জীবনসায়াহ্নেও পূরণ হলো না সাধ

দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত এরশাদ

6

নিজস্ব প্রতিনিধি : জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়েও ক্ষমতার মোহ কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার শেষ জীবনের ইচ্ছা জাতীয় সংসদের সর্বাধিক সম্মানিত স্পিকারের পদ। সরকারি দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা রয়েছে। নির্বাচনে বিএনপি ভালো ফলাফল করলে সংসদ ঝুলন্তও হতে পারে, এমন ধারণায় কূটকৌশলী এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর পদটি বাগিয়ে নেওয়ার চিন্তাও করছিলেন। বিএনপির সঙ্গে তার যোগাযোগও ছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল এবং এরশাদের শারীরিক অবস্থার অভাবনীয় অবনতি সব হিসাব-নিকাশ, পরিকল্পনা ওলট-পালট করে দেয়।
এরশাদ কয়েকটি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। হৃদ্্রোগ ছিল আগেই। তিনটি ব্লক ধরা পড়েছে। নতুন করে কিডনি জটিলতা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো হিমোগ্লোবিন ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। কদিন পর পরই রক্ত দিতে হয়। প্রোস্টেডের চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে। ঢাকায় চিকিৎসকেরা এরশাদ ক্যানসার আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করে চিকিৎসাও শুরু করেন। সিঙ্গাপুরে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার বিষয়টি পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়ে মারাত্মক এক জীবাণুর অস্তিত্ব। তবে প্রাথমিক অবস্থায় থাকায় যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এরশাদ। জি এম কাদেরকে বাসায় ডেকে এনে জাতীয় পার্টির প্যাডে নিজ হাতে লিখে সই করে এরশাদ ছোট ভাই কাদেরকে তার অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন। এ সময় দুই ভাই একে অপরকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কো-চেয়ারম্যান হিসেবে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদেরই এরশাদের অবর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু রওশন জি এম কাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে আপত্তি করেননি। তার সম্মতিতেই এরশাদ কাদেরকে দায়িত্ব দেন। রওশন জানেন তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা। তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত। আগামী তিন মাসের মধ্যেই এরশাদ দলীয় ফোরামে তার অবর্তমানে জি এম কাদেরের পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। এরশাদ কিডনি ও ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত বলে তার চলাচল, দৈনন্দিন জীবন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। মূলত এ কারণেই রংপুর এবং ঢাকায় নিজ নির্বাচনী এলাকায়ও তাকে দেখা যায়নি। তার পরও নির্বাচনে তার দল ২২টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিও খালি মাঠে গোল দিয়েছে। তবে বৃহত্তর রংপুরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন নির্ধারিত থাকায় সম্মানজনক অবস্থান পেতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। বিএনপিসহ নিবন্ধিত সবগুলো দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হওয়ায় এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি তেমন একটা বিতর্কিত হয়নি। সমস্যা হচ্ছে এরশাদের প্রচ- শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং পার্টির সাংগঠনিক সংকট। প্রায় ৯০ বছর বয়স্ক এরশাদের পক্ষে শারীরিক সমস্যা নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানো সম্ভব নয়। চিকিৎসকরা তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। এ অবস্থায় পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ দ্বিতীয় শীর্ষ নেতৃত্বের পদে থাকলেও তিনি এরশাদের বিশ্বস্তজন নন। ব্যক্তিগতভাবেও তারা ঢাকায় ভিন্ন বাসায় থাকছেন গোড়া থেকেই। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব তাকে দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলেই মনে করেন। জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা জানান, এরশাদের একমাত্র এবং দ্বিতীয় পছন্দে রয়েছেন তারই ছোট ভাই জি এম কাদের। রওশনও শারীরিকভাবে সুস্থ নন। তার সততা, ভাইয়ের প্রতি বিশ্বস্ততা, পার্টির প্রতি নিষ্ঠা প্রশ্নহীন হলেও পার্টিতে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা নেই। অপরদিকে সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা, অনিচ্ছাকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে এরশাদকে।
এরশাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, শেষ জীবনে তার একান্ত ইচ্ছা জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদে বসা। সম্মানিত এ আসনটিই তার কাম্যের কথা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ও অবহিত রয়েছে। বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ের বিবেচনায়ও রয়েছে। তবে তার শারীরিক অসামর্থ্যতা এবং বর্তমান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির আসনে থাকার বিষয়টি নিয়ে ভাবা হচ্ছে। কোনো কারণে একাদশ সংসদে শিরীন শারমিন স্পিকার হিসেবে না থাকলে তাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যাবে। তবে সে সম্ভাবনা কম। স্পিকার হিসেবে শিরীন শারমিনের ভূমিকায় সরকারি দল সন্তুষ্ট। সরকারের দিক থেকে নতুন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের শক্তিশালী নেতৃত্ব কামনা করা হচ্ছে। দশম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদের ভূমিকা ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিল। এতে জাতীয় পার্টি যেমনি সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শারীরিক সামর্থ্য সাপেক্ষে এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেখার ইচ্ছা সরকারি মহলেও। শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে এরশাদকে স্পিকার বা বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেখার সম্ভাবনা রয়েছে। রওশন এরশাদ নতুন সংসদেও বিরোধী দলের নেত্রীর আসনটি শর্ত সাপেক্ষে ছাড়তে রাজি। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ পেতে চান তিনি। সরকারের শীর্ষ মহল জাতীয় পার্টিকে সরকারে না নিয়ে বিরোধী দলে রাখার পক্ষে। জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী, নির্বাচিতরা ও নেতারা চান পার্টি সরকারের অংশীদার হিসেবে থাকুক। ক্ষমতার মোহমুক্ত হতে পারছেন না। দল ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় পার্টিকে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে দেখতে চন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।
এরশাদ শপথ নিলেও সংসদে খুব একটা আসা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদেরই বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করবেন। কাদেরের ব্যক্তিগত সততা প্রশ্নহীন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিশ্বস্ত এবং ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার জি এম কাদেরকে পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে দেখার বিষয়টি শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে বলে জানা যায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জি এম কাদেরের নির্বাচন-পূর্ববর্তী একান্ত বৈঠকে এ বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় বলে জানা যায়। এরশাদের নিজেরও ইচ্ছা ছোট ভাই কাদেরের হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া। নতুন বছরেই তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন। তবে দায়িত্বমুক্ত হলেও রাজনীতি থেকে বিদায় নিচ্ছেন না এরশাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here