয় দলকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে বলেন। এ চিঠিতে তিনি দেয়াল নিয়ে কোনো কথা বলেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here