মহাবিপদে বিএনপি

নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা

5

নিজস্ব প্রতিনিধি : বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিশাল জয়ের পরও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার, দেশের অগ্রযাত্রা ও গণতন্ত্র কি নিরঙ্কুশভাবে নিরাপদ? দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের কুচক্রী মহল, সন্ত্রাসী, জঙ্গিদের মাধ্যমে অস্থিরতা, নৈরাজ্য সৃষ্টির পরিকল্পিত প্রয়াস চালাতে পারে মর্মে আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের আইনগত লড়াইয়ের পরিস্থিতি নিয়েও শঙ্কা আছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা অধিকতর শক্ত হাতে অনাকাক্সিক্ষত সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন বলে সরকারদলীয়রা মনে করেন। প্রশ্ন উঠেছে বিদেশিদের, বিশেষ করে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্ব এ পর্যায়ে নমনীয় হলেও শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন ও সম্ভাব্য পরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে নেয়।
৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের আগে ও পরে দেশজুড়ে প্রাণ ও সম্পদহানিকর ব্যাপক অরাজক, ধ্বংসাত্মক ঘটনাবলি দেশ ও বিদেশের মানুষ মেনে নেয়নি। সরকার ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে ভয়ংকর সে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে।
তফসিল ঘোষণার পর দেশের অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক গোলযোগ হলেও ভোটের দিন তেমনটি হয়নি। ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির অভিযোগ, তাদের এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি, কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। সরকারদলীয় অস্ত্রধারীরা প্রশাসনের সহায়তায় ভোটের আগের দিন রাত থেকে ভোটের সারা দিন ভোটকেন্দ্রসমূহ দখল করে রাখে। রাতেই তারা জালভোটে সিল মেরে বাক্সে ঢোকায়। নির্দিষ্ট সংখ্যক সরকারদলীয় লোকজন অসংখ্য জাল ভোট দিয়েছেন। ভোটকেন্দ্রে বিএনপি, ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্প, পোস্টার, কর্মীদেরও দেখা যায়নি। বাইরে সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ বজায় রেখে পোলিং অফিসার, সহকারী পোলিং অফিসার হিসেবে কর্মরত সরকারি কর্মচারী, দায়িত্বরত পুলিশের সহযোগিতায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভোট চুকিয়ে রাখা হয়। বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের এজেন্ট না থাকায়, থাকতে না দেওয়ায় তা চ্যালেঞ্জ করারও কেউ ছিল না।
বিএনপির নেতাদের এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে সরকারি দল দাবি করেছে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিএনপির কর্মীরা আগেই সরে পড়েন। একই কারণে তাদের পোলিং এজেন্টরাও দায়িত্ব পালন হতে বিরত থাকেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের মতে, দেশের মানুষ উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার হাতকে অধিকতর শক্তিশালী করতেই নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়েছেন।
দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা অনেক ভোটার ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে আগে থেকেই এ ধারণা দৃঢ় হয়েছে যে বর্তমান সরকারই আবার ক্ষমতায় আসছে। বিএনপি ও ঐক্যজোটের প্রার্থী, কর্মী-সমর্থকদের নির্বাচনী তৎপরতার অনুপস্থিতি এর অন্যতম কারণ। প্রধানত এ কারণে অনেক ভোটার ভোট দিতে আগ্রহী হননি। দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা ও হেফাজতে ইসলামের কর্মী, সমর্থকরাসহ ধর্মপ্রাণ মানুষদের বড় অংশই বিএনপি, ঐক্যজোটের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা না দেখে নৌকা প্রতীকেই ভোট দিয়েছেন। তরুণ প্রজন্ম ও ভাসমান ভোটারদের অধিকাংশই নৌকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে তারা মনে করেন।
নির্বাচনের আগের রাতে পুলিশ ও সরকারদলীয় কর্মীরা বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের এজেন্ট ও নেতৃস্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে এমন ভীতি প্রবলভাবেই ছিল যে নির্বাচনের পর তাদের নিরাপদ জীবনযাত্রার স্বার্থে সক্রিয় না থাকা জরুরি। বিএনপির মহাসচিব দলের কর্মীদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরও অধিকাংশ কেন্দ্রেই বিএনপির কর্মীদের দেখা যায়নি। খোদ রাজধানী শহরে দৈনিক পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেলসমূহের সাংবাদিক, বিদেশি সাংবাদিক, দেশি-বিদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যবেক্ষক থাকায় এখানে সরকারদলীয় কর্মীদের ও পুলিশের আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ অনেক কম ছিল। সে ক্ষেত্রে দেশে তেমন একটা না হলেও বিদেশে তা ব্যাপক প্রচারের ঝুঁকি সরকার নেয়নি। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থকরা কোনো ঝুঁকিই নেননি। বিএনপি যেখানে এ নির্বাচনকে তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে, সেখানে দলটির নেতা-কর্মীরা ঝুঁকিমুক্ত সাহসী ভূমিকা নিলেন না কেন? দৃশ্যমানভাবে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি দলের বিপক্ষে নতুন কৌশলে ইঞ্জিনিয়ারিং, জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু তাদের অভিযোগসমূহ প্রমাণ করা দুরূহ। বিদেশিদের কাছে তাদের এমনি সব অভিযোগ কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা দেখার বিষয়। অবশ্য বিবিসিসহ কয়েকটি বিদেশি মাধ্যম প্রামাণ্যচিত্র দেখিয়েছে।
ঢাকাস্থ জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। নির্বাচন-পূর্ববর্তী সহিংসতার ঘটনাগুলো ছাড়া ভোটের দিন ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিরোধীদলীয় প্রার্থীর নির্বাচন থেকে শেষ পর্যায়ে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা বিদেশিদের কাছেও উদ্বেগের বিষয়। পশ্চিমা বিশ্বসহ বিদেশিদের সমর্থন, সহানুভূতি লাভই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের মুখ্য উদ্দেশ্য। ড. কামাল হোসেন এতে সফল হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না। এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বিএনপির অনেকের প্রয়াসও অনেকাংশেই বিফল হয়েছে। বিদেশিরা যাতে নির্বাচনী ফলাফল মেনে না নেয়, সে জন্য নানামুখী তৎপরতাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরান নির্বাচনকে মেনেই নিয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। ফলাফল মেনে নিয়ে সংসদে যাওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক-মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করেছে এই ফলাফল। বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় আনলেও এসবের আইনগত, বিধিসম্মত প্রতিষ্ঠা দেওয়া সহজসাধ্য নয়। মাঠে নামার মতো রাজনৈতিক, সাংগঠনিক শক্তিও নেই। জীবনযুদ্ধে লিপ্ত সাধারণ মানুষকে তারা সম্পৃক্ত করতে পারেননি। তারা নীরব বিপ্লবের আশায় ছিলেন। নতুন করে মামলা, গ্রেফতারের ভয়ে কর্মীরাও মাঠে নামতে এখন আর সাহসী হবেন না। ৫ জানুয়ারির পরবর্তী ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালানোর শক্তি জামায়াতের খুবই সীমিত। আঞ্চলিক একটা শক্তি সন্ত্রাসী, জঙ্গিদের ব্যবহার করতে পারে বলে গোয়েন্দাদের আশঙ্কা। তাদের হামলার ধরনও হবে ভিন্নতর। পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চতর পর্যায়ে তারা টার্গেট করে হামলা চালাতে পারে। উদ্দেশ্য সরকারকে স্থিতিশীল হতে না দেওয়া। সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণসহ তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here